ওরা মানুষকে জাদু শিখিয়েছিল — আল-বাক্বারাহ ১০২-১০৩

চৌধুরী সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সাবধানে এদিক ওদিক তাকিয়ে মগবাজারে এক অন্ধকার গলির ভেতর একটা দোকানে ঢুকছেন। সেই দোকান এক বিখ্যাত মন্ত্রগুরুর। সে নাকি জাদুটোনা করে মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে দিতে পারে। চৌধুরী সাহেব তার এলাকার প্রতিদ্বন্দী হাজী সাহেবের জীবন নষ্ট করে দেওয়ার জন্য সেই মন্ত্রগুরুর কাছে এসেছেন, যাতে করে পরের মাসের ইলেকশনে হাজী সাহেবকে হারিয়ে দিতে পারেন। এই মোক্ষম সময়ে হাজী সাহেবের জীবনে নানা ঝামেলা তৈরি করতে পারলে, চৌধুরী সাহেবের জন্য ইলেকশনে জেতা অনেক সহজ হয়ে যাবে।

তিনি এক অন্ধকার ঘরে মন্ত্রগুরুর সামনে গিয়ে বসলেন। তাকে তার সমস্যার কথা জানালেন। মন্ত্রগুরু তাকে বললেন, “দুশ্চিন্তা বন্ধ করুন। আমি ‘ওদেরকে’ ডাকছি। ওরা আপনার শত্রুর জীবন শেষ করে দেবে। তবে মনে রাখবেন, একবার যদি এই পথে পা বাড়ান, আর ফিরে আসার উপায় নেই।”

চৌধুরী সাহেবের তখন মনে পড়ে গেল, তার এক আত্নীয় তাকে বহুবার সাবধান করেছিলেন: এই সব জাদুটোনার মধ্যে না যেতে। এগুলো করা কুফরী। সারাজীবনের জন্য জাহান্নামে চলে যেতে হবে। কিন্তু চৌধুরী সাহেব জিদে অন্ধ হয়ে আছেন। গত তিন বছর তিনি হাজী সাহেবের কাছে ইলেকশনে হেরেছেন। এই বার আর না। যত কিছুই লাগে, তিনি এই বার ইলেকশনে জিতবেনই।

মন্ত্রগুরু এক লাখ টাকা নিয়ে তাকে এক ভয়ঙ্কর জাদু শিখিয়ে দিলেন। তিনি সেই জাদুর কাগজ আর সরঞ্জাম নিয়ে খুশি মনে বাসায় ফেরত যাচ্ছেন। এই বার ইলেকশনে তার জেতা ঠেকায় কে?

আমাদের উপমহাদেশে জাদুটোনার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। অনেকেই আজকাল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য জাদুটোনার আশ্রয় নিচ্ছেন। হাজার বছর আগে বনী ইসরাইল ঠিক একই কাজ করে নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছিল। আজকে অনেক মুসলিমরা ঠিক একই কাজ করে নিজেদেরকে চিরজীবনের জন্য ধ্বংস করে ফেলছেন।

2_102_1

তারা বরং সেগুলো অনুসরণ করত, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বের নামে মিথ্যা অপপ্রচার করত। সুলাইমান কোনোদিন কুফরী করেনি, বরং ওই শয়তানগুলোই কুফরী করেছিল। ওরা মানুষকে জাদু শিখিয়েছিল। বাবিল শহরে পাঠানো দুই ফেরেশতা হারুত এবং মারুতকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছিল, তা শিখিয়েছিল। … [আল-বাক্বারাহ ১০২]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

ওদের বিশ্বাস একেবারেই নগণ্য পর্যায়ের — আল-বাক্বারাহ ৮৮-৯১

আপনি পাড়ার কলেজের শিক্ষক মীর-জাফর সাহেবকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করছেন, “ভাই, কিছু চরমপন্থি দলের উল্টোপাল্টা কাজকর্মকে ইসলামের শিক্ষা বলে প্রচার করে ধর্মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করছেন, এটা তো অন্যায়। চেতনার নাম করে কিশোর-তরুণদের উত্তেজনার ড্রাগ দিয়ে, তাদেরকে রাজনৈতিক নেতাদের হাতের পুতুল বানাচ্ছেন, এটা কি একটা বিরাট প্রতারণা নয়? পাবলিসিটির লোভে আপনি মানুষকে অহেতুক ফুসলিয়ে, তাদেরকে সস্তা আবেগের খোরাক দিচ্ছেন, আল্লাহর تعالى কাছে এসবের জবাব কীভাবে দেবেন?”

কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। তার উত্তর, “ভাই, আমাকে এইসব ফালতু নীতিকথা বলে লাভ নেই। আমি একজন বিদেশ থেকে পিএইচডি করা শিক্ষিত মানুষ। আমি জানি আমি যা করছি সেটা ঠিক কাজ। আমাকে এই সব সব হাজার বছরের পুরনো আরব কেচ্ছা কাহিনী শুনিয়ে কোনো লাভ নেই। আমি কোনো গ্রামের অর্ধশিক্ষিত লোক না যে, আপনার এই সব শাস্তির কথা শুনে ভয় পাব। আপনি অন্যদিকে দেখেন।”

এই ধরনের মানুষরা কোনো আধুনিক সৃষ্টি নয়। হাজার বছর আগেও এই ধরনের মানুষ ছিল—

2_88

ওরা বলে, “(তোমরা যাই বলো না কেন) আমাদের অন্তর একদম সুরক্ষিত, কিছুই ঢুকবে না।” কিসের সুরক্ষিত? বরং আল্লাহ ওদেরকে ঘৃণা ভরে পরিত্যাগ করেছেন ওদের অবিশ্বাসের জন্য। ওদের বিশ্বাস একেবারেই নগণ্য পর্যায়ের। [আল-বাক্বারাহ ৮৮]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তখনি কেন তোমরা অহংকারী হয়ে যাও — আল-বাক্বারাহ ৮৭

আল্লাহ تعالى আমাদেরকে ইসলাম দিয়েছেন, যেন আমরা ইসলাম অনুসারে আমাদের জীবন গড়ে তুলি। কিন্তু অনেককেই দেখা যায় তাদের লাইফ স্টাইল, সংস্কৃতি, ফ্যাশন, দুই নম্বরি ব্যবসায় যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য ইসলামকে তাদের ইচ্ছামত পরিবর্তন করেন, যাতে করে সেই ‘ইসলাম’ মানতে নিজেদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন করতে না হয়। যেমন, আপনি আপনার প্রতিবেশীকে একদিন বললেন, “চৌধুরী সাহেব, ভাই কিছু মনে করবেন না, আপনার ব্যবসাটা কিন্তু হারাম ব্যবসা। আপনার ঘরের মেয়েরা যেই ধরনের কাপড় পড়ছেন, সেটা ইসলামের দৃষ্টিতে একেবারেই নিষিদ্ধ। আর আপনার ছেলেমেয়ের বিয়েতে যে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা উড়ালেন, আল্লাহর تعالى কাছে তার জবাব কীভাবে দেবেন?”

সাথে সাথে তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠবেন, “কি! আপনি কি বলতে চাচ্ছেন ইসলাম কী আমি সেটা জানি না? আপনাদের মত তালেবানদের জন্য আজকে ইসলামের এই অবস্থা। দেশটাকে আপনারা আরেকটা আফগানিস্তান বানিয়ে ফেলছেন।”

এধরনের মানুষদেরকে যখন কেউ বার বার নিষেধ করতে থাকে, এবং তাদের আসল জায়গায়: ব্যাংক ব্যালেন্স এবং সম্পত্তিতে সমস্যা তৈরি করে —তখন তারা তাদের ‘সোনার ছেলেদের’ ফোন করেন, “তোমাকে একটা লোকের নাম-ঠিকানা পাঠাচ্ছি। একে সরিয়ে ফেল।”

এদের উদাহরণ হলো এই আয়াতের বনী ইসরাইলের মতো—

2_87

আমি অবশ্যই মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম। তারপর তার সমর্থন করে ধারাবাহিকভাবে কয়েকজন রাসুল/বার্তাবাহক পাঠিয়েছিলাম। আর আমি মরিয়মের সন্তান ঈসাকে একদম পরিষ্কার নিদর্শন দিয়েছিলাম এবং তাকে পবিত্র রূহ দিয়ে শক্তিশালী করেছিলাম। যখনি কোনো রাসুল/বার্তাবাহক এমন কিছু নিয়ে আসে, যা তোমাদের কামনা-বাসনার বিরুদ্ধে যায়, তখনি কেন তোমরা অহংকারী হয়ে যাও? কেন তাদের কয়েকজনকে তোমরা মিথ্যাবাদীর কালিমা দাও, কয়েকজনকে খুন করো? [আল-বাক্বারাহ ৮৭]

Corruption-1

মানুষের মধ্যে একটা স্বভাবজাত প্রবৃত্তি আছে আইনকে নিজের সুবিধামত বিকৃত করে, অন্যের সাথে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করার, যাতে করে তারা তাদের স্বার্থপর সাম্প্রদায়িক, জাতিগত, দলগত উদ্দেশ্যগুলো হাসিল করতে পারে। এটা সাধারণত সেই সব সমাজে দেখা যায়, যেখানে মানুষ ন্যায়ভাবে চলার ন্যূনতম ধারণাগুলো হারিয়ে ফেলে।[৬]

একটা ছোট বাচ্চা চেষ্টা করে কীভাবে বাবা-মার কাছ থেকে ঘরের নিয়ম কানুনে শুধুমাত্র তার জন্য বিশেষ ছাড় পাওয়া যায়, “বাবা, আমি জানি আমাদের দিনে একটার বেশি চকলেট খাওয়া নিষেধ। কিন্তু শুধু আমাকে দিনের বেলা একটা, আর রাতের বেলা আরেকটা দেওয়া যায়? আমি ছোটকে দেখাব না। একদম লুকিয়ে লুকিয়ে খাব।” তারপর মানুষ বড় হলে মন্ত্রীকে ফোন করে, “সালাম মন্ত্রী সাহেব, সংসদে ওই বিলটা পাশ হলে কিন্তু আমাদের দল আর এই বছর গাড়ি পাবে না। আপনি ব্যবস্থা করুণ যেভাবেই হোক সেই বিলটা যেন পাশ না হয়। আমি আপনাকে খুশি করে দেব। গুলশানে দুটো বাড়ি আর আগামি দশ বছরের জন্য আপনার রঙিন পানির সাপ্লাই আমার দায়িত্ব। আপনার আর কী লাগবে শুধু বলেন আমাকে।” ধর্মীয় দলগুলোর মধ্যে চলে আরেক ধরনের আলোচনা, “হুজুরে পাক, আপনি দেশের সবচেয়ে বড় মুফতিদের একজন। এই ফতোয়াটা মঞ্জুর করে দেন। আমরা অমুক গ্রুপের সাথে চুক্তি করেছি। তারা আগামি বছর বাজারে হালাল সাবান ছাড়তে যাচ্ছে। সেখান থেকে ২০% কমিশন আমরা পাবো। শুধু দরকার এই ফতোয়াটা পাশ করার। তাহলেই সবাই অন্য সব সাবান বাদ দিয়ে, এই হালাল সাবান কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। আপনার মসজিদ করার জন্য যত বাজেট লাগে সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।”

সঠিক আইন, ন্যায়নীতি, আদর্শ তৈরি হয় নিরপেক্ষতা, পক্ষপাতহীনতা থেকে, যা মানুষের কামনা-বাসনা দিয়ে বিকৃত হয় না। এটা মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়, এর জন্য মানুষের উর্ধে কোনো উৎস দরকার, যার মধ্যে মানুষের যে মানবিক দুর্বলতাগুলো রয়েছে, সেগুলো নেই।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমরা কী করে যাচ্ছ, সেটা আল্লাহর অজানা নয় — আল-বাক্বারাহ ৮৪-৮৬

এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে রাজনীতি কত নোংরা হতে পারে, তা শেখাবেন। মানুষ কীভাবে নিজের স্বার্থের কারণে নিজের ভাইকে খুন করতে পারে, নিজের ভাইকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারে এবং দরকারের সময় রাতারাতি ভোল পাল্টে দুমুখো সাপ হয়ে যেতে পারে, তা এই আয়াত দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আজকের মুসলিমরা যে সাচ্চা বনী ইসরাইল হয়ে গেছে, সেটা আপনি নিজেই দেখতে পাবেন—

মনে করে দেখ, যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম, “তোমরা তোমাদের রক্ত ঝরাবে না এবং নিজেরদেকে তোমাদের ঘর থেকে বের করে দিবে না।” তোমরাই তো  তখন কথা দিয়েছিলে, আর তোমরাই ছিলে তার সাক্ষী!  [আল-বাক্বারাহ ৮৪]

“তোমরা তোমাদের রক্ত ঝরাবে না” 
  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এত কিছুর পরেও তোমাদের অন্তর পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেছে — আল-বাক্বারাহ ৭২-৭৪

এই তিনটি আয়াতে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার শিখব: মানুষের জীবনে নানা ধরনের সমস্যা আসে, যেগুলো তাকে ধাক্কা দেয়, যেন সে নিজেকে পরিবর্তন করে, অন্যায় করা বন্ধ করে। কিন্তু তারপরেও অনেক মানুষ অন্যায় করতে করতে একসময় তাদের অন্তর পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। অন্যায় তখন তাদের কাছে আর অন্যায় মনে হয় না। তারা তাদের নিজেদের ভুলগুলোকে নিয়ে আর ভেবে দেখে না। কেউ তাদেরকে সেই ভুলগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও, সে উপলব্ধি করে না। উপলব্ধি করলেও, নিজেকে পরিবর্তন করার মতো ইচ্ছা তাদের থাকে না।

cloudy mountain

আজকের যুগের একটি উদাহরণ দেই—

চৌধুরী সাহেব একটা সরকারি প্রোজেক্টে ঘুষ খেতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন। তার চাকরি চলে গেল। তিনি বছরের পর বছর ধরে বেকার। পরিবারের খরচ দিতে গিয়ে জমি-জমা বিক্রি করে নিঃস্ব হওয়ার মতো অবস্থা। একসময় তিনি তার প্রতিবেশীর অনেক অনুরোধে নামাজ পড়া শুরু করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে বার বার ক্ষমা চাইলেন, যেন আল্লাহ তাকে আরেকবার সুযোগ দেন। এক বছর পর তিনি একটা বিদেশি কোম্পানিতে ভালো বেতনে চাকরি পেলেন।

দুই বছর পরের ঘটনা: চৌধুরী সাহেব সেই বিদেশি কোম্পানিতে চাকরি করার সময় কোম্পানির খরচে বিদেশে গিয়ে অবৈধভাবে থেকে গেলেন। তারপর শুরু হলো হাজারো আইনগত সমস্যা। একটা সমস্যা কাটাতে গিয়ে তাকে আরেকটা অন্যায় করতে হয়, একে ওকে টাকা খাওয়াতে হয়, কাগজপত্র জাল করতে হয়। তার নিকট আত্মীয়রা তাকে বার বার বোঝালেন, যেন তিনি নিজেকে শোধরান। এভাবে দুই নম্বরি করে অশান্তিতে আর কতদিন থাকবেন? চৌধুরী সাহেব শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি তার লোভ সংবরণ করবেন, যতটুকু সম্ভব হালাল উপায়ে চলার চেষ্টা করবেন।

তিন বছর পরের ঘটনা: চৌধুরী সাহেব নানা ভাবে কাগজ জালিয়াতি করে, ভুয়া ডিগ্রি দেখিয়ে বহাল তবিয়তে বিদেশে বাস করছেন। শুধু তাই না, তিনি তার চৌদ্দ গুষ্টিকে দুই নম্বরি করে বিদেশে নিয়ে এসেছেন। এখন তার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। সাত মাস পর চেকআপ করতে গিয়ে ডাক্তার বললেন, “এক ভয়ংকর জটিলতা দেখা দিয়েছে: হয় মা বাঁচবে, না হয় সন্তান। তাদেরকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে: কাকে তারা বাঁচাতে চান?”

এরপর থেকে চৌধুরী সাহেব বার বার নামাজে কাঁদেন, “ও আল্লাহ! আমার স্ত্রী এবং সন্তানকে এবারের মতো বাঁচিয়ে দিন। আমি এখন থেকে নিষ্ঠার সাথে ধর্ম মানব, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ব, পরের বছরই হাজ্জ করতে যাব।” খুব শীঘ্রই তার মুখে ঘন দাঁড়ি, কপালে সিজদার দাগ, ঘন ঘন রোজা রাখতে দেখা গেল।

দুই মাস পর ডেলিভারি হলো। কোনো এক অদ্ভুত কারণে মা এবং সন্তান দুজনেই বেঁচে গেলেন। চৌধুরী সাহেব এবং তার স্ত্রী আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় চোখের পানি ফেলেন, এবং সন্তানের চেহারার দিকে দিন-রাত অবাক হয়ে পরম শান্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন।

এক বছর পরের ঘটনা: চৌধুরী সাহেবের হারাম লোন নিয়ে কেনা বাড়িতে বাচ্চার জন্মদিনের পার্টি হচ্ছে। রঙ বেরঙের পানীয়, টিভিতে প্রায় নগ্ন গায়িকার গানের ভিডিও চলছে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ছেলে-মেয়ে সবাই মাখামাখি করে নাচানাচি করছে। চৌধুরী সাহেবের স্ত্রী এক আপত্তিকর পশ্চিমা কাপড় পড়ে তার বন্ধুদের সামনে ঘোরাঘুরি করছেন। এদিকে চৌধুরী সাহেব চকচকে চোখে বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন…  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমাদেরকে যা বলা হয়েছে সেটা করো — আল-বাক্বারাহ ৬৮-৭১

ধর্মীয় নিয়ম-কানুনগুলোকে কীভাবে খামোখা ঘাঁটাঘাঁটি করে কঠিন বানানো যায়, যাতে তার অনুসরণ করা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়, এবং ধর্মীয় নির্দেশ শেষ পর্যন্ত মানতে না পারলে কীভাবে সব দোষ আল্লাহকে تعالى দেওয়া যায় — তার কিছু অভিনব উদাহরণ আমরা সূরা আল-বাক্বারাহ’র ৬৭-৭১ আয়াতে দেখতে  পাবো। প্রথমত আজকের যুগের মুসলিমদের একইভাবে ধর্মকে পেঁচিয়ে কঠিন বানানোর একটি উদাহরণ দেই—

চৌধুরী সাহেব সম্প্রতি ধর্মের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস হয়েছেন। তিনি তার জীবন থেকে, ধর্মীয় নির্দেশের বিরুদ্ধে যায়, এমন সব ব্যাপার একে একে দূর করার চেষ্টা করছেন। একদিন এলাকার জ্ঞানীগুণী হাজি সাহেবকে মসজিদে আলোচনায় বলতে শুনলেন, “মুসল্লি ভাইয়েরা, আজকাল টিভিতে অনেক হারাম জিনিস দেখানো হয়। টিভি আমাদের কিশোর-তরুন সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। টিভি দেখা হারাম। আপনারা আজকেই টিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিন।”  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তুমি কি আমাদের সাথে ফাজলেমি করছ? — আল-বাক্বারাহ ৬৭

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কিছু সাইকোলজি শেখাবেন: ১) কীভাবে মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর মানসিক দুর্বলতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং ২) কীভাবে একটি মোক্ষম মানসিক আক্রমণকে প্রতিহত করে, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ঠিক রেখে, লক্ষ্যে স্থির থাকতে হয়—

2_67

মনে করে দেখো, যখন মূসা তার লোকদেরকে বলেছিল, “আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবাই করতে আদেশ করেছেন।” তখন তারা বলল, “তুমি কি আমাদের সাথে ফাজলেমি করছ?” তিনি উত্তর দিলেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই, যেন আমি নির্বোধ-অবিবেক-লাগামহীন হয়ে না যাই।” [আল-বাক্বারাহ ৬৭]

ধরুন আপনাকে একজন মুসলিম ভাই খুব আগ্রহ নিয়ে ইসলামের কথা বলছে। আপনার কোনো ভুল সংশোধন করার জন্য কিছু উপদেশ শোনাচ্ছে, কু’রআন-হাদিস থেকে কোটেশন দিচ্ছে। কিন্তু আপনার সেটা সহ্য হচ্ছে না। আপনি কোনো যুক্তি দিয়ে তাকে খন্ডন করতে পারছেন না। আর আপনার কাছে কোনো বিকল্প প্রস্তাবও নেই। সেই অবস্থায় আপনি যদি তাকে পুরোপুরি নাস্তানাবুদ করে দিতে চান, তাহলে সোজা তার মুখের উপর কর্কশ ভাষায় জোর গলায় বলুন, “কী সব আবোল তাবোল কথা বলছেন! আপনার কি মাথা খারাপ নাকি? এই সব গাঁজাখুরি কথাবার্তা কোথা থেকে পান আপনারা? ইসলাম মোটেও এটা সমর্থন করে না!”

এর ফলাফল হবে নিচের যেকোনো একটি—

  • ১) সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার কথার খেই হারিয়ে ফেলবে এবং তার নিজের উপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। সে তখন মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে আমতা আমতা করে অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা শুরু করবে।
  • ২) সে অপমানে রেগে গিয়ে নিজের আহত ইগোকে বাঁচানোর জন্য: তার ইসলাম নিয়ে কত পড়াশোনা আছে, সে কোথা থেকে কী ডিগ্রি পেয়েছে, সে কোন শাইখের কাছ থেকে কী ফতোয়া শুনেছে — এইসব নিয়ে অনর্থক বক্তৃতা শুরু করে দিবে।

এই পদ্ধতিটি সাইকোলজির ভাষায় ‘গ্যাসলাইটিং’ এর একটি উদাহরণ। কাউকে তার নিজের সম্পর্কে সন্দেহে ফেলে দেওয়া, তার কথা, কাজকে একেবারেই ফালতু-ভুল-পাগলের প্রলাপ ইত্যাদি বলে বোঝানোর চেষ্টা করা, যেন সে নিজের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, রেগে গিয়ে উল্টোপাল্টা আচরণ শুরু করে — এটা হচ্ছে গ্যাসলাইটিং।[১৫২] যারা অহরহ গ্যাসলাইটিং করেন, তারা একধরনের বিকৃত মানসিকতার অধিকারী এবং তাদের জন্য বিশেষ ধরনের মানসিক চিকিৎসা রয়েছে। এধরনের মানুষরা সাধারণত পরিবর্তীতে নানা ধরণের জটিল মানসিক রোগের শিকার হন। যেমন, সাইকোপ্যাথরা অহরহ গ্যাসলাইটিং করেন।[১৫২]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এত কিছুর পরও তোমরা ফিরে গেলে — আল-বাক্বারাহ ৬৪-৬৬

চৌধুরী সাহেবের সন্তানটির জন্ম হলো ডেলিভারির তারিখের দুই মাস আগে। তাকে সাথে সাথে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হলো। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলেন। নার্সরা এসে তাকে সান্ত্বনা জানাচ্ছে, তাকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করছে। এই অবস্থায় তিনি জায়নামাজে বসে জীবনে প্রথমবারের মতো আল্লাহর تعالى কাছে অনেক কাঁদলেন। সারাজীবন আল্লাহর تعالى অবাধ্যতা করার জন্য ক্ষমা চাইলেন। বাকি জীবন দৃঢ়ভাবে ইসলাম মেনে চলার জন্য শপথ করলেন। তারপর ভেজা চোখে আইসিইউতে ফিরে গিয়ে দেখলেন: ডাক্তাররা ছোটাছুটি করছে — তার শিশুটির অবস্থা কোনো এক অদ্ভুত কারণে ভালো হতে শুরু করেছে! আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞতায়, শ্রদ্ধায় তিনি খুশিতে কেঁদে ফেললেন। মনে মনে অসংখ্যবার আল্লাহকে تعالى ধন্যবাদ দিলেন। একটু আগে করা শপথের কথা নিজেকে বার বার মনে করিয়ে দিলেন।

এক বছর পরের ঘটনা। চৌধুরী সাহেবের বাড়িতে জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলছে। ডিজে নিয়ে এসে ব্যাপক ধুমধাম করে ডিস্কো হচ্ছে। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, নারী-পুরুষ সবাই মাখামাখি করে নাচানাচি করছে। চারিদিকে রঙ বেরঙের পানীয়। টিভিতে প্রায় নগ্ন গায়িকার মিউজিক ভিডিও চলছে। ওদিকে বাইরে মাগরিবের আজান হচ্ছে। কিন্তু গানের শব্দে কেউ আজান শুনতে পারছে না।

2_64

এত কিছুর পরও তোমরা (সঠিক পথ থেকে) ফিরে গেলে। যদি তোমাদের উপর আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দয়া না থাকত, তাহলে তোমরা অবশ্যই সব হারিয়ে ফেলতে। [আল-বাক্বারাহ ৬৪]

erupted-volcano-chile-francisco-negroni-10

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তূর পর্বতকে তোমাদের মাথার উপর তুলে ধরেছিলাম — আল-বাক্বারাহ ৬৩

আল্লাহর تعالى বাণী নিয়ে মানুষের তামাশা করার প্রবণতার আরেকটি উদাহরণ আমরা এই আয়াতে পাব। বনী ইসরাইলিরা দেখল যে, নবী মূসা عليه السلام আল্লাহর تعالى কাছ থেকে যে তাওরাতের বাণী নিয়ে এসেছেন, সেই বাণী মেনে চলাটা বেশ কঠিন। তখন তারা সেটা থেকে বাঁচার জন্য অজুহাত খোঁজা শুরু করল। প্রথমে তারা নবী মূসাকে عليه السلام বলল: তার মুখের কথা তারা বিশ্বাস করবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর تعالى কাছ থেকে নিজের কানে না শুনছে।[৪][৮]

তখন নবী মূসা عليه السلام তাদের মধ্য থেকে ৭০ জন প্রতিনিধিকে বাছাই করে তূর পাহাড়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে আল্লাহ تعالى তাদেরকে সরাসরি তাওরাত মেনে চলার হুকুম দিলেন। তারপর সেই প্রতিনিধিরা ফিরে এসে নিজ নিজ গোত্রের সামনে স্বীকার করল যে, আল্লাহ تعالى সত্যিই তাদেরকে তাওরাত মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু এর সাথে তারা আর একটি কথা যোগ করে দিল: “আল্লাহ বলেছেন যে, তোমাদের পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব, ততটুকু মেনে চলবে। যা মেনে চলতে পারবে না, তা তিনি ক্ষমা করে দিবেন।”

এরপর থেকে তাওরাতের যেই নির্দেশই তাদের কাছে কঠিন মনে হতো, সেটাকেই তারা ছেড়ে দিত — এই মনে করে যে, আল্লাহ তা ক্ষমা করে দিবেন।[৪][৮] তাদের এই ভণ্ডামিতে আল্লাহ تعالى রেগে গিয়ে এক অসাধারণ ঘটনা ঘটালেন —

2_63

মনে করে দেখো, যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম (তাওরাত অনুসরণ করার জন্য), এবং তূর পর্বতকে তোমাদের মাথার উপর তুলে ধরেছিলাম, “শক্ত করে ধর, যা আমি তোমাদেরকে দিয়েছি এবং এতে যা আছে তা মনে রাখো — যাতে করে তোমরা (আল্লাহর প্রতি) সচেতন হতে পারো।” [আল-বাক্বারাহ ৬৩]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

চলে যাও এখান থেকে — আল বাক্বারাহ ৬১ পর্ব ২

বনী ইসরাইলিরা আল্লাহর تعالى দেওয়া ফ্রি, স্বাস্থ্যকর খাবার মান্‌ন এবং সালওয়ার মূল্য বুঝলো না। তারা নবী মূসাকে عليه السلام শাকসবজি, শশা, ডাল, রসুন, পেঁয়াজ ইত্যাদির একটা বাজারের লিস্ট দিয়ে বলল, আল্লাহর تعالى  কাছ থেকে এগুলো নিয়ে আসতে। তখন নবী মূসা عليه السلام রেগে গিয়ে বললেন:

2_61_3

চলে যাও এখান থেকে কোনো একটা শহরে! সেখানে তোমরা যা চেয়েছ, ঠিক তাই পাবে।

তিনি বনী ইসরাইলিদেরকে তাচ্ছিল্য করে বললেন যে, তারা যা চেয়েছে, ঠিক তাই পাবে। তারা ফ্রি, স্বর্গীয় খাবার খেয়ে তার মর্ম বোঝেনি। এখন বুঝবে দুনিয়ার খাবার জোগাড় করা কত কষ্টের। তারা স্বাস্থ্যকর খাবারের মূল্য দেয়নি। এখন নিজেদের বানানো অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে তার মাসুল দেবে। খাবারের চিন্তা না থাকায় তারা প্রতিদিন এত সময় পেত নিজেদেরকে সংশোধন করার জন্য, আল্লাহর تعالى ইবাদতের জন্য, সুস্থ বিনোদনের জন্য। এখন জীবনযুদ্ধে পড়ে বুঝবে ঠেলা কাকে বলে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)