ওরা মানুষকে জাদু শিখিয়েছিল — আল-বাক্বারাহ ১০২-১০৩

চৌধুরী সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সাবধানে এদিক ওদিক তাকিয়ে মগবাজারে এক অন্ধকার গলির ভেতর একটা দোকানে ঢুকছেন। সেই দোকান এক বিখ্যাত মন্ত্রগুরুর। সে নাকি জাদুটোনা করে মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে দিতে পারে। চৌধুরী সাহেব তার এলাকার প্রতিদ্বন্দী হাজী সাহেবের জীবন নষ্ট করে দেওয়ার জন্য সেই মন্ত্রগুরুর কাছে এসেছেন, যাতে করে পরের মাসের ইলেকশনে হাজী সাহেবকে হারিয়ে দিতে পারেন। এই মোক্ষম সময়ে হাজী সাহেবের জীবনে নানা ঝামেলা তৈরি করতে পারলে, চৌধুরী সাহেবের জন্য ইলেকশনে জেতা অনেক সহজ হয়ে যাবে।

তিনি এক অন্ধকার ঘরে মন্ত্রগুরুর সামনে গিয়ে বসলেন। তাকে তার সমস্যার কথা জানালেন। মন্ত্রগুরু তাকে বললেন, “দুশ্চিন্তা বন্ধ করুন। আমি ‘ওদেরকে’ ডাকছি। ওরা আপনার শত্রুর জীবন শেষ করে দেবে। তবে মনে রাখবেন, একবার যদি এই পথে পা বাড়ান, আর ফিরে আসার উপায় নেই।”

চৌধুরী সাহেবের তখন মনে পড়ে গেল, তার এক আত্নীয় তাকে বহুবার সাবধান করেছিলেন: এই সব জাদুটোনার মধ্যে না যেতে। এগুলো করা কুফরী। সারাজীবনের জন্য জাহান্নামে চলে যেতে হবে। কিন্তু চৌধুরী সাহেব জিদে অন্ধ হয়ে আছেন। গত তিন বছর তিনি হাজী সাহেবের কাছে ইলেকশনে হেরেছেন। এই বার আর না। যত কিছুই লাগে, তিনি এই বার ইলেকশনে জিতবেনই।

মন্ত্রগুরু এক লাখ টাকা নিয়ে তাকে এক ভয়ঙ্কর জাদু শিখিয়ে দিলেন। তিনি সেই জাদুর কাগজ আর সরঞ্জাম নিয়ে খুশি মনে বাসায় ফেরত যাচ্ছেন। এই বার ইলেকশনে তার জেতা ঠেকায় কে?

আমাদের উপমহাদেশে জাদুটোনার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। অনেকেই আজকাল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য জাদুটোনার আশ্রয় নিচ্ছেন। হাজার বছর আগে বনী ইসরাইল ঠিক একই কাজ করে নিজেদেরকে ধ্বংস করে ফেলেছিল। আজকে অনেক মুসলিমরা ঠিক একই কাজ করে নিজেদেরকে চিরজীবনের জন্য ধ্বংস করে ফেলছেন।

2_102_1

তারা বরং সেগুলো অনুসরণ করত, যা শয়তানরা সুলাইমানের রাজত্বের নামে মিথ্যা অপপ্রচার করত। সুলাইমান কোনোদিন কুফরী করেনি, বরং ওই শয়তানগুলোই কুফরী করেছিল। ওরা মানুষকে জাদু শিখিয়েছিল। বাবিল শহরে পাঠানো দুই ফেরেশতা হারুত এবং মারুতকে যা দিয়ে পাঠানো হয়েছিল, তা শিখিয়েছিল। … [আল-বাক্বারাহ ১০২]

MagicFire

আজকের যুগের শিক্ষিত মানুষরা এই সব জাদুটোনা মোটেও বিশ্বাস করতে চান না। তাদের কাছে এগুলো সব গাজাখুরী কথাবার্তা। যেই জিনিসের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, সেটা তাদের কাছে কোনোভাবেই সত্যি হতে পারে না। আজকের যুগে অনেক কিছুই আছে যার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, যেমন—

প্লাসিবো এফেক্ট: শরীরের উপর মনের নিয়ন্ত্রণ: অনেক মানুষকে আসল পেইনকিলারের বদলে গোপনে সাধারণ পানির জেল দিলেও দেখা যায়, শুধুমাত্র ‘ওষুধ দেওয়া হয়েছে’ এই বিশ্বাসের কারণেই অনেক সময় তাদের ব্যাথা সেরে যায়। এমনকি আলসার রোগীদেরকে না বলে গোপনে নকল ওষুধ দিয়ে আলসার দ্রুত ভালো হয়ে যেতেও দেখা গেছে।[১৮৮] কীভাবে এটা সম্ভব তার কোনো প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।

হোমিওপ্যাথি: যেখানে কিছু প্রাকৃতিক নির্যাসকে পানিতে দ্রবীভূত করতে করতে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় যে, দেখা যায় সেই প্রাকৃতিক নির্যাসের একটি অণুও হয়ত বাকি নেই, অথচ সেই পানি ঠিকই তার ওষধি গুণ ধরে রেখেছে। হিস্টামিন ডাইলিউশনের এই পরীক্ষাটি বিজ্ঞানীদের জন্য আজো একটা বিস্ময়।[১৮৯]

হিপনোসিস: মানুষকে ঘুমের মত অর্ধচেতন অবস্থায় নিয়ে গিয়ে তাকে যা বলা হয়, সে তখন অবচেতন ভাবে তাই করে। সে তার জীবনে ঘটে যাওয়া এমন সব ঘটনা, এমন বিস্তারিত ভাবে বলতে পারে, যা কোনো মানুষ চেতন অবস্থায় পারে না। এর কোনো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু এগুলোর যথেষ্ট উদাহরণ আমাদের সামনে আছে।[১৯১]

স্কাইকোয়েক: পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েকবার আকাশ থেকে অদ্ভুত ধরনের বুম শব্দ এবং অপার্থিব শব্দ শোনা গেছে, যা সেই দেশগুলোর সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও প্রচার করা হয়েছে। শব্দ শুনে মনে হয় আকাশে বিশাল কোনো যান্ত্রিক কিছু যেন গোঙাচ্ছে।[১৯০] এই অপার্থিব শব্দ কীভাবে হয়, তার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা এখনও দেওয়া যায়নি।

সাইকোকাইনেসিস: কোনো ঘটনার উপর মানুষের চিন্তার প্রভাব। মানুষের চিন্তা ব্যবহার করে একটি র‍্যান্ডম নম্বর জেনারেটরের আউটপুট পরিবর্তন করে ফেলা, মানুষের চিন্তার প্রভাবে অনেকগুলো বলের পড়ার দিক পরিবর্তন করা ইত্যাদি। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা ল্যাবে এগুলো বহুবার দেখানো হয়েছে। কীভাবে মানুষের চিন্তা এই সব ঘটনাকে প্রভাবিত করে তার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।[১৮৭]

ঠিক একইভাবে মহাবিশ্বে এরকম অনেক ঘটনা রয়েছে, যা বিজ্ঞান এখনো কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে এই নয় যে, বিজ্ঞান কোনোদিন সেগুলো ব্যাখ্যা করতে পারবে না, বা  এগুলো সবই মিথ্যা কথা। বরং বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে অনেক কিছুই আজকাল সত্য প্রমান করা গেছে, যা শত বছর আগের বিজ্ঞানীরা অস্বীকার করে গেছেন। হতে পারে ভবিষ্যতে কোনো যন্ত্র বের হলে, আমরা তখন অনেক কিছুই পর্যবেক্ষণ করতে পারব, যা আজকে সম্ভব হচ্ছে না।

কুরআনে পরিষ্কারভাবে কিছু বিশেষ ধরনের জাদুর কথা বলা আছে। হাজার বছর আগে বনী ইসরাইল এই ধরনের জাদু ব্যবহার করে নিজেদের পরিবার এবং সমাজ ধ্বংস করে গেছে। আজকের যুগেও এই ধরনের জাদুটোনা অহরহ ব্যবহার হচ্ছে। যদিও পত্রিকায় যেসব বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যেখানে নারী বশীকরণ, স্বাস্থ্য উদ্ধার, প্রেমে সফলতা, বিদেশে চাকরির নিশ্চয়তা ইত্যাদি সমস্যার সমাধানে নানাধরনের জাদুর ব্যবহার দেখা যায়, তবে এগুলোর প্রায় সবই ভূয়া। জাদুর মাধ্যমে মানুষের সমস্যার সমাধান তো দূরের কথা, উল্টো ঈমান ধ্বংস করে দুনিয়া এবং আখিরাতের জীবনকে ধ্বংস করে ফেলা ছাড়া আর কিছুই হয় না।

এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, আল্লাহ تعالى বলছেন যে, বনী ইসরাইলরা যখন জাদু করত, তারা বলত যে, এই জাদু আসলে এসেছে নবী সুলাইমান-এর عليه السلام কাছ থেকে। যেহেতু নবী সুলাইমান-কে عليه السلام আল্লাহ تعالى অনেক অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছিলেন, তাই তার অলৌকিকতার সুযোগ নিয়ে বনী ইসরাইলরা তাদের জাদুতে যে কোনো খারাপ কিছু নেই, তা প্রমান করার জন্য বলত যে সুলাইমানও  عليه السلام তো জাদু করে গেছেন। এখানে আল্লাহ تعالى বলছেন যে, সুলাইমান عليه السلام কোনোদিন জাদু করেননি। বরং তার যে সব অপার্থিব ক্ষমতা ছিল, সেগুলো সবই আল্লাহর تعالى দেওয়া বিশেষ ক্ষমতা। সেটা কোনো জাদু নয়।

আজকেও দেখা যায়, বাংলাদেশে অনেক জাদুকর দাবি করছে যে, তারা সুলাইমান-এর عليه السلام জাদুর ক্ষমতাকে বংশ পরম্পরায় উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছে। অনেক রঙবেরঙের বিজ্ঞাপনে অমুক মন্ত্রগুরুর সুলাইমান-এর عليه السلام ক্ষমতা রয়েছে, “সুলাইমানের জাদু”, “সুলাইমানের শাস্ত্র”, “সুলাইমানের উত্তরাধিকার” এই সব যারা দাবি করে, তারা সব ভণ্ড। আল্লাহ تعالى পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছেন যে, যারা এই সব করে তারা সব শয়তান। আর এগুলো সব কুফরি।

মানুষ কেন জাদু করে?

মানুষ যখন আল্লাহর تعالى কিতাবকে ভুলে যায়, তখন তারা এই সব দুই নম্বরী পদ্ধতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। পীর ধরা, বান মারা, জাদুটোনা করা —এই সব চাহিদা মানুষের মধ্যে তখনি আসে, যখন তার জীবনে কুরআনের শিক্ষা, আল্লাহর تعالى প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর تعالى সিদ্ধান্তের উপর আস্থা — এসব কিছু হারিয়ে যায়। তখন সে তার দুর্বিষহ জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মরীয়া হয়ে এইসব জঘন্য পদ্ধতির আশ্রয় নেয়। কিন্তু এগুলো করে তার জীবনে সমস্যা দূর হওয়া তো দুরের কথা, সে তার জীবনকে আরো দুর্বিষহ করে ফেলে এবং আল্লাহর تعالى প্রতি কুফরী করে চিরজীবনের জন্য জাহান্নামী হয়ে যায়।[১]

2_102_2

… ফেরেশতা দুজন মানুষকে কিছু শেখানোর আগে সাবধান করে দিত, “আমরা শুধুই একটা প্রলোভন, তোমরা কুফরী করো না।” কিন্তু তারপরেও এদের দুজনের কাছ থেকে ওরা শিখে নিত কীভাবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরানো যায়; যদিও কিনা সেটা ব্যবহার করে তারা কারো ক্ষতি করতে পারতো না, যদি না আল্লাহ ইচ্ছা করতেন। … [আল-বাক্বারাহ ১০২]

এই আয়াতে আবারো জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, মহাবিশ্বে যে ঘটনাই ঘটুক না কেন, সবই ঘটে আল্লাহর تعالى ইচ্ছাতে। তিনি মহাবিশ্ব পরিচালনার অনেক নিয়ম তৈরি করে দিয়েছেন, যেগুলোর কারণে মহাবিশ্বে অনেক ঘটনা ঘটে, আবার তিনিই সেই নিয়মগুলো যখন ইচ্ছা ব্যতিক্রম করেন। যেমন, আল্লাহ تعالى আগুনের একটি গুণ দিয়েছেন যা আমাদের চামড়া পুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই আগুনই আবার তাঁর ইচ্ছায় নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যায়, তাকে অক্ষত রেখে দেয়।[৬]

সুতরাং কোনো জাদুতে যদি কারো ক্ষতি হয়, প্রথমত আমাদেরকে এটা মেনে নিতে হবে যে, সেটা আল্লাহর تعالى ইচ্ছাতেই হয়েছে। যদি আল্লাহ تعالى ইচ্ছা না করতেন, তাহলে কিছুই হতো না। তখন আমাদেরকে খুঁজে দেখতে হবে, কেন এই ক্ষতিটা হলো? কেন আল্লাহ تعالى সেই মানুষের উপরে এই ক্ষতিটা হতে দিলেন? সেই মানুষটা কী দোষ করেছে?

যদি মানুষটা তার দোষ সংশোধন করে, আল্লাহর تعالى প্রতি আস্থা রাখে, কু’রআনের বাণীর উপর অটুট থাকে, তাহলে আল্লাহ تعالى ইচ্ছা করলে তাকে সব রকম ক্ষতি থেকে দূরে রাখতে পারেন। তাই যে ব্যক্তি জাদুর কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, তার তাড়াতাড়ি খুঁজে বের করা দরকার: তিনি এমন কী খারাপ কাজ করেছেন, যার কারণে আল্লাহর تعالى প্রতিরক্ষা তার উপর থেকে চলে গেছে, এবং আল্লাহ تعالى তার এত বড় ক্ষতি হতে দিয়েছেন? তখন পানি পড়া, তাবিজ, ঝাড়ফুঁকের পেছনে না ছুটে তার একমাত্র কাজ হলো: আল্লাহর تعالى কাছে আত্মসমর্পণ করা, এবং কু’রআনে শিখিয়ে দেওয়া পদ্ধতি অনুসরণ করে আল্লাহর تعالى কাছে জাদু থেকে মুক্তির জন্য আবেদন করা।

কু’রআনে বহুবার আল্লাহ আমাদেরকে বলেছেন, শুধুমাত্র তাঁর উপর ভরসা করতে হবে, শুধুমাত্র তাঁর কাছেই চাইতে হবে—

আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করলে কেউ তোমাদের পরাস্ত করতে পারবে না। আর তিনি যদি তোমাদেরকে একা ছেড়ে দেন, তাহলে কে আছে, যে তোমাকে সাহায্য করবে? যাদের ঈমান আছে তাদের উচিত শুধুমাত্র আল্লাহরই উপর ভরসা করা। [আলি-ইমরান ৩:১৬০]

…যে আল্লাহর উপর পুরোপুরি ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। [আত-তালাক্ব ৬৫:৩]

পূর্ব এবং পশ্চিমের রাব্ব তিনি। তিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কেউ নেই। সুতরাং শুধুমাত্র তাকেই রক্ষাকারী হিসেবে নাও। [আল-মুজাম্মিল ৮৩:৯]

জাদু থেকে বাঁচার উপায়

আমাদেরকে সবসময় মনে রাখতে হবে যে, একজন বিশ্বাসীর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে কু’রআন। পৃথিবীতে কোনো অশুভ শক্তি নেই, যা কু’রআনের আয়াতের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারে। কু’রআন যে কোনো বিশ্বাসীকে হতাশা, গ্লানি, অবসাদ, অমূলক ভয়ভীতি, কিছু হারানোর ভয়, কিছু না পাওয়ার অতৃপ্তি — এই সব মানসিক সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে পারে। শুধু দরকার বুঝে কু’রআন পড়া। শুধু তাই না, কু’রআনে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সব ধরনের জাদুটোনা, অশুভ দৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকার জন্য তিনটি প্রতিরক্ষা দিয়েছেন: সুরা ফাতিহা, ফালাক্ব এবং নাস।[১৯২]

সুরা ফাতিহা আমাদেরকে তাওহীদ এবং আল্লাহর উপর নির্ভরতা শেখায়। মানুষের প্রথম কাজ হচ্ছে তার ভেতরে তাওহীদকে শক্তিশালী করা। যতক্ষন পর্যন্ত তাওহীদের ধারণা মানুষের মধ্যে শক্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর تعالى ক্ষমতা, প্রতিরক্ষা, পরীক্ষায় গভীরভাবে বিশ্বাস করতে পারবে না। আল্লাহর تعالى প্রতি তার বিশ্বাস নড়বড়ে থাকবে। জীবনে কোনো খারাপ কিছু ঘটলেই তার বিশ্বাসে ফাটল ধরবে, নানা ধরনের সন্দেহ, সংশয়, হতাশা এসে ভর করবে। তখন তার মানসিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে তার আরও বেশি ক্ষতি করা যাবে। যখন তার ভিতরে তাওহীদ এতটাই শক্তভাবে বসবে যে, কোনো ধরনের কষ্ট, বিপদ, ভয়ংকর ঘটনা আল্লাহর تعالى প্রতি তার বিশ্বাস, আস্থা এবং নির্ভরতাকে একটুও টলাতে পারবে না, তখন সে তৈরি হবে সুরা ফালাক্বের জন্য।

সুরা ফালাক্ব কোনো মন্ত্র নয় যে, আমরা কিছুই না বুঝে সেটা বিড়বিড় করলেই আমাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। বরং এটি একটি শক্তিশালী দু’আ। এই সুরায় আমরা আল্লাহর تعالى কাছে বিশেষ কিছু অশুভ শক্তি এবং খারাপ প্রভাব থেকে প্রতিরক্ষার আবেদন করি। আমরা বার বার নিজেদেরকে মনে করিয়ে দেই, এগুলো সবই আল্লাহর تعالى সৃষ্টি এবং একমাত্র আল্লাহই تعالى পারেন আমাদেরকে এগুলো থেকে মুক্তি দিতে। আমরা আকুলভাবে সুরা ফালাক্বের মাধ্যমে আল্লাহর تعالى কাছে এই সব অশুভ শক্তি এবং খারাপ প্রভাব থেকে মুক্তি চাই। এই সুরা তিলাওয়াত করাটা তখন আমাদের জন্য আল্লাহর تعالى কাছে দুু’আ হয়ে যায়। আর আল্লাহ تعالى তাঁর বান্দাদের দুু’আ কখনো ফেলে দেন না।

তারপর সুরা নাস আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু শয়তান থেকে বিশেষভাবে মুক্তির জন্য দু’আ। এই সুরায় আমরা বার বার নিজেদেরকে মনে করিয়ে দেই, আল্লাহই تعالى সবচেয়ে বড়, তিনি সবকিছুর মালিক, তিনি সবাইকে পরম যত্নে পালন করেন। তিনি তাঁর পছন্দের বান্দাদেরকে কখনও ফেলে দেন না। আর শয়তান সবসময় চেষ্টা করে মানুষকে এগুলো ভুলিয়ে দেওয়ার, তাদের বিশ্বাস নড়বড়ে করে দেওয়ার। শয়তানের কাজ হচ্ছে ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে মানুষকে হতাশা, মানসিক অবসাদ, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগানো। সুরা নাস আমাদেরকে শেখায় যে, এই সব ফালতু ওয়াসওয়াসায় কান না দিয়ে, আমাদেরকে আল্লাহর تعالى প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, এবং নির্ভরতা আনার চেষ্টা করতে হবে। এতে করে আমাদের মন শক্ত হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে, হতাশা, অবসাদ দূর হবে।

এছাড়াও এই সুরা আমাদেরকে শেখায় যে, মানুষ এবং জিন উভয় জাতির মধ্যেই শয়তান রয়েছে, যারা মানুষের ক্ষতি করে। আমরা সেই সব শয়তানদের থেকে মুক্তি চাই। এই সব শয়তানরাই জাদু করে মানুষের ক্ষতি করে। যেরকম কিনা মানুষ এবং জিন শয়তানরা আগেকার যুগে বনী ইসরাইলকে জাদু শিখিয়েছিল, যার কথা আল-বাক্বারাহ’র এই আয়াতে বলা হয়েছে।

2_102_3

… তারা শিখেছিল কীভাবে নিজেদের সর্বনাশ করা যায়, কিন্তু কীভাবে নিজেদের কল্যাণ করা যায় সেটা নয়। যদিও তারা খুব ভালোভাবে জানতো যে, এই জ্ঞান যে শিখবে, তার আখিরাত শেষ। কী জঘন্য কারণেই না তারা নিজেদের আত্মাকে বেচেঁ দিয়েছিল —যদি তারা বুঝতো। [আল-বাক্বারাহ ১০২]

কীভাবে জাদু কাজ করে?

আমাদের আশেপাশে আল্লাহর تعالى এক অসাধারণ সৃষ্টি অদৃশ্য বুদ্ধিমান প্রাণীরা রয়েছে, এক এলিয়েন জাতি, যাদের কিছু ক্ষমতা আছে মানুষের ক্ষতি করার। এই জিন জাতির অনেকেই পথভ্রষ্ট, যারা তাদের শয়তানদের সাথে হাত মিলিয়ে মানুষের সৃষ্টির একদম শুরু থেকে মানুষের ক্ষতি করে এসেছে। অনেক পথভ্রষ্ট মানুষ, তাদের আত্মাকে এদের কাছে বেঁচে দিয়ে, চরম কুফরি এবং শিরকের মাধ্যমে এদের কাছে অনুরোধ করে এমন অনেক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটাতে পারে, যা আমাদের কাছে জাদু ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। সেই প্রাণীদেরকে দিয়ে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটানোর জন্য তারা নানা ধরনের জঘন্য কাজ করে — খুন, ব্যভিচার, সমকামিতা, মানুষের মল খাওয়া, কবরস্থানে বাস করা, এমনকি কু’রআনের উপর দাঁড়িয়ে থাকার মত জঘন্য কাজ।[১] এই সব করে তারা সেই সব শয়তানদের খুশি করে দেয়, কারণ শয়তানদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষকে জাহান্নামে পাঠানো। এভাবে তারা যখন নতুন মানুষ কাস্টমার পায় জাহান্নামে পাঠানোর জন্য, তখন সেই কাস্টমারের অনুরোধে তারা কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটায়। সেই অস্বাভাবিক ঘটনায় মানুষ মুগ্ধ হয়ে নিজেদেরকে তাদের দাস বানিয়ে ফেলে।

মুসলিম পরিবারের সন্তান হয়েও, অজ্ঞতার কারণে নতুন প্রজন্মের অনেকেই বিশ্বাস করে না যে, ‘নজর লাগা’ ‘অশুভ দৃষ্টি’ বলতে কিছু আছে। অনেকেই মনে করে এগুলি কুসংষ্কার। অজ্ঞতা এতোই বেশি যে, অনেকে জিনের অস্তিত্বও অবিশ্বাস করে। অথচ কুরআনকে বিশ্বাস করে, কেউ কেউ নামাজও পড়ে। এদেরকে আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন—
– সুরা নাস নিশ্চই মুখস্ত আপনার?
– হ্যা, এটতো বাচ্চাও পারে।
– একদম শেষ আয়াতটা কি?
– মিনাল জিন্নাতি ওয়ান্‌ নাস…
– তাহলে ওটার মানে কি?

মানে বলার পর তখন তারা অবাক হয়! আরও অবাক করার ব্যাপার হলো, এখনও অনেকে মনে করেন ইবলিস আগে ফেরেশতা ছিল!

অর্থ বুঝে কুরআন না পড়লে আমরা কতটাই অজ্ঞ থেকে যাই!

জাদুর ফলাফল ভয়ংকর

যে কোনো ধরনের জাদু, অশুভ দৃষ্টির পদ্ধতিগুলো এতটাই কুফরি এবং শিরকে ভরপুর যে, যারা এগুলো কেনে এবং বিক্রি করে, তাদের আখিরাত শেষ। তাদের কোনো ধরনের ক্ষমা পাওয়ার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাই জাদু করার চেষ্টা না করে মানুষের উচিত নিজেকে সংশোধন করা। কী কারণে তার জীবনে কিছু হচ্ছে না, আল্লাহ تعالى তাকে কিছু দিচ্ছেন না — সেটা খুঁজে বের করা, এবং নিজেকে পরিবর্তনের মাধ্যমে আল্লাহকে تعالى খুশি করার চেষ্টা করা। একমাত্র আল্লাহই تعالى পারেন তার জন্য ভালো কিছু তাকে দিতে। সে নিজে যদি অন্য কোনো পদ্ধতিতে জোর করে কিছু হাসিল করার চেষ্টা করে, তাহলে সেটা তার কাছে তখন ভালো মনে হলেও, সেটা আসলে তার জন্য ভালো নয়। কারণ, সত্যিই যদি সেটা তার জন্য ভালো হতো, তাহলে আল্লাহ تعالى নিশ্চয়ই তার দু’আ কবুল করে তাকে সেটা ইতিমধ্যেই দিতেন। যেহেতু আল্লাহ تعالى সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি তাকে সেটা দেবেন না, তার মূল কারণ: সেটা আসলে তার জন্য ভালো নয়। তাই সেটা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে এই সব জঘন্য পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে কোনো লাভ নেই।

যেমন, কেউ যদি জাদু করে কোনো নারীকে বশ করার চেষ্টা করে, বা কারো স্ত্রীকে তার স্বামীর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করে তারপর সেই স্ত্রীকে বিয়ে করার মতলবে জাদুর আশ্রয় নেয়, তখন সেই নারীকে সে হয়ত পেতে পারে। কিন্তু তারপর তার জীবন সুখের হওয়া তো দূরের কথা, এই দুনিয়া এবং আখিরাত, দুটোই তার জন্য নরক হয়ে যাবে। তাই প্রেমে অন্ধ হয়ে জোর করে কাউকে আদায় করার চেষ্টা করাটা একেবারেই বোকামি। একই ভাবে, কেউ যদি জাদু করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সর্বনাশ করে নিজে ব্যবসায়ে সফল হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তার ব্যবসায়ের সব আয় হারাম হয়ে যাবে। সে হারাম খাবে, হারাম পড়বে, ছেলেমেয়েদের হারাম খাইয়ে বড় করবে। এর ফলাফল হবে ভয়ংকর। তখন তার কোনো ইবাদত, দু’আ কবুল হবে না। দুনিয়ার অল্প কিছুদিনের সুখের লোভে সে সারাজীবনের জন্য জান্নাত হারিয়ে ফেলবে।

2_103

ওরা যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখত এবং তাঁর প্রতি সচেতন থাকতো, তাহলে আল্লাহর কাছে তাদের জন্য পুরষ্কার হতো অনেক ভালো — যদি তারা বুঝত। [আল-বাক্বারাহ ১০৩]

সুত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৮৭] Princeton Engineering Anomalies Research — http://www.princeton.edu/~pear/experiments.html, http://www.scientificexploration.org/edgescience/edgescience_04.pdf
  • [১৮৮] প্লেসবো এফেক্ট — নকল ওষুধে রোগমুক্তি শুধুমাত্র বিশ্বাসের কারণে http://www.nhs.uk/Livewell/complementary-alternative-medicine/Pages/placebo-effect.aspx
  • [১৮৯] Histamine dilutions modulate basophil activation — http://link.springer.com/article/10.1007%2Fs00011-003-1242-0
  • [১৯০] আকাশ থেকে অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ — http://www.examiner.com/article/san-diego-booms-earthquake-or-skyquake, http://www.utsandiego.com/news/2009/dec/21/mysterious-boom-shakes-county/, http://www.youtube.com/watch?v=oLIyh_L0_M8
  • [১৯১] হিপনোসিস — http://www.scientificamerican.com/article/hypnosis-memory-brain/
  • [১৯০] আকাশ থেকে অদ্ভুত যান্ত্রিক শব্দ — http://www.examiner.com/article/san-diego-booms-earthquake-or-skyquake, http://www.utsandiego.com/news/2009/dec/21/mysterious-boom-shakes-county/, http://www.youtube.com/watch?v=oLIyh_L0_M8
  • [১৯২] রুকইয়াহ, জিন এবং অশুভ দৃষ্টির প্রভাব থেকে মুক্তির পদ্ধতি — http://islamqa.info/en/3476, http://islamqa.info/en/89604, http://islamqa.info/en/9691

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—


ডাউনলোড করুন কুর‘আনের কথা অ্যাপ

9 thoughts on “ওরা মানুষকে জাদু শিখিয়েছিল — আল-বাক্বারাহ ১০২-১০৩”

  1. assalamu alaikum, vaia moner jorer kotha bollen palcebo effect e. Quantum method er byapar tao to sherokom. ora moner jorer bishoyta emphasize kore quantum method er classgulote. kintu Quantum method er shateh onek shirk naki jorito emon ekta lekha porlam koyekdin age. ei byapare kichu jana thakle ektu jodi share korten. jazakallahu khairan.

    1. মানুষের মনের কিছু ক্ষমতা যে রয়েছে, এনিয়ে যথেষ্ট এক্সপেরিমেন্ট রয়েছে। তবে সেই ক্ষমতাকে পদ্ধতিগত ভাবে শেখার জন্য যে সব ফর্মাল মেথড প্রচলিত রয়েছে, যার মধ্যে কোয়ান্টাম মেথড একটি, সেগুলোতে কিছু সমস্যা থাকতে পারে, যদি তারা আক্বিদার বিরুদ্ধে কোনো কথা বা কাজ করতে বলে। সুতরাং আমাদের সাবধান থাকতে হবে আমরা যেন আমাদের মানসিক ক্ষমতাকে ডেভেলপ করতে গিয়ে কোনো শিরক করে না ফেলি। সেগুলো সযত্নে এড়িয়ে গেলে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।

  2. আচ্ছা জ্বিন হাজিরা কি সত্যিই করা যায়,আমি বলতে চাই এসব জাদুটোনা যদি সত্যিই থাকত তাহলে তো এসব তান্তিকরা বিলগেটস হয়ে যেত,এসব জাদুকর রা তাহলে বিশ্বের ধনী ব্যাক্তিগুলোর কাতারে থাকতেন,কিন্তু নেই কেনো?তারা তাদের জাদু শক্তি দিয়ে একটা ব্যাংক ও ত লুট করে ধনী হয়ে যেতে পারে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *