তোমার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, এক যথার্থ উপহার —আন-নাবা

নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতি সদাসতর্কদের জন্যই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা— বাগানের পর বাগান, আঙ্গুরের সমাহার, আকর্ষণীয় মানানসই জুটি, উপচে পড়া পানপাত্র। সেখানে তারা কোনো ধরনের ফালতু কথা বা মিথ্যা কথা শুনবে না —তোমার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, এক যথার্থ উপহার। —আন-নাবা ৩১-৩৬

নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতি সদাসতর্কদের জন্যই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা

আল্লাহ تعالى আছেন এবং তিনি আমাদের সব কাজ দেখছেন, সব কথা শুনছেন এবং সব চিন্তা বুঝতে পারছেন —এই ব্যাপারে যারা সদা-সতর্ক থাকে এবং তাঁর ভয়ে নিজের কথা-কাজ-চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই হচ্ছেন মুত্তাকী অর্থাৎ তাকওয়াবান। শুধুমাত্র তাকওয়াবানদেরকে আল্লাহ تعالى নিশ্চয়তা দিয়েছেন চূড়ান্ত সফলতার।

কেন তাকওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ? শুধু নামাজ, রোজা, হাজ্জ করলেই কি যথেষ্ট নয়?

তাকওয়া নেই এমন পাঁচ-ওয়াক্ত-নামাজী বাসায় এসে পরিবারের সাথে, কাজের লোকের সাথে, এমনকি নিজের সন্তানের সাথে দানবের মত আচরণ করে। তাকওয়া নেই এমন হাজ্জি ঘুষ খেয়ে হজ্জে যায় এবং হজ্জ থেকে ফিরে এসে আবার ঘুষ খায়। তাকওয়া নেই এমন দাড়িওয়ালা পণ্যে ভেজাল দেয়, কমদামী মাল বেশী দামে চালিয়ে দেয়, কাগজপত্রে মিথ্যা কথা লিখে অন্যায় সুবিধা নেয়, অফিসে লুকিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করে, নামাজ পড়তে বের হয়ে আর সহজে কাজে ফেরত আসে না ইত্যাদি। —ধর্মীয় বেশভূষাধারী এই মানুষগুলোর স্বভাব এবং কাজের জন্য ইসলামের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়, কারণ এদেরকে দেখে অন্যেরা মনে করে যে, এটাই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের শিক্ষা। ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখন এরাই করে।

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আকাশকে খুলে দেওয়া হবে — আন-নাবা ১৭-৩০

চৌধুরী সাহেব স্বপরিবারে সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে এসেছেন। পাড়ে বসে তারা সমুদ্র উপভোগ করছিলেন, কিন্তু তার শিশু বাচ্চাটি এখন ক্ষুধায় কান্না শুরু করেছে। স্ত্রীকে নিয়ে উঠলেন নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বের করতে। তারা হেঁটে যাচ্ছিলেন, আর তখন এক ভীষণ শব্দে কানে তালা লেগে গেলো। তারপর পায়ের নিচে মাটি ভীষণ জোরে ঝাঁকুনি দিলো। তিনি দূরে ছিটকে পড়ে গেলেন। 

উপরে তাকিয়ে দেখলেন আকাশটা যেন গোলাপের মত লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, আকাশটাকে পৃথিবীর উপর থেকে ছিঁড়ে তুলে ফেলা হয়েছে। মহাকাশ খালি চোখে দেখা যাচ্ছে। আর পুরো মহাকাশে অজস্র ফাটল তৈরি হচ্ছে। তারাগুলো একে একে ঝরে যাচ্ছে। সূর্যকে কালো একটা কী যেন ঘিরে ফেলছে। দিনের বেলাতেও রাতের মত অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। চাঁদের শেষ আলোটুকুও একসময় নিভে গেলো। 

সৈকতে যারা ছিল সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে একেক দিকে দৌড়াচ্ছে। এমনকি তার স্ত্রীও বাচ্চা ফেলে আতংকে দৌড়াচ্ছেন। তিনি হতবিহ্বল হয়ে ছুটছেন। কোন দিকে যাবেন কিছুই জানেন না। 

সামনে একটা পাহাড় দেখে সেদিকে দৌড় দিলেন, যদি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়া যায়। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই এক ভীষণ ঝাপটা এসে পাহাড়টাকে গুড়ো-গুড়ো করে ধুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে গেলো। পেছনে সমুদ্রে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে পানি আকাশে ছিটকে উঠলো। তারপর সমুদ্রের পানিতেই আগুন ধরে গেল। এই অস্বাভাবিক ঘটনা দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না কী হচ্ছে চারপাশে! এটা তো কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়! 

একের পর এক ঝাপটায় আশেপাশের সবকিছু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তিনি হতবিহব্বল হয়ে তাকিয়ে দেখছেন। তার দৌড়ে পালানোর কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ করে তার গায়ে এসে একটা বাড়ি লাগলো…

সবকিছু অন্ধকার, নিশ্চুপ হয়ে গেলো। 

এরপর অনন্ত কাল যেন পার হয়ে গেলো।

চৌধুরী সাহেব চোখ খুলে তাকালেন। তার কানে এখন আরেকটি শব্দ বাজছে। তার মনে হলো, তিনি যেন এখনি মাটির ভেতর থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলেন। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন অজস্র মানুষের সমুদ্র। সবাই হতবিহব্বল হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। কেউ কেউ বিস্ফোরিত চোখে উপরে তাকিয়ে আছে। উপরে তাকিয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। এটা তো পরিচিত কোনো আকাশ নয়। অন্য কোনো জগতের আকাশ মনে হচ্ছে! আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত ছিঁড়ে ফাঁক করা। সেই ফাঁক দিয়ে উপরে দেখা যাচ্ছে প্রকাণ্ড কারা যেন এক ভীষণ আকৃতির কিছুকে তুলে ধরে রেখেছে।

নিচে তাকিয়ে তিনি অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলেন। পায়ের নিচে একদম মসৃণ সমতল মাটি। একটুও দাগ বা ভাঁজ নেই। যেদিকেই তাকান, সেদিকেই মসৃণ সমতল ভূমি, কোথাও উঁচু-নিচু কিছুই নেই। এটা তো সেই চিরচেনা পৃথিবীর মাটি নয়। মনে হচ্ছে ভিনগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি! 

তিনি সামনে থেকে কারো ডাক শুনলেন। সাথে সাথে তার দেহ নিজে থেকেই সেদিকে দৌড়ানো শুরু করল। তার আশেপাশের মানুষগুলোও দলে দলে সবাই পঙ্গপালের মতো সামনে দৌড়ে যাচ্ছে সেই ডাক শুনে। কী যেন ঘটতে যাচ্ছে সামনে! 

হঠাৎ করে তিনি এক ভীষণ আতংক অনুভব করলেন। কিছু একটা আসছে। অনেক দূর থেকে গর্জন করতে করতে বিশাল এক ভয়ংকর দানব যেন আসছে। দূরে দিগন্তে তাকিয়ে যা দেখলেন তাতে তিনি ভয়ে জমে গেলেন। এক বিশাল আগুনের জগতকে প্রকাণ্ড আকৃতির কারা যেন টেনে নিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে পুরো জগতটাই একটা হিংস্র দানব। হঠাৎ করে সেটি যেন ছাড়া পেয়ে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে তার শিকারকে খুঁজছে। তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন সেটা কী। হায় হায়! এই জিনিসের কথাই তো তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল! 

নিঃসন্দেহে সবকিছু ফয়সালার দিনটির সময় ঠিক করা আছে। সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। আর আকাশকে খুলে দেওয়া হবে এবং সেটা অনেকগুলো দরজার মতো হয়ে যাবে। পাহাড়গুলোকে চালিয়ে দেওয়া হবে, যেন তারা মরীচিকা—আন-নাবা ১৭-২০

নিঃসন্দেহে জাহান্নাম ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল সীমালঙ্ঘকারীদের জন্য, এক স্থায়ী আবাস হয়ে। যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকবে তারা। সেখানে কোনো ধরনের শীতলতার স্বাদ পাবে না, পাবে না কোনো পানীয়, শুধুই ফুটন্ত পানি এবং পুঁজ —উপযুক্ত প্রতিদান। —আন-নাবা ২১-২৬

জাহান্নাম ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে طاغين ত্বাগিনদের জন্য। এরা হচ্ছে চরম সীমালঙ্ঘনকারী। এরা কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। এদের জীবনটাই ছিল অবাধ্যতায় ভরা। যেমন—

চৌধুরী সাহেব বিশাল পরিমাণের ঘুষ খাইয়ে একটা সরকারি প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট হাতালেন। এর জন্য তিনি মন্ত্রীকে গুলশানে দুইটা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন। তারপর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে জোগাড় করা সেই বিশাল অংকের ঘুষ, সুদসহ শোধ করতে গিয়ে, এবং মন্ত্রীকে কথা দেওয়া দুইটা ফ্ল্যাটের টাকা উঠানোর জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে প্রজেক্টের অনেক টাকা এদিক ওদিক সরিয়ে ফেলতে হলো। দুই নম্বর সস্তা কাঁচামাল সরবরাহ করতে হলো। যোগ্য কনট্রাক্টরদের কাজ না দিয়ে অযোগ্য, সস্তা কনট্রাক্টরদের কাজ দিতে হলো, যারা কিনা তাকে প্রচুর ঘুষ খাওয়ালো। 

এরপর একদিন তার প্রজেক্ট ধ্বসে পড়ল। তার নামে ব্যাপক কেলেঙ্কারি হয়ে মামলা হয়ে গেলো। মামলায় উকিলের টাকা জোগাড় করতে তাকে আরও বিভিন্ন উপায়ে টাকা মারা শুরু করতে হলো। তারপর কয়েকদিন পর পর পুলিশ তাকে ধরতে আসে, আর তিনি উপরের তলার লোকদের ঘুষ খাইয়ে পুলিশকে হাত করে ফেলেন। 

প্রজেক্টে দুর্নীতির কারণে ভুক্তভোগী মানুষদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে একসময় অনেক টাকা খরচ করে কিছু ‘সোনার ছেলে’ পালতে হয়। তারা মাঝে মাঝেই খুন, ধর্ষণ করে, হোটেলে থেকে … করে এসে বিরাট বিল ধরিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে যখন পুলিশ ধরতে আসে, তিনি পুলিশকে টাকা খাইয়ে তাদেরকে রক্ষা করেন। এত দুশ্চিন্তার মধ্যে তিনি রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারেন না। দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার জন্য তাকে নিয়মিত মদ খাওয়া ধরতে হয়। এভাবে একটার পর একটা পাপে তিনি জড়িয়ে পড়তে থাকেন। অবাধ্যতা এবং সীমালঙ্ঘন তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু, তিনি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেন না, কারণ—

তারা ভাবতোই না যে, তাদের কাজের হিসেব কখনো দিতে হবে। আমার নিদর্শনগুলোকে সব মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করত —আমি সব গুনে গুনে হিসেব করে রেকর্ড করে রেখেছি। এবার তার প্রতিদান ভোগ করো। আমি তোমাদের শাস্তি কেবল বাড়াতেই থাকবো। —আন-নাবা ২৭-৩০ 

কোনোরকম জবাবদিহিতার ভয় যখন মানুষের মন থেকে চলে যায়, তখন সে পশুর থেকেও অধম হয়ে যায়। এরা তখন সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীতে পরিণত হয়। এদের দিয়ে এমন কোনো অন্যায় নেই, যা হয় না। 

আল্লাহ تعالى এদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি সব হিসেব করে রেখেছেন। শুধুই হিসেব করে রাখেননি, সেই হিসেবকে তিনি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেও রেখেছেন । أحصى আহ্‌সা অর্থাৎ গুণে গুণে হিসেব করে রাখা, সংরক্ষণ করে রাখা। দুনিয়াতে এরা পুলিশ, উকিল, বিচারপতিকে টাকা খাইয়ে সাক্ষী-প্রমাণ নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর تعالى হিসেব সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

শেষ অংশটি ভয়ঙ্কর — “আমি তোমাদের শাস্তি কেবল বাড়াতেই থাকবো।” আমরা যখন পৃথিবীতে কষ্টে থাকি, আমাদের মনে একটা সান্ত্বনা থাকে যে, আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই কষ্ট শেষ। যেমন, ধরুন আপনার গায়ে একদিন ফুটন্ত গরম পানি পড়ে গা ঝলসে চামড়া উঠে গেলো। আপনি এক মুহূর্তের জন্য না ঘুমিয়ে বিছানায় ছটফট করে ব্যথায় চিৎকার করছেন। প্রতিটা সেকেন্ড আপনার কাছে মিনিট মনে হচ্ছে। প্রত্যেকটা হৃদস্পন্দনের সাথে সাথে আপনার চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আপনি নিজেকে বোঝাচ্ছেন: “আর একটু। আর কয়েকটা দিন। তারপরেই ব্যথা কমে যাবে, ঘুমিয়ে যাবো, কষ্ট কমে যাবে…”

—এভাবে পৃথিবীতে আমরা প্রচণ্ড কষ্টের অভিজ্ঞতা ধৈর্য ধরে পার করি, কারণ আমরা জানি একদিন সেই কষ্ট শেষ হবে। এই আশা আমাদেরকে কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেয়, ধৈর্য ধরার অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু এই ধরনের মানুষরা, যারা জাহান্নামে চিরকাল থাকবে, তাদের কোনো আশা নেই। তাদের ধৈর্য ধরার কোনো অনুপ্রেরণা নেই। তারা জানে যে, তাদের এই প্রচণ্ড কষ্ট কখনো শেষ হবে না। এই বিকট দুর্গন্ধ, প্রচণ্ড গরম, অমানুষিক অত্যাচার — চলতেই থাকবে। কখনো তারা একটুও ঘুমাতে পারবে না। কোনোদিন তারা আগের সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারবে না। —এই ভয়ঙ্কর উপলব্ধি তাদের কষ্টকে হাজার গুনে বাড়িয়ে দেবে। জাহান্নামের প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণার সাথে যোগ হবে এক বুক ফাটা আতঙ্ক: এখানে তাদের কষ্ট বাড়তেই থাকবে।

যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকবে তারা

জাহান্নামে মানুষ যুগ যুগ ধরে থাকবে। এর কোনো শেষ নেই। কত যুগ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, বরং حقب হুকব অর্থ যুগ এবং أحقاب আহকাব অর্থ বহু যুগ। অত্যন্ত দীর্ঘ সময় বোঝানোর জন্য যুগ যুগ বলা হয়েছে। পরকালের দিন, মাস, বছরের দৈর্ঘ্য অনেক বড় হবে বলে বেশ কিছু সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। আর কুরআনের অন্যান্য জায়গায় আমরা দেখেছি ‘চিরকাল’ শব্দটা বিশেষভাবে ব্যবহার হতে। 

অনেকে প্রশ্ন করেন: অনন্তকাল শাস্তি কীভাবে ন্যায় বিচার হতে পারে? কেউ একজন যদি সারাজীবন অপরাধ করেও এবং সেজন্য যদি পুরো মানবজাতিরও ক্ষতি হয়, তারপরেও তাকে বহু কোটি বছর শাস্তি দিলে একসময় সেটা গিয়ে মোট পাপের সমান শাস্তি হবে। কিন্তু অনন্তকাল ধরে কাউকে শাস্তি দিতে থাকলে তো একসময় না একসময় গিয়ে তার শাস্তি যথাযথ প্রতিদানের থেকে বেশি হয়ে যাবেই? তখন সেটা কীভাবে ন্যায়বিচার হবে? 

আহলুস সুন্নাহ ওয়া আল জামাআহ-এর বিশ্বাস হলো যে, জাহান্নাম চিরকাল থাকবে এবং সেখানে অনেকেই থাকবে, যাদের শাস্তি কখনোই শেষ হবে না। এটাই হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত। মূল ধারার প্রায় সব বড় ইমামের একই মত যে, জাহান্নামে কিছু মানুষ চিরকাল শাস্তি পেতে থাকবে এবং জাহান্নাম অবিনশ্বর। যেমন, ফিরাউনের শাস্তির কোনো শেষ নেই। 

যারা প্রশ্ন করেন যে, কেন মানুষের সাময়িক জীবনের শাস্তি অনন্ত কাল হবে? —তাদের সমস্যা হলো যে, তারা মানুষের অন্যায়কে তার আয়ুকাল অনুসারে পরিমাপ করছেন, অন্যায়ের প্রভাব অনুসারে নয়। একজন মানুষ ৭০-৮০ বছর ধরে যে অন্যায় করতে পারে, তার থেকে অনেক বড় অন্যায় অন্য কেউ করতে পারে এক ঘণ্টায়, যার প্রভাব যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম থেকে যেতে পারে। এছাড়াও কুরআনের একটি আয়াত থেকে আমরা জানতে পারি যে, কিছু মানুষ আছে, যাদেরকে যদি অনন্ত জীবন দেওয়া হয়, তাহলে তারা অনন্তকাল ধরে অন্যায় করতে থাকবে। কারণ, এরা নিজেদেরকে এতটাই নষ্ট করে ফেলেছে যে, এরা সংশোধনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। এই ধরনের মানুষদেরকে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে অনন্তকাল শাস্তি দেওয়া হয়, কারণ সে পৃথিবীতে ৭০-৮০ বছর থাকুক, আর অনন্তকাল থাকুক, এরা পাপ করেই যাবে।

তুমি যদি তাদেরকে দেখতে, যাদেরকে আগুনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে, তারা বলবে, “হায়! আমাদেরকে যদি ফিরিয়ে নেওয়া হতো, তাহলে আমরা আমাদের রবের নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা বলতাম না এবং মুমিনদের একজন হয়ে যেতাম।” বরং তারা আগে যা গোপন করেছিল, সেটা এখন তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর যদিও বা তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হতো, তারা আবার তাই করত যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চিতভাবে এরা মিথ্যাবাদী। —আল-আনআম ২৭-২৮

এই আয়াতের অর্থ এই যে, এদেরকে যদি মৃত্যুর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের পরকালের স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়, তাহলে এরা এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, এরা অন্যায় করতেই থাকতো। এদের জন্য পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থেকে চিরকাল অন্যায় করা আর একসময় পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া একই কথা। এদের জন্য চিরকাল শাস্তিই যথার্থ।

তবে প্রাচীন তাফসিরবিদ আত-তাবারি বেশ কয়েকটি আছার সংগ্রহ করেছেন, যেখানে সাহাবিদের মন্তব্য আছে যে, জাহান্নাম একসময় খালি হয়ে যাবে বা একসময় এটিও ধ্বংস হয়ে যাবে এর ভেতরের অপরাধীদের নিয়ে, যখন তাদের উপযুক্ত শাস্তির মেয়াদ শেষ হবে। ইবন আল-কাইয়ুম-এর হাদি আল-আরওয়াহ বইয়ের এক লম্বা অধ্যায়ে যে সমস্ত আলিমরা জাহান্নামের অনন্ত শাস্তি সমর্থন করেন না, তাদের সেই দাবির পেছনে কারণগুলো দেখিয়েছেন। তার সারমর্ম হচ্ছে যে, জাহান্নাম-এর একাধিক পরিণতি হতে পারে এবং আল্লাহর রহমত এবং ক্ষমা সবকিছুর উপরে। তার বক্তব্য, “সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাবান বিচারকের প্রজ্ঞার এটা সাজে না যে, তিনি কাউকে সৃষ্টি করবেন চিরকাল শাস্তি দেওয়ার জন্য, অনন্ত শাস্তি যা শেষ হয় না এবং যার কোনো বিরতি নেই।” তবে তিনি নিজে কোনো একটি মতকে সমর্থন করে অন্য মতকে বাতিল বলেননি। বরং তিনি বলেছেন যে, “আল্লাহ ভালো জানেন।”

একইভাবে তার শিক্ষক ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ দুটো মতকেই তার লেখা শেষ বইতে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন। যদিও তিনি বলেননি যে, তিনি নিজে কোন মতকে সমর্থন করেন, কিন্তু তার লেখা পড়লে বোঝা যায় যে, জাহান্নাম চিরজীবন হতে পারে এবং নাও হতে পারে— এই দুটো মতকেই তিনি সমানভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি কোনোটাকেই বাতিল বলেননি।

যাহোক, জাহান্নাম চিরকাল থাকবে, নাকি কোটি কোটি কোটি বছর থাকবে তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না। জাহান্নামে এক মুহূর্ত থাকার অভিজ্ঞতা দুনিয়াতে যাবতীয় ফুর্তির আনন্দ বাতিল করে দেবে। এর শাস্তি এতটাই কুৎসিত যে, সেখানে একদিন থাকাটাও পৃথিবীতে আজীবন শাস্তি পাওয়া থেকে অনেক বেশি কষ্টের। তাহলে কোটি কোটি বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্ত অমানুষিক শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন সহ্য করার কথা চিন্তাও করা যায় না। 

কিয়ামতের বর্ণনার জন্য যে আয়াতগুলো ব্যবহার করা হয়েছে—
  •  فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ ﴿١٣﴾ وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً ﴿١٤﴾
  •  إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا ﴿١﴾ وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا ﴿٢﴾
  • فَإِذَا انشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ ﴿٣٧
  • إِذَا السَّمَاءُ انفَطَرَتْ ﴿١﴾ وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انتَثَرَتْ ﴿٢﴾
  • إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْوَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ… عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ)
  • فَإِذَا بَرِقَ الْبَصَرُ ﴿٧﴾ وَخَسَفَ الْقَمَرُ ﴿٨﴾ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ﴿٩﴾
  •  يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ ﴿١﴾ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَىٰ وَمَا هُم بِسُكَارَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ اللَّـهِ شَدِيدٌ ﴿٢﴾
  •  يَوْمَ تَرْجُفُ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ وَكَانَتِ الْجِبَالُ كَثِيبًا مَّهِيلًا ﴿١٤﴾
  •  وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ ﴿٣﴾
  •  يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ۚ ذَٰلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ ﴿٤٤﴾
  • ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُم قِيَامٌ يَنظُرُونَ
  •  وَانشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ ﴿١٦﴾ وَالْمَلَكُ عَلَىٰ أَرْجَائِهَا ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ﴿١٧﴾
  •  فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا ﴿١٠٦﴾ لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتًا ﴿١٠٧﴾
  •  يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّـهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴿٤٨﴾
  •  خُشَّعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُّنتَشِرٌ ﴿٧﴾ مُّهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ ۖ يَقُولُ الْكَافِرُونَ هَـٰذَا يَوْمٌ عَسِرٌ ﴿٨﴾
  •  وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِمَن يَرَىٰ ﴿٣٦﴾

সেদিন কিছু মানুষের চেহারা হবে খুশীতে উজ্জ্বল — আল-গাশিয়াহ পর্ব ১

সেই হতবিহ্বল করা দিনের কথা শুনেছ? যেদিন কিছু চেহারা থাকবে ভয়ে অবনত। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত আগুনে। ফুটন্ত পানির কুয়া থেকে পানি পান করতে দেওয়া হবে। বিষাক্ত কাটা ছাড়া আর কোনো খাবার পাবে না। যা কোনো পুষ্টি দেয় না, ক্ষুধাও মেটায় না।  —আল-গাশিয়াহ ১-৭

সেই হতবিহ্বল করা দিনের কথা শুনেছ?

আমরা যখন রাতে বিছানায় শুয়ে দেখি সবকিছু ভীষণ দুলতে শুরু করেছে, বুঝতে পারি যে ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। তখন আমরা আতংকে ছোটাছুটি শুরু করে দেই। এক ভূমিকম্পই আমাদের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেয়। কয়েকদিন আতংকে কাটে কখন ভূমিকম্পের বাকিটুকু হবে। সারাদিন মাথায় চিন্তা ঘুরতে থাকে: আরেকবার ভূমিকম্প হলে বাড়ি টিকে থাকবে? সব সম্পত্তি ঠিকমত বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে? ছেলেমেয়েদের কোনো অসুবিধা হবে না তো? ঠিকমত নামাজ পড়া হচ্ছে? আমার কবর কি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই হয়ে যাবে?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি মানবজাতিকে শিখিয়েছেন, যা তারা জানত না — আল-আলাক্ব — পর্ব ২

যিনি মানুষকে এক ঝুলন্ত গঠন থেকে সৃষ্টি করেছেন

আল্লাহ تعالى মানুষকে লক্ষ্য করতে বলছেন এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর। মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন আলাক্ব অর্থাৎ জমাট বাঁধা রক্ত বা ঝুলন্ত এক গঠন থেকে। এই বাণী যখন মানুষকে দেওয়া হয়েছিল, তখন মানুষ জানত না এই আয়াতের গভীরতা কতখানি। আজকে আমরা অত্যাধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি ভ্রূণ মায়ের গর্ভের দেওয়ালে আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকে। আর আলাক্ব শব্দের অর্থই হচ্ছে এমন একটা কিছু, যা আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকে।

আল্লাহ تعالى যখন মানুষকে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে বলেন, তখন তার মধ্যে কিছু উদ্দেশ্য থাকে। প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর تعالى অসীম ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং তাঁর প্রজ্ঞা সম্পর্কে মানুষকে চিন্তা করতে উৎসাহ দেওয়া। একটা মাত্র জমাট বাঁধা রক্ত থেকে একসময় চোখ, মুখ, কান, হাত, পা বের হয়ে বড় সড় একটা পরিপূর্ণ মানুষ তৈরি হয়ে যায়। জমাট বাধা রক্তের মধ্যে কোনো বিবেক, বুদ্ধি, চেতনা কিছুই নেই। এটা একটা বোধ শক্তিহীন জড় পদার্থ। অথচ এই রক্তের ফোঁটা থেকেই মহাবিশ্বের অন্যতম বুদ্ধিমান, চেতন, বিবেকবান, জটিল প্রাণীর জন্ম হয়। কীভাবে এক ফোঁটা রক্তের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণের তথ্য থাকে যে, তা মানুষের প্রতিটি অঙ্গের আকৃতি, গঠন, চামড়ার রঙ, চোখের রঙ, উচ্চতা, শারীরিক ক্ষমতা, মস্তিষ্কের মতো জটিলতম যন্ত্র গঠন করার যাবতীয় নির্দেশ সংরক্ষণ করা থাকে?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে—আত-তাকাছুর

বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে। যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছে যাও।
না! তোমরা একদিন জানতে পারবে।
আবারো বলছি, না! তোমরা একদিন জানতে পারবে।
সত্যিই, তোমরা যদি নিশ্চিতভাবে জানতে কী ঘটবে।
তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখতে পাবে। আবারো বলছি, তোমরা অবশ্যই নিজের চোখে তাকে দেখতে পাবে।
তারপর, সেদিন সুযোগ-সুবিধাগুলোর ব্যাপারে তোমাদেরকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে। —আত-তাকাছুর

বেশি-বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে দিয়েছে

“বন্ধুবান্ধব সব এতদিনে নিজের বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছে। আমি এখনও ভাড়াটিয়া বলে মানুষের কথা শুনছি। ওদের বাসায় বেড়াতে গেলে নিজেকে ফকির-ফকির মনে হয়। আর না। এবার বাড়ি কেনার ঋণটা নিতেই হবে।”

“অনেক হয়েছে, আর না। পুরনো গাড়িটা ফেলে দিয়ে এবার একটা নতুন গাড়ি কিনবোই। প্রতিবেশির বড় গাড়িটার পাশে আমার গাড়িটাকে একটা টেম্প্যু মনে হয়।”

“আমার পুরনো আমি-ফোনটা মানুষের সামনে বের করতে লজ্জা লাগে। সবাই যেন কেমন-কেমন করে তাকায়। আজকাল সবার হাতে আমি-ফোন ৭। পাশের বাড়ির কাজের মেয়েটার হাতেও আমার থেকে নতুন মডেলের ফোন!”

এই যে লোক দেখানোর প্রতিযোগিতার মানসিকতা—অন্যদের থেকে ভালো বাড়ি, গাড়ি কিনতে হবে। সব দামি ব্রান্ডের জিনিস ব্যবহার করি দেখাতে হবে—বেশি-বেশি পাওয়ার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা হচ্ছে আত-তাকাছুর (التَّكَاثُر)।[১][৪]

একসময় আমরা অনেক কাটখোর পুড়িয়ে বাড়ি কিনি। মানুষকে গর্ব করে দেখাই নতুন কেনা দামি আসবাবপত্র, ঝকঝকে বাথরুম। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই সেই স্বপ্নের বাড়ির উপর থেকে মন উঠে যায়। বেড়াতে গিয়ে অন্যের বাড়ির আসবাবপত্র, বাথরুম দেখে আফসোস শুরু হয়। আবার হয়তবা একদিন শখের ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনি। মানুষকে বলে বেড়াই, “এবার গাড়িটা কিনেই ফেললাম। বেশি না, মাত্র ৩৫ লাখ। সস্তায় পেয়ে গেছি, কী বলেন?” তারপর কয়েক বছর না যেতেই বন্ধুর নতুন গাড়ির সামনে সেটাকে লক্কড় মনে হয়। একসময় সবাইকে গর্ব করে দেখিয়ে বেড়ানো নতুন মোবাইল ফোনটা দুই বছর না যেতেই টেবিল থেকে সরিয়ে পকেটে লুকিয়ে রাখতে হয়। এত চেষ্টা করে এতসব পাওয়ার পরেও বেশিদিন প্রাপ্তির সুখ ধরে রাখা যায় না। শুরু হয় আবার প্রতিযোগিতার দৌড়।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যারা পেছনে কথা লাগায়, সামনাসামনি অপমান করে —এরা সব শেষ হয়ে যাক —আল-হুমাযাহ

যারা পেছনে কথা লাগায়, সামনাসামনি অপমান করে —এরা সব শেষ হয়ে যাক। যে সম্পদ জমা করে গুণেগুণে রেখে মনে করে যে, তার সম্পদ তাকে অমর করে রাখবে। কখনই না! তাকে ছুড়ে ফেলা হবে এক চূর্ণবিচূর্ণকারীর ভেতরে। জানো সেটা কী? সেটা আল্লাহর আগুন, লেলিহান শিখা। এটা মানুষের হৃদয়-মনকে জ্বালিয়ে দিয়ে আসে। এটা তাদের উপর ঘিরে আসবে। উঁচু উঁচু থামে। —আল-হুমাযাহ

হুমাযাহ হচ্ছে কারও পেছনে কথা লাগানো, গীবত করা। আর লুমাযাহ হচ্ছে কাউকে সামনা-সামনি দোষ ধরে অপমান করা, বাজে আচরণ করা।[৫][১৮] কিছু উদাহরণ দেই—

ফোন এসেছে। ওপাশ থেকে বলছে, “ভাবী, কেমন আছেন? আপনাকে অনেকদিন ফোন করে পাই না।” ভাবী উত্তর দিলেন, “আমার ফোনটা নষ্ট ছিল। ঠিক করতে দিয়েছিলাম।” ওপাশ থেকে, “ঠিক করতে? কেন ভাইসাহেব কি আপনাকে নতুন ফোন কিনে দেয় না? আজকাল সবার হাতে আমি-ফোন ৭। আমাকে ও নতুন মডেল বের হলেই কিনে দেয়। আপনারটা তো বোধহয় এখনও আমি-ফোন ৪ তাই না?” ভাবী বললেন, “না, না, অবশ্যই দেয়। আমি নিজেই কিনি না। আগেরটা তো চলছেই।” ওপাশ থেকে, “এটা কেমন কথা হলো? আপনি ঘরের সব কাজ করেন। বাচ্চাদের পালেন। আবার আপনাকে ভাঙ্গা ফোনও চালাতে হবে? ভাই মনে হচ্ছে আপনাকে ঠিকমতো কদর করেন না।”

ব্যাস, ভাবীর মাথায় ঢুকে গেলো, “ভাই আপনাকে ঠিকমতো কদর করেন না।” প্রথমে একটু মন খারাপ হলো। তারপর অভিমান। অভিমান বাড়তে বাড়তে রাগে পরিণত হলো। রাগ থেকে ঘৃণা। সন্ধ্যায় স্বামী যখন ঘরে ঢুকল, তখন থমথমে অবস্থা। স্বামী যখন বলল, “ইয়ে, খুব ক্ষুধা লেগেছে, একটু নাস্তা দেবে?”, সাথে সাথে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ!

—ফোন যে করেছিল, সে হচ্ছে হুমাযাহ। এরা মানুষে মানুষে কথা লাগায়। কানা-ঘুষা করে। অন্যের চরকায় তেল দেওয়া হচ্ছে এদের জীবিকা। এরা তাদের লিকলিকে জিভ দিয়ে অন্যের অন্তরে বিষ ঢেলে দেয়।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

ধন-সম্পদ, সন্তান কোনো কিছুই তার কাজে আসবে না — আল-মাসাদ

সুরা মাসাদ বা লাহাব কুর‘আনের অন্যতম বিতর্কিত সূরাহ। শুধুই যে অমুসলিমরা এই সূরাহকে আক্রমণ করে তাই নয়, একইসাথে অনেক মুসলিমদেরকেও দেখা যায় এই সূরাহ নিয়ে নানা সন্দেহে ভুগতে। তাদের উভয়ের অভিযোগ হচ্ছে, কেন কুর‘আনে শুধুই দুইজনকে অভিশাপ দিয়ে পুরো একটা সূরাহ দেওয়া হলো? এই সূরাহ পড়ে মুসলিমদের কী লাভ? কুর‘আন না মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক? এই সূরাহ’র মধ্যে তো কোনো পথনির্দেশ দেখা যাচ্ছে না? কোটি কোটি মানুষ এই সূরাহ মুখস্ত করে কোটি কোটি বার পড়ছে, শুধুই কোনো এক বদ পরিবারকে অভিশাপ দেওয়ার জন্য, এ কেমন কথা হলো? নামাজে দাঁড়িয়ে লক্ষ কোটি মানুষ এক পরিবারের গুষ্টি উদ্ধার করছে, এতে মুসলিম উম্মাহর কী উপকার হচ্ছে?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কিয়ামতের দিন আল্লাহ ওদের সাথে কথা বলবেন না — আল-বাক্বারাহ ১৭৪-১৭৬

গত কয়েক শতকে উপমহাদেশের মানুষদেরকে কৌশলে কুরআন থেকে দূরে রেখে কয়েকটা প্রজন্ম তৈরী করা হয়েছে, যারা কুরআন সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞানও রাখে না। এরা জানে না কুরআনে পরিষ্কারভাবে কী হালাল, কী  হারাম বলা আছে, তাওহীদের শিক্ষা কী? তারা শুধু পড়েছে কিছু গৎবাঁধা বই, যেই বইগুলোর অনেকগুলোতেই নানা ধরনের জাল হাদিস, বিদআতের ছড়াছড়ি।[১১] এভাবে একটি পুরো জাতিকে কুরআনে নিরক্ষর করে রেখে গেছে কিছু ইসলামী নামধারি দল এবং কথিত আলেম নিজেদের ইচ্ছামত ধর্ম ব্যবসা করার জন্য। এদের পরিণাম ভয়ঙ্কর—

2_174_title

2_174আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন সেটা যারা গোপন রাখে, আর দুনিয়ায় সামান্য লাভের বিনিময়ে তা বেচে দেয়, ওরা নিজেদের পেটে জাহান্নামের আগুন ছাড়া আর কিছু ভরে না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ওদের সাথে কথা বলবেন না, ওদেরকে পবিত্রও করবেন না। ওদের জন্য রয়েছে প্রচণ্ড কষ্টের শাস্তি। [আল-বাক্বারাহ ১৭৪]

আজকাল অনেক ‘আধুনিক মুসলিম’ কু’রআনের আয়াতগুলোর পরিষ্কার বাণীকে ধামাচাপা দিয়ে, অনেকসময় বিশেষভাবে অনুবাদ করে, ইসলামকে একটি ‘সহজ জীবন ব্যবস্থা’ হিসেবে মানুষের কাছে প্রচার করার চেষ্টা করছেন। তারা দেখছেন যে, পাশ্চাত্যের ‘উন্নত’ জাতিগুলো ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে কত আনন্দের জীবন যাপন করছে, জীবনে কত স্বাধীনতা উপভোগ করছে: প্রতিদিন রংবেরঙের মদ পান করছে, বিশাল সব আভিজাত্যের হোটেলে গিয়ে জুয়া খেলছে, সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছে; ইচ্ছামত সুন্দর কাপড় পড়ছে, বন্ধু বান্ধব নিয়ে নাচগান করছে—জীবনে কতই না ফুর্তি ওদের।

ওদের এত সুখ, এত আনন্দ দেখে তারা ভিতরে ভিতরে ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছে। কেন তারা ওদের মতো ফুর্তি করতে পারবে না? কেন তাদেরকে এতটা নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে হবে?— এটা তারা কোনোভাবেই নিজেদেরকে বোঝাতে না পেরে, চেষ্টা করছে কোনোভাবে যদি ইসলামকে একটি ‘আধুনিক’, ‘সহজ’ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষের কাছে প্রচার করা যায়। তখন তারা পশ্চিমাদের মতো ফুর্তি করতে পারবে, আবার মুসলিমদের কাছ থেকে একদম দূরেও সরে যেতে হবে না, সমাজে অপরাধীর মতো লুকিয়ে চলতে হবে না। ‘মুহাম্মাদ’ ‘আব্দুল্লাহ’ নাম নিয়ে একদিকে তারা সপ্তাহে একদিন জুম্মার নামায পড়তে যেতে পারবে, অন্যদিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে মেয়েদের সাথে নাচতে পারবে, রবিবারে পার্টিতে বন্ধুদের সাথে একটু রঙিন পানিও টানতে পারবে। এভাবে তারা ‘আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন সেটা গোপন রাখে, আর দুনিয়ায় সামান্য লাভের বিনিময়ে তা বেচে দেয়,’—কু’রআনের শিক্ষার পরিপন্থী একটি জীবন যাত্রাকে নিজেদের ফুর্তির জন্য মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য করানোর চেষ্টা করছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এরপরেও কিছু লোক আছে যারা অন্যদেরকে আল্লাহর সমান গুরুত্ব দেয়— আল-বাক্বারাহ ১৬৫-১৬৭

আমরা জীবনে প্রায়ই এমন কিছু পরিস্থিতিতে পড়ি, যখন ইসলামের নিয়ম মেনে চললে, আল্লাহর تعالى নির্দেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করলে দেখা যাবে যে, আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে, ব্যবসায় কোনো বড় কাস্টমার হারিয়ে ফেলব, চাকরিতে প্রমোশন হাতছাড়া হয়ে যাবে, সমাজে স্ট্যাটাস নষ্ট হয়ে যাবে, লোকজন নানা কথা বলাবলি করবে ইত্যাদি। জীবনে প্রায়ই এমন ঘটনা আসে, যখন নিজেকে বোঝাতে হয়, “থাক না, একদিনেরই তো ব্যাপার। একটু ঘুষ খেলে কী হয়। সবাই খাচ্ছে না?” অথবা হয়তো নিজেকে যুক্তি দেখাই, “আমি যদি এটা না করি, তাতে কী হবে? আমার পরে যে আসবে সে তো ঠিকই করবে। তারচেয়ে এবার একটু অন্যায় করি। পরে বেশি করে ভালো কাজ করে পাপ কেটে নেবো।”

স্ট্যাটাস, সম্পত্তি, ক্ষমতা, সম্মানকে আমরা এতটাই ভালবাসি যে, এদেরকে ধরে রাখার জন্য মাঝে মাঝেই ইসলামকে বিসর্জন দিয়ে দেই। জেনে শুনে আল্লাহর تعالى নির্দেশ অমান্য করি। মনে মনে আল্লাহর تعالى সাথে পাপ-পুণ্যের লেনদেনের হিসেব করি। তাঁকে تعالى বোঝানোর চেষ্টা করি: কেন তাঁর تعالى নিষেধ এবার মানছি না, এবং কেন তাঁর تعالى উচিত এবার আমাকে মাফ করে, আরেকবার সুযোগ দেওয়া।

যারা এধরনের কাজ করেন, তাদের কী হবে, তা এই আয়াতে বলা হয়েছে—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সে এক জঘন্য যাওয়ার জায়গা — আল-বাক্বারাহ ১২৬-১২৭

2_126

ইব্রাহিম বলেছিলেন, “ও আমার প্রভু, এই শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং এখানকার অধিবাসীদেরকে ফলমূল-সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিন: যারা আল্লাহ تعالى এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য।” আল্লাহ تعالى বলেছিলেন, “যারা অবিশ্বাস করবে, তাদেরকেও আমি কিছু দিনের জন্য সুখে থাকার ব্যবস্থা করে দেব, তারপর তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তিতে জোর করে ঢোকাবো— সে এক জঘন্য যাওয়ার জায়গা।” [আল-বাক্বারাহ ১২৬]

প্রশ্ন হল: কীসের শহর? নবী ইব্রাহিম عليه السلام যখন কা’বা বানাচ্ছিলেন, তখন তার চারপাশে ধুধু মরুভূমি। শহরের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু তিনি তার দূরদর্শিতা থেকে ঠিকই বুঝেছিলেন: আল্লাহর تعالى এই ঘরের আশেপাশে একদিন একটা শহর হবে। মানুষ দূর দূর থেকে আসবে এখানে হাজ্জ করতে। তাই তিনি আল্লাহর تعالى কাছে দু’আ করেছিলেন, যেন এখানকার বিশ্বাসী অধিবাসীদের নিরাপত্তা এবং খাওয়ার কোনো অভাব না হয়।

তার দু’আ আল্লাহ تعالى কবুল করেছেন। মক্কায় সারাবছর কোনো ফলের অভাব হয় না। অথচ মক্কায় এবং তার আশেপাশে মরুভূমিতে খেজুর ছাড়া কোনো ফল হয় না। তারপরেও সেখানে গেলে আপনি চায়নার আপেল, মিশরের কমলা, ভারতের কলা —কোনো কিছুর অভাব দেখবেন না। নানা দেশ থেকে সব সুস্বাদু ফল সেখানে সরবরাহ হচ্ছে গত হাজার বছর ধরে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)