ধর্ম মানতে কোনো ধরনের জোর জবরদস্তি নেই — আল-বাক্বারাহ ২৫৬

2_256

ধর্ম মানতে কোনো ধরনের জোর জবরদস্তি নেই। সঠিক পথ ভুল পথ থেকে পরিষ্কারভাবে আলাদা হয়ে গেছে। তাই যে তাগুত (মিথ্যা প্রভুদের) অস্বীকার করবে, এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আনবে, সে অবশ্যই এমন এক মজবুত হাতল ধরবে, যা ভাঙ্গার কোনো আশঙ্কা নেই। আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৫৬]

আল্লাহ تعالى এখানে কঠিনভাবে বলেছেন لَا إِكْرَاهَ, কোনো ধরনের জোর জবরদস্থি করা যাবে না। এই আয়াতে শব্দটা হচ্ছে إِكْرَاه, যার অর্থ কোনো একটা ব্যাপার কেউ ঘৃণা করে, এবং তাকে সেটাই জোর করে করানো।[১][৫] একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, কেন জোর জবস্থি করে ধর্ম মানানো সম্ভব না। ধর্ম মানুষের অন্তরের ব্যাপার। মানুষকে জোর করে কোনো কিছু বিশ্বাস করানো যায় না। কারো সামনে তলোয়ার ধরে বললাম, “তিন দিন সময় দিলাম। এর মধ্যে মুসলিম হয়ে যাও। নাইলে…” — তাহলে সে মনে প্রাণে ইসলামে বিশ্বাস করে, তার যাবতীয় ভুল বিশ্বাস ভেঙ্গে ফেলবে না। সে বড়জোর একজন মুনাফিক হয়ে যাবে। একইসাথে কাউকে গিয়ে হুমকি দিলাম, “যদি কালকে থেকে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে না দেখি, তাহলে তোমাকে ধরে… ” — এই হুমকিতে সে হয়তো মসজিদে যাবে। কিন্তু সেটা আল্লাহর تعالى জন্য হবে না, হবে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে।

জোর করে ইসলাম গ্রহণ করানো ‘ইসলাম’ এবং ‘মুসলিম’ এই দুটো শব্দের সংজ্ঞারই পরিপন্থী। ‘মুসলিম’ শব্দের অর্থ: যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর تعالى ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করেছে। কাউকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার ইচ্ছাকে আল্লাহর تعالى কাছে সমর্পণ করানো যায় না —এটা স্ববিরোধী, অযৌক্তিক কথা। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, আল্লাহ تعالى এই আয়াতে বলেননি যে, ইসলামে কোনো জোর জবস্থি নেই। বরং তিনি বলেছে,ধর্মে কোনো জরজবরদস্থি নেই। তাই অন্য ধর্মের লোকেরা যেন তাদের ধ্যান, ধারণা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি জোর করে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে না দেয়। তারা যেন মুসলিমদের শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রচারে বাঁধা না দেয়। যদি দেয়, সেটা ফিতনা হবে, এবং সেই ফিতনা দূর করতে মুসলিমরা সংগ্রাম করতে পারবে।[১১]  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি অনন্ত বিদ্যমান, সব কিছুর ধারক — আয়াতুল কুরসি, আল-বাক্বারাহ ২৫৫

কু’রআনে কিছু আয়াত রয়েছে, যেখানে আল্লাহ تعالى আমাদের অনেক মানসিক সমস্যা এবং প্রশ্নের সমাধান দিয়ে দিয়েছেন। এই আয়াতগুলো আমরা যখন মনোযোগ দিয়ে পড়ি, তখন ধাক্কা খাই। যখন সময় নিয়ে ভেবে দেখি, তখন আমাদের হতাশা, অবসাদ, ডিপ্রেশন, কিছু না পাওয়ার দুঃখ, নিজের উপরে রাগ, অন্যের উপরে হিংসা, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা —এই সবকিছু কাটিয়ে ওঠার শক্তি খুঁজে পাই। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করি যে, আমরা এতদিন থেকে যেসব সমস্যায় ভুগছিলাম, তার সমাধান তো এই আয়াতেই ছিল! এরকম একটি আয়াত হচ্ছে আয়াতুল কুরসি। এই আয়াতের প্রতিটি বাক্যে শিরক থেকে দূরে থাকার শিক্ষা রয়েছে এবং একই সাথে আমরা দুনিয়াতে যে নানা ধরনের শিকলের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছি, তা থেকে বেড়িয়ে আসার উপায় শেখানো হয়েছে—

2_255

আল্লাহ, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাসনার যোগ্য কেউ নেই, তিনি অনন্ত বিদ্যমান, সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশগুলো এবং পৃথিবীতে যা কিছুই আছে, সবকিছু শুধুমাত্র তাঁর। কে আছে যে তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে? তাদের দৃষ্টির সামনে এবং দৃষ্টির অগোচরে যা কিছুই আছে, তিনি তাঁর সব জানেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী আকাশগুলো এবং পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে কখনো ক্লান্ত করে না। তিনি সবার ঊর্ধ্বে, সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান। [আল-বাক্বারাহ ২৫৫]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সেই দিন চলে আসার আগেই আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে দান করো — আল-বাক্বারাহ ২৫৪

আমরা যখন দান করতে যাই, তখন আমাদের অনেকেরই বেশ কষ্ট হয়। মনে হয়, ইশ! নিজের এত কষ্টের টাকা অন্যকে দিয়ে দিলাম, হায় হায়, এই টাকাটা দিয়ে কত কিছু করতে পারতাম। অথচ আল্লাহ تعالى আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আমাদের যা কিছু আছে, তার সবই তাঁর দেওয়া। তিনি تعالى আমাদেরকে ‘আমাদের সম্পত্তি’ খরচ করতে বলছেন না, বরং বলছেন, তিনি আমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা থেকে যেন আমরা খরচ করি।

সময় নিয়ে চিন্তা করলেই আমরা দেখবো, আমরা জীবনে যা কিছুই অর্জন করেছি, তার সবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহর تعالى দেওয়া। যদি আল্লাহ تعالى আমাদেরকে মেধা, বুদ্ধি, হাত- পা, চোখ-কান, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, উপকারী মামা-চাচা-খালু না দিতেন, তাহলে আমাদের অর্জনগুলোর কিছুই হতো না। কু’রআনে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে যখন দান করতে বলেন, তখন তিনি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেন যে, আমরা দান করছি তাঁরই দেওয়া রিজক থেকে।

আল-বাক্বারাহ’র এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছেন যে, আমরা যেন সেই দিন আসার আগেই জলদি দান করি, যেদিন আর দান করার কোনো সুযোগ থাকবে না—

2_254

বিশ্বাসীরা, সেই দিন চলে আসার আগেই দান করো, আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে, যেদিন কোনো বিনিময় করা যাবে না, কোনো প্রাণের বন্ধু কাজে আসবে না, কোনো সুপারিশও না। আর যারা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে, তারাই হচ্ছে অন্যায়কারী। [আল-বাক্বারাহ ২৫৪]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কিন্তু তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলো, কেউ বিশ্বাস করলো, কেউ অবিশ্বাস করলো — আল-বাক্বারাহ ২৫৩

2_253-1

সেই রাসুলগণ, তাদের কয়েকজনকে আমি অন্যদের থেকে বেশি অনুগ্রহ করেছি। তাদের মধ্যে এমন কয়েকজন আছে, যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। এবং তাদের কাউকে তিনি বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। মরিয়মের সন্তান ঈসা-কে আমি পরিস্কার প্রমাণ দিয়েছি এবং পবিত্র রূহ দিয়ে সহযোগিতা করেছি। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তাহলে তাদের পরে যেসব জাতি এসেছিল, তারা কেউ একে অন্যের বিরুদ্ধে মারামারি করত না, তাদের কাছে পরিস্কার প্রমাণ আসার পরেও। কিন্তু তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলো, কেউ বিশ্বাস করলো, কেউ অবিশ্বাস করলো। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে মারামারি করত না, কিন্তু আল্লাহ যা চান, তাই করেন। [আল-বাক্বারাহ ২৫৩]

যখন রাসূল মুহাম্মাদ عليه السلام এর কার্টুন আঁকা হয়, তাঁর নামে আজেবাজে কথা ছড়ানো হয়, অপমানজনক চলচ্চিত্র বানানো হয়, তখন কিছু মুসলিমদের রক্ত গরম হয়ে যায়। অনেকেই রাস্তায় বেড়িয়ে অন্য নিরীহ মুসলিমদের গাড়ি, দোকান ভেঙ্গে রাসূলের عليه السلام প্রতি তাদের অগাধ ভালবাসার প্রমাণ দেখান। রাসূলের عليه السلام ‘শিক্ষার প্রতি সম্মান’ দেখিয়ে অ্যাম্বাসি ভাংচুর করেন, যেন যারা রাসূলের عليه السلام অপমান করে, তারা আর ভয়ে কখনো এরকম কাজ করার দুঃসাহস না দেখায়। যদিও সেরকম কিছু কোনোদিন হয়নি, বরং যারা এই কাজগুলো করে, তারা আরও বেশি প্রশ্রয় পেয়ে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেছে। মুসলিমরা প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে কয়েক  হাজার মানুষ তাদের কথা জানতো। প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর সারা পৃথিবীতে সংবাদ শিরোনাম হয়ে তাদের ব্যবসা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। রাসূলের عليه السلام বিরুদ্ধে নোংরামি আরও বেড়ে গেছে। মুসলিমরা তাদের ‘ঈমানী দায়িত্ব পালন’ করে রাসূলের عليه السلام অপমান গুটি কয়েক মানুষের থেকে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

তাহলে কী রাসূলের عليه السلام অপমান হলে আমরা প্রতিবাদ করব না? অবশ্যই করবো, কিন্তু করার সময় প্রজ্ঞা দেখাতে হবে, মূর্খতা দেখালে হবে না। একইসাথে আমাদের সব নবীর প্রতি নিরপেক্ষ হতে হবে। বহু বছর আগে থেকেই ঈসা عليه السلام এর বিকৃতি করে কার্টুন দিয়ে বাজার ভরে গেছে, হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে তাকে নিয়ে নিয়মিত ব্যাঙ্গ করা হয়। এগুলো নিয়ে মুসলিমদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। ব্যাপারটা এমন যে, ঈসা عليه السلام হচ্ছেন খ্রিস্টানদের সমস্যা, মুসলিমদের তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা না করলেও চলবে। ঈসা عليه السلام এর অপমান হলে তো খ্রিস্টানদের অপমান হয়, মুসলিমদের তাতে কিছু যায় আসে না। অন্য কোনো নবীর সম্মান রক্ষা করা মুসলিমদের ঈমানী দায়িত্ব না।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কত বার এমন হয়েছে যে, ছোট একটা দল বড় বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছে আল্লাহর অনুমতিতে —আল-বাক্বারাহ ২৪৬-২৫২

মুসলিমদের উপর যখন অমুসলিমরা নির্যাতন করে, তাদের সম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায়, কর্তৃত্ব দখল করে নেয়, বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়, তখন মুসলিমরা কীভাবে যুদ্ধ করে তাদের অধিকার আদায় করবে, তা আল্লাহ تعالى আল-বাক্বারাহ’তে তালুত এবং দাউদ عليه السلام-এর ঘটনার মাধ্যমে আমাদেরকে শিখিয়েছেন। এই আয়াতগুলো থেকে আমরা জানতে পারি: তারা কোন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ করেছিলেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে একটি মুসলিম সম্প্রদায় হাতে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করতে পারে। মাত্র ছয়টি আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে ইতিহাসের সেই অসাধারণ ঘটনার পরিষ্কার বর্ণনা দেবেন, যেই ঘটনা নিয়ে বাইবেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বিভ্রান্তিকর বর্ণনা আছে। এই আয়াতগুলো থেকে একজন নেতা অনেক উপলব্ধির বিষয় পাবেন। একই সাথে অনুসারীরাও বিভিন্ন প্রকারের নেতাদের সম্পর্কে সাবধান হতে পারবেন—

2_246_title

2_246

বনি ইসরাইলের ওই গোত্র প্রধানদের কথা ভেবে দেখেছ, যারা তাদের নবীকে বলেছিল, “আমাদের জন্য এক রাজা নির্ধারণ করে দিন, যেন আমরা আল্লাহর تعالى পথে যুদ্ধ করতে পারি।” তিনি বলেন, “যদি এমন হয় যে, তোমাদের উপর যুদ্ধ করার আদেশ আসলো, কিন্তু তারপরেও তোমরা যুদ্ধ করলে না, তখন?” তারা বলল, “কেন আমরা আল্লাহর تعالى পথে যুদ্ধ করবো না, যখন কিনা আমাদের ঘরবাড়ি থেকে আমাদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে?” তারপর যখন তাদের উপর যুদ্ধ করার আদেশ আসলো, কয়েকজন বাদে বেশিরভাগই পিঠটান দিলো। আল্লাহ تعالى অন্যায়কারীদের ভালো করে চেনেন। [আল-বাক্বারাহ ২৪৬]

এই আয়াতে বেশ কিছু শেখার ব্যাপার রয়েছে। কখন আল্লাহ تعالى যুদ্ধ করার অধিকার দেন? যখন মুসলিমদের উপর আক্রমণ হয়, তাদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল হয়ে যায়, তখন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ করার জন্য পরিষ্কার প্রমাণ কু’রআনে রয়েছে। এথেকেই দেখা যায়, ক্বিতাল বা যুদ্ধ হচ্ছে মূলত আত্মরক্ষামূলক।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)