কত বার এমন হয়েছে যে, ছোট একটা দল বড় বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছে আল্লাহর অনুমতিতে —আল-বাক্বারাহ ২৪৬-২৫২

মুসলিমদের উপর যখন অমুসলিমরা নির্যাতন করে, তাদের সম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায়, কর্তৃত্ব দখল করে নেয়, বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়, তখন মুসলিমরা কীভাবে যুদ্ধ করে তাদের অধিকার আদায় করবে, তা আল্লাহ ﷻ আল-বাক্বারাহ’তে তালুত এবং দাউদ ﷺ-এর ঘটনার মাধ্যমে আমাদেরকে শিখিয়েছেন। এই আয়াতগুলো থেকে আমরা জানতে পারি: তারা কোন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ করেছিলেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে একটি মুসলিম সম্প্রদায় হাতে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করতে পারে। মাত্র ছয়টি আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে ইতিহাসের সেই অসাধারণ ঘটনার পরিষ্কার বর্ণনা দেবেন, যেই ঘটনা নিয়ে বাইবেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বিভ্রান্তিকর বর্ণনা আছে। এই আয়াতগুলো থেকে একজন নেতা অনেক উপলব্ধির বিষয় পাবেন। একই সাথে অনুসারীরাও বিভিন্ন প্রকারের নেতাদের সম্পর্কে সাবধান হতে পারবেন—

2_246_title

2_246

বনি ইসরাইলের ওই গোত্র প্রধানদের কথা ভেবে দেখেছ, যারা তাদের নবীকে বলেছিল, “আমাদের জন্য এক রাজা নির্ধারণ করে দিন, যেন আমরা আল্লাহর ﷻ পথে যুদ্ধ করতে পারি।” তিনি বলেন, “যদি এমন হয় যে, তোমাদের উপর যুদ্ধ করার আদেশ আসলো, কিন্তু তারপরেও তোমরা যুদ্ধ করলে না, তখন?” তারা বলল, “কেন আমরা আল্লাহর ﷻ পথে যুদ্ধ করবো না, যখন কিনা আমাদের ঘরবাড়ি থেকে আমাদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে?” তারপর যখন তাদের উপর যুদ্ধ করার আদেশ আসলো, কয়েকজন বাদে বেশিরভাগই পিঠটান দিলো। আল্লাহ ﷻ অন্যায়কারীদের ভালো করে চেনেন। [আল-বাক্বারাহ ২৪৬]

এই আয়াতে বেশ কিছু শেখার ব্যাপার রয়েছে। কখন আল্লাহ ﷻ যুদ্ধ করার অধিকার দেন? যখন মুসলিমদের উপর আক্রমণ হয়, তাদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল হয়ে যায়, তখন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ করার জন্য পরিষ্কার প্রমাণ কু’রআনে রয়েছে। এথেকেই দেখা যায়, ক্বিতাল বা যুদ্ধ হচ্ছে মূলত আত্মরক্ষামূলক।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন —আল-বাক্বারাহ ২৪৫

2_245

কে আছে যে আল্লাহকে ﷻ ধার দেবে? তাহলে তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহই ﷻ কমিয়ে দেন এবং বাড়িয়ে দেন। তাঁর কাছেই তোমরা ফিরে যাবে। [আল-বাক্বারাহ ২৪৫]

এই আয়াত পড়ে যে কোনো মুসলিমের লজ্জা পাওয়া উচিত। আল্লাহ ﷻ আমার কাছে ধার চাইছেন? আমি দুনিয়ার লোভে এতটাই স্বার্থপর হয়ে গেছি যে, তিনি ﷻ এই ভাষা ব্যবহার করে আমাকে বলছেন তাঁর পথে খরচ করতে?

ধরুন, আপনার মা ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে কাজ করে আপনাকে বড় করেছেন,  আপনার পড়ালেখার খরচ যোগান করেছেন। তিনি আপনাকে একটুও কষ্ট করতে দেননি, যেন আপনার পড়াশুনায় কোনো ক্ষতি না হয়, যেন আপনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। আপনার মায়ের এই বিরাট আত্মত্যাগের জন্য আপনি বড় হয়ে শিক্ষিত হলেন, ডিগ্রি অর্জন করলেন, যথেষ্ট সম্পত্তির মালিকও হলেন। আপনার মা আপনার যত এত কষ্ট না করলে আপনি এত উপরে উঠতে পারতেন না। একদিন তিনি আপনাকে অনুরোধ করছেন, ‘বাবা, আমাকে কিছু টাকা ধার দেবে? আমি আগামী বছরই ফেরত দিয়ে দেবো। আর আমি তোমাকে ধারের টাকার দ্বিগুণ ফেরত দেবো। কোনো চিন্তা করো না বাবা। একটু ধার দেবে?’ —যখন মা তাকে এই ভাষায় অনুরোধ করছেন, দ্বিগুণ ফেরত দেওয়ার কথা বলছেন, এথেকেই বোঝা যায়, সে ছেলে হিসেবে কতটা নীচে নেমেছে, কতটা লোভী হয়ে গেছে যে, তাকে এভাবে বোঝাতে হচ্ছে।   (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা মৃত্যুর ভয়ে হাজারে হাজারে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল? — আল-বাক্বারাহ ২৪৩

2_243

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা মৃত্যুর ভয়ে হাজারে হাজারে বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল? তখন আল্লাহ ﷻ তাদেরকে বললেন, “মরো”। তারপরে একদিন তিনি তাদেরকে জীবিত করলেন। আল্লাহ ﷻ মানুষের অনেক কল্যাণ করেন, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ কৃতজ্ঞতা দেখায় না। [আল-বাক্বারাহ ২৪৩]

2_244

আর আল্লাহর ﷻ পথে যুদ্ধ (ক্বিতাল) করো। জেনে রেখো, আল্লাহ ﷻ সব শুনছেন, সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৪৪]

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট নিয়ে দুটো ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। একটি ঘটনা হলো: একদল মানুষ একবার মহামারি আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ ﷻ তাদেরকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যু দেন এটা শেখানোর জন্য যে, মানুষ কখনো মৃত্যু থেকে পালাতে পারবে না। যাদের জন্য মৃত্যু নির্দিষ্ট, সেদিন সে মারা যাবেই। মানুষের ক্ষমতা নেই তার জন্য নির্ধারিত মৃত্যু থেকে পালিয়ে যাওয়ার। [৬][৮][৯][১০][১২][১৪][১৭][১৮]

আরেকটি ঘটনা, যার সাথে কু’রআনের আয়াতগুলোর সাথে সঙ্গতি মেলে, তা হলো: বনু ইসরাইলদেরকে যখন তাদের প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদেশ করা হয়েছিল নবীর মাধ্যমে, তখন হাজার খানেক মানুষ জানের ভয়ে যুদ্ধ করা থেকে পালিয়ে যায়। তাদেরকে আল্লাহ ﷻ অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে মৃত্যু দেন। এভাবে তিনি মানুষকে শেখান যে, আল্লাহর ﷻ পথে যুদ্ধ করা থেকে পালিয়ে গিয়ে কোনো লাভ নেই। যার মারা যাওয়ার কথা, সে মারা যাবেই। যার জন্য আল্লাহ ﷻ হায়াত লিখে রেখেছেন, সে একটার পর একটা যুদ্ধে অংশ নিলেও মরবে না, জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেই। আর যার জন্য আল্লাহ ﷻ মৃত্যু লিখে রেখেছেন, সে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গুহায় গিয়ে বসে থাকলেও মারা যাবেই। শুধুই পার্থক্য হলো, যুদ্ধে গেলে মৃত্যু হবে একটা বিরাট অর্জন, আর পালিয়ে গেলে মৃত্যু হবে অর্থহীন, অপমানকর এক সমাপ্তি।[১২][১৪][৪][৬][১৭][১৮][১৩]

2_243_title

জিহাদ এবং ক্বিতালের মধ্যে পার্থক্য
আজকে জিহাদ এবং ক্বিতাল শব্দদুটোর ব্যাপক অপব্যবহার করা হচ্ছে। একদল সংগঠন কু’রআনের আয়াতগুলোতে জিহাদ এবং ক্বিতালের মধ্যে পার্থক্য না করে, জিহাদের জায়গায় ক্বিতাল করার প্রচারণা চালাচ্ছে। আরেকদল সংগঠন ক্বিতালের আয়াতগুলোকে সাধারণ জিহাদ অনুবাদ করে স্পষ্ট প্রতিরোধ এবং যুদ্ধের জায়গায় চুপচাপ বসে অপেক্ষা করা এবং অন্যায়ের সাথে আপোষ করে চলার জন্য প্রচারণা করছে।

এই দুই পক্ষই দাবি করে যে, যেহেতু জিহাদ এবং ক্বিতাল সমার্থক শব্দ, তাই এই শব্দ দুটোকে একে অপরের জায়গায় বদল করা যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এরা আয়াতগুলোতে জিহাদের জায়গায় ক্বিতাল এবং ক্বিতালের জায়গায় জিহাদ সুবিধামত বসিয়ে, তাদের ইচ্ছেমত অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা করে, যেন তারা তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পারে। একারণে যখনই যুদ্ধ, সংগ্রাম, হত্যা ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো আয়াত বা হাদিস পাবেন, প্রথমেই দেখে নেবেন আরবিতে শব্দটা কি জিহাদ নাকি ক্বিতাল।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সূরাহ ফাতিহাহ —আমরা যা শিখিনি

সম্পাদনা: ডঃ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, শাইখ সানাউল্লাহ নজির আহমদ, শরিফ আবু হায়াত অপু

রাসুল মুহাম্মাদ ﷺ যখন ১৪০০ বছর আগে অমুসলিম আরবদেরকে কু’রআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তা শুনে আরবদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো—

কি অসাধারণ কথা! এভাবে তো আমরা কখনও আরবি ব্যবহার করার কথা ভেবে দেখিনি! এত অসাধারণ বাক্য গঠন, শব্দ নির্বাচন তো আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরাও করতে পারে না! এমন কঠিন বাণী, এমন হৃদয় স্পর্শী করে কেউ তো কোনো দিন বলতে পারেনি! এই জিনিস তো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়! এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর ﷻ বাণী! আমি সাক্ষি দিচ্ছি – লা ইলাহা ইল্লালাহ…

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

নামাজগুলোর সাবধানে যত্ন নাও — আল-বাক্বারাহ ২৩৮

ফার্সি ভাষায় ‘নামাজ’, আরবিতে ‘সালাহ’ শব্দটির একটি অর্থ হলো ‘সংযোগ’। নামাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ﷻ সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করি, সবসময় তাঁকে মনে রাখি। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একারণেই দিয়েছেন, যেন আমরা কাজের চাপে পড়ে, হিন্দি সিরিয়াল বা খেলা দেখতে গিয়ে, বা রাতভর ভিডিও গেম খেলতে গিয়ে তাঁকে ভুলে না যাই। কারণ তাঁকে ভুলে যাওয়াটাই হচ্ছে আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। যখনি আমরা একটু একটু করে আল্লাহকে ﷻ ভুলে যাওয়া শুরু করি, তখনি আমরা আস্তে আস্তে অনুশোচনা অনুভব না করে খারাপ কাজ করতে শুরু করি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আমাদের পতন। দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আমাদেরকে এই একটু একটু করে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে, আল্লাহর ﷻ সাথে সংযোগ কিছুটা হলেও ধরে রাখে।

লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, সূরা আল-বাক্বারাহ’তে তালাক নিয়ে কয়েকটি আয়াত এবং বিধবাদের নিয়ে কয়েকটি আয়াতের ঠিক মাঝখানে আল্লাহ ﷻ নামাজের কথা বললেন—

2_238

নামাজগুলোর সাবধানে যত্ন নাও, আর বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের, আর আল্লাহর ﷻ সামনে সম্পূর্ণ একাগ্রতার সাথে দাঁড়াও। [আল-বাক্বারাহ ২৩৮]

তালাক এবং মৃত্যু দুটোই মানুষের জন্য ভয়াবহ ঘটনা। অনেকেই এই পরিস্থিতিতে পড়ে সবার আগে আল্লাহকে ﷻ দোষ দেন, “কেন আমার বেলায় এমন হলো? আমি কী করেছি? আমার তো কোন দোষ ছিলো না? আমি এত নামাজ পড়তাম, যাকাত দিতাম, রোজা রাখতাম, তাহলে আমার কপালে এমন মানুষ জুটলো কেন?” —আল্লাহ ﷻ এই দুই কঠিন ঘটনার মাঝখানে নামাজের আয়াত দিয়ে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, জীবনে যতই কষ্ট আসুক, আমরা যেন নামাজ ছেড়ে না দেই। নামাজকে আমাদের শক্ত হাতে পাহারা দিতে হবে। জীবনের কঠিন ঘটনাগুলোতে আল্লাহর ﷻ সাথে রাগ করে নামাজ ছেড়ে না দিয়ে, বরং দৃঢ়ভাবে নামাজকে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। নামাজ হচ্ছে আল্লাহর ﷻ সাথে আমাদের সংযোগ, আল্লাহর সাথে আমাদের একান্ত সম্পর্ক। বিপদ, দুর্যোগ, শারীরিক বা মানসিক কষ্টের সময় যদি আমরা আল্লাহর ﷻ সাথেই সংযোগ কেটে দেই, তাহলে আমরা কার কাছে যাবো? আল্লাহ ﷻ ছাড়া আর কে আছে, যে আমাদের কঠিন অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারে?

2_238_title  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)