আকাশকে খুলে দেওয়া হবে — আন-নাবা ১৭-৩০

চৌধুরী সাহেব স্বপরিবারে সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে এসেছেন। পাড়ে বসে তারা সমুদ্র উপভোগ করছিলেন, কিন্তু তার শিশু বাচ্চাটি এখন ক্ষুধায় কান্না শুরু করেছে। স্ত্রীকে নিয়ে উঠলেন নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বের করতে। তারা হেঁটে যাচ্ছিলেন, আর তখন এক ভীষণ শব্দে কানে তালা লেগে গেলো। তারপর পায়ের নিচে মাটি ভীষণ জোরে ঝাঁকুনি দিলো। তিনি দূরে ছিটকে পড়ে গেলেন। 

উপরে তাকিয়ে দেখলেন আকাশটা যেন গোলাপের মত লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, আকাশটাকে পৃথিবীর উপর থেকে ছিঁড়ে তুলে ফেলা হয়েছে। মহাকাশ খালি চোখে দেখা যাচ্ছে। আর পুরো মহাকাশে অজস্র ফাটল তৈরি হচ্ছে। তারাগুলো একে একে ঝরে যাচ্ছে। সূর্যকে কালো একটা কী যেন ঘিরে ফেলছে। দিনের বেলাতেও রাতের মত অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। চাঁদের শেষ আলোটুকুও একসময় নিভে গেলো। 

সৈকতে যারা ছিল সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে একেক দিকে দৌড়াচ্ছে। এমনকি তার স্ত্রীও বাচ্চা ফেলে আতংকে দৌড়াচ্ছেন। তিনি হতবিহ্বল হয়ে ছুটছেন। কোন দিকে যাবেন কিছুই জানেন না। 

সামনে একটা পাহাড় দেখে সেদিকে দৌড় দিলেন, যদি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়া যায়। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই এক ভীষণ ঝাপটা এসে পাহাড়টাকে গুড়ো-গুড়ো করে ধুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে গেলো। পেছনে সমুদ্রে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে পানি আকাশে ছিটকে উঠলো। তারপর সমুদ্রের পানিতেই আগুন ধরে গেল। এই অস্বাভাবিক ঘটনা দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না কী হচ্ছে চারপাশে! এটা তো কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়! 

একের পর এক ঝাপটায় আশেপাশের সবকিছু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তিনি হতবিহব্বল হয়ে তাকিয়ে দেখছেন। তার দৌড়ে পালানোর কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ করে তার গায়ে এসে একটা বাড়ি লাগলো…

সবকিছু অন্ধকার, নিশ্চুপ হয়ে গেলো। 

এরপর অনন্ত কাল যেন পার হয়ে গেলো।

চৌধুরী সাহেব চোখ খুলে তাকালেন। তার কানে এখন আরেকটি শব্দ বাজছে। তার মনে হলো, তিনি যেন এখনি মাটির ভেতর থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলেন। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন অজস্র মানুষের সমুদ্র। সবাই হতবিহব্বল হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। কেউ কেউ বিস্ফোরিত চোখে উপরে তাকিয়ে আছে। উপরে তাকিয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। এটা তো পরিচিত কোনো আকাশ নয়। অন্য কোনো জগতের আকাশ মনে হচ্ছে! আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত ছিঁড়ে ফাঁক করা। সেই ফাঁক দিয়ে উপরে দেখা যাচ্ছে প্রকাণ্ড কারা যেন এক ভীষণ আকৃতির কিছুকে তুলে ধরে রেখেছে।

নিচে তাকিয়ে তিনি অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলেন। পায়ের নিচে একদম মসৃণ সমতল মাটি। একটুও দাগ বা ভাঁজ নেই। যেদিকেই তাকান, সেদিকেই মসৃণ সমতল ভূমি, কোথাও উঁচু-নিচু কিছুই নেই। এটা তো সেই চিরচেনা পৃথিবীর মাটি নয়। মনে হচ্ছে ভিনগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি! 

তিনি সামনে থেকে কারো ডাক শুনলেন। সাথে সাথে তার দেহ নিজে থেকেই সেদিকে দৌড়ানো শুরু করল। তার আশেপাশের মানুষগুলোও দলে দলে সবাই পঙ্গপালের মতো সামনে দৌড়ে যাচ্ছে সেই ডাক শুনে। কী যেন ঘটতে যাচ্ছে সামনে! 

হঠাৎ করে তিনি এক ভীষণ আতংক অনুভব করলেন। কিছু একটা আসছে। অনেক দূর থেকে গর্জন করতে করতে বিশাল এক ভয়ংকর দানব যেন আসছে। দূরে দিগন্তে তাকিয়ে যা দেখলেন তাতে তিনি ভয়ে জমে গেলেন। এক বিশাল আগুনের জগতকে প্রকাণ্ড আকৃতির কারা যেন টেনে নিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে পুরো জগতটাই একটা হিংস্র দানব। হঠাৎ করে সেটি যেন ছাড়া পেয়ে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে তার শিকারকে খুঁজছে। তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন সেটা কী। হায় হায়! এই জিনিসের কথাই তো তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল! 

নিঃসন্দেহে সবকিছু ফয়সালার দিনটির সময় ঠিক করা আছে। সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। আর আকাশকে খুলে দেওয়া হবে এবং সেটা অনেকগুলো দরজার মতো হয়ে যাবে। পাহাড়গুলোকে চালিয়ে দেওয়া হবে, যেন তারা মরীচিকা—আন-নাবা ১৭-২০

নিঃসন্দেহে জাহান্নাম ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল সীমালঙ্ঘকারীদের জন্য, এক স্থায়ী আবাস হয়ে। যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকবে তারা। সেখানে কোনো ধরনের শীতলতার স্বাদ পাবে না, পাবে না কোনো পানীয়, শুধুই ফুটন্ত পানি এবং পুঁজ —উপযুক্ত প্রতিদান। —আন-নাবা ২১-২৬

জাহান্নাম ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে طاغين ত্বাগিনদের জন্য। এরা হচ্ছে চরম সীমালঙ্ঘনকারী। এরা কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। এদের জীবনটাই ছিল অবাধ্যতায় ভরা। যেমন—

চৌধুরী সাহেব বিশাল পরিমাণের ঘুষ খাইয়ে একটা সরকারি প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট হাতালেন। এর জন্য তিনি মন্ত্রীকে গুলশানে দুইটা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন। তারপর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে জোগাড় করা সেই বিশাল অংকের ঘুষ, সুদসহ শোধ করতে গিয়ে, এবং মন্ত্রীকে কথা দেওয়া দুইটা ফ্ল্যাটের টাকা উঠানোর জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে প্রজেক্টের অনেক টাকা এদিক ওদিক সরিয়ে ফেলতে হলো। দুই নম্বর সস্তা কাঁচামাল সরবরাহ করতে হলো। যোগ্য কনট্রাক্টরদের কাজ না দিয়ে অযোগ্য, সস্তা কনট্রাক্টরদের কাজ দিতে হলো, যারা কিনা তাকে প্রচুর ঘুষ খাওয়ালো। 

এরপর একদিন তার প্রজেক্ট ধ্বসে পড়ল। তার নামে ব্যাপক কেলেঙ্কারি হয়ে মামলা হয়ে গেলো। মামলায় উকিলের টাকা জোগাড় করতে তাকে আরও বিভিন্ন উপায়ে টাকা মারা শুরু করতে হলো। তারপর কয়েকদিন পর পর পুলিশ তাকে ধরতে আসে, আর তিনি উপরের তলার লোকদের ঘুষ খাইয়ে পুলিশকে হাত করে ফেলেন। 

প্রজেক্টে দুর্নীতির কারণে ভুক্তভোগী মানুষদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে একসময় অনেক টাকা খরচ করে কিছু ‘সোনার ছেলে’ পালতে হয়। তারা মাঝে মাঝেই খুন, ধর্ষণ করে, হোটেলে থেকে … করে এসে বিরাট বিল ধরিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে যখন পুলিশ ধরতে আসে, তিনি পুলিশকে টাকা খাইয়ে তাদেরকে রক্ষা করেন। এত দুশ্চিন্তার মধ্যে তিনি রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারেন না। দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার জন্য তাকে নিয়মিত মদ খাওয়া ধরতে হয়। এভাবে একটার পর একটা পাপে তিনি জড়িয়ে পড়তে থাকেন। অবাধ্যতা এবং সীমালঙ্ঘন তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু, তিনি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেন না, কারণ—

তারা ভাবতোই না যে, তাদের কাজের হিসেব কখনো দিতে হবে। আমার নিদর্শনগুলোকে সব মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করত —আমি সব গুনে গুনে হিসেব করে রেকর্ড করে রেখেছি। এবার তার প্রতিদান ভোগ করো। আমি তোমাদের শাস্তি কেবল বাড়াতেই থাকবো। —আন-নাবা ২৭-৩০ 

কোনোরকম জবাবদিহিতার ভয় যখন মানুষের মন থেকে চলে যায়, তখন সে পশুর থেকেও অধম হয়ে যায়। এরা তখন সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীতে পরিণত হয়। এদের দিয়ে এমন কোনো অন্যায় নেই, যা হয় না। 

আল্লাহ تعالى এদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি সব হিসেব করে রেখেছেন। শুধুই হিসেব করে রাখেননি, সেই হিসেবকে তিনি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেও রেখেছেন । أحصى আহ্‌সা অর্থাৎ গুণে গুণে হিসেব করে রাখা, সংরক্ষণ করে রাখা। দুনিয়াতে এরা পুলিশ, উকিল, বিচারপতিকে টাকা খাইয়ে সাক্ষী-প্রমাণ নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর تعالى হিসেব সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

শেষ অংশটি ভয়ঙ্কর — “আমি তোমাদের শাস্তি কেবল বাড়াতেই থাকবো।” আমরা যখন পৃথিবীতে কষ্টে থাকি, আমাদের মনে একটা সান্ত্বনা থাকে যে, আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই কষ্ট শেষ। যেমন, ধরুন আপনার গায়ে একদিন ফুটন্ত গরম পানি পড়ে গা ঝলসে চামড়া উঠে গেলো। আপনি এক মুহূর্তের জন্য না ঘুমিয়ে বিছানায় ছটফট করে ব্যথায় চিৎকার করছেন। প্রতিটা সেকেন্ড আপনার কাছে মিনিট মনে হচ্ছে। প্রত্যেকটা হৃদস্পন্দনের সাথে সাথে আপনার চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আপনি নিজেকে বোঝাচ্ছেন: “আর একটু। আর কয়েকটা দিন। তারপরেই ব্যথা কমে যাবে, ঘুমিয়ে যাবো, কষ্ট কমে যাবে…”

—এভাবে পৃথিবীতে আমরা প্রচণ্ড কষ্টের অভিজ্ঞতা ধৈর্য ধরে পার করি, কারণ আমরা জানি একদিন সেই কষ্ট শেষ হবে। এই আশা আমাদেরকে কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেয়, ধৈর্য ধরার অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু এই ধরনের মানুষরা, যারা জাহান্নামে চিরকাল থাকবে, তাদের কোনো আশা নেই। তাদের ধৈর্য ধরার কোনো অনুপ্রেরণা নেই। তারা জানে যে, তাদের এই প্রচণ্ড কষ্ট কখনো শেষ হবে না। এই বিকট দুর্গন্ধ, প্রচণ্ড গরম, অমানুষিক অত্যাচার — চলতেই থাকবে। কখনো তারা একটুও ঘুমাতে পারবে না। কোনোদিন তারা আগের সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারবে না। —এই ভয়ঙ্কর উপলব্ধি তাদের কষ্টকে হাজার গুনে বাড়িয়ে দেবে। জাহান্নামের প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণার সাথে যোগ হবে এক বুক ফাটা আতঙ্ক: এখানে তাদের কষ্ট বাড়তেই থাকবে।

যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকবে তারা

জাহান্নামে মানুষ যুগ যুগ ধরে থাকবে। এর কোনো শেষ নেই। কত যুগ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, বরং حقب হুকব অর্থ যুগ এবং أحقاب আহকাব অর্থ বহু যুগ। অত্যন্ত দীর্ঘ সময় বোঝানোর জন্য যুগ যুগ বলা হয়েছে। পরকালের দিন, মাস, বছরের দৈর্ঘ্য অনেক বড় হবে বলে বেশ কিছু সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। আর কুরআনের অন্যান্য জায়গায় আমরা দেখেছি ‘চিরকাল’ শব্দটা বিশেষভাবে ব্যবহার হতে। 

অনেকে প্রশ্ন করেন: অনন্তকাল শাস্তি কীভাবে ন্যায় বিচার হতে পারে? কেউ একজন যদি সারাজীবন অপরাধ করেও এবং সেজন্য যদি পুরো মানবজাতিরও ক্ষতি হয়, তারপরেও তাকে বহু কোটি বছর শাস্তি দিলে একসময় সেটা গিয়ে মোট পাপের সমান শাস্তি হবে। কিন্তু অনন্তকাল ধরে কাউকে শাস্তি দিতে থাকলে তো একসময় না একসময় গিয়ে তার শাস্তি যথাযথ প্রতিদানের থেকে বেশি হয়ে যাবেই? তখন সেটা কীভাবে ন্যায়বিচার হবে? 

আহলুস সুন্নাহ ওয়া আল জামাআহ-এর বিশ্বাস হলো যে, জাহান্নাম চিরকাল থাকবে এবং সেখানে অনেকেই থাকবে, যাদের শাস্তি কখনোই শেষ হবে না। এটাই হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত। মূল ধারার প্রায় সব বড় ইমামের একই মত যে, জাহান্নামে কিছু মানুষ চিরকাল শাস্তি পেতে থাকবে এবং জাহান্নাম অবিনশ্বর। যেমন, ফিরাউনের শাস্তির কোনো শেষ নেই। 

তবে প্রাচীন তাফসিরবিদ আত-তাবারি বেশ কয়েকটি আছার সংগ্রহ করেছেন, যেখানে সাহাবিদের মন্তব্য আছে যে, জাহান্নাম একসময় খালি হয়ে যাবে বা একসময় এটিও এর ভেতরের অপরাধীদের নিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে, যখন তাদের উপযুক্ত শাস্তির মেয়াদ শেষ হবে। ইবন আল-কাইয়ুম-এর হাদি আল-আরওয়াহ বইয়ের এক লম্বা অধ্যায়ে যে সমস্ত আলিমরা জাহান্নামের অনন্ত শাস্তি সমর্থন করেন না, তাদের সেই দাবির পেছনে কারণগুলো দেখিয়েছেন। তার সারমর্ম হচ্ছে যে, জাহান্নাম-এর একাধিক পরিণতি হতে পারে এবং আল্লাহর রহমত এবং ক্ষমা সবকিছুর উপরে। তার বক্তব্য, “সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাবান বিচারকের প্রজ্ঞার এটা সাজে না যে, তিনি কাউকে সৃষ্টি করবেন চিরকাল শাস্তি দেওয়ার জন্য, অনন্ত শাস্তি যা শেষ হয় না এবং যার কোনো বিরতি নেই।”

যাহোক, জাহান্নাম চিরকাল থাকবে, নাকি কোটি কোটি কোটি বছর থাকবে তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না। জাহান্নামে এক মুহূর্ত থাকার অভিজ্ঞতা দুনিয়াতে যাবতীয় ফুর্তির আনন্দ বাতিল করে দেবে। এর শাস্তি এতটাই কুৎসিত যে, সেখানে একদিন থাকাটাও পৃথিবীতে আজীবন শাস্তি পাওয়া থেকে অনেক বেশি কষ্টের। তাহলে কোটি কোটি বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্ত অমানুষিক শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন সহ্য করার কথা চিন্তাও করা যায় না। 

কিয়ামতের বর্ণনার জন্য যে আয়াতগুলো ব্যবহার করা হয়েছে—
  •  فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ ﴿١٣﴾ وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً ﴿١٤﴾
  •  إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا ﴿١﴾ وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا ﴿٢﴾
  • فَإِذَا انشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ ﴿٣٧
  • إِذَا السَّمَاءُ انفَطَرَتْ ﴿١﴾ وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انتَثَرَتْ ﴿٢﴾
  • إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْوَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ… عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ)
  • فَإِذَا بَرِقَ الْبَصَرُ ﴿٧﴾ وَخَسَفَ الْقَمَرُ ﴿٨﴾ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ﴿٩﴾
  •  يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ ﴿١﴾ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَىٰ وَمَا هُم بِسُكَارَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ اللَّـهِ شَدِيدٌ ﴿٢﴾
  •  يَوْمَ تَرْجُفُ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ وَكَانَتِ الْجِبَالُ كَثِيبًا مَّهِيلًا ﴿١٤﴾
  •  وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ ﴿٣﴾
  •  يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ۚ ذَٰلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ ﴿٤٤﴾
  • ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُم قِيَامٌ يَنظُرُونَ
  •  وَانشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ ﴿١٦﴾ وَالْمَلَكُ عَلَىٰ أَرْجَائِهَا ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ﴿١٧﴾
  •  فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا ﴿١٠٦﴾ لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتًا ﴿١٠٧﴾
  •  يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّـهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴿٤٨﴾
  •  خُشَّعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُّنتَشِرٌ ﴿٧﴾ مُّهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ ۖ يَقُولُ الْكَافِرُونَ هَـٰذَا يَوْمٌ عَسِرٌ ﴿٨﴾
  •  وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِمَن يَرَىٰ ﴿٣٦﴾

কী ব্যাপারে তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছে? — আন-নাবা পর্ব ১

কী ব্যাপারে তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছে? সেই বিরাট ঘটনার ব্যাপারে? যা নিয়ে তাদের নিজেদের ভেতরেই নানা মতবিরোধ? সাবধান! শীঘ্রই তারা জানতে পারবে। শেষ পর্যন্ত গিয়ে তারা জানতে পারবেই! — আন-নাবা ১-৫

একদিন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে; তারপর কোটি কোটি মানুষকে আবার সৃষ্টি করে ওঠানো হবে এবং তাদের সমস্ত স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়া হবে; তারপর তাদের পুরো জীবনটাকে দেখানো হবে —এটা কোনোভাবে সম্ভব, সেটা অনেকেই বিশ্বাস করত না। আবার অনেকে মনে করত যে, এরকম কিছু যদি সত্যিই ঘটে, তাহলে সেই দিন তাদের পীর-ফকির-দরবেশ-আউলিয়া-ওস্তাদ-দেবতাদের কাছে তারা ফিরে যাবে। তখন তাদের আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। কত টাকা-পয়সা, ফুল-মিষ্টি-নারিকেল খরচ করেছে এদের পেছনে। সেগুলোর বিনিময়ে কিছুই পাবে না, তা কী করে হয়? —আবার অনেকে মনে করত যে, একদিন যদি সবার বিচার হয়ও, এক সৃষ্টিকর্তার পক্ষে কি আর হাজার কোটি মানুষের সব কাজের খবর রাখা সম্ভব? এত মানুষের খুঁটিনাটি বিচার করার সময় কোথায়? নিশ্চয়ই তিনি শুধু ঘাঘু অপরাধীদের ধরে শাস্তি দেবেন? বাকিরা সবাই আরামে পার পেয়ে যাবে। আবার অনেকে মনে করত যে, এই দুনিয়াতে তারা কত সম্মান-সম্পদ নিয়ে আনন্দে আছে। তার মানে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তাদের উপর মহা খুশি। মৃত্যুর পরে নিশ্চয়ই তাদের জন্য আরও বেশি সম্মান-সম্পদ অপেক্ষা করছে।[৭] 

—শেষ বিচার দিন কোনো ঠাট্টা তামাশার বিষয় নয়। এটি সৃষ্টিজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এই দিন অসহায় অত্যাচারিত মানুষের ন্যায্য বিচার পাওয়ার দিন। জোর খাটিয়ে দুনিয়ায় পার পেয়ে যাওয়া সব অত্যাচারীর পাকড়াওয়ের দিন। এই দিন সর্বোচ্চ আদালতে হাজিরা দেওয়ার দিন। হাজার কোটি মামলার শুনানি এবং ফয়সালার দিন। একইসাথে এই দিন সকল ন্যায়পরায়ন, যোগ্য মানুষের ভালো কাজ এবং ত্যাগের প্রতিদান পাওয়ার দিন। পরম-করুণাময়ের অসীম দয়া উপভোগের দিন। তাহলে, কোন সাহসে মানুষ এরকম এক বিরাট ঘটনাকে নিয়ে একে অন্যর সাথে ঠাট্টা করে?

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কোনটা সৃষ্টি করা বেশি কঠিন: তোমরা, নাকি যে আকাশ তিনি বানিয়েছেন, সেটা? — আন-নাযিয়াত পর্ব ২

কোনটা সৃষ্টি করা বেশি কঠিন: তোমরা, নাকি যে আকাশ তিনি বানিয়েছেন, সেটা? তিনি সেটার ছাদকে উঁচু করেছেন, সুবিন্যস্ত করেছেন। এর রাতে আধার দিয়েছেন এবং এর দিনের উজ্জ্বলতা প্রকাশ করেছেন। আর ভূমিকে তারপরে বিস্তৃত করেছেন। তা থেকে পানি এবং তৃণভূমি বের করেছেন। দৃঢ়ভাবে পর্বতমালাকে গেঁথে দিয়েছেন। এসবই তোমাদের এবং তোমাদের গবাদির জীবিকার জন্য। —আন-নাযিয়াত ২৭-৩৩

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যখন জীবন্ত পুতে ফেলা শিশু কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে… —আত-তাকউইর

যখন সূর্য গুটিয়ে ফেলা হবে। যখন তারকাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা হবে। যখন পর্বতমালাকে চলমান করা হবে। যখন পূর্ণ গর্ভবতী উটকে উপেক্ষা করা হবে। যখন বন্য পশুদের একসাথে করা হবে। যখন সাগরগুলো উত্তাল করে ফেলা হবে। যখন আত্মাকে জুড়ে দেওয়া হবে। যখন জীবন্ত পুতে ফেলা শিশু কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে: কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে? যখন আমলনামা প্রকাশ করা হবে। যখন আকাশের আবরণ তুলে ফেলা হবে। যখন জাহান্নামের তীব্র আগুনকে ভীষণভাবে প্রজ্বলিত করা হবে। যখন জান্নাতকে কাছে নিয়ে আসা হবে। তখন প্রত্যেকে জেনে যাবে: সে কী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।  —আত-তাকউইর ১-১৪

মহাবিশ্বের ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। সেদিন আমাদের উপরে আকাশে এবং আমাদের চারপাশে পৃথিবীতে এমন ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটবে যে, মানুষ সেদিন তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তির কথাও বেমালুম ভুলে গিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটতে থাকবে। আরবদের কাছে দশ মাসের গর্ভবতী উট, যার বাচ্চা দেওয়ার করার সময় হয়ে গেছে, তা ছিল সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, কারণ সেটি তাদেরকে আরেকটি মূল্যবান সম্পদ— একটি উটের বাচ্চা উপহার দিত এবং একই সাথে দুধ দিত। এধরনের উটকে তারা নিয়মিত সবরকম যত্ন নিত, নিরাপত্তার সবরকম ব্যবস্থা করতো, দিনরাত এই উটের চিন্তায় মশগুল থাকতো।

যেদিন মহাবিশ্বের ধ্বংস শুরু হয়ে যাবে, সেদিন সেই মূল্যবান সম্পদকে উপেক্ষা করে নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আজকের দিনে তুলনা করলে, মানুষ তার দামি গাড়ি, বাড়ি, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ফেলে পালাতে থাকবে—রাস্তায় পড়ে থাকবে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, আওডি। আলিশান বাড়ি, ফুল-ফলের বাগান দরজা খোলা অবস্থায় খালি পড়ে থাকবে। অনেক পরিশ্রমের অর্জন যেই মূল্যবান সম্পদগুলো, যেগুলোর চিন্তায় মানুষ দিনরাত মশগুল থাকতো, নিরাপত্তার সবরকম ব্যবস্থা নিত, নিয়মিত যত্ন নিত—সেদিন কেউ ফিরেও তাকাবে না সেগুলোর দিকে।

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এরপরও কীভাবে তুমি বিচার দিনকে অস্বীকার করতে পারো? — আত-তীন পর্ব ২

শপথ ডুমুর এবং জলপাই ফলের। শপথ সিনিন এলাকার তুর পর্বতের। আর এই নিরাপদ শহরের। নিঃসন্দেহে আমি মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর খাঁড়া গঠনে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে নিকৃষ্টতম পর্যায়ে নেমে যেতে দেই। তবে তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সঠিক কাজ করেছে। তাদের জন্য এমন সুন্দর প্রতিদান রয়েছে, যা কখনও শেষ হবে না। এরপরও কীভাবে তুমি বিচার দিনকে অস্বীকার করতে পারো? আল্লাহ কি অন্য সব বিচারকের থেকে বড় বিচারক নন? — আত-ত্বীন

নাস্তিকরা প্রশ্ন করে: যদি সত্যিই সৃষ্টিকর্তা থাকে, তাহলে কীভাবে যুদ্ধ, খুন, ধর্ষণ হয়? কীভাবে স্রস্টা মানুষকে শিশু ধর্ষণের মত বিকৃত সব অপরাধ করতে দেয়? একজন দয়ালু, বুদ্ধিমান, বিবেকবান সৃষ্টিকর্তা কীভাবে মানুষ নামের এরকম হিংস্র, ধ্বংসাত্মক, নিষ্ঠুর একটা প্রাণী তৈরি করতে পারে? মানুষের অস্তিত্বই কী সবচেয়ে বড় প্রমাণ নয় যে, সৃষ্টিকর্তা বলে আসলে কিছু নেই? সবই হচ্ছে স্বার্থপর বিবর্তনের ফসল?

অন্যদিকে, অনেক মুসলিমরা প্রশ্ন করেন: মানুষকে জাহান্নামে এমন সব ভয়ংকর, নিষ্ঠুর শাস্তি কেন দেওয়া হবে? মানুষের অপরাধ আর কতই বা বড় হয় যে, তাকে লক্ষ কোটি বছর আগুনে পোড়াতে হবে? একজন ন্যায়বান স্রস্টা কীভাবে মানুষকে এত শাস্তি দিতে পারে? আর মানুষকে এমনভাবে বানানো হলো কেন যে, সে এত অপরাধ করতে পারে? মানুষকে কি আরেকটু ভালো করে বানানো যেত না?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

মানুষ হতভম্ব হয়ে বলবে, “কী হচ্ছে এর!” —আয-যালযালাহ

পৃথিবীকে যখন ভীষণভাবে ঝাঁকানো হবে এবং পৃথিবী তার সব বোঝা বের করে দেবে। আর মানুষ হতভম্ব হয়ে বলবে, “কী হচ্ছে এর!” সেদিন সে সবকিছু জানিয়ে দেবে, কারণ তোমার প্রতিপালক তাকে নির্দেশ দিয়েছেন। সেদিন মানুষ আলাদা আলাদাভাবে বের হবে, যাতে তাদেরকে দেখানো যায় তারা কী করেছে। তারপর কেউ অণু পরিমাণ ভালো কাজ করে থাকলেও তা দেখতে পাবে। আর কেউ অণু পরিমাণ খারাপ কাজ করে থাকলেও তা দেখতে পাবে। —আয-যালযালাহ

সুধীবৃন্দরা প্রশ্ন করেন, “গত হাজার বছরে কত প্রজন্ম ‘কিয়ামত আসলো বলে!’ — এই ভয় পেয়ে জীবন পার করে গেছে। কই? কিয়ামত তো হয়নি? তাহলে কি তারা সারাজীবন এক অমূলক ভয় পেয়ে জীবন পার করে গেলো না? আমার জীবনে কিয়ামত হবে তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই? তাহলে খামোখা ভয় পেয়ে কী লাভ? মক্কার আরবদের হাজার বছর আগে কিয়ামতের এত সব ভয় দেখানো হলো, কই, কিয়ামত তো তাদের জীবনে হলো না? তাহলে এত এত সব আয়াত ফালতু ভয়?”

— তাদের এই সমস্যার উত্তর তাদের প্রশ্নের ভেতরেই রয়েছে: “ভয় দেখিয়ে কী লাভ?”    (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কে তোমাকে ধারনা দেবে সেই ভীষণ আঘাত সম্পর্কে?—আল-ক্বারিআহ

এক ভীষণ আঘাত! কী সেই ভীষণ আঘাত? কে তোমাকে ধারনা দেবে সেই ভীষণ আঘাত সম্পর্কে?
একদিন মানুষ বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো ছোটাছুটি করবে। আর পর্বতগুলো হয়ে যাবে ধুনা পশমের মতো।
তারপর যার ভালো কাজের পাল্লাগুলো ভারি হবে, সে থাকবে আরাম-আয়েসে, সুখে-শান্তিতে। আর যার পাল্লাগুলো হালকা হবে, তাকে গ্রাস করবে এক গভীর গর্ত।
কে তোমাকে ধারনা দেবে সেটা কী? সেটা এক লেলিহান শিখার আগুন।
—আল-ক্বারিআহ

এক ভীষণ আঘাত! কী সেই ভীষণ আঘাত?

আল-ক্বারিআহ الْقَارِعَة এসেছে ক্বারাআ قرع  থেকে, যার অর্থ এমনভাবে বারি দেওয়া, যার আওয়াজ শুনে মনে আতংকের সৃষ্টি হয়। যেমন, কেউ রাতের বেলা এসে ধুম ধুম করে দরজায় বারি মারছে।[৭] আপনি আতংকিত হয়ে গেলেন, পুলিশ এলো নাকি? এই ধরণের বারি হচ্ছে ক্বারাআ, যা মানুষের মনে আতংক তৈরি করে। ক্বারিআহ হচ্ছে ক্বারাআ-এর চরম রূপ —এক ভীষণ বারি, যা শুনে মনে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। এমন এক বারি, যা ভেঙ্গে সব তছনছ করে দেয়।[১]

কিয়ামতের আগমন হবে এক ভীষণ বারির মাধ্যমে। রাতের বেলা কেউ এসে দরজায় বারি দিলে ঘরের ভেতরে সবাই যেমন আতংকিত হয়ে যায়, তেমনি এই ভয়ংকর বারির শব্দে সবাই চরম আতংকিত হয়ে যাবে। এই ভীষণ বারি পুরো মহাবিশ্বে মহাপ্রলয় ঘটানো শুরু করে দেবে।[৭]  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সেদিন কেউ কারও সাহায্য পাবে না — আল-বাক্বারাহ ১২৩

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে ‘ক্রিমিনাল সাইকোলজি’ শিখিয়েছেন। একজন অপরাধী চারভাবে তার অপরাধের শাস্তি থেকে বাঁচার চেষ্টা করে, যেগুলো কিয়ামাতের দিন কোনোই কাজে আসবে না—

2_123

সাবধান সেই দিনের ব্যাপারে: ১) যেদিন কেউ অন্য কারও জন্য একটুও এগিয়ে আসবে না, ২) কোনো বিনিময় নেওয়া হবে না, ৩) কারও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না — ৪) সেদিন কেউ কারও সাহায্য পাবে না। [আল-বাক্বারাহ ১২৩]

2_123

প্রথমে সে চেষ্টা করে তার দোষকে অন্য কারও ঘাড়ে চাপানোর। সে প্রমাণ করে দেখানোর চেষ্টা করে যে, আসলে অপরাধটা সে করেনি, অন্য কেউ করেছে। যেমন, “আমি তো ইচ্ছা করে ঘুষ খাইনি! ওরা আমাকে সেধে একটা ফ্লাট দিয়েছিল দেখেই তো আমি ওদেরকে প্রজেক্টের কন্ট্রাক্টটা দিয়েছিলাম। ওরা আমাকে ফ্লাট দিলো কেন? এটা ওদের দোষ!”

যদি এতে কাজ না হয়, তখন সে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে যে, আসলে সে অপরাধ করতে বাধ্য হয়েছিল অন্য কারও জন্য: “আমি তো ইচ্ছা করে হাতাকাটা ব্লাউজ, আর ফিনফিনে পাতলা শাড়ি পরে বিয়েতে যাইনি। আমি যদি হিজাব করে বিয়েতে যেতাম, তাহলে আমার স্বামীকে সবাই ‘মোল্লা-তালেবান-ব্যাকডেটেড’ বলত। ওর জন্যই তো আমি স্মার্টভাবে সেজে বিয়েতে যেতে বাধ্য হয়েছি। এতে আমার তো কোনো দোষ নেই? দোষ হচ্ছে সমাজের!”

এধরনের চেষ্টা করে কোনো লাভ নেই, কারণ: “সেদিন কেউ অন্য কারও জন্য একটুও এগিয়ে আসবে না।”

এগুলো যখন কোনো কাজে আসে না, তখন অপরাধীরা চেষ্টা করে টাকা খাওয়ানোর, সম্পত্তির লোভ দেখানোর: “জজ সাহেব, আমার কেসটা ছেড়ে দ্যান, আমি আপনাকে খুশি করে দিবো। উত্তরায় আমার অনেক প্লট আছে। আপনার রঙিন পানির সাপ্লাই নিয়ে আর কোনো চিন্তা করতে হবে না।” কিয়ামাতের দিন কেউ যদি গিয়ে বলে, “আমি তো তিন-তিনবার হাজ্জ করেছি! এই দেখেন আমার পাসপোর্ট: তিনবার ভিসা দেওয়া আছে। সুদের লোন নিয়ে কেনা আমার একমাত্র বাড়িটা তিনটা হজ্জ দিয়ে মাফ করা যায় না?”

আল্লাহ تعالى বলে দিয়েছেন যে, তাঁর সাথে এসব কিছুই চলবে না: “কোনো বিনিময় নেওয়া হবে না।” আমাদের হারাম সম্পত্তি হালাল করে যেতে হবে, যাদের হক মেরে দেওয়া হয়েছে, তাদের হক আদায় করে যেতে হবে। সেটা না পারলে হারাম সম্পত্তি দান করে দিতে হবে। কিন্তু হারাম টাকায় করা সম্পত্তি সারাজীবন ভোগ করে, মানুষের হক মেরে গিয়ে, তারপর সেটা সালাত, সিয়াম, হাজ্জ দিয়ে বিনিময় করা যাবে না। কিয়ামাত এধরনের ব্যবসা করার জায়গা নয়।

অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর চেষ্টা করে যখন লাভ হয় না, তখন অপরাধীরা চেষ্টা করে ওপরের লেভেলের কোনো মামা-চাচা-খালু ধরার, কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি দিয়ে সুপারিশ করার, বা কোনো ক্ষমতাশালী কারও সাথে যদি তার ওঠা-বসা থাকে তাহলে সেটার ভয় দেখানোর। যেমন, “আমার মামা ছিলেন হজ্জ সেন্টারের চেয়ারম্যান। তিনি বিশ বার হজ্জ কাফেলা নিয়ে গেছেন। তাকে একটু ডাকুন, তিনি আমার হয়ে সুপারিশ করবেন।”

সেটা করে লাভ না হলে, শেষ ভরসা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে যে, তার সাথে কোনো সন্মানিত বা বিখ্যাত মানুষের সম্পর্ক আছে, এবং সে জন্য তাকে একটু বিশেষ ‘খাতির’ করতে হবে: “আমার বাবা সিলেটের অমুক পিরের ভগ্নিপতির মামার শ্যালক ছিলেন। আমি নিজে সৈয়দ বংশের সন্তান! আমরা সবাই আধ্যাত্মিক পরিবারে জন্মেছি। আমাকে তো খন্দকার বংশের মতো দেখলে হবে না!”

আল্লাহ تعالى সোজা বলে দিয়েছেন, “সেদিন কারও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে না।”  شفاعة (শাফাআত) অর্থাৎ সুপারিশ-এর দুটি পদ্ধতিই এখানে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে—১) কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজে থেকে অন্য কোনো অপরাধীর জন্য সুপারিশ করতে পারবে না, ২) কোনো অপরাধীকে অনুমতি দেওয়া হবে না, অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক উপস্থাপন করার।

সকল চেষ্টা যখন বিফল হয়, তখন অপরাধীরা শেষ ভরসা হিসেবে গায়ের জোর দেখানোর চেষ্টা করে। তার দলের সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে মারামারি, খুনাখুনি করে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। তাদেরকে আল্লাহ تعالى শেষ কথা জানিয়ে দিয়েছেন, “সেদিন কেউ কারও সাহায্য পাবে না।” আল্লাহর تعالى সামনে তার দলের সাঙ্গপাঙ্গরা, ভাড়াটে খুনিরা কেউ কিছুই করতে পারবে না। উলটো ওরা সবাই ভয়ে, আতঙ্কে থর থর করে কাঁপতে থাকবে—নিজেদেরকে কীভাবে বাঁচানো যায়, সেই চিন্তায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে যাবে।

“সেই দিনের ব্যাপারে সাবধান: যেদিন কেউ কারও জন্য এগিয়ে আসবে না”—আপনি যেই আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য তার বিয়ের অনুষ্ঠানে অর্ধ নগ্ন হয়ে গেলেন, যেই বন্ধুর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার জন্য তার বাচ্চার বার্থডে পার্টিতে গিয়ে ছেলে-মেয়ে মাখামাখি করে নাচ-গান করলেন, যেই প্রতিবেশীর সামনে স্ট্যাটাস ঠিক রাখার জন্য সুদের লোন নিয়ে নতুন মডেলের গাড়ি কিনলেন—সেই আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশীরা কেউ কিয়ামাতের দিন আপনাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে না।

সেদিন আমরা যখন নিজেদের দোষে জান্নাত হারিয়ে ফেলব, তারপর ভয়ংকর কিছু সত্তা এসে নিষ্ঠুরভাবে আমাদেরকে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামের আগুনের দিকে নিয়ে যেতে থাকবে, তখন আমরা যতই হাহাকার করি, “আমার ছেলেটা আমাকে শেষ করে দিয়েছে। ওকে ধরেন! ওর পড়ালেখার জন্য দিনরাত দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আমি নামাজ পড়তে পারিনি। ওকে নিয়ে যান, আমাকে ছেড়ে দেন!”
“আমার মেয়েটার জন্য আজকে আমি শেষ! ও কার না কার সাথে প্রেম করে, এই ভয়ে আমি কোচিং সেন্টারে গিয়ে বসে থাকতাম। আমার বদলে ওকে ধরেন, আমাকে মাফ করে দেন!”
“আমার স্বামীর জন্য আমি হিজাব করিনি। আমার স্বামীকে জাহান্নামে নেন, আমাকে বাঁচান! আমি তো বুঝতে পারিনি এরকম হবে!”
“আমার বউয়ের শপিং-এর খরচের জন্য দিনরাত চাকরি-ব্যবসা করতে গিয়ে আমি ইসলাম শিখতে পারিনি। আমার দোষ নেই! আমার বউকে জাহান্নামে নেন। প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দেন!”

—কোনো লাভ হবে না। জাহান্নামের আগুনের শিখা ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘের মতো আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে।

يُبَصَّرُونَهُمْ ۚ يَوَدُّ الْمُجْرِمُ لَوْ يَفْتَدِي مِنْ عَذَابِ يَوْمِئِذٍ بِبَنِيهِ ﴿١١﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَأَخِيهِ ﴿١٢﴾ وَفَصِيلَتِهِ الَّتِي تُؤْوِيهِ ﴿١٣﴾ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ يُنجِيهِ ﴿١٤﴾ كَلَّا ۖ إِنَّهَا لَظَىٰ
সেদিন তাদের একে অন্যকে দেখতে বাধ্য করা হবে। অন্যায়কারীরা চাইবে যেন সে নিজেকে সেই দিনের শাস্তি থেকে বাঁচাতে পারে: তার নিজের সন্তান, সহধর্মিণী, ভাই, নিকটাত্মীয়দের বিনিময়ে হলেও, যারা কিনা তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। এমনকি পৃথিবীর সবার বিনিময়ে হলেও সে নিজেকে বাঁচাতে চাইবে। কখনই নয়! সেটা এক হিংস্র আগুণের শিখা! [আল-মা’আরিজ ৭০:১১-১৫]


বাকারাহ-এর এই আয়াতটি হচ্ছে আমাদের জন্য একটি সাবধান বাণী: আমাদেরকে Sense of Priority ঠিক করতে হবে। সব সময় মাথায় রাখতে হবে: আমি সমাজ, সংস্কৃতি, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, সন্তানদের জন্য নিজেকে ব্যস্ত রাখতে গিয়ে যেন আমার প্রভুকে ভুলে না যাই। আমার প্রভু সবার আগে। আমার সন্তান স্কুলে আধা ঘণ্টা বেশি সময় বসে থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাকে তাড়াতাড়ি আনতে গিয়ে আমি আমার প্রভুর সাথে যুহরের ওয়াক্তের মিটিংটা মিস করতে পারি না। আমার বান্ধবী তার গায়ে-হলুদে না যাবার জন্য মন খারাপ করতে পারে, কিন্তু তাই বলে আমার প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে আমি সাজব কিছু পরপুরুষের মনোরঞ্জন করার জন্য—এটা হতে পারে না। আমার প্রতিবেশী আমার ভাঙা গাড়ি দেখে আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারে, কিন্তু আমার প্রভু আমাকে দেখছেন, আর আমি ব্যাংকে বসে হারাম লোনের কাগজে সই করছি—এটা হতে পারে না। ‘লোকে কী বলবে’—সেটা আমি ভয় পাই না, বরং ‘আমার প্রভু রাগ করবেন’—সেটা আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।