আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করেন, তুমি তাহলে সেটাকে পশ্চিম দিকে উদয় করাও দেখি? — আল-বাক্বারাহ ২৫৮

2_258

তুমি কি ওকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্পর্কে তর্ক করেছিল, যেখানে কিনা আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? যখন ইব্রাহিম বলল, “আমার রাব্ব হচ্ছেন তিনি, যিনি জীবন দেন, এবং মৃত্যু দেন।” তখন সে বলল, “আমি জীবন দেই, আমি মৃত্যু দেই।” তখন ইব্রাহিম বলল, “আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করেন, তুমি তাহলে সেটাকে পশ্চিম দিকে উদয় করাও দেখি?” তখন সেই অস্বীকারকারী হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আল্লাহ অন্যায়কারী মানুষদের পথ দেখান না। [আল-বাক্বারাহ ২৫৮]

“তুমি কি ওকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্পর্কে তর্ক করেছিল?”

আল্লাহ تعالى কল্পনা করতে বলছেন সেই রোমহর্ষক ঘটনার কথা, যখন নবী ইব্রাহিম عليه السلام তখনকার প্রতাপশালী রাজা নমরুদ-এর দরবারে গিয়ে তার মুখের উপর তাকে রাব্ব বলে মানতে অস্বীকার করেছিলেন।[১২] রাজা নমরুদ নিজের বিশাল রাজত্ব এবং ক্ষমতায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, সে নিজেকে বিশ্বজগতের রাব্ব বলে দাবি করতো। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কল্পনা করতে বলছেন সেই দৃশ্যের কথা, যেখানে এরকম একজন ফিরাউন টাইপের রাজা, তার মন্ত্রীসভা, দেহরক্ষী, লোকবল নিয়ে সভার একদিকে বসে আছে, আর অন্যদিকে প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন নবী ইব্রাহিম عليه السلام একা। তিনি একা সেই অহংকারী প্রতাপশালী রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন, যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করছেন যে, রাজা যা দাবি করছে তা ভুল।

এটা এতটাই সাহসিকতার একটি ঘটনা যে, আল্লাহ تعالى কুর’আনে বলছেন, “তুমি কি ওকে দেখনি?” — অর্থাৎ একবার সেই দৃশ্যের কথা চিন্তা করো। আজকে আমরা অফিসের বসকে চোখের সামনে অন্যায় করতে দেখেও চাকরির ভয়ে কিছু বলি না। আত্মীয়স্বজনকে নিয়মিত ইসলামের নিয়ম ভাঙতে দেখেও কিছু বলি না, পাছে যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের অসামাজিক কাজ করতে দেখলে, নিজের মত রাস্তা মাপি, ‘কী দরকার খামোখা নিজের সম্মান নষ্ট করে?’ আর সেখানে নবী ইব্রাহিম عليه السلام তখনকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, কেবিনেট মিটিঙে সবার সামনে দাঁড়িয়ে, পুলিশ, আর্মির তোয়াক্কা না করে, প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বলছিলেন যে, তিনি যা করছেন সেটা অন্যায়। — কুর’আনে দেওয়া এই দৃশ্য থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি বিশুদ্ধ বিশ্বাসের অধিকারী ছিলেন — আল-বাক্বারাহ ১৩৫-১৩৭

ইহুদি, খ্রিস্টানরা রাসুল মুহাম্মাদ عليه السلام-কে মানুষ হিসেবে বেশ পছন্দই করতো। তারা জানতো: তিনি একজন সৎ, বিনয়ী মানুষ, কোনো অন্যায় করেন না, ধনী-গরিব পার্থক্য করেন না। এমনকি তারা রাসুলের عليه السلام কাছে নিজেদের সম্পদ আমানত হিসেবেও রেখে যেত। সবদিক থেকে তারা রাসুলকে عليه السلام একজন অনুসরণ করার মত আদর্শ মানুষ হিসেবেই মানতো। কিন্তু তারপরেও যখন রাসুল عليه السلام তাদেরকে হাজারো যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে, তারা ভুল পথে আছে, তাদের ধর্মগ্রন্থগুলো বিকৃত হয়ে গেছে, তখন তারা আর রাসুলের عليه السلام কথা শুনত না। বরং উলটো বলতো—

2_135_title

2_135ওরা বলে, “তোমরা ইহুদি কিংবা খ্রিস্টান হয়ে যাও, তাহলেই পথ পাবে।” বলে দাও, “আমরা বরং ইব্রাহিমের পথ অনুসরণ করবো, তিনি বিশুদ্ধ বিশ্বাসের অধিকারী ছিলেন। তিনি কখনই আল্লাহর تعالى সাথে শিরককারীদের একজন ছিলেন না।” [আল-বাক্বারাহ ১৩৫]

প্রথমে আমাদের বোঝা দরকার: তারা যখন বলছে ইহুদি বা খ্রিস্টান হয়ে যেতে, তারা আসলে কোন ধর্মের দিকে ডাকছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

খবরদার, মুসলিম না থাকা অবস্থায় যেন মারা যেও না — আল-বাক্বারাহ ১৩২-১৩৩

আজকে যদি আপনাকে ডাক্তার বলে: আপনার রক্তে ক্যান্সার ধরা পড়েছে এবং আপনি আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মারা যাবেন, সিঙ্গাপুরে গিয়েও লাভ হবে না—আপনি তখন কী করবেন? আপনি কি তখন কাঁথা জড়িয়ে টিভির সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফালতু তারকা শো, টক শো, হিন্দি সিরিয়াল দেখবেন? আপনি কি পরদিন অফিসে গিয়ে কলিগদের সাথে শেষ বারের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা মারবেন? আপনি কি আপনার ছেলেমেয়েকে শেষ বারের মতো একটু খুশি করার জন্য ভিডিও গেম কিনে দিবেন, যেখানে তারা রামদা-ছুরি নিয়ে একপাল অর্ধ মৃত, রক্তাক্ত জম্বিকে মেরে কোনো এক বিকৃত কারণে বড়ই আনন্দ পায়? আপনি কি এই অবস্থায় আপনার মেয়েকে নৃত্য শিল্পী বানাবেন, ছেলেকে ব্যান্ডের দলে যোগ দেওয়াবেন, যেন তারা সেগুলো করে আপনার মৃত্যুর পরে আপনার জন্য ‘অশেষ সওয়াব’ অর্জন করে?

না, আপনি তখন এগুলোর কিছুই করবেন না। অথচ আজকে আপনি ঠিকই সেগুলো করে যাচ্ছেন, এটা ভালো করে জেনে যে: আপনি আজকে হোক, কালকে হোক, একদিন না একদিন মারা যাবেনই। তারপর একসময় আপনাকে আবার জাগিয়ে তোলা হবে এবং তারপর আপনাকে ধরে নিয়ে বিশ্বজগতের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবানের সামনে দাঁড় করানো হবে: আপনার জীবনের প্রতি মুহূর্তের হিসাব দেওয়ার জন্য। সেদিন তাঁর সামনে মাথা নিচু করে আপনি তাঁকে কী বলবেন—সেটা কি ঠিক করে রেখেছেন?

কোনো কারণে আমরা এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি চিন্তা করতে চাই না। এরকম চিন্তা মাথায় এলেই আমাদের কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। আমরা দ্রুত চিন্তার টপিক পাল্টে ফেলি। যদি আমাদের কোনো বন্ধু বা আত্মীয় আমাদেরকে এই ব্যাপারটি নিয়ে কিছু বলা শুরু করে, আমরা জলদি তাকে বলি, “কী বলছেন এইসব! এই সব মরা-টরার কথা শুনতে ভালো লাগছে না। বাদ দেন। আসেন অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি।”

আমরা কোনো এক অদ্ভুত কারণে নিজেদেরকে একধরনের সেলফ ডিলিউশনে (মতিবিভ্রমে) ডুবিয়ে রাখি যে, আগামি কয়েক সেকেন্ড পরে আমি যে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যাব না, বা কালকে আমি যে বাসায় ফেরার পথে অ্যাকসিডেন্ট করে মারা যাব না—এ ব্যাপারে আমি একশ ভাগ নিশ্চিত। আল্লাহর সাথে আমার একধরনের চুক্তি আছে: তিনি আমাকে সত্তর-আশি বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবেনই। তাই জীবনে অনেক সময় আছে ধর্ম-টর্ম করার। এখন আগে যত পারি চাকরি, ব্যবসা, পার্টি করে; মুভি, হিন্দি সিরিয়াল দেখে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা মার্কেটে ঘুরে, লক্ষ টাকা খরচ করে বেড়িয়ে এসে, যত পারি জীবনটা উপভোগ করে নেই। বলা তো যায় না, যদি মরে যাই? তাহলে তো এসব আর করা হবে না।

2_132_title

2_132

ইব্রাহিম এবং ইয়াকুব যখন তাদের সন্তানদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, “বাবারা, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের জন্য এই দীনকে বেছে নিয়েছেন। তাই খবরদার, আল্লাহর تعالى প্রতি পুরোপুরি অনুগত (মুসলিম) না থাকা অবস্থায় যেন মারা যেও না।” [আল-বাক্বারাহ ১৩২]

এই আয়াতে আমরা দেখতে পাই: দু’জন নবী তাদের সন্তানদেরকে ঠিক একই ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছিলেন: তারা যেন সবসময় আল্লাহর تعالى প্রতি অনুগত অবস্থায় থাকে, যেন যে কোনো সময় মৃত্যু এসে হাজির হলে, তাদের মৃত্যুটা হয় ‘মুসলিম’ অর্থাৎ আল্লাহর تعالى প্রতি পুরোপুরি অনুগত অবস্থায়। তারা যেন কখনো এমন অবস্থায়, এমন একটা কাজ করতে গিয়ে মারা না যায়, যখন তারা আল্লাহর تعالى প্রতি পুরোপুরি অনুগত (মুসলিম) ছিল না।

এই আয়াতটি আমাদের জন্য একটা ভয়ঙ্কর সাবধান বাণী। আমরা যতই নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, যাকাত দেই, ইসলামের দাওয়াহ দেই, আমাদের মৃত্যু যেন কখনো এমন অবস্থায় না হয়, যখন আমি আল্লাহর تعالى প্রতি অনুগত ছিলাম না। এমন একটা কাজ করছিলাম, বা এমন এক অবস্থায় চলে গিয়েছিলাম, যা আল্লাহ تعالى ঘৃণা করেন।

আমি যেন কখনো রাত তিনটার সময় ইন্টারনেটে একটা বাজে ভিডিও দেখা অবস্থায় মারা না যাই। আমি যেন কখনো ব্যাংকে হারাম লোণের কাগজে সই করার সময় হার্ট অ্যাটাক করে মারা না যাই। বন্ধু-বান্ধবের সাথে পার্টি করতে গিয়ে মারা না যাই। বিয়ের দাওয়াতে অর্ধ-নগ্ন ভাবে সেজে বাড়ি ফেরার সময় গাড়ি এক্সিডেন্ট করে মারা না যাই। ঘুষের টাকায় কেনা হারাম বাড়িতে, হারাম বিছানায় শুয়ে মারা না যাই। —এরকম একটা মৃত্যু হবে আল্লাহর تعالى কঠিন নির্দেশের বিরুদ্ধে অন্যায় করা অবস্থায় — আল্লাহর প্রতি চরম অবাধ্য অবস্থায়। এরকম ভয়ঙ্কর লজ্জাজনক, দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু আমার যেন না হয়।

তাই রাত দুইটার সময় ফেইসবুকে একজনের শেয়ার করা একটা ভিডিওতে ক্লিক করার আগে দশবার ভাবি: “যদি এই বাজে ভিডিওটা দেখার সময় আমি মারা যাই?” বন্ধুদের সাথে পার্টিতে যাওয়ার আগে একবার চিন্তা করি: “যদি পার্টিতে যাওয়ার সময় গাড়ি এক্সিডেন্ট করে মারা যাই?” আত্মীয়ের বিয়ের দাওয়াতে সেজেগুজে যাওয়ার আগে একবার আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি: “এই সাজে, এই কাপড়ে আল্লাহর تعالى সামনে দাঁড়াতে পারবো?”  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আমি সমর্পণ করলাম সকল সৃষ্টির প্রভুর প্রতি — আল-বাক্বারাহ ১৩১

সুধীবৃন্দদেরকে যখন বলা হয় ধর্মে বিশ্বাস করতে, তখন তারা প্রশ্ন করেন: কেন? কীজন্য আমাদের আল্লাহকে تعالى মানতে হবে? আল্লাহ تعالى আছে প্রমাণ কী? তোমরা নিজেদের ইচ্ছামত নিয়মকানুন বানিয়ে আমাদেরকে মানানোর চেষ্টা করছ, যাতে করে আমরা তোমাদের কথা মতো চলি। আর তখন আমাদেরকে তোমরা ইচ্ছেমত ব্যবহার করতে পারো। শুধু তোমাদের কথার উপর ভরসা করে আমরা আমাদের জীবন পালটিয়ে ফেলতে পারবো না। আমাদেরকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেখাতে হবে। একদম নিজের চোখে কিছু একটা দেখাতে হবে, যা আমাদের সব সন্দেহ দূর করে দেবে।

নবী ইব্রাহিমকে عليه السلام যখন বলা হয়েছিল আল্লাহর تعالى প্রতি সমর্পণ করতে, তখন তিনি কী বলেছিলেন দেখা যাক—

2_131_title

2_131

যখন তাকে তার প্রভু বললেন, “সমর্পণ করো”, তিনি সাথে সাথে বললেন, “আমি সমর্পণ করলাম সকল সৃষ্টির প্রভুর প্রতি।” [আল-বাক্বারাহ ১৩১]

একজন নবী হচ্ছেন সেই যুগের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষদের একজন। একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, সুযোগ্য মানুষ ছাড়া আর কারো পক্ষে কোনো দেশের দাগী আসামী, রাজনীতিবিদ, জমিদার, মাতব্বরদেরকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। সুধীবৃন্দরা অনেকে দাবি করেন: নবীরা ছিলেন মানসিক রোগী, তাদের মতিবিভ্রম হতো, তাই তারা গায়েবী বাণী শুনতেন। আবার অনেকে দাবি করেন: নবীরা ছিলেন আসলে অত্যন্ত চালাক ক্ষমতা লোভী প্রতারক, যারা ক্ষমতার জন্য মানুষকে ধোঁকা দিয়ে গেছেন। দেখা যাক এই দাবিগুলো কতখানি যুক্তিযুক্ত—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যে ওদেরকে আপানার আয়াত শোনাবে — আল-বাক্বারাহ ১২৯-১৩০

মানুষকে ইসলামের দাওয়াহ দেওয়ার সময় যারা দাওয়াহ দেন, তাদেরকে তিনটি বাঁধা পার করতে হয়—
১) তুমি কে? তোমার কথা আমি কেন শুনবো?
২) তোমার ধর্ম কি আমার ধর্মের থেকে বেশি সঠিক? তুমি কি মনে করো: তুমি সঠিক পথে আছে, আর আমরা সবাই ভুল পথে আছি?
৩) আমাদেরকে কেন তোমাদের মতই হতে হবে?

নবি, রাসুলদেরকে এই বাঁধাগুলো পার করতে হয়েছে। তাদেরকে এমন সব সময়ে, এমন সব মানুষের কাছে পাঠানো হয়েছিল, যারা একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। একশ্রেণীর মানুষের চরম অন্যায়ের কারণে আরেক শ্রেণীর মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও নবি, রাসুলরা অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এই কঠিন বাঁধাগুলো অতিক্রম করে অত্যাচারী মানুষগুলোকে পথ দেখিয়ে গেছেন।

এখন, আমাদের কাছে যদি বাইরের দেশ থেকে কেউ এসে ধর্ম প্রচার করা শুরু করে, তাহলে প্রথমেই আমাদের মনে হবে: সে কোথাকার কে যে, আমাদেরকে ধর্ম শেখাতে এসেছে? সে কীভাবে বুঝবে আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মানসিকতা, আমাদের সীমাবদ্ধতা? তার দেশে অনেক কিছু চলতে পারে, যেটা আমাদের দেশে চলবে না। আবার আমাদের অনেক কিছুই তার সংস্কৃতি অনুসারে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। আমাদেরকে কি সবদিক থেকে তার মতো, তার দেশের মানুষের মতো হতে হবে নাকি?

একারণে যখন কোনো নবি বা রাসুল, তাদের এলাকার মানুষের মাঝে বড় হয়ে, তাদেরই মাঝে ধর্ম প্রচার করতেন, তখন তাদেরকে এই সমস্যাটার সম্মুখীন হতে হতো না। তারা তাদের আশেপাশের মানুষের সংস্কৃতি, রীতিনীতি, মানসিকতা ভালো করে বুঝতেন এবং সে অনুসারে তাদেরকে ধর্ম শেখাতে পারতেন। একারণে একজন বাঙালি দাঈ যতটা না ভালোভাবে বাঙালীদের মাঝে ইসলামের শিক্ষা প্রচার করতে পারবেন, মানুষকে বোঝাতে পারবেন, মানুষের ভেতরে পরিবর্তন আনতে পারবেন, একজন আরব বা ইংরেজ দাঈ সেভাবে পারবেন না। ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি, আদব-কায়দা একটা বিরাট বাঁধা হয়ে থাকবে সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতার পথে।

নবি ইব্রাহিম عليه السلام এই ব্যাপারটি বুঝেছিলেন, একারণেই তিনি আল্লাহর تعالى কাছে দুআ করেছিলেন, যেন আল্লাহ تعالى তার বংশধরদের মধ্যে থেকে একজনকে রাসুল হিসেবে গড়ে তোলেন, যাকে ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতির বিরাট বাঁধা অতিক্রম করতে হবে না—

2_129_title

2_129

ও আমাদের প্রভু, ওদের মধ্যে থেকে একজনকে রাসুল হিসেবে গড়ে তুলুন, যে ওদেরকে আপানার আয়াত শোনাবে, তাদেরকে আপনার বিধি-বিধান এবং প্রজ্ঞা শেখাবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। নিঃসন্দেহে আপনি সর্বোচ্চ ক্ষমতা-কর্তৃত্বের অধিকারী, পরম প্রজ্ঞাবান। [আল-বাক্বারাহ ১২৯]

এই আয়াতে নবি ইব্রাহিম عليه السلام দুআ করেছেন: ٱبْعَثْ অর্থাৎ ‘গড়ে তুলতে’। রাসুল যেন তার বংশধরদের মাঝে থেকে বড় হয়ে একজন রাসুল হন। তিনি যেন অন্য কোনো জায়গা থেকে না আসেন। এলাকার মানুষ যেন তাকে তাদেরই একজন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন — আল-বাক্বারাহ ১২৮

আমাদের সন্তানদের কেউ যদি মেধাবী হয়, তাহলে তাকে ডাক্তার বানাই। তারচেয়ে কম মেধাবীটা হয় ইঞ্জিনিয়ার। আরেকটু কম হলে বাংলা বা ইংলিশে পড়ে। আর যেটার অবস্থা একেবারেই খারাপ, সেটাকে আমরা মাদ্রাসায় দেই, ইমাম সাব বানাই। আমাদের মধ্যে কোনো এক অদ্ভুত কারণে একটা ধারণা আছে যে, ছেলেমেয়েরা বড় হলে নিজেরাই সৎ, আদর্শ মানুষ হবে, দুনিয়ায় শান্তিতে থাকবে। দুনিয়ায় শান্তিতে থাকাটাই আসল কথা। পরে কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ছেলেমেয়েদেরকে অত ইসলাম শেখানোর প্রয়োজন নেই। ইসলাম শিখে হবেটা কী? ইসলাম কী ছেলেমেয়েকে বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ, সন্মান, উচ্চশিক্ষা —এসব কিছু দেবে?

তারপর তারা বড় হয়। ডাক্তারটা একসময় গিয়ে ১ লাখ টাকার অপারেশন করে ৫ লাখ টাকায়। বছর খানেকের মধ্যে কোটিপতি হয়ে বিদেশে চলে যায়। ওদিকে সেই ৫ লাখ টাকার বিল দিতে গিয়ে রোগীর পরিবার লোণে জর্জরিত হয়ে, পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে, অভাবে, কষ্টে, দুশ্চিন্তায় বছরের পর বছর পার করে। ইঞ্জিনিয়ারটা বড় হয়ে বিরাট অঙ্কের ঘুষ খেয়ে প্রজেক্ট করে। সেই ঘুষের টাকা দিয়ে সে বাড়ি-গাড়ি করে, আর তার ছেলেমেয়েরা ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে থার্টি-ফার্স্ট নাইটে ড্রিঙ্ক করে মাতলামি করে। বাংলা, ইংরেজিতে পড়াগুলো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে মারামারি, খুনাখুনি, ধর্ষণ করে।

এদিকে ইমাম সাহেব মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতন পেয়ে তার পরিবারকে নিয়ে কোনোমতে দিন পার করে হলেও তার ছেলেমেয়েকে নৈতিকতা শেখান, হাফেজ বানান। বাবা-মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লে তিনি এবং তার স্ত্রী নিষ্ঠার সাথে বছরের পর বছর তাদের সেবা করেন। যেদিন বাবা-মা মারা যায়, সেদিন তিনি তার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ভাইদেরকে ফোন করে আর পান না। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি নিজেই হাজার হাজার মুসল্লিকে সাথে নিয়ে বাবা-মার জানাজা পড়েন। ইমাম সাহেবের বাবা-মা’র জানাজা, কত বিরাট সন্মানের জানাজা!

আজকের প্রজন্মের একটা বড় অংশ ভয়াবহ রকমের নৈতিক অবক্ষয়ে ডুবে গেছে: তাদের বাবা-মা’দের দুনিয়ায় সম্পদ, সন্মান, আরাম-আয়েশের লোভের জন্য। সেই সব বাবা-মা’দের কাছে তাদের সন্তানরা হচ্ছে পেনশন। সেই পেনশনের মূল্য বাড়ানোর জন্য তারা যতভাবে সম্ভব চেষ্টা করেন সন্তানদেরকে দুনিয়াতে বড়লোক বানাবার। ইসলাম হচ্ছে তাদের পেনশনের মূল্য বৃদ্ধিতে একটি বাঁধা মাত্র। ছেলে ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলে, দাঁড়িওলা বন্ধুদের সাথে মেলামেশা শুরু করলে, তারা আতঙ্কিত হয়ে যান: এই বুঝি আমাদের পেনশন গেল!

এই ধরনের বাবা-মাদের ভেতরে এই ভয়ঙ্কর লোভ জন্ম হতে দিয়েছে তাদেরই বাবা-মা, যারা অনেকে নিজেরা ইসলাম মানলেও, তাদের সন্তানদেরকে ইসলামের পথে রাখার জন্য কোনো জোর দেননি। যার ফলে তারা তাদের বংশধরদের মধ্যে ইসলাম হারিয়ে যাওয়ার একটা চেইন রিয়াকশন শুরু করে দিয়ে গেছেন, যার ফলাফল আজকের ইসলাম ভুলে যাওয়া, নৈতিকভাবে ধ্বসে যাওয়া প্রজন্ম।

এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে এই প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য একটাই উপায়— তাদেরকে আল্লাহর تعالى প্রতি অনুগত করা। তাদেরকে উপলব্ধি করানো যে, সামনে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা আসছে। আজকে তাদেরকে ‘বাস্তবতা’ বলতে যা শেখানো হচ্ছে, সেটা কয়েক বছরের মায়া মাত্র। আসল বাস্তবতা আসছে সামনে, যেখানে সময় কখনো শেষ হবে না, যেই মহাবিশ্ব কখনো ধ্বংস হবে না। নবী ইব্রাহিম عليه السلام তা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি তার সন্তান এবং বংশধরদের জন্য দু’আ করেছিলেন—

2_128

ও আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) করে রাখুন, এবং আমাদের বংশধর থেকে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) একটি জাতি তৈরি করে দিন। আমাদেরকে দেখিয়ে দিন কীভাবে ইবাদত করতে হয় এবং আমাদের ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ করুন। নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন, নিরন্তর দয়াময়। [আল-বাক্বারাহ ১২৮]

2_128_title  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সে এক জঘন্য যাওয়ার জায়গা — আল-বাক্বারাহ ১২৬-১২৭

2_126

ইব্রাহিম বলেছিলেন, “ও আমার প্রভু, এই শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং এখানকার অধিবাসীদেরকে ফলমূল-সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিন: যারা আল্লাহ تعالى এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য।” আল্লাহ تعالى বলেছিলেন, “যারা অবিশ্বাস করবে, তাদেরকেও আমি কিছু দিনের জন্য সুখে থাকার ব্যবস্থা করে দেব, তারপর তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তিতে জোর করে ঢোকাবো— সে এক জঘন্য যাওয়ার জায়গা।” [আল-বাক্বারাহ ১২৬]

প্রশ্ন হল: কীসের শহর? নবী ইব্রাহিম عليه السلام যখন কা’বা বানাচ্ছিলেন, তখন তার চারপাশে ধুধু মরুভূমি। শহরের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু তিনি তার দূরদর্শিতা থেকে ঠিকই বুঝেছিলেন: আল্লাহর تعالى এই ঘরের আশেপাশে একদিন একটা শহর হবে। মানুষ দূর দূর থেকে আসবে এখানে হাজ্জ করতে। তাই তিনি আল্লাহর تعالى কাছে দু’আ করেছিলেন, যেন এখানকার বিশ্বাসী অধিবাসীদের নিরাপত্তা এবং খাওয়ার কোনো অভাব না হয়।

তার দু’আ আল্লাহ تعالى কবুল করেছেন। মক্কায় সারাবছর কোনো ফলের অভাব হয় না। অথচ মক্কায় এবং তার আশেপাশে মরুভূমিতে খেজুর ছাড়া কোনো ফল হয় না। তারপরেও সেখানে গেলে আপনি চায়নার আপেল, মিশরের কমলা, ভারতের কলা —কোনো কিছুর অভাব দেখবেন না। নানা দেশ থেকে সব সুস্বাদু ফল সেখানে সরবরাহ হচ্ছে গত হাজার বছর ধরে।

এছাড়াও সূরা আল-কাসাস ২৮:৫৭-এ বলা আছে: أَوَلَمْ نُمَكِّن لَّهُمْ حَرَمًا ءَامِنًا يُجْبَىٰٓ إِلَيْهِ ثَمَرَٰتُ كُلِّ شَىْءٍ رِّزْقًا مِّن لَّدُنَّا অর্থাৎ সবকিছুর ফল মক্কাতে আসে। এর অর্থ শুধুমাত্র গাছের ফলই নয়, বরং সবকিছুর ফল, সেটা কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে উৎপন্ন পণ্যদ্রব্য সবকিছুই। মক্কাবাসিদের চাষবাস করার কোনো দরকার হয় না। তারা সেই সময়টুকু আল্লাহর تعالى ইবাদতে মনোযোগ দিতে পারেন।[৪]

নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন
নবী ইব্রাহিম عليه السلام মক্কার জন্য আল্লাহর تعالى কাছে নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন চেয়েছিলেন। তার এই দু’আ থেকে তার অসাধারণ প্রজ্ঞার নিদর্শন পাওয়া যায়, কারণ আমরা আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে  সোশালজিতে পড়ি: একটি জাতির উন্নতির জন্য দুটো জিনিস দরকার— ১) নিরাপত্তা, ২) উন্নয়ন। এর একটিও যদি না থাকে, সেই জাতি বেশি দূর যেতে পারে না।[১]

যেমন, একটি দেশে উন্নয়ন থাকতে পারে। হতে পারে সেই দেশে যথেষ্ট খাদ্য তৈরি হচ্ছে, বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। নতুন অফিস, স্কুল-কলেজও হচ্ছে। কিন্তু সে দেশে মানুষের জানমালের যদি কোনো নিরাপত্তা না থাকে, দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী থাকে, সবসময় মারামারি, ভাংচুর, খুন লেগেই থাকে —তাহলে সেই দেশের শিক্ষিত, দক্ষ মানুষগুলো সুযোগ পেলেই অন্য দেশে চলে যাবে, যেখানে তারা নিরাপত্তা পাবে।[১] সবাই প্রথমে নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। যতই টাকা থাকুক, ঘরের বাইরে বের হলে যদি ছিনতাইকারী, ক্যাডার, খুন, গুম, ধর্ষণের ভয় থাকে, দেশের সরকার যদি জনগণকে জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে সেই মানুষগুলো এক সময় ভাবা শুরু করে, “কী হবে এদেশে থেকে? কীসের জন্য আমি প্রতিদিন নিজের এবং আমার পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নেব? এখানে কামড়ে থাকার মতো আছেটা কী?”

আবার অন্যদিকে কোনো দেশে যদি যথেষ্ট নিরাপত্তা থাকে, শক্তিশালী পুলিশ বাহিনী থাকে, কিন্তু সেই দেশে কোনো উন্নয়ন না থাকে, যথেষ্ট চাকরির সুযোগ না থাকে, ব্যবসার সুযোগ না থাকে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের আয় তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে সেই দেশেও মানুষ থাকতে চাইবে না, এবং সেই জাতি বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারবে না। দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারলে, মানুষ একসময় মরিয়া হয়ে উঠবে।[১] গৃহ যুদ্ধ শুরু হবে। দুর্ভিক্ষ হবে। জাতি ধ্বসে যাবে।

যারা আল্লাহ تعالى এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে
নবী ইব্রাহিম عليه السلام দু’আ করেছিলেন যেন শুধু বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ تعالى নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন দেন। কিন্তু আল্লাহ تعالى অবিশ্বাসীদের জন্যও তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু অবিশ্বাসীদের জন্য এই নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন হবে তাদের জাহান্নামে যাওয়ার পাথেয়। তারা বিপুল পরিমাণের সম্পত্তির মালিক হবে, সোনা দিয়ে লেপা মার্সিডিজ গাড়ি, বিশাল ব্যক্তিগত দোতলা প্লেন, মাইলের পর মাইল গাড়ির বহর, আকাশচুম্বী সব বিল্ডিং-এর মালিক হবে। কিন্তু এগুলো সব তাদেরকে বিলাসিতায় ডুবিয়ে রাখবে, আল্লাহ تعالى এবং আখিরাত থেকে ভুলিয়ে রাখবে। তারপর কিয়ামতের দিন তাদেরকে পশুর মতো তাড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামের হিংস্র আগুনে ছুঁড়ে ফেলা হবে।

2_126_title

নবী ইব্রাহিমের عليه السلام দু’আ
নবী ইব্রাহিম যখন কা’বা তৈরি শেষ করলেন, তিনি এবং তার সন্তান ইসমাইল দু’আ করলেন—

2_127

ইব্রাহিম এবং ইসমাইল যখন কা’বার ভিত্তি তৈরি করছিলেন, “ও আমাদের প্রভু, আমাদের কাছ থেকে এটি গ্রহণ করুণ। আপনি তো সব শোনেন, সব জানেন।” [আল-বাক্বারাহ ১২৭]

এখন প্রশ্ন আসে, কা’বা তৈরি করার সময় নবী ইব্রাহিম عليه السلام কেন দু’আ করছিলেন, যেন তাদের তৈরি কা’বা আল্লাহ تعالى গ্রহণ করে নেন? তারা কি আল্লাহর تعالى আদেশই অনুসরণ করছিলেন না? এখানে গ্রহণ না করার মতো কী কারণ থাকতে পারে?

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শেখাচ্ছেন: আমরা যদিও আল্লাহর تعالى নির্দেশ অনুসারে নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, যাকাত দেই —কিন্তু এগুলো আল্লাহ تعالى গ্রহণ নাও করতে পারেন, কারণ, আল্লাহর تعالى হুকুম পালনে আমাদের যথেষ্ট ত্রুটি থাকতে পারে। নামাজ পড়েই আমরা যেন ধরে না নেই, “ব্যাস, আমার আজকের সব ফরজ দায়িত্ব শেষ। ফেরেশতারা, তোমরা চলে এসো, আমি জান্নাতে যাওয়ার জন্য তৈরি।” রমজানে ৩০ রোজা রেখে যেন না ভাবি, “আমি এখন শিশুর মতো পবিত্র। আমার জান্নাতে যাওয়া আর ঠেকায় কে?” ফেইসবুকে ইসলামের উপরে পোস্ট দিয়ে হাজার খানেক লাইক পেয়ে যেন না ভাবি, “১০০০ লাইক x ৭০ নেকি = ৭০,০০০ নেকি। চমৎকার! জান্নাতুল ফেরদাউস পর্যন্ত পৌঁছাতে আর মাত্র ৩০০ লাইক দরকার।”

আমরা একটা মসজিদ দিতে পারলে ভাবি: এই মসজিদে যত মানুষ নামাজ পড়বে, তার সওয়াবের অংশীদার হবো আমি। কিয়ামতের দিন আমার নেকির পাল্লা এত ভারি হবে যে, তা তোলার জন্য কয়েকজন ফেরেশতা লাগবে। আর এখানে নবী ইব্রাহিম عليه السلام তৈরি করছেন কা’বা! এই কা’বায় প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হাজি ইবাদত করতে আসেন। হাজার বছর ধরে কত কোটি কোটি মানুষের ইবাদত হয়েছে এই কা’বা ঘিরে। তিনি যদি কা’বায় আসা প্রত্যেক মানুষের ইবাদতের সওয়াবের অংশীদার হন, তাহলে তিনি কী পরিমাণ সওয়াব পাবেন এই কা’বা থেকে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আর তিনিই আল্লাহর تعالى কাছে ভিক্ষা চাইছেন, যেন তার এই চেষ্টা আল্লাহ تعالى কবুল করে নেন!

আল্লাহ تعالى যদি অনুগ্রহ করে আমাদের ইবাদতগুলো কবুল করে না নেন, তাহলে সর্বনাশ! আমাদের একটা নামাজও কবুল হবে না, কারণ নামাজে দাঁড়িয়ে এমন কোনো চিন্তা নেই, যা আমরা করি না। আমাদের রোজা কবুল হবে না, কারণ রোজা রেখে আমরা মিথ্যা বলি, গীবত করি, অন্যের উপর অন্যায় করি, নিজের সুবিধার জন্য টাকা এদিক ওদিক করি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি। আমাদের যাকাত কবুল হবে না, কারণ যাকাত দেওয়ার সময় আমরা যতভাবে সম্ভব কম সম্পত্তির হিসেব করে, যাদেরকে যাকাত দিলে বেশি নাম হবে, তাদেরকে দেই। আমাদের হাজ্জ কবুল হবে না, কারণ হাজ্জের টাকায় মিশে আছে ব্যাঙ্কের সুদ, মামা-চাচা-খালু ধরে অন্যায়ভাবে জোগাড় করা চাকরি বা ব্যবসার আয়।

একারণে আমাদের প্রতিটি ইবাদতের পরে আল্লাহর تعالى কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে, যেন তিনি অনুগ্রহ করে তা গ্রহণ করে নেন। নবী ইব্রাহিম عليه السلام যেভাবে আকুলভাবে আল্লাহকে تعالى অনুরোধ করেছিলেন, “আপনি তো সব শোনেন” —ঠিক একইভাবে আমাদেরকেও আল্লাহর تعالى কাছে অনুরোধ করতে হবে, যেন তিনি আমাদের আকুল অনুরোধ শোনেন। “আপনি তো সব জানেন” —শত ভুলত্রুটি, দুর্বলতার পরেও আমাদের চেষ্টাকে তাঁর تعالى অসীম রহমতে বিবেচনা করেন। নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام মতো একজন নবী যদি কা’বা-র মতো বিরাট সন্মানের স্থাপনা বানিয়ে আল্লাহর تعالى কাছে সেটা গ্রহণ করার জন্য ভিক্ষা চাইতে পারেন, তাহলে আমরা কোথাকার কে?

এই আয়াতে বাবা-মাদের জন্য একটা শেখার ব্যাপার আছে: নবী ইব্রাহিম عليه السلام দু’আ করেছিলেন তার ছেলেকে সাথে নিয়ে। তিনি কা’বা তৈরি করেছেন ছেলেকে সাথে নিয়ে। আমরা অনেকেই নিজেরা ইসলামের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস হলেও, আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ইসলামের কাজে খুব একটা লাগাই না। তাদেরকে সাথে নিয়ে ইবাদত করি না। অনেকে আছেন যারা সারাদিন অফিস করে এসেই চলে যান মসজিদে, হালাক্বায়: ইসলামের কাজে অংশ নিতে। অথচ এদিকে ঘরে তার ছেলে সারাদিন ভিডিও গেম খেলছে, মেয়ে হিন্দি সিরিয়াল দেখছে। অনেকে নিজেরা মসজিদে, রাস্তাঘাটে কষ্ট করে ইসলামের জন্য কাজ করলেও, তাদের আদরের দুলালদেরকে ঘরে বসে নামাজ-কুরআন পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। আবার অনেক মা নিজেরা হিজাব করলেও দেখা যায় তার কিশোরী-তরুণী মেয়ে হালের ফ্যাশনে গা ভাসিয়ে তারই সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام কাছ থেকে আমাদের সবার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার আছে: নিজে ইসলামের জন্য কাজ করলেই হবে না, একইসাথে সন্তানদেরকেও সাথে নিয়ে ইসলামের জন্য কাজ করতে হবে। এর ফলে সন্তান যেমন জীবনের বাস্তবতা বাবা-মার কাছ থেকে শিখবে, একইসাথে সন্তান সুযোগ পাবে কিছু ভালো সময় তার বাবা-মার সাথে কাটানোর। একসাথে কাটানো এই সুন্দর সময়গুলো তাদের সারাজীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। বাবা-মা যদি সত্যিই চান জান্নাতে গিয়ে সন্তানদের সাথে অনন্ত সুখ উপভোগ করতে, তাহলে তাদের এই জীবন থেকেই সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে জান্নাতের জন্য কাজ শুরু করা উচিত।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।

আমার প্রতিশ্রুতি অন্যায়কারীদের কাছে পৌঁছাবে না — আল-বাক্বারাহ ১২৪-১২৫

আপনি বহুবছর বিদেশে কাজ করে দেশে ফিরছেন। এর মধ্যে আপনার এক সন্তান হয়েছে, যাকে আপনি এর আগে কখনো দেখেননি। দেশে ফিরে আপনি তাকে প্রথম বারের মতো দেখবেন, এই খুশিতে আপনি আত্মহারা। কয়েকটা দিন সন্তানের সাথে হেসে-খেলে দিন পার করতে না করতেই, একরাতে স্বপ্ন দেখলেন: আপনি কুরবানি করছেন, আপনার হাতে রক্তাক্ত ছুড়ি, কিন্তু একি! কুরবানির পশুর জায়গায় পড়ে রয়েছে আপনার মৃত সন্তান! আপনি ঘুম ভেঙ্গে লাফ দিয়ে জেগে উঠলেন। এরকম একটা জঘন্য স্বপ্ন দেখে অস্থিরতায় ঘেমে গেলেন। স্বপ্নটা এতটা বাস্তব ছিল, মনে হচ্ছিল ভবিষ্যতের কোনো একটা ঘটনা আপনি নিজের চোখে ঘটতে দেখছেন। এত ভয়ঙ্কর বাস্তব স্বপ্ন আপনি এর আগে কখনো দেখেননি।

পরদিন আপনি ছেলের সাথে খেলছেন। কিন্তু আপনার মন বসছে না। বার বার রাতের দুঃস্বপ্নের কথাটা মনে হচ্ছে। সেদিন রাতে আবারো আপনি সেই স্বপ্নটা দেখলেন। চিৎকার দিয়ে লাফ দিয়ে জেগে উঠলেন। পরদিন আবারো একই স্বপ্ন। কয়েকদিন একই স্বপ্ন দেখার পর আপনি বুঝতে পারলেন, এটা কোনো সাধারণ স্বপ্ন নয়। আপনাকে এই ঘটনা ঘটাতে হবে। আপনাকে স্বপ্নের মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এই কাজ করার।

আপনি স্ত্রীকে বলতে গেলেন। আর দশজনের মতো যদি আপনার স্ত্রী হতো, তাহলে সে চিৎকার দিয়ে উঠত, “কী! তোমার কি মাথা খারাপ? জলদি ডাক্তার দেখাও। খবরদার যদি আর কখনো এই কথা শুনি, তাহলে আমি কালকেই আমার ছেলেমেয়ে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যাব।” কিন্তু না, আপনার পরহেজগার, একান্ত নিষ্ঠাবান স্ত্রী আপনাকে বোঝালেন, “আল্লাহর تعالى নির্দেশ আমাদেরকে মানতেই হবে।”

আপনি ভাবলেন: ছেলেকে ঘটনাটা খুলে বলি, তাহলে অন্তত ছেলেটা ভয় পেয়ে চিৎকার শুরু করবে, কিছু একটা ঘটাবে, আর আপনাকে এই কাজটা করতে হবে না। কিন্তু ছেলেকে বলার পর সে শান্ত ভাবে আপনাকে বোঝালো, “বাবা, আল্লাহই تعالى তোমাকে এই কাজ করতে বলছেন। তোমাকে তো অবশ্যই আল্লাহর تعالى নির্দেশ মানতে হবে। চিন্তা করো না বাবা, আমি একটুও কাঁদবো না। তুমি কুরবানি করার আগে আমার চোখটা ঢেকে দিও, যাতে আমি ভয় পেয়ে সরে না যাই।” আপনার বুক ভেঙ্গে গেল। আপনি বুঝতে পারলেন, আপনাকে এই কাজটা করতে হবেই।

বহুবছর আগে আপনাকে এরকম আরেকটা কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। আপনার কাছে নির্দেশ এসেছিল: আপনার স্ত্রী এবং শিশু বাচ্চাটাকে মরুভূমিতে রেখে আসতে হবে। আপনি স্ত্রীকে বললেন, “আমার কাছে নির্দেশ এসেছে, তোমাকে এবং বাচ্চাটাকে মরুভূমিতে রেখে আসতে হবে।” আপনার স্ত্রী কিছুক্ষণ পাথরের মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নীরবে মেনে নিলেন। আপনি তাদেরকে নিয়ে উটের পিঠে চড়ে, শিশুকে বুকে নিয়ে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে মরুভূমিতে চলছেন। এই ভয়ঙ্কর যাত্রায় বাচ্চাটা যে কোনো সময় মারা যেতে পারে। কিন্তু তারপরেও আপনি যাচ্ছেন।

গহীন মরুভূমিতে বহুদূর যাওয়ার পর তাদেরকে একটা জায়গায় থামতে বললেন। সেখানে তাদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখে আপনাকে বিদায় নিতে হবে। নিজের ভেতরের কান্না আটকে রেখে, শোকে পাথর হয়ে তাদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। আপনার স্ত্রী বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আপনার চলে যাওয়া দেখলেন। আপনি চলে যাচ্ছেন, আর হাজারো দুশ্চিন্তা আপনার মাথায় আসছে, “ওদের কাছে যে খাবার রেখে এসেছি, সেটা তো কিছুক্ষণ পরেই শেষ হয়ে যাবে? ওরা পানি পাবে কোথা থেকে? পানি থাকা তো দূরের কথা, চারিদিকে যতদূর চোখ যায়, কোনো গাছপালাও নেই। এভাবে কতক্ষণ বেঁচে থাকবে ওরা?”

এরকম ভয়ঙ্কর কিছু পরীক্ষা, যেগুলো আমরা আমাদের জীবনে দেওয়ার কথা চিন্তাও করতে পারি না, নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام জীবনে সত্যি সত্যিই ঘটেছিল, যার উল্লেখ এই আয়াতে এসেছে—

2_124

মনে কর দেখো, যখন ইব্রাহিমকে তার প্রভু কিছু নির্দেশ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন, এবং তিনি তার সব পূরণ করেছিলেন।
আল্লাহ تعالى বলেন, “আমি তোমাকে মানবজাতির ইমাম করবো।”
ইব্রাহিম বলেন, “আমার বংশধরেরাও কি?”
আল্লাহ تعالى বলেন, “আমার প্রতিশ্রুতি অন্যায়কারীদের কাছে পৌঁছাবে না।” [আল-বাক্বারাহ ১২৪]

2_124_title

আমাদের যখন বাচ্চাদেরকে স্কুলে আনতে যেতে দেরি হয়, জ্যামে আটকিয়ে থাকি, পুরো সময়টা আতংকে থাকি: বাচ্চাদের কিছু হলো কিনা; কোনো ছেলেধরা এসে ধরে নিয়ে গেল কিনা। সেখানে নবী ইব্রাহিম عليه السلام নিজের হাতে তার শিশু সন্তানকে, স্ত্রীকে মরুভূমিতে রেখে এসেছিলেন। তিনি জানতেন সেখানে তাদের বাঁচার কোনোই উপায় নেই। তারা পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে ভীষণ কষ্ট পেয়ে মারা যাবে। তারপরেও তিনি সেই কঠিন পরীক্ষা দিয়েছেন, কারণ আল্লাহর تعالى আদেশের উপর কোনো কথা নেই।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)