নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন — আল-বাক্বারাহ ১২৮

আমাদের সন্তানদের কেউ যদি মেধাবী হয়, তাহলে তাকে ডাক্তার বানাই। তারচেয়ে কম মেধাবীটা হয় ইঞ্জিনিয়ার। আরেকটু কম হলে বাংলা বা ইংলিশে পড়ে। আর যেটার অবস্থা একেবারেই খারাপ, সেটাকে আমরা মাদ্রাসায় দেই, ইমাম সাব বানাই। আমাদের মধ্যে কোনো এক অদ্ভুত কারণে একটা ধারণা আছে যে, ছেলেমেয়েরা বড় হলে নিজেরাই সৎ, আদর্শ মানুষ হবে, দুনিয়ায় শান্তিতে থাকবে। দুনিয়ায় শান্তিতে থাকাটাই আসল কথা। পরে কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ছেলেমেয়েদেরকে অত ইসলাম শেখানোর প্রয়োজন নেই। ইসলাম শিখে হবেটা কী? ইসলাম কী ছেলেমেয়েকে বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ, সন্মান, উচ্চশিক্ষা —এসব কিছু দেবে?

তারপর তারা বড় হয়। ডাক্তারটা একসময় গিয়ে ১ লাখ টাকার অপারেশন করে ৫ লাখ টাকায়। বছর খানেকের মধ্যে কোটিপতি হয়ে বিদেশে চলে যায়। ওদিকে সেই ৫ লাখ টাকার বিল দিতে গিয়ে রোগীর পরিবার লোণে জর্জরিত হয়ে, পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে, অভাবে, কষ্টে, দুশ্চিন্তায় বছরের পর বছর পার করে। ইঞ্জিনিয়ারটা বড় হয়ে বিরাট অঙ্কের ঘুষ খেয়ে প্রজেক্ট করে। সেই ঘুষের টাকা দিয়ে সে বাড়ি-গাড়ি করে, আর তার ছেলেমেয়েরা ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে থার্টি-ফার্স্ট নাইটে ড্রিঙ্ক করে মাতলামি করে। বাংলা, ইংরেজিতে পড়াগুলো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে মারামারি, খুনাখুনি, ধর্ষণ করে।

এদিকে ইমাম সাহেব মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতন পেয়ে তার পরিবারকে নিয়ে কোনোমতে দিন পার করে হলেও তার ছেলেমেয়েকে নৈতিকতা শেখান, হাফেজ বানান। বাবা-মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লে তিনি এবং তার স্ত্রী নিষ্ঠার সাথে বছরের পর বছর তাদের সেবা করেন। যেদিন বাবা-মা মারা যায়, সেদিন তিনি তার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ভাইদেরকে ফোন করে আর পান না। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি নিজেই হাজার হাজার মুসল্লিকে সাথে নিয়ে বাবা-মার জানাজা পড়েন। ইমাম সাহেবের বাবা-মা’র জানাজা, কত বিরাট সন্মানের জানাজা!

আজকের প্রজন্মের একটা বড় অংশ ভয়াবহ রকমের নৈতিক অবক্ষয়ে ডুবে গেছে: তাদের বাবা-মা’দের দুনিয়ায় সম্পদ, সন্মান, আরাম-আয়েশের লোভের জন্য। সেই সব বাবা-মা’দের কাছে তাদের সন্তানরা হচ্ছে পেনশন। সেই পেনশনের মূল্য বাড়ানোর জন্য তারা যতভাবে সম্ভব চেষ্টা করেন সন্তানদেরকে দুনিয়াতে বড়লোক বানাবার। ইসলাম হচ্ছে তাদের পেনশনের মূল্য বৃদ্ধিতে একটি বাঁধা মাত্র। ছেলে ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলে, দাঁড়িওলা বন্ধুদের সাথে মেলামেশা শুরু করলে, তারা আতঙ্কিত হয়ে যান: এই বুঝি আমাদের পেনশন গেল!

এই ধরনের বাবা-মাদের ভেতরে এই ভয়ঙ্কর লোভ জন্ম হতে দিয়েছে তাদেরই বাবা-মা, যারা অনেকে নিজেরা ইসলাম মানলেও, তাদের সন্তানদেরকে ইসলামের পথে রাখার জন্য কোনো জোর দেননি। যার ফলে তারা তাদের বংশধরদের মধ্যে ইসলাম হারিয়ে যাওয়ার একটা চেইন রিয়াকশন শুরু করে দিয়ে গেছেন, যার ফলাফল আজকের ইসলাম ভুলে যাওয়া, নৈতিকভাবে ধ্বসে যাওয়া প্রজন্ম।

এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে এই প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য একটাই উপায়— তাদেরকে আল্লাহর تعالى প্রতি অনুগত করা। তাদেরকে উপলব্ধি করানো যে, সামনে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা আসছে। আজকে তাদেরকে ‘বাস্তবতা’ বলতে যা শেখানো হচ্ছে, সেটা কয়েক বছরের মায়া মাত্র। আসল বাস্তবতা আসছে সামনে, যেখানে সময় কখনো শেষ হবে না, যেই মহাবিশ্ব কখনো ধ্বংস হবে না। নবী ইব্রাহিম عليه السلام তা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি তার সন্তান এবং বংশধরদের জন্য দু’আ করেছিলেন—

2_128

ও আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) করে রাখুন, এবং আমাদের বংশধর থেকে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) একটি জাতি তৈরি করে দিন। আমাদেরকে দেখিয়ে দিন কীভাবে ইবাদত করতে হয় এবং আমাদের ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ করুন। নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন, নিরন্তর দয়াময়। [আল-বাক্বারাহ ১২৮]

2_128_title

ধর্ম তো যত নষ্টের মূল?
অনেকে প্রশ্ন করেন: ধর্ম যদি সত্যিই শান্তি এনে দিত, তাহলে আজকে ধর্মের নামে এত মারামারি, খুনাখুনি কেন? যতসব টেররিস্ট শুধু মুসলিমরাই কেন? কী কারণে আমি আমার সন্তানদেরকে ইসলাম শেখাবো, দাঁড়িওলাদের সাথে মিশতে দেবো? যদি ওরা জঙ্গি হয়ে যায়?

Encyclopedia of Wars নামের তিন খণ্ডের এক বিশাল বইয়ে ১৭৬৩টি যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২৩টি যুদ্ধকে ধর্ম সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার অর্থ এই পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ৬.৯৮% যুদ্ধ ধর্ম সম্পর্কিত। ৯৩% যুদ্ধের সাথে ধর্মের কোনোই সম্পর্ক নেই।

J. Rummel এর বিখ্যাত Lethal Politics এবং Death by Government বইয়ে দেখানো হয়েছে, নাস্তিকদের কারণে হত্যার পরিমাণ কতখানি—

Non-Religious Dictator Lives Lost
Joseph Stalin 42,672,000
Mao Zedong 37,828,000
Adolf Hitler 20,946,000
Chiang Kai-shek 10,214,000
Vladimir Lenin 4,017,000
Hideki Tojo 3,990,000
Pol Pot 2,397,000

Rummel বলেন—

প্রায় ১৭ কোটি পুরুষ, মহিলা এবং শিশুকে গুলি করে, পিটিয়ে, নির্যাতন করে, কুপিয়ে, পুড়িয়ে, অভুক্ত রেখে, বরফে জমিয়ে, পিষে বা জোর করে কাজ করিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। জীবন্ত পুঁতে, পানিতে ডুবিয়ে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, বোমা মেরে, বা অন্য আরও নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে সরকারগুলো নিরস্ত্র, অসহায় দেশবাসী এবং বিদেশীদের হত্যা করেছে। মোট মৃতের সংখ্যা ৩০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। মানব জাতি যেন এক কালো মহামারির শিকার। কিন্তু এই মহামারি কোনো জীবাণু থেকে সৃষ্ট মহামারি নয়, বরং শক্তির মোহ থেকে সৃষ্ট মহামারি।

১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যানে অ্যামেরিকাতে মাত্র ৬% আক্রমণ হয়েছে মুসলিম চরমপন্থিদের দ্বারা, বাকি ৯৪% আক্রমণ হয়েছে ল্যাটীনো, বামপন্থি চরমপন্থি, ইহুদি চরমপন্থি, কম্যুনিস্ট, এবং অন্যান্য সংগঠন দিয়ে। [http://www.globalresearch.ca/non-muslims-carried-out-more-than-90-of-all-terrorist-attacks-in-america/5333619]

একইভাবে ইউরোপে ৯৯.৬% আক্রমনের পেছনে কোনো মুসলিম দলের হাত নেই। যেমন, ২০০৬, ২০০৭, ২০০৮ সালের ইউরোপের পরিসংখ্যানে: পাঁচটি আক্রমণ ইসলাম চরমপন্থীদের দ্বারা, আর বাকি ১,৫৮৯টি আক্রমণ বিভিন্ন অমুসলিম, সেক্যুলার দলের দ্বারা। এই পরিসংখ্যানগুলো ইউরোপের সরকারি পরিসংখ্যান থেকে নেওয়া। বিস্তারিত জানতে এই আর্টিকেলটি পড়ুন: http://www.loonwatch.com/2010/01/terrorism-in-europe/

শুধু তাই না, আমেরিকার সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে: ধর্ম সম্পর্কিত আক্রমণে ৮২%-৯৭% হতাহত হচ্ছে মুসলিমরাই!

The claim is similar to one in a 2011 report by the US government’s National Counter-Terrorism Center (NCTC), which said: “In cases where the religious affiliation of terrorism casualties could be determined, Muslims suffered between 82 and 97% of terrorism-related fatalities over the past five years.” [http://www.bbc.co.uk/news/magazine-30883058]

দুঃখজনকভাবে আজকে আধুনিক যুগের মানুষরা মিডিয়ার গণমগজ ধোলাইয়ের শিকার। মিডিয়া বেশিরভাগ মানুষকে সফলভাবে বোঝাতে পেরেছে যে, যত মারামারি, খুনাখুনি, হত্যা হয়, তার বেশিরভাগ হয় ধর্মের কারণে। ধর্ম না থাকলে মানুষ অনেক শান্তিতে বাস করতে পারত। মিডিয়ার নানা ধরনের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটাই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে যে, তারা ভালো করে জানে: মিডিয়া যা বলে, তার বেশিরভাগই উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিকৃত, কিন্তু তারপরেও তারা মিডিয়াকেই বিশ্বাস করে, যখন তা ধর্মের ব্যাপারে কিছু বলে।

“আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) করে রাখুন”

মুসলিম শব্দের অর্থ: যারা আল্লাহর تعالى প্রতি আত্মসমর্পণ করেছে, যারা আল্লাহর تعالى নির্দেশের প্রতি অনুগত। যারা বিশ্বাসে, কথায়, কাজে আল্লাহর تعالى প্রতি অনুগত —তারাই মুসলিম। এটি কোনো দেশ, স্থান বা কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম ধর্ম রাসুল মুহাম্মাদ عليه السلام প্রথম নিয়ে আসেননি। আদম عليه السلام, নুহ عليه السلام, ইব্রাহিম عليه السلام, মুসা عليه السلام, ঈসা عليه السلام — এদের সবাইকে আল্লাহ تعالى যে ধর্ম দিয়েছিলেন, তার নাম ইসলাম। তারা সবাই এক আল্লাহর تعالى উপাসনা করতেন। আমরা কু’রআনেই দেখতে পাই ইব্রাহিম عليه السلام নবীর সময় থেকেই নামাজ, রোজা, হাজ্জ-এর প্রচলন ছিল।

“আমাদেরকে দেখিয়ে দিন কীভাবে ইবাদত করতে হয়”
নবী ইব্রাহিম عليه السلام আল্লাহকে تعالى অনুরোধ করেছিলেন যেন, তাকে এবং তার বংশধরদেরকে আল্লাহ تعالى দেখিয়ে দেন: কীভাবে সঠিকভাবে ইবাদত করতে হয়। তিনি নিজে থেকে চিন্তা করে ইবাদতের পদ্ধতি বের করার কথা চিন্তাও করেননি, কারণ তিনি জানতেন মানুষ কখনো নিজে থেকে চিন্তা করে বের করতে পারে না: কীভাবে মহান স্রষ্টার ইবাদত করতে হয়। যখন মানুষ তার উর্বর মস্তিষ্ক ব্যবহার করে আল্লাহর تعالى ইবাদত করার পদ্ধতি বের করার চেষ্টা করে, তখন ফলাফল হয় ভয়াবহ। রাসুল মুহাম্মাদ عليه السلام এর সময়ে মক্কার লোকেরা মনে করতো: আল্লাহ تعالى অত্যন্ত পবিত্র। তার সামনে মানুষের বানানো কৃত্রিম কাপড়ের কোনো দরকার নেই। তাই তারা কাপড় খুলে, প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে, জন্মদিনের পবিত্র পোশাকে কা’বার চারপাশে তাওয়াফ করতো।

একইভাবে মানুষ যখন নিজে থেকে স্রষ্টার ইবাদত করার পদ্ধতি বের করার চেষ্টা করে, তখন তারা সন্ন্যাসী হয়ে পরিবার ছেড়ে গহীন বনে চলে যায়। অনেকে পরিবারকে একা ফেলে রেখে শীতের মধ্যে এক বিশেষ নদীর তীরে গিয়ে আল্লাহকে تعالى ডাকার পদ্ধতি আবিষ্কার করে। অনেকে একসাথে গোল হয়ে বসে ড্রাগ এডিক্টদের মতো মাথা দুলিয়ে হুঙ্কার দিয়ে ‘আল্লাহু! আল্লাহু!’ করে যিকর করার পদ্ধতি বের করে। একারণেই ইবাদতের ব্যাপারে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে: ইবাদত শুধুমাত্র আল্লাহর تعالى দেখানো উপায়ে করা যাবে, অন্য যে কোনো পদ্ধতি, যা ধর্মের অংশ বলে মনে করা হবে, সেটাই বিদ’আহ।

কোনো কাজের ব্যাপারে ইসলামের মূলনীতি হচ্ছে: সবকিছুই বৈধ (মুবাহ্‌), যদি না সেটার বিপক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে দলিল পাওয়া না যায়। কিন্তু ইবাদতের বেলায় মূলনীতি উলটো: সব রকম পদ্ধতি বিদ’আহ, যদি না সেই পদ্ধতির পক্ষে কুরআন-সুন্নাহ থেকে স্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। এই মূলনীতির পেছনে বিরাট প্রজ্ঞা রয়েছে। যারা শারিয়াহ নিয়ে পড়াশুনা করেছেন, এবং ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছেন, তারা বুঝতে পারবেন কেন এই মূলনীতি আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। এই মূলনীতি ভাঙলে কী ভয়াবহ সব ঘটনা শুরু হয় তার বহু নিদর্শন ইতিহাসে রয়েছে।

“আমাদের ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ করুন”
প্রশ্ন হচ্ছে: নবী ইব্রাহিম عليه السلام কী অন্যায় করেছেন যে, তিনি আল্লাহর تعالى কাছে ক্ষমা চাইছেন? তিনি এই মাত্র কা’বা তৈরি করলেন, যার দিকে মুখ করে হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ ইবাদত করবে। এই কা’বায় তাওয়াফ করতে প্রতি বছর লক্ষ হাজি আসেন। যদি একটা মসজিদ বানালে তা থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সাদাকা জারিয়াহ’র সওয়াব পাওয়া যায়, তাহলে কা’বা থেকে নবী ইব্রাহিম عليه السلام কী কল্পনাতিত পরিমাণের সাদাকা জারিয়াহ সওয়াব পাচ্ছেন, তা চিন্তাও করা যায় না। এই পর্যায়ের একটা কাজ করে তিনি আল্লাহর تعالى কাছে ক্ষমা চাইছেন —কী কারণ হতে পারে?

তিনি বুঝেছেন: আল্লাহ تعالى যদি তার এই কাজ কবুল না করেন, তার ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা না করেন, তাহলে সর্বনাশ। আল্লাহ تعالى যদি অনুগ্রহ করে আমাদের ইবাদতগুলো কবুল করে না নেন, তাহলে আমরা শেষ! আমাদের একটা নামাজও কবুল হবে না, কারণ নামাজে দাঁড়িয়ে এমন কোনো চিন্তা নেই, যা আমরা করি না। আমাদের রোজা কবুল হবে না, কারণ রোজা রেখে আমরা মিথ্যা বলি, গীবত করি, অন্যের উপর অন্যায় করি, নিজের সুবিধার জন্য টাকা এদিক ওদিক করি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি। আমাদের যাকাত কবুল হবে না, কারণ যাকাত দেওয়ার সময় আমরা যতভাবে সম্ভব কম সম্পত্তির হিসেব করে, যাদেরকে যাকাত দিলে বেশি নাম হবে, তাদেরকে দেই। আমাদের হাজ্জ কবুল হবে না, কারণ হাজ্জের টাকায় মিশে আছে ব্যাঙ্কের সুদ, মামা-চাচা-খালু ধরে অন্যায়ভাবে জোগাড় করা চাকরি বা ব্যবসার আয়।

একারণে আমাদের প্রতিটি ইবাদতের পরে আল্লাহর تعالى কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে, যেন তিনি অনুগ্রহ করে তা গ্রহণ করে নেন। নবী ইব্রাহিম عليه السلام যেভাবে আকুলভাবে আল্লাহকে تعالى অনুরোধ করেছিলেন, “নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন, নিরন্তর দয়াময়” —ঠিক একইভাবে আমাদেরকেও আল্লাহর تعالى পবিত্র নামের দোহাই দিয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, তার দয়া ভিক্ষা চাইতে হবে। নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام মতো একজন নবী যদি কা’বা-র মতো বিরাট সন্মানের স্থাপনা বানিয়ে আল্লাহর تعالى কাছে সেটা গ্রহণ করার জন্য ভিক্ষা চাইতে পারেন, তাহলে আমরা কোথাকার কে?

আমরা মনে করি: তাওবাহ হচ্ছে খারাপ কাজের জন্য ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শেখাচ্ছেন: তাওবাহ হচ্ছে ভালো কাজগুলোতেও যে দোষত্রুটি আছে, তা থেকে ক্ষমা চাওয়া এবং ভালো কাজগুলো যে আরও ভালো হতে পারতো, তা সবসময় মনে রাখা। নবী ইব্রাহিম عليه السلام তাওবাহ করার এক বিরাট স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়ে গেছেন: তিনি কা’বা বানিয়ে তাওবাহ করেছেন! এত বড় একটা ভালো কাজ যে আরও ভালো হতে পারতো, তা উপলব্ধি করার মতো বিনয়-নম্রতা তার মধ্যে ছিল।

আমাদের কাছে মনে হতে পারে, “আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, বছর শেষে যাকাত দেই। আমি এই বার একটা মসজিদে হাজার খানেক টাকাও দিলাম। আমার আবার তওবাহ করার দরকার কী? তওবাহ করবো কীসের জন্য?” —এগুলো হচ্ছে শয়তানের কণ্ঠস্বর। তওবাহ করতে আমাদের যদি কোনো সঙ্কোচ, কোনো অনিচ্ছা কাজ করে, তার কারণ জাহান্নাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ারটা শয়তান আমাদেরকে বুঝতে দিতে চায় না। সে চায় না: আমাদের ভেতরে তাওবাহ করার মতো মানসিকতা, অভ্যাস কোনোটাই তৈরি হোক। কারণ, সেগুলো তৈরি হলে তার জন্য সর্বনাশ। আমরা আল্লাহর تعالى কাছ থেকে আমাদের অন্যায়, দোষ-ত্রুটিগুলোর জন্য ক্ষমা পেয়ে যাবো, আর সে আমাদের মতো এত ভালো কাস্টমার হারিয়ে ফেলবে।

একারণে মানুষকে বোকা বানানোর জন্য শয়তান যে পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে, তার কয়েকটি হলো—

  • ১) নিজেকে যথেষ্ট ভালো মানুষ বলে বিশ্বাস করানো এবং নিজের অন্যায় কাজগুলো নিজেই যুক্তি দিয়ে ন্যায় কাজ বলে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। যেমন, আমরা ঘুষ দিয়ে ভাবি সেটা কোনো দোষের কিছু না, কারণ আমরা নিজে তো ঘুষ খাচ্ছি না। আর ঘুষ না দিলে তো কাজটা অন্য কোনো ভাবে করাতে পারতাম না। তাই এই ঘুষ দেওয়াটা নিশ্চয়ই হালাল। এভাবে আমরা ‘হালাল ঘুষ’-এর প্রচলন শুরু করি। একইভাবে ধীরে ধীরে হালাল সুদ, হালাল লোণ, হালাল ইনস্যুরেন্স, হালাল লটারি –এরকম অনেক কিছুই হালাল হয়ে যাওয়া শুরু হয় আমাদের কাছে। শয়তান যেভাবে আদমের (আ) সামনে নত না হওয়ার জন্য যুক্তিতর্ক দিয়ে আল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, সে যা করেছে সেটাই ঠিক, সেরকম আমরাও যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করি কোন হারামটা আসলে আজকাল হারাম না।
  • ২) ধর্মে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, ধর্ম প্রত্যেকের নিজের ব্যাপার –এটা বিশ্বাস করানো। আল্লাহর উপর বিশ্বাস থাকলেই হল। ধর্মীয় রীতিনীতিগুলো আসলে কিছু আনুষ্ঠানিকতা। সবার জন্য নামাজ, রোজা করা লাগে না। হজ্জ করতে গেলে যদি দেশে দুর্যোগ হয়, তখন পরিবারকে বাঁচাবে কে? মানুষকে যাকাত দিয়ে কী হবে? তারা তো আর যাকাত পেয়ে সচ্ছল হয়ে যাচ্ছে না।
    শয়তান আল্লাহ تعالىকে বিশ্বাস করে, আমরাও আল্লাহ تعالىকে বিশ্বাস করি। কিন্তু শয়তানের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো— আমরা সেই বিশ্বাস অনুসারে কাজ করি। —এই পার্থক্যটা শয়তান যেভাবে পারে দূর করে ফেলার চেষ্টা করে, যেন আমরা মানুষরূপী শয়তান হয়ে যাই।
  • ৩) চাকরি, ব্যবসা, পড়ালেখা ইত্যাদি দৈনন্দিন কাজগুলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্বাস করানো এবং মনে করানো যে, আল্লাহর সাথে আমার চুক্তি আছে, আল্লাহ আমাকে মরার আগে মাফ করে দিবেন। যেমন, আমি একজন ডাক্তার! আমি মানুষের জীবন বাঁচাই! আমার নিশ্চয়ই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার দরকার নেই? আমি তো সেই সময়ে কয়েকজন রুগীর জীবন বাঁচাতে পারি। কোনটা বেশি জরুরি? নামাজ পড়া না মানুষের জীবন বাঁচানো? আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাকে মাফ করে দিবেন।
  • ৪) সবসময় টাকা পয়সা, সম্পত্তি, সুখ হারানোর ভয়ের মধ্যে রাখা। যেমন, আমাদের এক গরিব আত্মীয় চিকিৎসার জন্য আমাদের কাছে টাকা চাইতে আসলো, কিন্তু আমরা ভাবা শুরু করলাম, “এই লোকটাকে কয়েক হাজার টাকা দিলে তো আমার বাড়ি কেনার জন্য জমানো সত্তুর লাখ টাকা কমে যাবে, আমার বাড়ি কেনা পিছিয়ে যাবে! কালকে যদি আমার চাকরি চলে যায়, তাহলে তো আর আমার বাড়ি কেনা হবে না? যদি এক মাস পরে বাড়ির দাম হঠাৎ করে বেড়ে যায়?”
  • ৫) নিজেকে দিয়ে অন্যায় করাতে না পারলে, কাছের মানুষদেরকে দিয়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে অন্যায় করানো। যেমন, আপনি বহুদিন চেষ্টার পর আজকে শেষ পর্যন্ত কু’রআন নিয়ে বসেছেন পড়ার জন্য, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার স্বামী বা স্ত্রী এসে আপনাকে টিভিতে একটা অনুষ্ঠান দেখার জন্য তাগাদা দেওয়া শুরু করলো। অথবা আপনি অনেক আয়োজন করে বসেছেন একটা ইসলামিক আর্টিকেল পড়বেন, কিন্তু পড়া শুরু করতে না করতেই বন্ধুর ফোন: দোস্ত, চল্‌ কালকে ‘ইয়ে’ করতে যাই। শুরু হলো আধা ঘণ্টা ফোনে কথা, তারপর রাতের খাওয়া, টিভি এবং ঘুম। আপনার আর সেদিন আর্টিকেল পড়া হল না। তারপর কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেল, আপনি ভুলে গেলেন সেই আর্টিকেলের কথা।
  • ৬) “আমার আর জান্নাতে যাওয়ার কোনো আশা নেই। আমি যা করেছি, তা আল্লাহ تعالى কখনই মাফ করবেন না। তারচেয়ে বাকি জীবনটা যতপারি মৌজমাস্তি করে যাই” — এই ধারণাটা শয়তান আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, যেন আমরা কখনো তাওবাহ করার কথা চিন্তাও না করি। অনেকসময় দেখা যায়, আমরা একটা পাপ করি, তারপর মাঝেমধ্যে মনে হয়: আল্লাহর تعالى কাছে মাফ চাওয়া দরকার। সাথে সাথে আমাদের ভেতরে একটা তাগাদা চলে আসে: “আরে না, তাওবাহ করে কী হবে, আল্লাহ تعالى কী আমাকে বার বার ক্ষমা করবেন নাকি? পরে একসময় কিছু ভালো কাজ করে নেব, আমার পাপ কাটাকাটি হয়ে যাবে।”
  • ৭) উপরের পদ্ধতিগুলো পড়ার সময় আপনার হয়তো আশেপাশের কারও না কারও কথা মনে হচ্ছিল এবং আপনি মনে মনে ভাবছিলেন, “তাইতো! এইটা দেখি ওর সাথে একদম মিলে যায়!” আপনার ভেতরে এই যে চিন্তাটা হচ্ছে, যেখানে আপনি মনে করছেন আপনার এই সমস্যাগুলোর কোনোটাই নেই, এগুলো সবই হচ্ছে আপনার আশেপাশের মানুষদের সমস্যা –এটা শয়তান আপনার ভেতরে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সে চায়: আপনি যেন অন্যকে সংশোধন করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন, নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা না করেন। সে আপনার ভেতরে একধরনের অহংকার বোধ ঢুকিয়ে দেয় যে, আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আপনার আশেপাশের সবাইকে জাহান্নামে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। আপনি এমনিতেই জান্নাতে যাচ্ছেন, তাই যাওয়ার আগে কিছু জনসেবা করা দরকার।

আসুন, আমরা নবী ইব্রাহিমের عليه السلام কাছ থেকে শিখি: কীভাবে নিজেদের সন্তান এবং বংশধরদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাতে হয়। কীভাবে আল্লাহকে تعالى যথাযথ সন্মান দিয়ে, আমাদের নিচু অবস্থান উপলব্ধি করে, আমাদের সব ভালো এবং খারাপ কাজ তাওবাহ দিয়ে ঘিরে রাখতে হয়। সবসময় মনে রাখার চেষ্টা করি: আগে নিজে এবং নিজের পরিবারকে বাঁচাই, তারপর অন্যকে বাঁচাই।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قُوٓا۟ أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَٰٓئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ

বিশ্বাসীরা, এমন এক আগুন থেকে নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারকে বাঁচাও, যার জ্বালানী হচ্ছে মানুষ এবং পাথর, যার দায়িত্বে আছে নৃশংস-পাষাণ নিষ্ঠুর ফেরেশতারা। যারা আল্লাহর تعالى নির্দেশকে কখনো অমান্য করে না, বরং যা নির্দেশ দেওয়া হয় ঠিক তাই করে। [আত-তাহরিম ৬৬:৬]

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—


ডাউনলোড করুন কুর‘আনের কথা অ্যাপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *