তারা মানুষের কাছে হাত পাতেন না — আল-বাক্বারাহ ২৭৩

তোমাদের দান সেই অভাবীরা পাবে, যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে নিবেদিত যে, তারা জীবিকার খোঁজে বের হতে পারে না। তারা মানুষের কাছে হাত পাতেন না দেখে অজ্ঞরা মনে করে যে, তাদের কোনো অভাব নেই। কিন্তু তুমি তাদের লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল করলে বুঝতে পারবে। তারা কখনও নাছোড়বান্দার মতো চায় না। আর তোমরা ভালো যা কিছুই দান করবে, আল্লাহ অবশ্যই সে ব্যাপারে সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৭৩]

কিছু মানুষ আছেন যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদেরকে পুরোপুরি বিলিয়ে দেন। এরা এমন সব ত্যাগ স্বীকার করেন, যেগুলো আমরা সাধারণ মুসলিমরা করার মতো সাহস কখনও করতে পারি না। এদের অনেকে নিজেদের ভিটেমাটি, সচ্ছল জীবন ছেড়ে দূর দেশে চলে যান ইসলামের জন্য পড়াশুনা করতে। আবার অনেকে হারাম চাকরি বা ব্যবসা আর করবেন না, এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধুই আল্লাহকে খুশি করার জন্য চাকরি বা ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অভাবের জীবন বেছে নেন। আবার অনেকে এলাকায় অন্যায় শাসন, দুর্নীতি এসব থেকে পালিয়ে সৎভাবে বেঁচে থাকার জন্য সব ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যান। এভাবে আল্লাহর تعالى পথে নিজেদেরকে পুরোপুরি নিবেদিত করে দেওয়ার ফলে তাদের পক্ষে আর জীবিকা অর্জন করে সচ্ছলভাবে জীবন যাপন করার সুযোগ থাকে না। তারা অত্যন্ত অভাবের মধ্যে জীবন পার করতে থাকেন, কিন্তু আশেপাশের কাউকে সেটা নিজে থেকে বুঝতে দেন না।[১১][১২][১৪][১৭]

এই ধরনের মানুষরা ভিখিরি নন। তারা কখনও মানুষের কাছে হাত পাতেন না। তাদের ভেতরে আত্মসম্মান বোধ আছে। সাধারণ ফকিরের মতো মানুষের কাছে গিয়ে তাদের অভাব নিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করেন না। এঁদেরকে দেখে আমরা অনেক সময় ভাবি, “অভাব থাকলে তো সে চাইতই। কিছু চাচ্ছে না যখন, তাহলে নিশ্চয়ই টাকাপয়সা ভালোই আছে। নিশ্চয়ই কোনো পার্ট টাইম কাজ করে যেটা আমি জানি না। না হলে হয়ত গ্রামে জমি জমা আছে, যেখান থেকে ভালোই ইনকাম হয়।” —যারা এরকম ভাবে আল্লাহ تعالى তাদের জন্য এই আয়াতে কঠিন একটা শব্দ ব্যবহার করেছেন —জাহিল।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমরা যদি তোমাদের দানের কথা প্রকাশ করে দাও, তাহলে তাতেও কল্যাণ আছে — আল-বাক্বারাহ ২৭১-২৭২

তোমরা যদি তোমাদের দানের কথা প্রকাশ করে দাও, তাহলে তাতেও কল্যাণ আছে। আর যদি তা গোপন রাখো এবং তা অভাবীদের দাও, তাহলে সেটা তোমাদের জন্য আরও বেশি ভালো হবে। তোমাদের গুনাহগুলোর কিছু মাফ করার উপায় হয়ে যাবে। আর তোমাদের সব কাজের ব্যাপারে আল্লাহ খবর রাখেন। [আল-বাক্বারাহ ২৭১]

সাদাকা অর্থাৎ দান করে সেটা মানুষের কাছে প্রকাশ করে দেওয়া দোষের কিছু নয়, যদি সেটাতে অন্যরা দান করতে উদ্বুদ্ধ হয়। শুধু সাবধান থাকতে হবে যেন, দানের উদ্দেশ্য শুধুই লোক দেখানো হয়ে না যায়। এর আগের আয়াতগুলোতেই আমরা দেখেছি যে, যারা শুধুই লোক দেখানো দান করে, আল্লাহকে تعالى খুশি করা একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে না, অথবা যাদেরকে দান করা হয়েছে, তাদেরকে বার বার খোটা দেয়, তাদের পরিণাম ভয়ংকর। তারা এর কোনো প্রতিদান আল্লাহর কাছে তো পাবেইনা উপরন্তু এটা তাদের জাহান্নামে যাবার কারণও হতে পারে। কিন্তু এই আয়াতে বলা হচ্ছে যে, যদি দান করে সেটা মানুষ প্রকাশ করে দেয়, এবং তা থেকে অন্যরা উৎসাহিত হয়, যা থেকে অভাবীদেরই শেষ পর্যন্ত উপকার হয়, তাহলে এই প্রকাশ করার মধ্যেও কল্যাণ রয়েছে।[১২][১৪][১৯][২০]  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমরা যা কিছুই খরচ করো, বা যেটাই মানত করো, আল্লাহ অবশ্যই তা জানেন — আল-বাক্বারাহ ২৭০

তোমরা যা কিছুই খরচ করো, বা যেটাই মানত করো, আল্লাহ অবশ্যই তা জানেন। আর যালিমদের সাহায্য করার কেউ নেই। [আল-বাক্বারাহ ২৭০]

আমরা যা কিছুই খরচ করি, সেটা আল্লাহর تعالى রাস্তায় হোক, বা অন্য কোনো অসৎ কাজে হোক না কেন, আল্লাহ تعالى তা অবশ্যই জানেন। রাস্তায় চলার সময় এক অন্ধ ফকিরকে দেখে খুব খারাপ লাগলো, পকেট থেকে একশ টাকার নোট বের করে চুপচাপ তার হাতে গুঁজে দিলেন, সেটা আর কেউ না দেখলেও আল্লাহ تعالى অবশ্যই দেখলেন। কেউ রাস্তার মধ্যে ময়লা ফেলে গেছে। মানুষ কষ্ট করে তা পাশ কাটিয়ে হেটে যাচ্ছে। আপনি নিজের টাকা খরচ করে কাউকে ডেকে এনে তা পরিষ্কার করে দিলেন। এর জন্য কেউ আপনাকে কোনো ধন্যবাদ দিলো না, কোনো পদক দিলো না, ইলেকশনে দাঁড়াতে আমন্ত্রণ জানালো না। কিন্তু আল্লাহ تعالى ঠিকই তা দেখেছেন। আপনার জন্য সম্মান পদক-এর থেকেও বিরাট কিছু অপেক্ষা করছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে, সে বিরাট কল্যাণ পেয়ে গেছে —আল-বাক্বারাহ ২৬৯

তিনি যাকে চান, তাকে প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়েছে, সে বিরাট কল্যাণ পেয়ে গেছে। আর চিন্তাশীল মানুষরা ছাড়া কেউ শিক্ষা নেবে না। [আল-বাক্বারাহ ২৬৯]

হিকমাহ অর্থাৎ প্রজ্ঞা এসেছে ইহ্‌কাম احكم থেকে, যার অর্থ কথা বা কাজে পরিপূর্ণতা, পারফেকশন।[১৪] প্রজ্ঞা হচ্ছে জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহার। আমাদের অনেক জ্ঞান থাকতে পারে, কিন্তু যদি প্রজ্ঞা না থাকে, তাহলে সেই জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার হবে না। যেমন: আমরা অনেকেই জানি, আল্লাহ تعالى আমাদের ক্বদর/ভাগ্যের মালিক, তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এই ব্যাপারে কুর’আনের আয়াতগুলো আমরা পড়েছি, আমাদের জ্ঞান যথেষ্টই আছে। কিন্তু তারপরও আমরা বাচ্চার কপালে কালো টিপ দেই, যেন অশুভ চোখ না লাগে। স্বামীর নাম নেওয়া যাবে না, তাতে অমঙ্গল হয়। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পেছনে তাকানো যাবে না, তাতে যাত্রা অশুভ হয়। কুর‘আনের আয়াতের সাথে হাবিজাবি দু’আ লেখা তাবিজ পড়ি, যেন অসুখ না হয়। —এরকম শত শত ভুল ধারণায় আমরা বিশ্বাস করি, কারণ আমাদের জ্ঞান থাকলেও প্রজ্ঞা আসেনি। আমরা শিখিনি আমাদের জ্ঞান কীভাবে কাজে লাগাতে হয়।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায় — আল-বাক্বারাহ ২৬৮

আমরা যখন যাকাত দেওয়ার সময় হিসেব করে দেখি কত যাকাত দিতে হবে, তখন ভাবি, “এত্ত গুলো টাকা দিয়ে দিতে হবে! এত টাকা যাকাত দিয়ে কী হবে? মানুষের অভাবের তো কোনো শেষ নেই। যত দিবো, তত চাইবে।” — যাকাতের পরিমাণ দেখে আমাদের আফসোস শুরু হয়ে যায়, অথচ ভেবে দেখি না যে, এটা হচ্ছে আমাদের সম্পত্তির মাত্র ২.৫%অংশ, খুবই নগণ্য পরিমাণ। বাকি বিশাল ৯৭.৫% অংশ সম্পত্তি আমাদের জমা হয়ে আছে। যাকাত দেওয়ার সময় আমাদের শুধু আফসোস হয় যে, কতগুলো টাকা বের হয়ে গেলো। সেই টাকা না দিলে কত কিছু কিনতে পারতাম, কত কিছু করতে পারতাম। অথচ চিন্তা করে দেখি না যে, আল্লাহ تعالى আমাদেরকে এত সম্পত্তি দিয়েছেন যে, তার এক নগণ্য অংশও আমাদের কাছে এত বেশি মনে হচ্ছে —এই ধরনের চিন্তাগুলো আসে শয়তানের কাছ থেকে, কারণ আল্লাহ تعالى বলেছেন—

শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয় দেখায়, আর তোমাদেরকে অশ্লীল কাজ করতে তাগাদা দেয়। কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং প্রাচুর্যের নিশ্চয়তা দেন। আল্লাহ তো সবকিছু ঘিরে আছেন, তিনি সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৬৮]

আমরা যখন আল্লাহর تعالى পথে দান করতে যাই, তখন আমাদের মনে নানা ধরনের চিন্তা আসা শুরু হয়ে যায়, “বাড়ি ভাড়া দেওয়ার টাকা থাকবে? ছেলে মেয়েদের পড়ার খরচ দিতে পারবো? ঈদের শপিং করতে পারবো?” অথচ যখন শপিং মল বা রেস্টুরেন্টে যাই, আমরাই তখন দেদারসে টাকা উড়াতে থাকি। তখন আমাদের মাথায় বাড়ি-ভাড়া, সন্তানের ভবিষ্যৎ-এর কথা মাথায় আসে না। যে লোক মসজিদের দান বাক্সে একশ টাকা দিবে না দশ টাকা দিবে এই নিয়ে নিজের মধ্যে যুদ্ধ করতে থাকে, সেই মানুষই সিনেমা, টিভি, রংবেরঙের পানীয়, দামি খাবার, ব্রান্ড কাপড়, বিদেশে বেড়াতে যাওয়া — এসবের জন্য দুহাতে টাকা খরচ করতে একটুও বাধে না।[১৭]    (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

খারাপ জিনিসগুলো দেওয়ার নিয়ত করবে না, যেগুলো যদি কেউ তোমাদেরকে দিত, তাহলে তোমরা ঘৃণায় চোখ বুজে তা নিতে — আল-বাক্বারাহ ২৬৭

আমরা যখন দান করার চিন্তা করি, তখন আলমারিতে খুঁজে দেখি কোন জামাকাপড়গুলো আর পরার যোগ্য নেই, কোন আসবাবপত্রগুলো মানুষের সামনে রাখলে আর মান সম্মান থাকছে না, ফ্রিজে কোন খাবারগুলো খেলে বাথরুম থেকে আর বের না হওয়ার সম্ভাবনা আছে ইত্যাদি। গরিবদেরকে খাওয়াতে গেলে হাড্ডি-চর্বি ভর্তি মাংসগুলো দেই, যেগুলো নিজে খাওয়ার কথা চিন্তা করব না, আর নিজের জন্য ভালো মাংসগুলো রেখে দিই। গরিব প্রতিবেশী, কর্মচারীদেরকে তিনদিনের বাসি তরকারিগুলো সুন্দর প্লেটে করে পাঠিয়ে দেই। এভাবে দান করে মনে করি বিরাট সওয়াবের কাজ করে ফেলেছি, আল্লাহ تعالى নিশ্চয়ই এখন আমার উপরে বড়ই খুশি।

বিশ্বাসীরা শোনো, তোমরা যা কিছু অর্জন করেছ, আর যা কিছু আমি তোমাদেরকে পৃথিবী থেকে দিয়েছি, তার মধ্যে থেকে ভালোগুলো আল্লাহর পথে খরচ করো। খারাপ জিনিসগুলো দেওয়ার নিয়ত করবে না, যেগুলো যদি কেউ তোমাদেরকে দিত, তাহলে তোমরা ঘৃণায় চোখ বুজে তা নিতে। আর জেনে রেখো, আল্লাহ সকল চাহিদার ঊর্ধ্বে, তিনি অত্যন্ত প্রশংসিত। [আল-বাক্বারাহ ২৬৭]

আল্লাহ تعالى পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে, তিনি تعالى এধরনের দান গ্রহণ করবেন না। দান করার সময় যেন আমরা নিজেদেরকে গ্রহীতার জায়গায় চিন্তা করি। আমি গরিব, অভাবী হলে কি সেই দান খুশি মনে নিতাম? যদি আমি নিজে সেই দান না নিই, তাহলে কীভাবে আমি সেটা অন্যকে দেওয়ার কথা চিন্তা করি? আমার কি কোনো বিবেক নেই? সূরা আলে ইমরানে এক ভয়ংকর আয়াত আছে—“তুমি কোনোদিনও পুণ্য অর্জন করবে না, যতক্ষণ না তুমি সেটা দান করো, যা তুমি নিজে ভালোবাসো।” [৯২]

অনেক সময় আমরা নিজেদেরকে বোঝাই যে, অভাবীরা এইসব ছেড়া, ভাঙা, বাসি জিনিস পেলেই খুশি হয়। ওদের কি আর আমাদের মতো এত চাহিদা আছে নাকি? আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলেননি খুঁজে দেখতে যে, ওরা খুশি হবে কিনা। তিনি تعالى এক কঠিন স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে দিয়েছেন: আমি নিজে খুশি হবো কিনা, যদি আমাকে কেউ সেই সব জিনিস দান করত।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

দানের কথা মনে করিয়ে খোটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করে দিয়ো না —আল-বাক্বারাহ ২৬৪-২৬৬

দান করে তারপর খোটা দেওয়া, কথা শোনানো কতটা খারাপ, তা আল্লাহ تعالى আবারো আমাদেরকে সাবধান করে দিয়েছেন—

বিশ্বাসীরা শোনো, দানের কথা মনে করিয়ে খোটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানকে বরবাদ করে দিয়ো না, সেই লোকের মত, যে কিনা দান করে মানুষকে দেখানোর জন্য এবং আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে না। ওর উদাহরণ হলো একটা বড় পাথরের মতো, যার উপরে কিছুটা মাটির আস্তর জমে, কিন্তু তারপর ভারি বৃষ্টি এসে সব মাটি ধুয়ে আবার খালি পাথর রেখে যায়। সে যা অর্জন করলো, তার কিছুই তার আর কাজে লাগলো না। আল্লাহ অবিশ্বাসী লোকদের পথ দেখান না। [আল-বাক্বারাহ ২৬৪]

“দেখেন ভাবি, বুয়াকে এই ঈদে এই নতুন কাপড়টা কিনে দিয়েছি। ও সবসময় পুরনো ছেড়া একটা কাপড় পড়ে আসতো। এখন ওকে কত ভালো দেখাচ্ছে না?” অথবা, “ভাই সাহেব, আপনাকে আমি অনেকদিন থেকে সাহায্য করে আসছি। এবার আপনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন, নাকি? আপনি কি সারাজীবন আমার ঘাড়ে ঝুলে থাকবেন?” —অনেক সময় আমরা যাদেরকে দান করি, তাদেরকে নানা ভাবে কষ্ট দিই। তাদের অভাবের কথা বার বার মনে করিয়ে দিই। তাদেরকে যে আমি কত উপকার করছি, সেটা সুযোগ পেলেই জানান দিই। তাদের কাছ থেকে ফুটফরমাশ একটু কম পেলেই দানের কথা মনে করিয়ে দিই, যেন সে আমার দানের প্রতিদান দিতে কোনো গাফিলতি না করে। এসব করে আমরা আমাদের দানকে পুরোপুরি বাতিল করে দিই।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

দান করে তারপর কষ্ট দেওয়ার থেকে সুন্দর কথা বলা এবং ক্ষমা করা উত্তম —আল-বাক্বারাহ ২৬১-২৬৩

ইসলাম সম্পর্কে অনেকের এক ধরনের ধারণা আছে যে, ধর্ম হচ্ছে নামাজ পড়া, রোজা রাখা, বছরে একবার যাকাত দেওয়া, ব্যাস এই পর্যন্তই। এর বাইরে অন্য ভালো কাজগুলো, যেমন দান করা, আত্মীয়ের উপকার করা, অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো, এগুলো ঐচ্ছিক ব্যাপার; করলে ভালো, না করলেও চলে। এই ভুল ধারণার কারণে আজকে মুসলিম সমাজে আমরা অনেক মুসলিম দেখতে পাই, যারা দাঁড়ি-টুপি, টাখনুর উপরে কাপড়ের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস, কিন্তু কোনোদিন তাদেরকে এতিম খানায় দান করতে দেখা যায় না। আবার অনেকে হিজাবের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস, কিন্তু প্রতিবেশীরা তার কাছে সামান্য তেল, লবণ বা প্লেট-বাটি ধার চাইতে এসে মন খারাপ করে ফিরে যায়। আবার অনেকে দিনরাত ইসলামি বই পড়ে, অনলাইনে ফাতওয়ার পর ফাতওয়া পড়ে, ফেইসবুকে কাফির, খারিজি, বিদআতি এই সব নিয়ে তর্ক করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে, নিজেদেরকে সালাফদের প্রকৃত অনুসারী মনে করে, অথচ কোনোদিন তাদেরকে মসজিদের দান বাক্সে মানিব্যাগের ছোট নোটের থেকে বেশি কিছু দিতে দেখা যায় না।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কীভাবে আল্লাহ একে আবার জীবিত করবেন, যেখানে কিনা তা মৃত? — আল-বাক্বারাহ ২৫৯-২৬০

অথবা তাকে দেখেছ, যে ধ্বসে যাওয়া এক জনবসতির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলেছিল,  “কীভাবে আল্লাহ একে আবার জীবিত করবেন, যেখানে কিনা তা মৃত?” তখন আল্লাহ তাকে একশ বছর মৃত রাখলেন, তারপর তাকে আবার বাঁচিয়ে তুলে বললেন, “তুমি কতদিন এভাবে ছিলে?” সে উত্তর দিলো, “একদিন বা এক দিনের কিছু অংশ।” আল্লাহ বললেন, “না, বরং তুমি এভাবে একশ বছর ছিলে। তোমার খাবার এবং পানীয়ের দিকে তাকাও। সেগুলো পচেনি। এবার তোমার গাধার দিকে তাকাও —আমি তোমাকে মানুষের জন্য এক নিদর্শন করে দেব — হাড্ডিগুলোর দিকে তাকাও, দেখো কীভাবে আমি সেগুলোকে একসাথে করি, মাংস দিয়ে আবৃত করি।” তারপর যখন তাকে পরিষ্কার করে দেখানো হলো, সে বলল, “আমি জানি আল্লাহ সবকিছুর উপরে সব ক্ষমতা রাখেন।” [আল-বাক্বারাহ ২৫৯]

প্রেক্ষাপট

একবার একজন নবী, যার সাথে আল্লাহ تعالى যোগাযোগ করেছিলেন, তিনি এক মৃত জনবসতির ধ্বংসস্তূপ দেখে ভাবছিলেন যে, কীভাবে আল্লাহ تعالى এই সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া জনবসতিকে আবার প্রাণ দেবেন? তখন আল্লাহ تعالى তাকে একশ বছর মৃত রেখে, আবার জীবিত করে দেখিয়ে দিলেন। একই সাথে তার যেন কোনো সন্দেহ না থাকে, সেজন্য তিনি تعالى তার চোখের সামনে তার সাথের গাধার (বা তার) মৃত পচে যাওয়া দেহকে আবার জীবিত করে দেখিয়ে দিলেন।[১২][১৪]

এই আয়াত থেকে এবং এর পরের আয়াত থেকে আমরা দেখবো, নবীরা, যারা কিনা আল্লাহর تعالى প্রতি সবচেয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন, তারাও মাঝে মধ্যে গায়েবে বিশ্বাস নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেন। তাদেরও জানতে ইচ্ছে করে আল্লাহ تعالى কীভাবে অলৌকিক ঘটনা ঘটান, কীভাবে তিনি تعالى মৃতকে জীবিত করেন। সুতরাং এথেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, আল্লাহর تعالى ক্ষমতা বা আল্লাহ تعالى কীভাবে আমাদের দৃষ্টিতে অলৌকিক ঘটনা ঘটাবেন, সেটা জানতে চাওয়াটা দোষের না। মানুষের কৌতূহল থাকবেই। আল্লাহ تعالى মানুষকে কৌতূহল দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই কৌতূহলই মানুষকে জ্ঞান অর্জন করতে, প্রযুক্তি তৈরি করতে তাড়না দেয়। কৌতূহল না থাকলে মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী হতে পারত না। সুতরাং কৌতূহল সমস্যা না। তবে সমস্যা হচ্ছে অহেতুক কৌতূহল এবং কৌতূহল মেটাতে না পারলে আল্লাহর تعال ক্ষমতায় অবিশ্বাস করা।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করেন, তুমি তাহলে সেটাকে পশ্চিম দিকে উদয় করাও দেখি? — আল-বাক্বারাহ ২৫৮

2_258

তুমি কি ওকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্পর্কে তর্ক করেছিল, যেখানে কিনা আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? যখন ইব্রাহিম বলল, “আমার রাব্ব হচ্ছেন তিনি, যিনি জীবন দেন, এবং মৃত্যু দেন।” তখন সে বলল, “আমি জীবন দেই, আমি মৃত্যু দেই।” তখন ইব্রাহিম বলল, “আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করেন, তুমি তাহলে সেটাকে পশ্চিম দিকে উদয় করাও দেখি?” তখন সেই অস্বীকারকারী হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আল্লাহ অন্যায়কারী মানুষদের পথ দেখান না। [আল-বাক্বারাহ ২৫৮]

“তুমি কি ওকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্পর্কে তর্ক করেছিল?”

আল্লাহ تعالى কল্পনা করতে বলছেন সেই রোমহর্ষক ঘটনার কথা, যখন নবী ইব্রাহিম عليه السلام তখনকার প্রতাপশালী রাজা নমরুদ-এর দরবারে গিয়ে তার মুখের উপর তাকে রাব্ব বলে মানতে অস্বীকার করেছিলেন।[১২] রাজা নমরুদ নিজের বিশাল রাজত্ব এবং ক্ষমতায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, সে নিজেকে বিশ্বজগতের রাব্ব বলে দাবি করতো। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কল্পনা করতে বলছেন সেই দৃশ্যের কথা, যেখানে এরকম একজন ফিরাউন টাইপের রাজা, তার মন্ত্রীসভা, দেহরক্ষী, লোকবল নিয়ে সভার একদিকে বসে আছে, আর অন্যদিকে প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন নবী ইব্রাহিম عليه السلام একা। তিনি একা সেই অহংকারী প্রতাপশালী রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন, যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করছেন যে, রাজা যা দাবি করছে তা ভুল।

এটা এতটাই সাহসিকতার একটি ঘটনা যে, আল্লাহ تعالى কুর’আনে বলছেন, “তুমি কি ওকে দেখনি?” — অর্থাৎ একবার সেই দৃশ্যের কথা চিন্তা করো। আজকে আমরা অফিসের বসকে চোখের সামনে অন্যায় করতে দেখেও চাকরির ভয়ে কিছু বলি না। আত্মীয়স্বজনকে নিয়মিত ইসলামের নিয়ম ভাঙতে দেখেও কিছু বলি না, পাছে যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের অসামাজিক কাজ করতে দেখলে, নিজের মত রাস্তা মাপি, ‘কী দরকার খামোখা নিজের সম্মান নষ্ট করে?’ আর সেখানে নবী ইব্রাহিম عليه السلام তখনকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, কেবিনেট মিটিঙে সবার সামনে দাঁড়িয়ে, পুলিশ, আর্মির তোয়াক্কা না করে, প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বলছিলেন যে, তিনি যা করছেন সেটা অন্যায়। — কুর’আনে দেওয়া এই দৃশ্য থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)