যারা বিশ্বাস করেছে এবং ভালো কাজ করেছে, তারাই হচ্ছে সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ —আল-বাইয়িনাহ

চৌধুরী সাহেব দিনরাত ইন্টারনেট ঘেঁটে আর অমুসলিমদের লেখা কিছু বই পড়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, ইসলামে অনেক ঘাপলা আছে। তাকে ধর্মের কথা বলতে গেলেই তিনি তার সংগ্রহ করা ‘কুর‘আনের শত ভুল’-এর লিস্ট ধরিয়ে মানুষকে ঘাবড়ে দেন। দাঁড়িওলা কাউকে পাশে পেলে গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “ভাই, কুর‘আনে অমুক অমুক আয়াতে তো ব্যাকরণ ভুল আছে। তাহলে কুর‘আন সত্য হয় কীভাবে? আবার দেখেন এই এক আয়াতে বলা আছে অমুক ঘটেছে, কিন্তু আরেক আয়াতে বলা আছে তমুক ঘটেছে। ঘটনা তো মিললো না? তারপর দেখেন কুর‘আনের আবার কতগুলো ভার্সন আছে। একদল এক আয়াত একভাবে পড়ে, আবার আরেকদল সেই আয়াত অন্যভাবে পড়ে। তাহলে তো কুর‘আন একটা না, কয়েকটা?”

—এরকম শত বছর ধরে চলে আসা কিছু বহুল প্রচলিত অপপ্রচারনা সম্প্রতি আবিষ্কার করে তিনি তার উৎসাহ ঢেকে রাখতে পারছেন না। কারণ ইসলাম সত্য না হলে তাকে আর ঠেকায় কে? এবার তিনি নিঃসংকোচে যাবতীয় ফুর্তি করতে পারবেন। কেউ কিছু বলতে এলেই তাকে এইসব দলিল ধরিয়ে দিয়ে চুপ করিয়ে দেবেন।

এখন, তাকে যদি কেউ দেখায় যে, কুর‘আন যখন এসেছে তখন আরবি ব্যাকরণই ছিল না। শত বছর পরে কুর‘আন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই আরবেরা আরবি ব্যাকরণ দাঁড় করিয়েছে। তাহলে কীভাবে কুর‘আনে ব্যাকরণ ভুল থাকতে পারে? আর সে যেই ভুলগুলো দাবি করছে, সেগুলো আরবির উচ্চতর ভাবের প্রয়োগ। স্কুলের ব্যাকরণ দিয়ে কুর‘আনকে দেখলে মনে হবে ভুল। যেমন কিনা ইংরেজির ব্যাকরণ অনুসারে শেক্সপিয়ারের গদ্যে অনেক ভুল আছে। কিন্তু আসলে সেগুলো ভাবের উচ্চতর প্রয়োগ ছাড়া আর কিছু নয়।[৩৯৯]

একইভাবে, তাকে যদি দেখানো হয় যে, কুর‘আনে একটি বড় ধারাবাহিক ঘটনাকে বিভিন্ন ক্যামেরা এঙ্গেলে একেক সুরায় একেকভাবে দেখানো হয়, আসলে সব ঘটনা একই। বা তাকে যদি দেখানো হয় যে, কুর‘আনের তিলায়াতের যাবতীয় পার্থক্য হচ্ছে হয় আঞ্চলিক উচ্চারণের পার্থক্য, না হয় এমন কিছু নগণ্য পার্থক্য যার কারণে কখনই আয়াতের মূল অর্থ বদলে যায় না।[৪০০] যেমন, এক এলাকার মানুষরা তিলাওয়াত করে, “তাকে মার দেওয়া হবে”, যেটা অন্য এলাকার মানুষরা তিলাওয়াত করে, “হইরে ফিটান দেয়া হইব” — মূল অর্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই —তাহলেও কোনো লাভ হয় না। তার সন্দেহ তখনও যায় না।

যখন তাকে পরিষ্কার সব প্রমাণ দেখিয়ে ভুল প্রমাণ করা হয়, তখন সে তাড়াতাড়ি ভোল পাল্টে ফেলে বলে, “তাহলে এমন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটে না কেন যে, মানুষের ইসলাম নিয়ে সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়? একটা ফেরেশতা এসে মানুষকে ইসলামের কথা বললেই তো সবাই ইসলাম মেনে নিত?” —হাজার হাজার বছর ধরে এই চৌধুরী সাহেবরা একই কথা বলে আসছেন, যা কিনা সূরাহ আল-বাইয়িনাহ-তে বলা হয়েছে—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমাদের ধর্ম তোমাদেরই থাকুক, আমার ধর্ম আমার — আল-কাফিরুন

বলো, “কাফিরেরা শোনো! তোমরা যা উপাসনা করো, আমি তা করি না। আর আমি যা উপাসনা করি, তোমরা তার উপাসক নও। তোমরা যা উপাসনা করছ, আমি কখনই তা করবো না। আর আমি যা উপাসনা করি, তোমরা তার উপাসক নও। তোমাদের ধর্ম তোমাদেরই থাকুক, আমার ধর্ম আমার।” [আল-কাফিরুন]

বলো, “কাফিরেরা শোনো! তোমরা যা উপাসনা করো, আমি তা করি না।”

তাহলে কি আমরা প্রতিবেশী হিন্দু, খ্রিস্টানদের দরজায় কড়া নেড়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বলবো, “হে কাফির, শুনেন। আপনি যা উপাসনা করেন, আমি তা করি না। আর আমি যা উপাসনা করি, আপনি তার উপাসক নন…?” — রাসুল عليه السلام কি এভাবে ইসলাম প্রচার করেছেন? বরং রাসুল عليه السلام কুর‘আনের নির্দেশ অনুসারে সুন্দর মার্জিতভাবে বিধর্মীদের ইসলামের পথে ডেকেছেন। তাহলে এই সূরাহ’য় তাকে এই কঠিন ভাষায় বিধর্মীদের সম্বোধন করতে বলা হলো কেন? একদিকে কুর‘আন বলে যে, তাকে সবার জন্য রহমত রূপে পাঠানো হয়েছে (২১:১০৭)। মানুষকে প্রজ্ঞার সাথে এবং মার্জিতভাবে ইসলামের পথে ডাকতে, সুন্দরভাবে তাদের সাথে যুক্তিতর্ক করতে (১৬:১২৫)। আবার এই সূরাহ’য় দেখা যাচ্ছে বিধর্মীদেরকে ‘কাফির’ ডেকে তাদেরকে কঠিন ভাষায় বুঝিয়ে দিতে তারা কী ভুল করছে —কীভাবে একই কুর‘আনে দুই জায়গায়, দুইভাবে বিধর্মীদের সাথে কথা বলার নির্দেশ থাকতে পারে? এটা কি স্ববিরোধী নয়?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করেন, তুমি তাহলে সেটাকে পশ্চিম দিকে উদয় করাও দেখি? — আল-বাক্বারাহ ২৫৮

2_258

তুমি কি ওকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্পর্কে তর্ক করেছিল, যেখানে কিনা আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? যখন ইব্রাহিম বলল, “আমার রাব্ব হচ্ছেন তিনি, যিনি জীবন দেন, এবং মৃত্যু দেন।” তখন সে বলল, “আমি জীবন দেই, আমি মৃত্যু দেই।” তখন ইব্রাহিম বলল, “আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিকে উদয় করেন, তুমি তাহলে সেটাকে পশ্চিম দিকে উদয় করাও দেখি?” তখন সেই অস্বীকারকারী হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আল্লাহ অন্যায়কারী মানুষদের পথ দেখান না। [আল-বাক্বারাহ ২৫৮]

“তুমি কি ওকে দেখনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার রাব্ব সম্পর্কে তর্ক করেছিল?”

আল্লাহ تعالى কল্পনা করতে বলছেন সেই রোমহর্ষক ঘটনার কথা, যখন নবী ইব্রাহিম عليه السلام তখনকার প্রতাপশালী রাজা নমরুদ-এর দরবারে গিয়ে তার মুখের উপর তাকে রাব্ব বলে মানতে অস্বীকার করেছিলেন।[১২] রাজা নমরুদ নিজের বিশাল রাজত্ব এবং ক্ষমতায় এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে, সে নিজেকে বিশ্বজগতের রাব্ব বলে দাবি করতো। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কল্পনা করতে বলছেন সেই দৃশ্যের কথা, যেখানে এরকম একজন ফিরাউন টাইপের রাজা, তার মন্ত্রীসভা, দেহরক্ষী, লোকবল নিয়ে সভার একদিকে বসে আছে, আর অন্যদিকে প্রতিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন নবী ইব্রাহিম عليه السلام একা। তিনি একা সেই অহংকারী প্রতাপশালী রাজার সামনে দাঁড়িয়ে তার ভুল ধরিয়ে দিচ্ছেন, যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করছেন যে, রাজা যা দাবি করছে তা ভুল।

এটা এতটাই সাহসিকতার একটি ঘটনা যে, আল্লাহ تعالى কুর’আনে বলছেন, “তুমি কি ওকে দেখনি?” — অর্থাৎ একবার সেই দৃশ্যের কথা চিন্তা করো। আজকে আমরা অফিসের বসকে চোখের সামনে অন্যায় করতে দেখেও চাকরির ভয়ে কিছু বলি না। আত্মীয়স্বজনকে নিয়মিত ইসলামের নিয়ম ভাঙতে দেখেও কিছু বলি না, পাছে যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তাঘাটে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের অসামাজিক কাজ করতে দেখলে, নিজের মত রাস্তা মাপি, ‘কী দরকার খামোখা নিজের সম্মান নষ্ট করে?’ আর সেখানে নবী ইব্রাহিম عليه السلام তখনকার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, কেবিনেট মিটিঙে সবার সামনে দাঁড়িয়ে, পুলিশ, আর্মির তোয়াক্কা না করে, প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি বলছিলেন যে, তিনি যা করছেন সেটা অন্যায়। — কুর’আনে দেওয়া এই দৃশ্য থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

না, না, আমাদের বাপ-দাদাদের যা করতে দেখেছি, আমরাও তা-ই করবো — আল-বাক্বারাহ ১৭০-১৭১

2_170_title

2_170যখন তাদেরকে বলা হয়, “আল্লাহ تعالى যা পাঠিয়েছেন, তা অনুসরণ করো।” তারা বলে, “না, না, আমাদের বাপ-দাদাদের যা করতে দেখেছি, আমরাও তা-ই করবো।” কী! যেখানে কিনা ওদের বাপ-দাদারা বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করতো না এবং তারা সঠিক পথ পাওয়ারও চেষ্টা করেনি? [আল-বাক্বারাহ ১৭০]

প্রশ্ন হচ্ছে: কেন মানুষ বাপদাদার অনুসরণ করা এত পছন্দ করে। সাধারণ উত্তর হচ্ছে: তাদের প্রতি সম্মান রেখে এবং এই বিশ্বাস থেকে যে, তারা আমাদের থেকে ধর্ম ভালো জানতো। কিন্তু এর ভিতরে আরেকটা গোপন স্বার্থপর কারণ আছে। আমরা যদি লক্ষ্য করে দেখি কোন ব্যাপারগুলো মানুষ অন্ধ অনুকরণ করে, আমরা দেখবো যে, সেগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে: কীভাবে নিজের কথা, কাজ, আচরণ, উপার্জন, সংস্কৃতি, ফ্যাশন —এসব কিছুতে কোনো পরিবর্তন না করে, বিভিন্ন শর্টকাট ব্যবস্থায় পার পেয়ে যাওয়া যায়।

যেমন: আমরা কুর’আন না বুঝে শুধুই আরবিতে তিলাওয়াত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবো, কারণ আমাদের বাপ-দাদারা তাই করে গেছেন। কিন্তু আসল কারণ হচ্ছে, বুঝে কুর’আন পড়লে তো জেনে যাবো আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কী কী করতে বলেছেন, কী কী করতে মানা করেছেন। এসব জেনে গেলে তো বিবেকের দংশনে পুড়তে হবে। তারপর আল্লাহকে تعالى জবাব দেব কীভাবে? তার চেয়ে কিছুই না বুঝে দিন-রাত কুর’আন তিলাওয়াত করে যাও। আমাদের বাপ-দাদারা করলে, আমরা কেন করবো না?

আবার আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে চলে আসা ইসলামের মূল্যবোধের বিরোধী কাজগুলো করা বন্ধ করবো না। ৭ দিন ধরে অনুষ্ঠান করে, নারী-পুরুষ সব মাখামাখি করে বিয়ের অনুষ্ঠান করবো। তারপর বছরে এক রাত ১০০ রাকাআত নফল নামাজ পড়ে সব গুনাহ মাফ করে ফেলবো। আমরা নিয়মিত ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হাতানো বন্ধ করবো না। কিন্তু সেই হারাম টাকা দিয়ে অমুকবাগী পিরের মুরিদ হয়ে, তাকে খুশি করে, তার হাত ধরে জান্নাতে চলে যাওয়ার আশা রাখবো। আমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবো না। কিন্তু এক উমরি-ক্বাযা নামাজ পড়ে, সব ছেড়ে আসা নামাজ মাফ করিয়ে নেবো। এভাবে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন না এনে, বছরে দুই-তিন বার কোনো হুজুগের ইবাদত করে চেষ্টা করবো সব মাফ করে ফেলার। কারণ আমাদের বাপ-দাদারা সেটা করে গেছেন। তারা পারলে আমরা পারবো না কেন?

যখন এধরনের মানুষদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, এভাবে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণ ভুল, তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। এই ধরনের মানসিকতার মূল কারণ হচ্ছে হিংসা।[আল-বাক্বারাহ ৮৯-৯০] তবে এটি ঠিক হিংসা নয়, সাইকোলজির ভাষায় একে বলে সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স বা আত্মগরীমা: অন্যের কাছে নিজের হীনমন্যতা ঢেকে রাখার জন্য নিজেকে বড় বলে জাহির করার এক ধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা। তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না যে, আপনি তাদের যুগ যুগ ধরে করে আসা উপাসনাগুলোকে বিদ’আহ বলে প্রমাণ করে দিচ্ছেন; তাদের মাথা ভর্তি হাদিসগুলোকে জাল হাদিস বলে সংশোধন করে দিচ্ছেন। তারা কোনোভাবেই মানতে পারছে না যে, আপনি ইসলামের সঠিক শিক্ষা পেয়েছেন, আর তারা সারাজীবন বাপ-দাদার অনুসরণ করে ভুল পথে ছিল।

আপনি তাদেরকে যতই বোঝাবার চেষ্টা করেন, তারা কোনোভাবেই শুনবে না। কারণ তারা মনে করে যে, আপনার কথা শুনলে তারা আপনার কাছে হেরে যাবে। তাদের এত দিনের কামানো ধর্মীয় বেশভূষা, নূরানি দাঁড়ি-পাঞ্জাবি-আতরের সন্মান, যেখানে কিনা মসজিদে তাদেরকে দেখলে সবাই সরে গিয়ে প্রথম কাতারে জায়গা ছেড়ে দেয়, সেখানে কিনা আমরা তাদেরকে বলছি: তাদের ইসলামের ভিত্তিটাই ছিল ভুল? এটা হতেই পারে না! তাদের হিংসা, আত্মগরীমা তাদেরকে অন্ধ, বধির, মূক করে দিয়েছে।

এখানে একটা ব্যাপার পরিস্কার করা দরকার: এই আয়াতে আল্লাহ অন্ধ আনুগত্য করতে শুধুমাত্র তখনি মানা করেছেন, যখন আমরা এমন কারো অনুসরণ করছি, যে নিজে সঠিক পথে নেই, এবং যে তার বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করে না।[১৪] আল্লাহ এই আয়াতে দুটো শর্ত দিয়ে দিয়েছেন কাদেরকে অনুসরণ করা যাবে না—

১) বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করতো না

আক্বল عقل অর্থ কোনো কিছু বেধে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেমন উট দড়ি দিয়ে বেধে রাখা, যেন পালিয়ে না যায়। নিজের রাগ, ঘৃণা, হিংসা, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধি ব্যবহার করা হচ্ছে আক্বল।[১]

মানুষের অনেক বুদ্ধি থাকতে পারে। কিন্তু সেই বুদ্ধিকে যদি লাগাম দেওয়া না হয়, তখন সেই বুদ্ধি থেকে ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হয়। মানুষ তখন সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী হয়ে যায়। তাই বুদ্ধিমান হওয়া মানেই যে একজন ভালো মানুষ হওয়া, তা নয়। যেমন, অনেক জ্ঞানী মানুষদেরকে আমরা দেখেছি, যারা দীর্ঘ সাধনা করে আল্লাহকে تعالى খুশি করার নানা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। যেমন, আমুক মানুষটা অত্যন্ত পবিত্র। তাকে খুশি রাখতে পারলে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর تعالى কাছে তদবির করে আমার বড় বড় গুনাহ মাফ করে দেবেন। তাই সেই পবিত্র মানুষটাকে মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা দাও, তার সাগরেদদেরকে ভুরিভোজ করাও। অমুক মাসে অমুক রাতে ১০০ রাকাআত নফল নামাজ পড়লে সারা জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়, যেটা বছরের অন্য কোনো দিনে হয় না, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

যে তার বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তার বুদ্ধিকে ভালো কাজে লাগাতে পারে, বুদ্ধি ব্যবহার করে নিজেকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে, কু’রআনের ভাষায় তারাই বুদ্ধিমান। কু’রআনে যত জায়গায় আক্বল অর্থাৎ বুদ্ধিমান মানুষদের কথা এসেছে, সব জায়গায় এমন সব মানুষদের বোঝানো হয়েছে, যাদের বিবেক তাদের বুদ্ধিকে লাগাম দিয়ে রাখে। এদের বুদ্ধি তাদের প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

২) তারা সঠিক পথেও ছিল না

এই আয়াতের শেষে يَهْتَدُون ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ সাধারণত করা হয়, “সঠিক পথ লাভ করেনি।” কিন্তু এটি এসেছে اهتدى ইহতাদা থেকে, যার অর্থ হচ্ছে: দেখানো সঠিক পথে চলার জন্য নিজে থেকে আন্তরিক চেষ্টা করা।[১] এখানে একটি খুব সূক্ষ্ম ভাষাগত পার্থক্য আছে। আল্লাহ تعالى মানুষকে সঠিক পথে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘাড় ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন না, বরং তিনি মানুষকে সঠিক পথ কোনটা সেটা দেখিয়ে দেন। তারপর মানুষের কাজ হচ্ছে সেই সঠিক পথে চলার চেষ্টা করা। মানুষকে সেই চেষ্টাটা করতে হবে। চেষ্টা ছাড়া কেউ সঠিক পথ পাবে না এবং চেষ্টা ছাড়া কেউ সঠিক পথে টিকেও থাকতে পারবে না।[১] যারা দার্শনিক তর্ক দেখায়, “আল্লাহ যদি চাইতেন, তাহলে তো আমি সবসময় ভালোই থাকতাম। তিনি চাননি দেখেই তো আমি ভালো থাকতে পারিনি…”—তাদেরকে  ইহতাদা اهتدى এর মানে ঠিকভাবে বুঝতে হবে।

একটা উদাহরণ দেই—

আপনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, একসময় একটা চৌরাস্তা মোড়ে গিয়ে একটা সাইন বোর্ড দেখলেন: “চট্টগ্রাম ৫০ মাইল”, কিন্তু আপনি সেদিকে না গিয়ে দূরে একটা সিনেমা হল দেখা যাচ্ছে, সেদিকে যাওয়া শুরু করলেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ঠিকই আপনাকে সঠিক পথ দেখিয়েছিল, কিন্তু আপনি اهتدى (সঠিক পথে চলার চেষ্টা) করেননি।

যারা আল্লাহর تعالى বাণী অনুসরণ করে সঠিক পথে চলার আন্তরিক চেষ্টা করেনি, নিজের খেয়াল খুশি মতো ধর্ম অনুসরণ করেছে, অন্যের অন্ধ অনুকরণ করেছে, নিজেদের উর্বর মস্তিস্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন শর্টকাট ইবাদত আবিষ্কার করেছে, তাদের অনুকরণ করতে আল্লাহ تعالى মানা করেছেন।

তাহলে কি কোনো ইমামকে অনুসরণ করবো না?

অনেকে মনে করেন এই আয়াতে ‘কোনো প্রশ্ন না করে অনুসরণ’ (তাক্বলিদ) পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তাক্বলিদ নিষেধ করা হয়েছে তখনি, যখন কিনা যাকে অনুসরণ করা হচ্ছে, সে নিজে আক্বল ব্যবহার করে না এবং ইহতাদা-ও করে না। ধর্মীয় ব্যাপারে পারদর্শী নন এমন কাউকে অবশ্যই ধর্মীয় ব্যাপারে জ্ঞানী, অভিজ্ঞদের মত মেনে নিতে হবে, তাদের শেখানো পথ অনুসরণ করতে হবে।[১৪] কারণ কুর’আনেই আল্লাহ تعالى বলেছেন—

তোমরা যদি কোনো ব্যাপারে না জানো, তাহলে যারা জানে, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। [আন-নাহল ৪৩]

কিন্তু কাউকে জিগ্যেস করার আগে নিজে থেকে ইজতিহাদ, অর্থাৎ নিজের বিচার-বুদ্ধি, উপস্থিত তথ্য, প্রমাণ ব্যবহার করে নিশ্চিত হতে হবে যে, যাকে জিগ্যেস করা হচ্ছে, সে এই ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানে।[১৪] এমন কাউকে জিগ্যেস করতে যাবো না, যে কিনা আমি যা শুনতে চাই, সেটাই আমাকে বলবে। যদি সে আমার পছন্দ মতো উত্তর না দেয়, তাহলে আরেকজনকে গিয়ে জিগ্যেস করবো —এমনটা করা একধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। অথবা এমন কারো কাছে যাবো না, যে কিনা আমাকে সহজ কিছু করতে বলবে। আর যার কাছে গেলে কঠিন কিছু করতে বলবে, তার কাছে যাবো না —এমন করাটাও অসৎ মানসিকতার পরিচয়।

2_171অবিশ্বাসীদেরকে ডাকা হলো এমন কাউকে ডাকার মতো, যে কিনা হাঁকডাক ছাড়া আর কিছু শোনে না — বধির, মূক ও অন্ধ —এরা কেউ বিবেক-বুদ্ধি খাঁটায় না। [আল-বাক্বারাহ ১৭১]

এই ধরনের মানুষরা হলো তারা, যাদের কাছে প্রায়ই আল্লাহ‌র تعالى বাণী আসে। তারা সেটা নিয়ে অল্প একটু চিন্তা-ভাবনা করে ছেড়ে দেয়। আল্লাহ‌র تعالى বাণী শুনে, বুঝে, নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনার কোনো চেষ্টা তাদের মধ্যে নেই। একারণেই আল্লাহ‌ تعالى তাদেরকে বধির, মূক এবং অন্ধের সাথে তুলনা করেছেন। কারণ তাদের মস্তিস্কের সঠিক ব্যবহার না করতে করতে, তাদের সত্য শোনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে—তারা বধির। তারা নিজে থেকে মানুষকে প্রশ্ন করে সত্যকে জানার চেষ্টা করে না—তারা মূক। তাদের চোখের সামনে সত্য থাকলেও, তারা সেটা দেখে না দেখার ভান করে—তারা অন্ধ। তাদের আর কোনোভাবেই ভালো হবার সম্ভাবনা নেই।[৩]

আপনার মনে হতে পারে—আল্লাহ تعالى যদি অবিশ্বাসকারিদেরকে বধির, মূক, অন্ধ বলে ঘোষণা দেন, তাহলে তাদের দোষ কী? তারা তো ইচ্ছা করলেও ভালো হতে পারবে না। কাফির, মুনাফিকরা তাদের মস্তিস্কের সঠিক ব্যবহার না করতে করতে, তাদের মস্তিস্কের সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলেছে।[৩] মানুষ যদি ছয় মাস তার পা ব্যবহার না করে, তার পায়ের পেশি শুকিয়ে যায়, তখন আর সে দাঁড়াতে পারে না। একই ভাবে মানুষ যদি মস্তিস্কের যথেষ্ট ব্যবহার না করে, তাহলে তার মস্তিস্ক ভোঁতা হয়ে যায়। মস্তিস্ক এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, মানুষ তা যত ব্যবহার করবে, তা তত শক্তিশালী হবে। একারণেই আল্লাহ‌ تعالى কু’রআনে শত শত উপমা, দৃশ্য, ঘটনা, যুক্তি-তর্ক, নানা ধরনের রহস্য দিয়ে রেখেছেন, যেন মানুষ কু’রআন বার বার পড়লে তার চিন্তাশক্তি বাড়ে, কল্পনা শক্তি প্রখর হয়, সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা বাড়ে।

মানুষ যখন তার সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ব্যবহার করে না, সত্য জানার পরেও সেটা মেনে নিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে না, তখন ধীরে ধীরে তার নিজেকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা একসময় নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মস্তিস্কের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি আল্লাহ‌রই تعالى সৃষ্টি। তিনিই মানুষকে এভাবে বানিয়েছেন।

অনেক সময় আমরা ইসলামের উপর কোনো বই বা আর্টিকেল পড়ে উপলব্ধি করি যে, আমরা এতদিন যা শিখে এসেছি, তার মধ্যে ভুল রয়েছে। হাজার বছর থেকে বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কিছু রীতিনীতি, ধারণাগুলো আসলে ইসলাম সমর্থন করে না। অনেক সময় দেখা যায়: আমরা যে দলের শিক্ষা এতদিন অনুসরণ করে এসেছি, তার বিরুদ্ধে কুরআন, সাহিহ হাদিসেই যথেষ্ট শক্ত দলিল আছে। তখন আমরা অনেক সময় ভাবা শুরু করি, “এই খবর যদি মানুষকে জানানো হয় তাহলে ফিতনা তৈরী হবে। মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। হুজুরদের প্রতি শ্রদ্ধা উঠে যাবে। এরচেয়ে বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর ত্যাগ করা ভালো। থাক না কিছু কথা গোপন। আল্লাহ تعالى মাফ করবেন।”

সাবধান! কুর’আনে বহু আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে এই ধরনের চিন্তা করা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। এই ধরনের মানসিকতা বিরাট সব অন্যায়ের পথ খুলে দেয়।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ।

প্রমাণ দেখাও, যদি সত্যি বলে থাকো — আল-বাক্বারাহ ১১১-১১২

আজকাল সুধীবৃন্দরা দাবি করেন, “তোমাদের ইসলাম একটা অসহনশীল, বর্বর ধর্ম। তোমরা দাবি করো যে, ইসলাম হচ্ছে একমাত্র সঠিক ধর্ম, আর অন্য সব ধর্ম সব ভুল। আর তোমরা অন্য ধর্মের মানুষদের সন্মান করো না, তাদের অধিকার দাও না, তাদেরকে কাফির গালি দিয়ে হত্যা করার কথা বলো। এরচেয়ে অমুক ধর্ম অনেক সহনশীল, সুন্দর। ”
—এর উত্তর খুব সহজ: প্রথমত, হ্যা, ইসলাম দাবি করে যে, ইসলাম হচ্ছে একমাত্র সঠিক ধর্ম এবং বাকি সব ধর্ম তার আসল রূপ থেকে বিকৃত হয়ে গেছে, যার কারণে সেগুলো আর মানা যাবে না। দ্বিতীয়ত, খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মও সেটাই দাবি করে, এমনকি হিন্দু ধর্মও একই দাবি করে, যেখানে খোদ কৃষ্ণই সেই কথা বলেছেন ভগবৎ গীতায়। তৃতীয়ত, যদি কোনো ধর্ম না দাবি করে যে, সে একমাত্র সঠিক ধর্ম, কারণ বাকি সব ধর্ম বিকৃত হয়ে গেছে, তার মানে দাঁড়ায়: সৃষ্টিকর্তা সেই নতুন ধর্ম পাঠিয়েছেন এমনিতেই সময় কাটানোর জন্য। তিনি বসে বসে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন, তাই তিনি নতুন একটা কিছু করার জন্য প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে, বিপুল পরিমাণ মানুষের সময় খরচ করে, অনেক মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে এমন একটা নতুন ধর্ম পাঠালেন, যেটা না মানলেও কোনো সমস্যা নেই, কারণ আগের ধর্মগুলো তো ঠিকই আছে। অন্য ধর্মের লোকরা সব সৎ পথেই আছে এবং স্বর্গেও যাবে। তাই এই নতুন ধর্মটা যদি কেউ মানে তো ভালো, না মানলেও কোনো সমস্যা নেই।

আজকাল এইসব সুধীবৃন্দরা যা দাবি করছেন, তা হচ্ছে অনেকটা এরকম: ইসলাম বা অন্য ধর্মগুলোতে, যেখানে সৃষ্টিকর্তা ঘোষণা দিয়েছেন যে, সেটাই একমাত্র সঠিক ধর্ম কারণ অন্য ধর্মগুলো বিকৃত হয়ে গেছে, সেখানে আসলে স্রস্টার বলা উচিত ছিল, “হে আমার বান্দারা, আজকে আমি তোমাদেরকে একটা ধর্ম দিলাম। এটা অন্য সব ধর্ম থেকে বেশি ঠিক, তা আমি দাবি করবো না। আমার ভুল ত্রুটি হতেই পারে। আর এটা তোমরা মানতেও পারো, নাও পারো। সমস্যা নেই, একটা ধর্ম মানলেই হলো। বেশি দুষ্টামি না করলে তোমরা স্বর্গে যাবেই।”

এই পর্বে ধর্ম নিয়ে দুটো ব্যাপারে আলোচনা করা হবে: ১) Religious Exclusivity বা ধর্মীয় স্বতন্ত্রতা, ২) Religious Intolerance বা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। আমরা দেখব হিন্দু, খ্রিস্টান, ইহুদি, ইসলাম — এই ধর্মগুলোর মধ্যে কোনটা আসলেই সহিষ্ণুতা প্রচার করে।

quran-and-bible

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)