এসবের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির মানুষদের জন্য অবশ্যই বিরাট নিদর্শন রয়েছে — আল-বাক্বারাহ ১৬৪ — ২য় পর্ব

2_164_title2

প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে: আকাশ এবং পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে কেউ যদি গভীরভাবে ভেবে দেখে, সে দেখবে যে, এসবের সৃষ্টির মধ্যে একই মূলধারার ডিজাইন লক্ষ্য করা যায়, একজন স্রষ্টারই স্বাক্ষর স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে। একইভাবে কেউ যদি দিন-রাতের পরিবর্তন নিয়ে ভেবে দেখে: কীভাবে দিন-রাতের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন হয়, কেন রাতের আকাশে অন্ধকার থাকে, কীভাবে প্রতি বছর একই দৈর্ঘ্যের দিনরাত হয়, তাহলে সে দেখবে এটা বিশেষভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেন মানুষের মতো জটিল প্রাণ একদিন পৃথিবীতে আসতে পারে।

তারপর কেউ যদি পানিতে ভেসে চলা জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে: কীভাবে এত ভারি একটা জিনিস পানিতে ভেসে আছে, তাহলে সে দেখবে: পানির এক বিশেষ গুণ ‘প্লবতা’র কারণেই তা হয়। যদি এই বিশেষ গুণ পানিতে দেওয়া না হতো, তাহলে সভ্যতা গড়ে উঠত না, কোনো প্রাণী পানিতে ভেসে থাকতে পারতো না। প্রাণী জগৎ কখনই আজকে এই পর্যায়ে আসতে পারতো না। কেউ একজন ইচ্ছে করে এই ব্যাপারগুলো নির্ধারণ করেছেন দেখেই আজকে মানুষ পৃথিবীতে বাস করতে পারছে, এত বৈচিত্র্যের উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগৎ হতে পেরেছে, পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য এত আরাম দায়ক হয়েছে।

এবার আয়াতের বাকি নিদর্শনগুলো নিয়ে দেখি—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এসবের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির মানুষদের জন্য অবশ্যই বিরাট নিদর্শন রয়েছে — আল-বাক্বারাহ ১৬৪ পর্ব ১

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى বুদ্ধিমান মানুষদের চিন্তা করার জন্য কিছু নিদর্শন দিয়েছেন। তিনি تعالى বলছেন যে, যদি মানুষ বুদ্ধিমান হয়, তাহলে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষ এই উপসংহারে পৌঁছাবেই: আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ থাকতেই পারে না।

2_164_title

2_164আকাশ এবং পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাতের পরিবর্তনে, মানুষের জন্য পণ্য নিয়ে সমুদ্রে ভেসে চলা জাহাজে, আকাশ থেকে আল্লাহর পাঠানো পানিতে, যা মৃত জমিকে আবার প্রাণ দেয়, এর মধ্যে সব ধরণের প্রাণীকে ছড়িয়ে দেয়, বাতাসের পরিবর্তনে এবং আকাশ এবং পৃথিবীর মাঝখানে মেঘের নিয়ন্ত্রিত চলাচলে —এসবের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির মানুষদের জন্য অবশ্যই বিরাট নিদর্শন রয়েছে। [আল-বাক্বারাহ ১৬৪]

এই আয়াতে একটি খুবই শক্তিশালী বাণী রয়েছে। আল্লাহ تعالى কে —তা তিনি শুধু কু’রআন, হাদিসের বাণীর মাধ্যমেই আমাদেরকে জানাননি, আমাদের চারপাশের এই বিশাল জগতের মধ্যে পরিষ্কারভাবে তাঁর تعالى পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁকে জানার জন্য যে, আমাদের শুধু হালাক্বাতে গিয়ে লেকচার শোনা, মসজিদে গিয়ে খুতবা শোনা, বা শুধু ধর্মীয় বই পড়তে হবে তা নয়, তাঁর এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে, পৃথিবী ঘুরে দেখলে, আকাশ নিয়ে চিন্তা করলে, আমরা তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারবো। আল্লাহর تعالى আয়াত ءَايَٰت—যার অর্থ নিদর্শন—দুই ভাবে আমাদের কাছে এসেছে: ১) তাঁর পাঠানো বাণীর মাধ্যমে, এবং ২) তাঁর সৃষ্টিজগতের মাধ্যমে।[১] যারা বুদ্ধিমান, তারা সৃষ্টিজগতের মধ্যেই আল্লাহর পরিচয় تعالى খুঁজে পায়। তাঁর একত্ব এবং মহত্ত্ব উপলব্ধি করে বিস্ময়ে মাটিতে লুটিয়ে যায়।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কিছু নেই — আল-বাক্বারাহ ১৬৩

ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এসেছে এই আয়াতে—

2_163_title

2_163তোমাদের উপাসনার যোগ্য সত্তা একজন। তিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কিছু নেই। পরম দয়ালু তিনি, নিরন্তর করুণাময় তিনি। [আল-বাক্বারাহ ১৬৩]

“তোমাদের إِلَٰه ‘ইলাহ’ একজন” — إِلَٰه ইলাহ শব্দটিকে সাধারণত উপাস্য বা উপাসনার যোগ্য প্রভু অনুবাদ করা হয়। কিন্তু ইলাহ অর্থ আসলে হচ্ছে: কোনো কিছু বা কাউকে এতটাই চাওয়া হয়, এতটাই ভালবাসা হয় যে, ভালবাসা তখন উপাসনার পর্যায়ে চলে যায়। হৃদয়ে তখন দিন, রাত শুধু ইলাহ-এর চিন্তা ঘোরে। ইলাহ হয়ে যায় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আকাঙ্খা। বাকি সব কিছু ইলাহ’র কাছে তখন তুচ্ছ। মন তখন ইলাহকে পাওয়া, ইলাহকে তুষ্ট করার চিন্তায় বিভোর হয়ে যায়।[১] [১১]

হাজার বছর ধরে মানুষের ইলাহ ছিল বিভিন্ন দেব-দেবী, সূর্য, চাঁদ, তারা, গরু ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক বস্তু, এমনকি বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষও। এদেরকে তুষ্ট করার জন্য, এদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার জন্য মানুষ এমন কিছু নেই, যা করতো না, সেটা মানুষ কুরবানী করে হলেও। ইলাহ যে শুধু এধরনের কোনো প্রাকৃতিক কিছু বা মানুষ হতে হবে তা নয়, এটি যে কোনো কিছু হতে পারে। কারো বেলায় ইলাহ হয় তার সম্পদ। কারো বেলায় তা হয় তার মান-সম্মান, সমাজে স্ট্যাটাস। কারো বেলায় ইলাহ হয়ে যায় তার জৈবিক কামনা। কারো বেলায় তার ইলাহ হয়ে যায় তার স্বামী, বা স্ত্রী, এমনকি সন্তানরাও। মানুষ তখন এসব ইলাহ’কে পেতে গিয়ে তার সমস্ত মনোযোগ, সময়, শক্তি দিয়ে দেয়। শুধু তাই না, অনেক সময় মানুষ একাধিক ইলাহ’কে একই সাথে পাওয়ার চেষ্টা করে। তখন শুরু হয় একাধিক ইলাহ’র মধ্যে প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত একাধিক ইলাহ’র কোনোটাকেই ঠিক মতো না পেয়ে অশান্তি, অতৃপ্তিতে, হতাশায় ডুবে যায়।[১১]  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যারা আমার পাঠানো পরিষ্কার প্রমাণ এবং পথনির্দেশ গোপন করে — আল-বাক্বারাহ ১৫৯-১৬২

একটি ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বসে কারিকুলাম ঠিক করছেন। একজন প্রস্তাব দিলেন প্রথম দুই সেমিস্টার রিয়াদুস সালেহীন পড়াতে। সবাই সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। আরেকজন প্রস্তাব দিলেন এর সাথে সহিহ বুখারী পড়াতে। সেটাও সবাই একবাক্যে রাজি। এরপর আরেকজন বেহেশতি জেওর, কাসাসুল আনবিয়া ঢুকিয়ে দিতে বললেন। সেটাও পাশ হয়ে গেল।

এরমধ্যে একজন বললেন, প্রতি সেমিস্টারে কুরআনের এক পারার অর্থসহ তিলাওয়াত শেখাতে। এই প্রস্তাব শুনে অন্যেরা আঁতকে উঠলেন, “না, না, শুধু আরবি তিলাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখুন। মানুষকে কুরআন অর্থসহ শেখালে বিভ্রান্তি হবে। মানুষ নিজে থেকেই নিজেদের মত যা খুশি বুঝে নিয়ে আমল করা শুরু করে দেবে। কুরআন সবার জন্য নয়। কুরআন বুঝতে গেলে অনেক বছর আরবি শিখতে হয়, আরবি ব্যাকরণে অভিজ্ঞ হতে হয়, কমপক্ষে ১৪টা তাফসির পড়তে হয়। এগুলো সব না শিখিয়ে শুধু কুরআন অর্থ সহ শেখালে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষকে কুরআন থেকে যত দূরে রাখা যায়, ততই বরং কম ফিতনা হবে।”

2_159_title

2_159যারা আমার পাঠানো পরিষ্কার প্রমাণ এবং পথনির্দেশ গোপন করে, আমি মানুষের জন্য কিতাবে পরিষ্কার করে দেওয়ার পরেও, ওদেরকে আল্লাহ ঘৃণা ভরে পরিত্যাগ করেন, এবং অভিশাপকারীরা ওদেরকে অভিশাপ দেয়। [আল-বাক্বারাহ ১৫৯]

হাজার বছর আগে ইহুদি রাবাইরা (ধর্মীয় পন্ডিতরা) তাওরাতকে শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেই কুক্ষিগত করে রেখেছিল। সাধারণ ইহুদিরা কখনো তাওরাত নিজেরা পড়তে পারতো না, সেটা তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। তাওরাতকে জনসাধারণের ধরাছোয়ার বাইরে রেখে রাবাইরা নিজেদের ইচ্ছামত শরীয়াহ বানিয়ে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করার জন্য ইচ্ছেমত হালাল, হারাম নির্ধারণ করে গেছে। নানা ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি ঢুকিয়ে গেছে, যেগুলো তাদেরকে ক্ষমতা, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি এনে দিয়েছে। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তাওরাতের পরিষ্কার নিষেধকেও বৈধ বলে চালিয়ে দিয়েছে। এভাবে তারা সফল ভাবে কয়েকশত বছর ধরে সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পরিষ্কার বাণী, পথনির্দেশ থেকে দূরে রেখে একটা পুরো জাতিকে ভুল পথে নিয়ে গেছে।[১][১১]

একইভাবে গত কয়েক শতকে উপমহাদেশের মানুষদেরকে কৌশলে কুরআন থেকে দূরে রেখে কয়েকটা প্রজন্ম তৈরী করা হয়েছে, যারা কুরআন সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞানও রাখে না। এরা জানে না কুরআনে পরিষ্কারভাবে কী হালাল, কী  হারাম বলা আছে। কুরআনে তাওহীদের শিক্ষা কী, তা তারা জানে না। তারা শুধু পড়েছে কিছু গৎবাঁধা বই, যেই বইগুলোর অনেকগুলোতেই নানা ধরনের জাল হাদিস, বিদআতের ছড়াছড়ি।[১১] এভাবে একটি পুরো জাতিকে কুরআনে নিরক্ষর করে রেখে গেছে কিছু ইসলামী দল এবং ‘আলেম’ নিজেদের ইচ্ছামত ধর্ম ব্যবসা করার জন্য। এদের পরিণাম ভয়ঙ্কর—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যে নিজে থেকে ভালো কাজ করে, আল্লাহ অবশ্যই তার মূল্যায়ন করেন — আল-বাক্বারাহ ১৫৮

2_158_title

2_158সাফা এবং মারওয়াহ আল্লাহর تعالى নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। তাই যারা কা’বা ঘরে হাজ্জ বা উমরাহ করে, তারা এদুটিকে ঘিরে ঘুরলে কোনো দোষ নেই। আর যে নিজে থেকে ভালো কাজ করে, আল্লাহ تعالى অবশ্যই তার মূল্যায়ন করেন, তিনি সব কিছুর ব্যাপারে জানেন। [আল-বাক্বারাহ ১৫৮]

সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর تعالى নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। এই আয়াতে নিদর্শন বলতে শা’আইর شَعَآئِرِ ব্যবহার করা হয়েছে, যার একবচন শা’ইরাহ شعيرة এসেছে شعر থেকে। এর অর্থ: কোনো স্থাপত্য, চিহ্ন, যা দেখে মানুষের কোনো উপলব্ধি হয়। কোনো কিছু দেখে আমরা যখন কোনো স্মৃতিচারণ করি, আমাদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি হয়, সেটা شعيرة।[১] যেমন বাঙালিদের شعيرة হচ্ছে স্মৃতিসৌধ, যা আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। সেরকম সাফা এবং মারওয়া আমাদেরকে নবী ইব্রাহিম عليه السلام এর স্ত্রীর পানির খোঁজে ছোটাছুটি করার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাদের ভীষণ কঠিন সব পরীক্ষা আল্লাহর تعالى প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে নির্দ্বিধায় পার করার চেতনায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এরাই হচ্ছে তারা, যাদের জন্য বিশেষভাবে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে অভিবাদন এবং অনুগ্রহ — আল-বাক্বারাহ ১৫৬-১৫৭

আমাদের জীবনে প্রায়ই কষ্ট, দুর্দশা আসে। তখন আমরা অনেকেই দিশেহারা হয়ে যাই। কাউকে তখন ভাগ্য, যোগ্যতার অভাব অথবা কপালকে দোষ দিতে দেখা যায়। আবার কারো বেলায় সেটা অন্য কারো দোষ: সমাজের দোষ, দেশের দোষ, সরকারের দোষ, না হলে বউয়ের দোষ। অনেককে আবার নানা ধরনের দার্শনিক প্রশ্ন করতে দেখা যায়: “আমার কেন এরকম হলো? আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, সারাজীবন মানুষের সেবা করেছি। তাহলে আমার কপালে এত দুঃখ-কষ্ট কেন?”

—এধরনের আহাজারি, দোষারোপ করে কোনো লাভ হয় না। বরং নেতিবাচক কথা এবং চিন্তা আমাদের মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেয়। নিজের ভেতরের তিক্ততা অন্যের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়। অন্যদের জন্য সে তখন মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যরা তখন তাদের মন খারাপ হয়ে যাওয়ার ভয়ে এই ধরনের মানুষদের এড়িয়ে চলে।

অথচ একজন মুসলিমের কখনোই এভাবে চিন্তা করার কথা না। মুসলিমদের যে ধরনের মানসিকতা থাকার কথা, যা থাকলে একজন মুসলিম যে কোনো বিপদ, কষ্টের সময় হাসিমুখে পার করতে পারে, তা আল্লাহ تعالى এই দুটি আয়াতে আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন—

2_156_157_revised

2_156_157দুর্দশা আঘাত করলে যারা সাথে সাথে বলে, “আমরা তো আল্লাহরই تعالى সম্পত্তি, আর অবশ্যই আমরা আল্লাহর تعالى কাছেই ফিরে যাচ্ছি।” এরাই হচ্ছে তারা, যাদের জন্য বিশেষভাবে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে অভিবাদন এবং অনুগ্রহ। আর এরাই তারা, যারা সঠিক পথ পেয়ে গেছে। [আল-বাক্বারাহ ১৫৬-১৫৭]

আমরা অনেকেই মুখে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলি, কিন্তু উপলব্ধি করি না কত বড় একটা কথা আমরা বলছি। এর অর্থ: “আমরা তো আল্লাহরই تعالى সম্পত্তি, আর আল্লাহর تعالى কাছেই আমরা ফিরে যাবো।” আমরা যদি এই কথাটির উদ্দেশ্য আত্মস্থ করতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন পাল্টে যাবে। আসুন কিছু উদাহরণ দেখি—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

কু’রআনে এমন  কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো আমাদেরকে জীবনের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: আমরা কীভাবে নিজেরাই নিজেদের জীবনটাকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিই। আর কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, ভয় হাসিমুখে পার করার শক্তি যোগায়। এরকম একটি আয়াত হলো—

2_155_title

2_155আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই: মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও। [আল-বাক্বারাহ ১৫৫]

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই

আল্লাহ تعالى শুরু করছেন: وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ — আল্লাহ تعالى আমাদেরকে এই দুনিয়াতে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই, নেবেন। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আরবিতে দুই বার জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন। কারো বেলায় সেই পরীক্ষা হয়তো চাকরি হারিয়ে ফেলে অভাবে, কষ্টে জীবন পার করা। কারো বেলায় হয়তো বাবা-মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তানদের জটিল অসুখের চিকিৎসায় দিনরাত সংগ্রাম করা। কারো বেলায় হয়তো নিজেরই নানা ধরনের জটিল অসুখ। কারো বেলায় আবার জমি-জমা, সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সাথে শত্রুতা, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার, দুশ্চরিত্র স্বামী, পরপুরুষে আসক্ত স্ত্রী, ড্রাগে আসক্ত ছেলে, পরিবারের মুখে কালিমা লেপে দেওয়া মেয়ে —কোনো না কোনো সমস্যায় আমরা পড়বোই। এই সমস্যাগুলো হচ্ছে আমাদের জন্য পরীক্ষা।

পৃথিবীতে আমরা এসেছি পরীক্ষা দিতে —এটা হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। হিন্দি সিরিয়াল, মিউজিক, ভিডিও গেম, রংবেরঙের পানীয়, হাজারো বিনোদন সবসময় আমাদেরকে চেষ্টা করে এই বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দিতে। আমরা নিজেদেরকে প্রতিদিন নানা ধরনের বিনোদনে বুঁদ করে রেখে জীবনের কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করি। আমরা বিনোদনে যতই গা ভাসাই, ততই বিনোদনের প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। যতক্ষণ বিনোদনে ডুবে থাকি, ততক্ষণ জীবনটা আনন্দময় মনে হয়। তারপর বিনোদন শেষ হয়ে গেলেই অবসাদ, বিরক্তি, একঘেয়েমি ঘিরে ধরে। ধীরে ধীরে একসময় আমরা জীবনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। “কেন আমার নেই, কিন্তু ওর আছে?” “কেন আমারই বেলায় এরকম হয়, অন্যের কেন এরকম হয় না?” —এই সব অসুস্থ প্রশ্ন করে আমরা আমাদের মানসিক অশান্তিকে জ্বালানী যোগাই। এত যে অশান্তি, তার মূল কারণ হলো: আমরা যে এই জীবনে শুধু পরীক্ষা দিতে এসেছি —এই কঠিন বাস্তবতাটা ভুলে যাওয়া।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

না! তারা জীবিত, বরং তোমরাই তা উপলব্ধি কর না — আল-বাক্বারাহ ১৫৪

আপনি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন। সামনে হঠাৎ দেখলেন, দুইজন মস্তান এসে এক মহিলার সাথে অশালীন ব্যবহার করছে। তাঁর জিনিসপত্র কেড়ে নিচ্ছে। তাঁর সম্ভ্রমহানি করছে। আশেপাশে মানুষগুলো দেখেও না দেখার ভান করে যে যার মতো হেঁটে যাচ্ছে। আপনার স্ত্রী রাগে, ঘৃণায় দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, “দিনদিন মানুষ কী পশু হয়ে যাচ্ছে? দিনদুপুরে একজন মহিলার সাথে এরকম হচ্ছে, আর কেউ এগিয়ে আসছে না?” আপনার মাথায় রক্ত উঠে গেল। আপনি শার্টের হাতা গুটিয়ে তাদের দিকে এগোচ্ছেন, আর সাথে সাথে আপনার স্ত্রী আপনাকে শক্ত করে জাপটে ধরে চোখ লাল করে তাকিয়ে বললেন, “কী করছ! তোমার কি মাথা খারাপ নাকি? দেখছ না লোকগুলো মস্তান? আমাকে বিধবা করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি? এই মূহুর্তে বাসায় চলো।”

একদিন হঠাৎ রাস্তায় হইচই শুনে আপনি বাসার বারান্দা দিয়ে নীচে তাকিয়ে দেখলেন, কয়েকজন লোক একজন টুপি-দাড়িওয়ালা লোককে ধরে ব্যাপক পেটাচ্ছে। লোকটা বাঁচাও, বাঁচাও বলে গোঙাচ্ছে, কিন্তু আশেপাশে কেউ এগিয়ে আসছে না। একটু দূরে মানুষজন আড়চোখে দেখে, দ্রুত না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছে। আপনার বাবা-মা আপনার পাশে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছেন, আর আফসোস করছেন, “ইস, দেশটার কী অবস্থা! এরা দিনের বেলা সবার সামনে যা খুশি করে বেড়াচ্ছে, কেউ কিছু বলছে না। সব কাপুরুষ হয়ে গেছে।” আপনি সাথে সাথে হাতে একটা লাঠি নিয়ে নীচে যেতে নিলেন, আর আপনার বাবা-মা চিৎকার করে উঠলেন, “কোথায় যাচ্ছ? খবরদার, ঘরের বাইরে বের হবে না। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। আমি তোমার বাবা, আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে নীচে যেতে দিবো না।”

একটা সময় ছিল, যখন একদল মানুষ কোনো ধরনের শারীরিক, মানসিক অত্যাচার, মৃত্যুর পরোয়া না করে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। স্বামী-স্ত্রী একসাথে যুদ্ধে গেছেন। বাবা-ছেলে একে অন্যের পিঠে পিঠ লাগিয়ে তলোয়ার নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। মা নিজের হাতে ছেলেকে যুদ্ধের পোশাকে সাজিয়ে যুদ্ধ করতে পাঠিয়েছেন। তাদের কারণে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়া একটা জাতির হাত থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে। তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই আজকে আমরা ইসলাম পেয়েছি, নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করতে পারছি। তারা আল্লাহর تعالى কাছে এতটাই সন্মানিত যে, আল্লাহ تعالى তাদেরকে ‘মৃত’ বলতে পর্যন্ত আমাদেরকে কঠিন নিষেধ করেছেন—

2_154_title

2_154আল্লাহর تعالى রাস্তায় যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, তাদেরকে মৃত বলবে না। না! তারা জীবিত, বরং তোমরাই তা উপলব্ধি কর না। [আল-বাক্বারাহ ১৫৪]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যারা ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, আল্লাহ অবশ্যই তাদের সাথে আছেন —আল-বাক্বারাহ ১৫৩

আল-বাকারাহ’র এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে জীবনের সকল বিপদ-আপদ, দুঃখ, হতাশাকে হাসিমুখে পার করার জন্য এক বিরাট মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছেন—

2_153_title

2_153যারা বিশ্বাস করেছ, শোনো: ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করো এবং সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। যারা ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, আল্লাহ تعالى অবশ্যই তাদের সাথে আছেন।  [আল-বাক্বারাহ ১৫৩]

আমাদের জীবনে যখন কোনো বড় বিপদ আসে, কষ্টে চারিদিকে অন্ধকার দেখতে থাকি, তখন মুরব্বিদেরকে বলতে শোনা যায়, “সবুর করো, সব ঠিক হয়ে যাবে।” দেশে-বিদেশে মুসলিমদেরকে মেরে শেষ করে ফেলা হচ্ছে, কু’রআন পোড়ানো হচ্ছে, রাস্তাঘাটে টুপি-দাড়িওয়ালা কাউকে দেখলে পেটানো হচ্ছে, আর মসজিদের ইমামদেরকে জুম্মার খুতবায় বলতে শোনা যাচ্ছে, “সবর করেন ভাই সাহেবরা। সব ঠিক হয়ে যাবে। ইসলামের বিজয় নিকটেই—ইন শাআ আল্লাহ।”

ব্যাপারটা এমন যে, আমরা ধৈর্য নিয়ে চুপচাপ বসে থেকে শুধু নামাজ পড়লেই আল্লাহ تعالى আমাদের হয়ে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দিবেন। এই অত্যন্ত প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর মূল কারণ হচ্ছে ‘সবর’ শব্দের অর্থ ঠিকমত না জানা এবং কু’রআনের এই আয়াতে ব্যবহৃত বিশেষ কিছু শব্দের অর্থগুলো ঠিকমত না বোঝা।

এই আয়াতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ রয়েছে: ১) সবর صبر এবং ২) আস্তাই’-নু أستعين । সবর শব্দটির সাধারণত অর্থ করা হয়: ধৈর্য ধারণ করা। কিন্তু সবর অর্থ মোটেও শুধুই ‘ধৈর্য ধারণ করা’ নয় যে, আমরা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব, অত্যাচার মুখ বুঝে সহ্য করে যাব, অবস্থার পরিবর্তনে কিছুই করব না, এই ভেবে যে, একদিন আল্লাহ تعالى সব ঠিক করে দিবেন। প্রাচীন আরবরা যখন ‘সবর’ বলত, তখন এর মধ্যে কোনো দুর্বলতার ইঙ্গিত ছিল না। প্রাচীন আরব কবি হাতিম আত-তাঈ এর একটি কবিতায়[৭] আছে,

তলোয়ার নিয়ে আমরা তাদের বিরুদ্ধে সবর করলাম, কষ্ট এবং যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল, স্থির হয়ে গেল।

আরেকটি কবিতা জুহাইর ইবন আবি সুল্মা[৭] এর লেখা—

শক্তিশালী যুদ্ধের ঘোড়ায় চেপে রাজার জামাইরা যুদ্ধের ময়দানে সবর করল, যখন অন্যরা আশা হারিয়ে ফেলেছিল।

উপরের উদাহরণে সবর-এর ব্যবহার দেখলেই বোঝা যায়, সবর মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। সবর এর অর্থ হচ্ছে: প্রতিকূলতার মধ্যে ধৈর্য নিয়ে, লক্ষ্য ঠিক রেখে, অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সুযোগের অপেক্ষা করা।[৫] সবরের তিনটি অংশ রয়েছে: ১) ধৈর্যের সাথে কষ্ট, দুর্ভোগ সহ্য করা, ২) অবস্থার পরিবর্তন করতে গিয়ে কোনো পাপ করে না ফেলা, ৩) আল্লাহর تعالى আনুগত্য থেকে সরে না যাওয়া।[৪] মানুষ সাধারণত সবর বলতে প্রথমটিকেই বুঝে থাকে। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য এই তিনটিই বাধ্যতামূলক। এই তিনটির একটি যদি বাদ যায়, তাহলে তা কু’রআন এবং হাদিসের ভাষায় সবর নয়।[৪]

আস্তা’ই-ন এর অর্থ করা হয়: সাহায্য চাও। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে: আপনি একা চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারছেন না, আপনি এখন সহযোগিতা চান। যেমন: রাস্তায় আপনার গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। আপনি একা ঠেলে পারছেন না। তখন আপনি রাস্তায় কাউকে অনুরোধ করলেন আপনার সাথে ধাক্কা দেবার জন্য। এটা হচ্ছে আস্তা’ই-ন। কিন্তু আপনি যদি আরামে গাড়িতে এসি ছেড়ে বসে থেকে রাস্তায় কাউকে বলতেন ধাক্কা দিতে, তাহলে সেটা আস্তাই’ন হতো না।[১] একারণেই আমরা সূরা ফাতিহাতে বলি: ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাই’ন—আমরা যথাসাধ্য চেষ্টার সাথে সাথে আল্লাহর تعالى কাছে সাহায্য চাই।

এই দুটি শব্দ যখন একসাথে হয়: আস্তাইনু বিস-সাবরি أ سْتَعِينُوا۟ بِٱلصَّبْرِ তখন এর মানে দাঁড়ায়: যতই কষ্ট, দুর্ভোগ হোক, অবস্থার পরিবর্তন করতে গিয়ে কোনো পাপ কাজ না করে হালাল উপায়ে চেষ্টা করতে থাকা, নিজের ঈমানকে ঠিক রাখা এবং একই সাথে আল্লাহর تعالى কাছে সাহায্য চাওয়া।

সালাহ (নামাজ) শব্দটির একটি অর্থ হলো ‘সংযোগ’, আর সালাহ’র বহুবচন হলো সালাত। সালাতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর تعالى সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করি, সবসময় তাঁকে মনে রাখি। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একারণেই দিয়েছেন, যেন আমরা কাজের চাপে পড়ে, হিন্দি সিরিয়াল আর  খেলা দেখতে গিয়ে বা রাতভর ভিডিও গেম খেলতে গিয়ে তাঁকে ভুলে না যাই। কারণ তাঁকে ভুলে যাওয়াটাই হচ্ছে আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। যখনি আমরা আল্লাহকে تعالى একটু একটু করে ভুলে যাওয়া শুরু করি, তখনি আমরা আস্তে আস্তে অনুশোচনা অনুভব না করেই খারাপ কাজ করতে শুরু করি। আর এখান থেকেই শুরু হয় আমাদের পতন।

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তার কিছু উদাহরণ দেই—

আপনি অনেক চেষ্টা করেও একটা ব্যবসা ধরতে পারছেন না। মাত্র কয়েক লাখ টাকা ঘুষ দিতে না পারার জন্য কাজটা আপনার হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু না, আপনি ঘুষ দেবেন না, মামা-চাচা ধরবেন না, মন্ত্রীকে একটা ফ্লাট কিনে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তদবির করবেন না।  আপনি ধৈর্য ধরে, কোনো পাপ না করে, নামাজে আল্লাহর تعالى কাছে সাহায্য চাইবেন এবং একই সাথে চেষ্টা করতে থাকবেন: অন্য কোনো হালাল উপায়ে এগোনো যায় কি না। যদি শেষ পর্যন্ত কোনো হালাল উপায়ে ব্যবসাটা না-ও হয়, ভালো কথা, অন্য কিছুর জন্য চেষ্টা করবেন। আল্লাহর تعالى উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখবেন যে, আপনার ভালোর জন্য আল্লাহ تعالى আপনাকে সেই ব্যবসাটা করতে দিতে চাননি অথবা আপনার ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করা হয়েছে মানুষের বৃহত্তর কল্যাণের জন্য।

আপনার বাচ্চার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। আপনি তার মাথায় পানি না ঢেলে, তাকে ডাক্তার না দেখিয়ে, জায়নামাজে বসলেন আল্লাহর تعالى কাছে সাহায্য চাওয়ার জন্য—এটা এই আয়াতের শিক্ষা নয়। আপনি বাচ্চার চিকিৎসার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন, আর নামাজে বারবার আল্লাহর تعالى কাছে সাহায্য চাইবেন—এটাই এই আয়াতের শিক্ষা। আবার অনেকে বাচ্চার কঠিন অসুখ হলে এবং অনেক চেষ্টার পরও অসুখ ভালো না হলে, আল্লাহর تعالى উপর রাগ করে নামাজ পড়া ছেড়ে দেন, “কেন আমার বাচ্চারই এই কঠিন অসুখটা হবে? আমি কী অন্যায় করেছি? ওই ঘুষখোর চৌধুরী সাহেবের বাচ্চার কিছু হয় না কেন?”—ঠিক এই কাজটা করতেই এই আয়াতে মানা করা আছে।

দেশে ইসলামের দুর্দিন যাচ্ছে, মুসলিমদের ধরে মেরে ফেলা হচ্ছে, মসজিদে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আপনার টুপি-দাড়ি বা হিজাব দেখে একদিন আপনাকে রাস্তায় কিছু বখাটে যুবক ধরে মারধোর করল, আর আপনি ঘরে বসে শুধুই আল্লাহর تعالى কাছে কান্নাকাটি করছেন, যেন আল্লাহ تعالى দেশের অবস্থার পরিবর্তন করে দেন, আবার দেশের মুসলিমদেরকে ক্ষমতা দিয়ে দেন, দেশে ইসলামের রাজত্ব কায়েম করে দেন—এটা এই আয়াতের শিক্ষা নয়। এই আয়াতের শিক্ষা হচ্ছে: আপনার প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলে, আপনি ন্যায় বিচার পাবার জন্য পুলিশের কাছে যাবেন, দরকার হলে সেই যুবকগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করবেন। যতদিন ন্যায় বিচার না পাচ্ছেন: চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করবেন, পত্রিকায় লেখালেখি করবেন এবং একই সাথে প্রতিদিন আল্লাহর تعالى কাছে নামাজে সাহায্য চাইবেন। কিন্তু কখনই প্রতিশোধ নেওয়ার মনোভাব থেকে কু’রআনের বিরুদ্ধে যায়, এমন কোনো কাজ করে ফেলবেন না। যেমন, বোমাবাজি, রাস্তায় নিরীহ মানুষের গাড়ি ভাঙা, নিরীহ মানুষের জীবনে সমস্যার সৃষ্টি করা ইত্যাদি কু’রআনের শিক্ষার বিরোধী কোনো কাজ করবেন না। আল্লাহর تعالى উপর ভরসা রাখবেন যে, তিনি একদিন না একদিন ন্যায় বিচার করবেনই, সেটা এই দুনিয়াতে না হলে, আখিরাতে অবশ্যই হবে।

আয়াতের শুরুটা খুব গুরুত্বপূর্ণ: يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ — “যারা ঈমান এনেছ, শোনো।” আল্লাহ تعالى এখানে বিশেষভাবে ঈমানের সাথে সবর এবং সালাতকে জুড়ে দিয়েছেন। কারণ যারা ঈমান আনেন, তাদেরকে প্রতিনিয়ত সবরের পরিচয় দিতে হয়। আমরা যারা ইসলাম মেনে চলার চেষ্টা করি, আমাদের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় আমাদের কাছের মানুষরা আমাদের মনের এমন সব দুর্বল জায়গায় আঘাত করে, এমন সব খারাপ কাজ করে, যার জন্য আমরা ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে মরি। আমরা ইচ্ছা করলেই এমন এক চরম প্রতিশোধ নিতে পারি যে, এর পরে ওরা আর কোনোদিন আমাদের সাথে এরকম করার কথা চিন্তাও করবে না—শুধু দরকার একটুখানি অন্যায় করা, ইসলামের গণ্ডির বাইরে এক পা দেওয়া। কিন্তু আল্লাহর تعالى কথা মনে রেখে আমরা তা করি না। ঈমান নষ্ট করার ঝুঁকি নিই না। রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে অস্থির হয়ে এপাশ-ওপাশ করতে থাকি, মনে মনে রিহার্সাল করতে থাকি: একটা উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য কী কী বলা যায়, কী কী করা যায়—কিন্তু পরদিন ঠিকই নিজেকে সংবরণ করি, যেন এমন কোনো কিছু করে না ফেলি, যার জন্য আল্লাহকে تعالى জবাব দিতে পারব না —এটা সবরের লক্ষণ।

আল-বাক্বারাহ’র এই আয়াতে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য শিখতে পারি: বিপদে পড়লে আল্লাহর تعالى কাছে ধৈর্যের সাথে চেষ্টা এবং নামাজ —এই দুটোর মাধ্যমেই সাহায্য চাইতে হবে। এর একটিও বাদ দিলে হবে না। আর যারা ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, আল্লাহ تعالى তাদের সাথে থাকবেন বলে তিনি কথা দিয়েছেন।

আমরা অনেক সময় জীবনে দুঃখ-কষ্টে পড়লে একাকী অনুভব করি, নিজেকে অসহায় ভাবি। মনে মনে হাহাকার করি, “কেউ কি নেই যার কাছে গিয়ে একটু মনের কষ্টের কথা বলতে পারি, একটু বুকটা হালকা করতে পারি?” —এর উত্তর আল্লাহ تعالى দিয়েছেন:

যারা ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা (সবর) করে, আল্লাহ تعالى অবশ্যই তাদের সাথে আছেন।

আমরা যখন সবর করছি, তিনি আমাদের পাশে আছেন। আমাদের কখনো একাকী অনুভব করার, নিজেকে নিরুপায়, অসহায় মনে করার কোনো কারণ নেই, কারণ আল্লাহ تعالى অবশ্যই আছেন আমাদের পাশে। আমরা যে কোনো সময় নামাজে দাঁড়িয়ে, তাঁর সামনে মাথা নত করে বুকের ভেতর জমে থাকা সব দুঃখ, কষ্ট, অপমান, হতাশা উজাড় করে দিতে পারি। তিনি অবশ্যই তা শুনবেন। তিনি আস-সামি’: সব কিছু শোনেন। আমরাই বরং তাঁর সাথে কথা বলি না।

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।

আমাকে মনে করো, আমিও তোমাদেরকে মনে করবো — আল-বাক্বারাহ ১৫২

2_152_title

2_152তাই আমাকে মনে করো, আমিও তোমাদেরকে মনে করবো। আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, আর আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না। [আল-বাক্বারাহ ১৫২]

কু’রআনে একটি ব্যাপার বার বার ঘুরে ফিরে আসে: আল্লাহর تعالى প্রতি আমাদেরকে কৃতজ্ঞতা দেখাতে হবে। প্রশ্ন আসে: আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানোর জন্য এত জোর দেওয়া হয়েছে কেন? আল্লাহর تعالى তো কোনো কিছুর দরকার নেই? তাহলে কৃতজ্ঞতা দেখিয়ে কার কী লাভ হচ্ছে?

টাইম ম্যাগাজিনে একটি আর্টিকেল[২৮৫] বের হয়েছে কৃতজ্ঞতার উপকারিতার উপরে। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে ২,৬১৬ জন বয়ঃপ্রাপ্ত মানুষের উপরে গবেষণা করে দেখা গেছে: যারা অপেক্ষাকৃত বেশি কৃতজ্ঞ, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা, অমূলক ভয়-ভীতি, অতিরিক্ত খাবার অভ্যাস এবং মদ, সিগারেট ও ড্রাগের প্রতি আসক্তির ঝুঁকি অনেক কম। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে: মানুষকে নিয়মিত আরও বেশি কৃতজ্ঞ হতে অনুপ্রাণিত করলে, মানুষের নিজের সম্পর্কে যে হীনমন্যতা আছে, নিজেকে ঘৃণা করা, নিজেকে সবসময় অসুন্দর, দুর্বল, উপেক্ষিত মনে করা, ইত্যাদি নানা ধরণের সমস্যা ৭৬% পর্যন্ত দূর করা যায়।

২০০৯ সালে ৪০১ জন মানুষের উপর গবেষণা করা হয়, যাদের মধ্যে ৪০%-এর ক্লিনিকাল স্লিপ ডিসঅর্ডার, অর্থাৎ জটিল ঘুমের সমস্যা আছে। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, তারা একনাগাড়ে বেশি ঘুমাতে পারেন, তাদের ঘুম নিয়মিত হয়, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েন এবং দিনের বেলা ক্লান্ত-অবসাদ কম থাকেন।

নিউইয়র্কের Hofstra University সাইকোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ড: জেফ্রি ফ্রহ ১০৩৫ জন ১৪-১৯ বছর বয়সি শিক্ষার্থীর উপর গবেষণা করে দেখেছেন: যারা বেশি কৃতজ্ঞতা দেখায়, তাদের পরীক্ষায় ফলাফল অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো, সামাজিক ভাবে বেশি মেলামেশা করে এবং হিংসা ও মানসিক অবসাদে কম ভোগে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই মানসিক সমস্যাগুলো মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাদের মধ্যে বাবা-মার প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ আশংকাজনকভাবে কম।

Wall Street Journal একটি আর্টিকেলে[২৮৬] বলা হয়েছে

যেসব বয়ঃস্থ মানুষ প্রতিনিয়ত কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন: তাদের কর্মস্পৃহা, জীবনসম্বন্ধে তাদের আস্থা, তাদের সামাজিক মেলামেশা, এবং তাদের সুখানুভূতি কৃতজ্ঞতাবোধহীনদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি হয়ে থাকে –প্রায় এক যুগ গবেষণার ফল থেকে এটি জানা গেছে। এদের মধ্যে হতাশা, ঈর্ষা, লোভ অথবা মদ্যপানে আসক্তি আসার সম্ভাবনা কম। এরা অপেক্ষাকৃত বেশি আয় করে থাকে, এরা গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়ে, এরা নিয়মিত ব্যায়াম করার সুযোগ পায় এবং ভাইরাসজনিত রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও এদের বেশি।

এবার বুঝতে পারছেন, কেন আমাদের প্রতিদিন ৫ ওয়াক্তে, কমপক্ষে ১৭ বার সুরা ফাতিহায় বলা উচিত—

আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন
সমস্ত প্রশংসা এবং ধন্যবাদ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিজগতের প্রভু। [ফাতিহা ১:২]

“আমাকে মনে করো”

ٱذْكُرُوا۟ এসেছে ذكر থেকে, যা কু’রআনে অনেকগুলো অর্থে এবং উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে: ১) উল্লেখ করা, ২) মুখস্থ করা, ৩) পুনরায় মনে করা, ৪) মনে রাখা, ৫) কিছু নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা, ৬) উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা, ৭) উপলব্ধি করে অনুতপ্ত হওয়া, ৮) কোনো শিক্ষাকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি।[১৪২] আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলছেন: তিনি আমাদের যা কিছু দিয়েছেন, তার সব আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হবে, নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি আমরা তা করি, তাহলেই আমরা তাক্বওয়া অর্থাৎ আল্লাহর تعالى প্রতি সবসময় গভীরভাবে সচেতন থাকতে পারবো।

অনেক সময় আমরা যিকর বলতে শুধু নিজেকেই মনে করানো বুঝি। কিন্তু যিকরের একটি অর্থ হলো: কাউকে মনে করানো, উল্লেখ করা। ধরুন, আপনার পরিবারের এক সদস্য গত কয়েক ঘণ্টা ধরে সোফায় বসে একটার পর একটা চ্যানেল পাল্টাচ্ছে, আর হাতে চিপস নিয়ে যাবর কাটছে। আপনি তাকে গিয়ে তাগাদা দিলেন: সে কী চরম অর্থহীন একটা কাজ করে জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করছে — সেটা ভালো করে বোঝালেন। তাকে আল্লাহর تعالى কথা মনে করিয়ে দিলেন — তখন এটা যিকর হয়ে যাবে। যিকর মানে শুধুই নিজে নিজে দু’আ পড়া নয়।[১]

এছাড়াও, আল্লাহকে تعالى মনে করা মানে শুধু মুখে যিকর করাই নয়, বরংতাঁর আদেশ অনুসারে কাজ করা, এবং নিষেধ অনুসারে খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকাই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তাঁকে মনে করা।[৪] [১৪] কারণ আমরা যখন আল্লাহর تعالى নির্দেশকে অমান্য করতে থাকি, তখন আমরা তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে যাই। যখন আমরা অফিসের কাজ, বাচ্চাকে স্কুলে আনা-নেওয়া, সপ্তাহের বাজার, মেহমানদারী করতে গিয়ে ওয়াক্তের পর ওয়াক্ত নামাজ ছেড়ে দেই, আমরা শুধু তাঁর অবাধ্যই হই না, তাঁর প্রতি আমরা অকৃতজ্ঞও হয়ে যাই। যদি আমরা সত্যিই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতাম, তাহলে কখনই অফিসের বস-সন্তান-ঘরের কাজ থেকে তাঁকে কম গুরুত্ব দিতাম না।

যিনি আমাদের স্বাস্থ্য, সম্পত্তি, সংসার, সন্তান, সঙ্গ, সম্মান, সম্ভ্রম —সবকিছুর মালিক, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে বা কিছুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, সেগুলোর পেছনে দৌড়াতে গিয়ে তাঁকেই ভুলে যাওয়া এবং ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয়ে তাঁর নিষেধ অমান্য করা—এধরনের কাজগুলো তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন ছাড়া আর কিছু নয়।

“আমিও তোমাকে মনে করবো”

আল্লাহ تعالى আমাদের কথা মনে করবেন! সৃষ্টিজগতের মহান সম্রাট আমাদের কথা বলবেন! এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?

একটা উদাহরণ দেই। ধরুন, চৌধুরী সাহেব একজন মন্ত্রীর কাছে মাসের পর মাস ধরে তদবির করছেন তার একটা পদোন্নতির ব্যাপারে। একদিন তাকে মন্ত্রী ফোন করে বলল, “চৌধুরী সাহেব, খুশির খবর। আজকে প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে আপনার কথা বললাম। প্রধানমন্ত্রী নিজে আপনার কাগজ-পত্র দেখতে চাইলেন, আপনার ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন।” —এই কথা শুনে চৌধুরী সাহেব আনন্দে গদগদ হয়ে গেলেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে তার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছেন? কী সৌভাগ্যের কথা!

এবার চিন্তা করে দেখুন, আপনি যখন আল্লাহ ﷻ কে স্মরণ করছেন, এই যে আর্টিকেলটা পড়ছেন, হতে পারে এই মুহূর্তে এক ঐশ্বরিক সমাবেশে উচু-পর্যায়ের সৃষ্টিদের সাথে, মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ-ক্ষমতাবান নিজে আপনার ব্যাপারে কথা বলছেন। আপনি যে তাঁকে মনে করছেন, সেটা তিনি নিজে লক্ষ্য করছেন। তিনি এই মুহূর্তে আপনাকে পুরস্কার লিখে দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন, হয়তো বা আপনার ভাগ্য পরিবর্তনেরও নির্দেশ দিচ্ছেন। আপনার এই মুহূর্তটি কত বড় সম্মানের একটি মুহূর্ত!

“আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও, আর আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না”

এই অংশে আল্লাহ تعالى বলছেন: তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে এবং তাঁর প্রতি অকৃতজ্ঞ না হতে। কেন তিনি শুধুই কৃতজ্ঞ হতে বলে আয়াত শেষ করে দিলেন না? আলাদা করে অকৃতজ্ঞ হতে না বলার প্রয়োজন কী ছিল?

আল্লাহ تعالى জানেন: আমরা তাঁর প্রতি যথাযথ কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারবো না। তিনি যে প্রতিদিন আমাদেরকে কত কিছু দেন, আমাদের অগোচরে কত বিপদ থেকে বাঁচান, আমাদের না জানিয়ে কত দিক থেকে সমস্যাগুলোকে সহজ করে দেন —সেটা আমরা উপলব্ধি করতে পারবো না, তাঁকে যথাযথ সম্মানও করতে পারবো না। তাই আমরা তাঁর প্রতি ঠিকমতো কৃতজ্ঞতা না দেখালেও, অন্তত যেন অকৃতজ্ঞতা না দেখাই। অকৃতজ্ঞতা দেখালে তিনি তা ছেড়ে দেবেন না।

আমরা কীভাবে আল্লাহর تعالى প্রতি অকৃতজ্ঞতা দেখাই, তার কিছু উদাহরণ দেই—

বিশ বছর পড়াশুনা করে বের হওয়ার পর দেখা যায় আর চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসার সুযোগ নেই। মাসের পর মাস ইন্টার্ভিউ দিতে দিতে অবস্থা কাহিল। বাসায় এসে রাতে খেতে বসলে বাবা-মা ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ দিয়ে বলেন, “এভাবে আর কতদিন চলবে? একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে?” বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, মাথার উপরে ছাদ, শোয়ার বিছানা, কল ছাড়লেই পরিষ্কার পানি, চুলায় গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, তিনবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা, ফ্রিজ ভর্তি খাবার —এতসব থাকতেও প্রতিদিন নিজের ভেতরে হাহাকার চলে, “ও আল্লাহ تعالى, এভাবে আর কত দিন? কেন আপনি আমার সাথেই এরকম করছেন? আমার বন্ধুদের চাকরি হয়, আমার কেন হয় না? চাচাতো ভাইয়েরা বাড়ি-গাড়ি করে ফেলেছে, আর আমি বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি? কেন আপনি আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছেন?”

একদিন চাকরি-ব্যবসা হয়। সম্পত্তির মালিক হয়। বিয়ে হয়। তারপর দেখা যায় সন্তান হচ্ছে না। বছরের পর বছর পার হয়ে যাচ্ছে। অনেক ডাক্তার দেখিয়ে লাভ হচ্ছে না। কত গরিবদের খাওয়ানো, মাজারে দান, পানি-পড়া, ডাব-পড়া, তেল-ম্যাসাজ, কালো জিরা চলে। অথচ হিসেব করলে দেখা যাবে: ভালো বেতনের চাকরি, যথেষ্ট সম্পত্তি, গুণবতী স্ত্রী, সুস্থ বাবা-মা, নিজের বাড়ি, গাড়ি, বাসায় চাকর —সব আছে। এতসবকিছু থাকতেও সে মনের দুঃখে নামাজ পড়া ছেড়ে দিয়েছে, আর প্রতি দিন আক্ষেপ করছে, “ও আল্লাহ تعالى, আপনি আমাদের সাথে এরকম কেন করছেন? আমরা কি খুব বেশি কিছু চাই আপনার কাছে? সবার সন্তান আছে। আমাদেরকে কেন দেবেন না? আমরা কী অন্যায় করেছি?”

আমাদের অনেকেরই বেলায় দেখা যায়: স্বাস্থ্য, সম্পত্তি, সংসার, সন্তান, সঙ্গ, সম্মান, সম্ভ্রম—এগুলোর কোনো একটা বা দুটা যদি না থাকে, বা কম থাকে, শুরু হয় হতাশা, আক্ষেপ, দুঃখ, আল্লাহকে تعالى নিয়ে অভিযোগ। যেমন ধরুন, কারো স্বাস্থ্য, সম্পত্তি, সন্তান, সঙ্গ, সম্মান, সম্ভ্রম —এই সবই আছে, শুধু সংসারে ঝামেলা। শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে প্রায়ই সমস্যা, কটু কথা থেকে ঝগড়া। ব্যাস, তার জীবন যেন বরবাদ হয়ে যায়। যখনি তার সাথে দেখা হয়, আধাঘণ্টা ধরে তার জীবনের করুণ কাহিনীর বর্ণনা। দুই-একদিন পরপর কাউকে ফোন করে এক ঘণ্টা ধরে তার শোকগাঁথা না শোনালে তার বুকের পাথর নামে না। নামাজে আল্লাহর تعالى কাছে কত অভিযোগ, “ও আল্লাহ تعالى, শেষ পর্যন্ত এই রেখেছিলেন আমার কপালে? আমাকে কেন এত শয়তান স্বামী/স্ত্রী দিলেন? আমার বন্ধুরা কত ভালো পরিবার পেয়েছে। আমি কি একটু শান্তির জীবন পেতে পারতাম না?”

যখন আমাদের জীবনে কোনো দিক থেকে কিছু কম থাকে এবং আমরা আশেপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে দেখি: তাদের তো সেটা ঠিকই আছে, তখন প্রশ্ন করা শুরু করি, “তাহলে আমার নেই কেন? আমি কী দোষ করেছি?” কিন্তু আমরা কখনো খুঁজে দেখি না যে, যাদেরকে দেখে আক্ষেপ করছি, তাদর স্বাস্থ্য, সম্পত্তি, সংসার, সন্তান, সঙ্গ, সম্মান, সম্ভ্রম —এই সবগুলোর মধ্যে কোনোদিকে কিছু একটা কম আছে কিনা। আমরা শুধু দেখি: আমার যা নেই বা যা কম আছে, সেটা আর কার কার আছে। যাদের আছে, “ওরা কতই না সুখী। শুধু আমি হচ্ছি পোড়া কপাল।” খোঁজ নিলে দেখা যায়, তারাও একই কথা ভাবছে। তাদের যা নেই, সেটা আমার কেন আছে, তা নিয়ে তাদের কত না হা-হুতাশ।

অনেক বছর আগে আল্লাহ যখন ইবলিসকে তাঁর সান্নিধ্য থেকে বের করে দিচ্ছিলেন, তখন ইবলিস একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শপথ করেছিল, যা থেকে তার মানুষকে ধ্বংস করার অন্যতম একটি প্রধান পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়—

(ইবলিস বলল) “আমি মানুষের কাছে আসব: ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই কৃতজ্ঞ না।” [আ’রাফ ৭:১৭]

ইবলিস অনেক আগেই বলে গিয়েছিল যে, আমরা বেশিরভাগই আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞ হবো না, যার কারণে আমরা দুনিয়া এবং আখিরাতে পস্তাবো। আজকে আমরা ওরই কথা প্রতিনিয়ত সত্যি প্রমাণ করে দিচ্ছি।

এখন, আমাদের কারো জীবনে যদি দশটা দিকের মধ্যে তিনটা দিকে সমস্যা থাকে, তাহলে আমরা সেই তিনটা দিকও কেন ভালো হলো না, তা নিয়ে প্রতিনিয়ত আক্ষেপ করতে পারি, অথবা বাকি সাতটা দিকে আল্লাহ যে আমাদের যথেষ্ট ভালো রেখেছেন, তা নিয়ে প্রতিদিন তাঁকে কৃতজ্ঞতা দেখাতে পারি। কোনটা করবো, তা ঠিক করতে এই আয়াতটি কিছুটা অনুপ্রেরণা দেবে—

মনে করে দেখো, তোমাদের প্রভু কথা দিয়েছিলেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি তোমাদেরকে আরও দিতেই থাকবো। কিন্তু তোমরা যদি অকৃতজ্ঞ হও… আমার শাস্তি প্রচণ্ড কষ্টের।” [ইব্রাহিম ১৪:৭]

আল্লাহর تعالى উপরে যারা পুরোপুরি নির্ভর করতে পারেন, তারা গাজার বোনদের মত নিশ্চিন্তে হিজাব পরে রাতে ঘুমাতে যান। কারণ তারা মেনে নিয়েছেন: আল্লাহ تعالى যদি চান, তাহলে আজকে রাতেই তিনি শহিদ হবেন। তখন উদ্ধারকারীরা যেন তাকে বেপর্দা অবস্থায় দেখে না ফেলে। তারা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে বাইরের পোশাক পরিয়ে, পকেটে খাবার গুঁজে দিয়ে বিছানায় শোয়ান। হয়ত আজকে রাতেই তার সন্তানরা একা একা রাস্তায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে থাকবে। আগামীকাল থেকে বাবা-মা ছাড়া জীবন পার করতে হবে —তাই তারা প্রস্তুত। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, সবই আল্লাহর تعالى ইচ্ছে। আল্লাহ تعالى যখন চাইবেন, তখন তা হবেই।

এই ধরনের মুমিনদের চাকরি নিয়ে অস্থিরতা থেকে মানসিক চাপ (স্ট্রেস), প্রেমে বিফলতার কারণে হতাশা, অপারেশনের আতঙ্কে রাতে ঘুম না হওয়া, ছেলেমেয়েদের পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে উচ্চ রক্তচাপ বাঁধিয়ে ফেলা —এই সব সমস্যায় জীবন জর্জরিত হয়ে যায় না। এই সমস্যাগুলো আমাদের মত নড়বড়ে ঈমানের মানুষদের সমস্যা, যারা আল্লাহর تعالى প্রতি কৃতজ্ঞ হয় না, এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহর تعالى প্রতি অকৃতজ্ঞতা দেখায়।

আসুন আমরা কু’রআনের আয়াতগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করি। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কু’রআন দিয়েছেন এক আত্মিক নিরাময় হিসেবে। আমাদের অনেক মানসিক সমস্যার সমাধান রয়েছে কু’রআনে। নিয়মিত বুঝে কু’রআন পড়লে আমরা খুব সহজেই ওষুধের উপর আমাদের নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারব। স্ট্রেস-ডিপ্রেশন থেকে মুক্ত হয়ে শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ জীবন যাপন করতে পারব — ইন শাআ আল্লাহ।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • [১৪২] ذكر যিকর শব্দের বিস্তারিত অর্থ।
  • [২৮৫] Szalavitz, M. and Szalavitz, M. (2015). Why Gratitude Isn’t Just for Thanksgiving | TIME.com. [online] TIME.com. Available at: http://healthland.time.com/2012/11/22/why-gratitude-isnt-just-for-thanksgiving/ [Accessed 28 Apr. 2015].
  • [২৮৬] Beck, M. (2015). Thank You. No, Thank You. [online] WSJ. Available at: http://www.wsj.com/articles/SB10001424052748704243904575630541486290052 [Accessed 28 Apr. 2015].