তোমার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, এক যথার্থ উপহার —আন-নাবা

নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতি সদাসতর্কদের জন্যই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা— বাগানের পর বাগান, আঙ্গুরের সমাহার, আকর্ষণীয় মানানসই জুটি, উপচে পড়া পানপাত্র। সেখানে তারা কোনো ধরনের ফালতু কথা বা মিথ্যা কথা শুনবে না —তোমার রবের পক্ষ থেকে পুরস্কার, এক যথার্থ উপহার। —আন-নাবা ৩১-৩৬

নিঃসন্দেহে আল্লাহর প্রতি সদাসতর্কদের জন্যই রয়েছে চূড়ান্ত সফলতা

আল্লাহ تعالى আছেন এবং তিনি আমাদের সব কাজ দেখছেন, সব কথা শুনছেন এবং সব চিন্তা বুঝতে পারছেন —এই ব্যাপারে যারা সদা-সতর্ক থাকে এবং তাঁর ভয়ে নিজের কথা-কাজ-চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে, তারাই হচ্ছেন মুত্তাকী অর্থাৎ তাকওয়াবান। শুধুমাত্র তাকওয়াবানদেরকে আল্লাহ تعالى নিশ্চয়তা দিয়েছেন চূড়ান্ত সফলতার।

কেন তাকওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ? শুধু নামাজ, রোজা, হাজ্জ করলেই কি যথেষ্ট নয়?

তাকওয়া নেই এমন পাঁচ-ওয়াক্ত-নামাজী বাসায় এসে পরিবারের সাথে, কাজের লোকের সাথে, এমনকি নিজের সন্তানের সাথে দানবের মত আচরণ করে। তাকওয়া নেই এমন হাজ্জি ঘুষ খেয়ে হজ্জে যায় এবং হজ্জ থেকে ফিরে এসে আবার ঘুষ খায়। তাকওয়া নেই এমন দাড়িওয়ালা পণ্যে ভেজাল দেয়, কমদামী মাল বেশী দামে চালিয়ে দেয়, কাগজপত্রে মিথ্যা কথা লিখে অন্যায় সুবিধা নেয়, অফিসে লুকিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করে, নামাজ পড়তে বের হয়ে আর সহজে কাজে ফেরত আসে না ইত্যাদি। —ধর্মীয় বেশভূষাধারী এই মানুষগুলোর স্বভাব এবং কাজের জন্য ইসলামের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যায়, কারণ এদেরকে দেখে অন্যেরা মনে করে যে, এটাই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের শিক্ষা। ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখন এরাই করে।

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আকাশকে খুলে দেওয়া হবে — আন-নাবা ১৭-৩০

চৌধুরী সাহেব স্বপরিবারে সমুদ্রের পাড়ে বেড়াতে এসেছেন। পাড়ে বসে তারা সমুদ্র উপভোগ করছিলেন, কিন্তু তার শিশু বাচ্চাটি এখন ক্ষুধায় কান্না শুরু করেছে। স্ত্রীকে নিয়ে উঠলেন নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজে বের করতে। তারা হেঁটে যাচ্ছিলেন, আর তখন এক ভীষণ শব্দে কানে তালা লেগে গেলো। তারপর পায়ের নিচে মাটি ভীষণ জোরে ঝাঁকুনি দিলো। তিনি দূরে ছিটকে পড়ে গেলেন। 

উপরে তাকিয়ে দেখলেন আকাশটা যেন গোলাপের মত লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, আকাশটাকে পৃথিবীর উপর থেকে ছিঁড়ে তুলে ফেলা হয়েছে। মহাকাশ খালি চোখে দেখা যাচ্ছে। আর পুরো মহাকাশে অজস্র ফাটল তৈরি হচ্ছে। তারাগুলো একে একে ঝরে যাচ্ছে। সূর্যকে কালো একটা কী যেন ঘিরে ফেলছে। দিনের বেলাতেও রাতের মত অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। চাঁদের শেষ আলোটুকুও একসময় নিভে গেলো। 

সৈকতে যারা ছিল সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে একেক দিকে দৌড়াচ্ছে। এমনকি তার স্ত্রীও বাচ্চা ফেলে আতংকে দৌড়াচ্ছেন। তিনি হতবিহ্বল হয়ে ছুটছেন। কোন দিকে যাবেন কিছুই জানেন না। 

সামনে একটা পাহাড় দেখে সেদিকে দৌড় দিলেন, যদি উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়া যায়। কিন্তু তিনি পৌঁছানোর আগেই এক ভীষণ ঝাপটা এসে পাহাড়টাকে গুড়ো-গুড়ো করে ধুলোর মতো উড়িয়ে নিয়ে গেলো। পেছনে সমুদ্রে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে পানি আকাশে ছিটকে উঠলো। তারপর সমুদ্রের পানিতেই আগুন ধরে গেল। এই অস্বাভাবিক ঘটনা দেখে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না কী হচ্ছে চারপাশে! এটা তো কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়! 

একের পর এক ঝাপটায় আশেপাশের সবকিছু ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তিনি হতবিহব্বল হয়ে তাকিয়ে দেখছেন। তার দৌড়ে পালানোর কোনো জায়গা নেই। হঠাৎ করে তার গায়ে এসে একটা বাড়ি লাগলো…

সবকিছু অন্ধকার, নিশ্চুপ হয়ে গেলো। 

এরপর অনন্ত কাল যেন পার হয়ে গেলো।

চৌধুরী সাহেব চোখ খুলে তাকালেন। তার কানে এখন আরেকটি শব্দ বাজছে। তার মনে হলো, তিনি যেন এখনি মাটির ভেতর থেকে ছিটকে বেড়িয়ে এলেন। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলেন অজস্র মানুষের সমুদ্র। সবাই হতবিহব্বল হয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। কেউ কেউ বিস্ফোরিত চোখে উপরে তাকিয়ে আছে। উপরে তাকিয়ে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। এটা তো পরিচিত কোনো আকাশ নয়। অন্য কোনো জগতের আকাশ মনে হচ্ছে! আকাশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত ছিঁড়ে ফাঁক করা। সেই ফাঁক দিয়ে উপরে দেখা যাচ্ছে প্রকাণ্ড কারা যেন এক ভীষণ আকৃতির কিছুকে তুলে ধরে রেখেছে।

নিচে তাকিয়ে তিনি অদ্ভুত একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলেন। পায়ের নিচে একদম মসৃণ সমতল মাটি। একটুও দাগ বা ভাঁজ নেই। যেদিকেই তাকান, সেদিকেই মসৃণ সমতল ভূমি, কোথাও উঁচু-নিচু কিছুই নেই। এটা তো সেই চিরচেনা পৃথিবীর মাটি নয়। মনে হচ্ছে ভিনগ্রহে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি! 

তিনি সামনে থেকে কারো ডাক শুনলেন। সাথে সাথে তার দেহ নিজে থেকেই সেদিকে দৌড়ানো শুরু করল। তার আশেপাশের মানুষগুলোও দলে দলে সবাই পঙ্গপালের মতো সামনে দৌড়ে যাচ্ছে সেই ডাক শুনে। কী যেন ঘটতে যাচ্ছে সামনে! 

হঠাৎ করে তিনি এক ভীষণ আতংক অনুভব করলেন। কিছু একটা আসছে। অনেক দূর থেকে গর্জন করতে করতে বিশাল এক ভয়ংকর দানব যেন আসছে। দূরে দিগন্তে তাকিয়ে যা দেখলেন তাতে তিনি ভয়ে জমে গেলেন। এক বিশাল আগুনের জগতকে প্রকাণ্ড আকৃতির কারা যেন টেনে নিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে পুরো জগতটাই একটা হিংস্র দানব। হঠাৎ করে সেটি যেন ছাড়া পেয়ে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে তার শিকারকে খুঁজছে। তিনি দেখেই বুঝতে পারলেন সেটা কী। হায় হায়! এই জিনিসের কথাই তো তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছিল! 

নিঃসন্দেহে সবকিছু ফয়সালার দিনটির সময় ঠিক করা আছে। সেদিন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে আসবে। আর আকাশকে খুলে দেওয়া হবে এবং সেটা অনেকগুলো দরজার মতো হয়ে যাবে। পাহাড়গুলোকে চালিয়ে দেওয়া হবে, যেন তারা মরীচিকা—আন-নাবা ১৭-২০

নিঃসন্দেহে জাহান্নাম ওঁত পেতে অপেক্ষা করছিল সীমালঙ্ঘকারীদের জন্য, এক স্থায়ী আবাস হয়ে। যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকবে তারা। সেখানে কোনো ধরনের শীতলতার স্বাদ পাবে না, পাবে না কোনো পানীয়, শুধুই ফুটন্ত পানি এবং পুঁজ —উপযুক্ত প্রতিদান। —আন-নাবা ২১-২৬

জাহান্নাম ওঁত পেতে অপেক্ষা করছে طاغين ত্বাগিনদের জন্য। এরা হচ্ছে চরম সীমালঙ্ঘনকারী। এরা কোনো সাধারণ অপরাধী নয়। এদের জীবনটাই ছিল অবাধ্যতায় ভরা। যেমন—

চৌধুরী সাহেব বিশাল পরিমাণের ঘুষ খাইয়ে একটা সরকারি প্রজেক্টের কন্ট্রাক্ট হাতালেন। এর জন্য তিনি মন্ত্রীকে গুলশানে দুইটা ফ্ল্যাট কিনে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন। তারপর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে জোগাড় করা সেই বিশাল অংকের ঘুষ, সুদসহ শোধ করতে গিয়ে, এবং মন্ত্রীকে কথা দেওয়া দুইটা ফ্ল্যাটের টাকা উঠানোর জন্য শেষ পর্যন্ত তাকে প্রজেক্টের অনেক টাকা এদিক ওদিক সরিয়ে ফেলতে হলো। দুই নম্বর সস্তা কাঁচামাল সরবরাহ করতে হলো। যোগ্য কনট্রাক্টরদের কাজ না দিয়ে অযোগ্য, সস্তা কনট্রাক্টরদের কাজ দিতে হলো, যারা কিনা তাকে প্রচুর ঘুষ খাওয়ালো। 

এরপর একদিন তার প্রজেক্ট ধ্বসে পড়ল। তার নামে ব্যাপক কেলেঙ্কারি হয়ে মামলা হয়ে গেলো। মামলায় উকিলের টাকা জোগাড় করতে তাকে আরও বিভিন্ন উপায়ে টাকা মারা শুরু করতে হলো। তারপর কয়েকদিন পর পর পুলিশ তাকে ধরতে আসে, আর তিনি উপরের তলার লোকদের ঘুষ খাইয়ে পুলিশকে হাত করে ফেলেন। 

প্রজেক্টে দুর্নীতির কারণে ভুক্তভোগী মানুষদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে একসময় অনেক টাকা খরচ করে কিছু ‘সোনার ছেলে’ পালতে হয়। তারা মাঝে মাঝেই খুন, ধর্ষণ করে, হোটেলে থেকে … করে এসে বিরাট বিল ধরিয়ে দেয়। তারপর তাদেরকে যখন পুলিশ ধরতে আসে, তিনি পুলিশকে টাকা খাইয়ে তাদেরকে রক্ষা করেন। এত দুশ্চিন্তার মধ্যে তিনি রাতে কোনোভাবেই ঘুমাতে পারেন না। দুশ্চিন্তা ভুলে থাকার জন্য তাকে নিয়মিত মদ খাওয়া ধরতে হয়। এভাবে একটার পর একটা পাপে তিনি জড়িয়ে পড়তে থাকেন। অবাধ্যতা এবং সীমালঙ্ঘন তার জীবনটাকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু, তিনি কোনো ভ্রুক্ষেপ করেন না, কারণ—

তারা ভাবতোই না যে, তাদের কাজের হিসেব কখনো দিতে হবে। আমার নিদর্শনগুলোকে সব মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করত —আমি সব গুনে গুনে হিসেব করে রেকর্ড করে রেখেছি। এবার তার প্রতিদান ভোগ করো। আমি তোমাদের শাস্তি কেবল বাড়াতেই থাকবো। —আন-নাবা ২৭-৩০ 

কোনোরকম জবাবদিহিতার ভয় যখন মানুষের মন থেকে চলে যায়, তখন সে পশুর থেকেও অধম হয়ে যায়। এরা তখন সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণীতে পরিণত হয়। এদের দিয়ে এমন কোনো অন্যায় নেই, যা হয় না। 

আল্লাহ تعالى এদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি সব হিসেব করে রেখেছেন। শুধুই হিসেব করে রাখেননি, সেই হিসেবকে তিনি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেও রেখেছেন । أحصى আহ্‌সা অর্থাৎ গুণে গুণে হিসেব করে রাখা, সংরক্ষণ করে রাখা। দুনিয়াতে এরা পুলিশ, উকিল, বিচারপতিকে টাকা খাইয়ে সাক্ষী-প্রমাণ নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু আল্লাহর تعالى হিসেব সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

শেষ অংশটি ভয়ঙ্কর — “আমি তোমাদের শাস্তি কেবল বাড়াতেই থাকবো।” আমরা যখন পৃথিবীতে কষ্টে থাকি, আমাদের মনে একটা সান্ত্বনা থাকে যে, আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই কষ্ট শেষ। যেমন, ধরুন আপনার গায়ে একদিন ফুটন্ত গরম পানি পড়ে গা ঝলসে চামড়া উঠে গেলো। আপনি এক মুহূর্তের জন্য না ঘুমিয়ে বিছানায় ছটফট করে ব্যথায় চিৎকার করছেন। প্রতিটা সেকেন্ড আপনার কাছে মিনিট মনে হচ্ছে। প্রত্যেকটা হৃদস্পন্দনের সাথে সাথে আপনার চামড়া জ্বলে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আপনি নিজেকে বোঝাচ্ছেন: “আর একটু। আর কয়েকটা দিন। তারপরেই ব্যথা কমে যাবে, ঘুমিয়ে যাবো, কষ্ট কমে যাবে…”

—এভাবে পৃথিবীতে আমরা প্রচণ্ড কষ্টের অভিজ্ঞতা ধৈর্য ধরে পার করি, কারণ আমরা জানি একদিন সেই কষ্ট শেষ হবে। এই আশা আমাদেরকে কষ্ট সহ্য করার শক্তি দেয়, ধৈর্য ধরার অনুপ্রেরণা দেয়। কিন্তু এই ধরনের মানুষরা, যারা জাহান্নামে চিরকাল থাকবে, তাদের কোনো আশা নেই। তাদের ধৈর্য ধরার কোনো অনুপ্রেরণা নেই। তারা জানে যে, তাদের এই প্রচণ্ড কষ্ট কখনো শেষ হবে না। এই বিকট দুর্গন্ধ, প্রচণ্ড গরম, অমানুষিক অত্যাচার — চলতেই থাকবে। কখনো তারা একটুও ঘুমাতে পারবে না। কোনোদিন তারা আগের সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারবে না। —এই ভয়ঙ্কর উপলব্ধি তাদের কষ্টকে হাজার গুনে বাড়িয়ে দেবে। জাহান্নামের প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণার সাথে যোগ হবে এক বুক ফাটা আতঙ্ক: এখানে তাদের কষ্ট বাড়তেই থাকবে।

যুগ যুগ ধরে সেখানে থাকবে তারা

জাহান্নামে মানুষ যুগ যুগ ধরে থাকবে। এর কোনো শেষ নেই। কত যুগ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি, বরং حقب হুকব অর্থ যুগ এবং أحقاب আহকাব অর্থ বহু যুগ। অত্যন্ত দীর্ঘ সময় বোঝানোর জন্য যুগ যুগ বলা হয়েছে। পরকালের দিন, মাস, বছরের দৈর্ঘ্য অনেক বড় হবে বলে বেশ কিছু সহিহ হাদিস পাওয়া যায়। আর কুরআনের অন্যান্য জায়গায় আমরা দেখেছি ‘চিরকাল’ শব্দটা বিশেষভাবে ব্যবহার হতে। 

অনেকে প্রশ্ন করেন: অনন্তকাল শাস্তি কীভাবে ন্যায় বিচার হতে পারে? কেউ একজন যদি সারাজীবন অপরাধ করেও এবং সেজন্য যদি পুরো মানবজাতিরও ক্ষতি হয়, তারপরেও তাকে বহু কোটি বছর শাস্তি দিলে একসময় সেটা গিয়ে মোট পাপের সমান শাস্তি হবে। কিন্তু অনন্তকাল ধরে কাউকে শাস্তি দিতে থাকলে তো একসময় না একসময় গিয়ে তার শাস্তি যথাযথ প্রতিদানের থেকে বেশি হয়ে যাবেই? তখন সেটা কীভাবে ন্যায়বিচার হবে? 

আহলুস সুন্নাহ ওয়া আল জামাআহ-এর বিশ্বাস হলো যে, জাহান্নাম চিরকাল থাকবে এবং সেখানে অনেকেই থাকবে, যাদের শাস্তি কখনোই শেষ হবে না। এটাই হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত। মূল ধারার প্রায় সব বড় ইমামের একই মত যে, জাহান্নামে কিছু মানুষ চিরকাল শাস্তি পেতে থাকবে এবং জাহান্নাম অবিনশ্বর। যেমন, ফিরাউনের শাস্তির কোনো শেষ নেই। 

যারা প্রশ্ন করেন যে, কেন মানুষের সাময়িক জীবনের শাস্তি অনন্ত কাল হবে? —তাদের সমস্যা হলো যে, তারা মানুষের অন্যায়কে তার আয়ুকাল অনুসারে পরিমাপ করছেন, অন্যায়ের প্রভাব অনুসারে নয়। একজন মানুষ ৭০-৮০ বছর ধরে যে অন্যায় করতে পারে, তার থেকে অনেক বড় অন্যায় অন্য কেউ করতে পারে এক ঘণ্টায়, যার প্রভাব যুগ যুগ ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম থেকে যেতে পারে। এছাড়াও কুরআনের একটি আয়াত থেকে আমরা জানতে পারি যে, কিছু মানুষ আছে, যাদেরকে যদি অনন্ত জীবন দেওয়া হয়, তাহলে তারা অনন্তকাল ধরে অন্যায় করতে থাকবে। কারণ, এরা নিজেদেরকে এতটাই নষ্ট করে ফেলেছে যে, এরা সংশোধনের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। এই ধরনের মানুষদেরকে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে অনন্তকাল শাস্তি দেওয়া হয়, কারণ সে পৃথিবীতে ৭০-৮০ বছর থাকুক, আর অনন্তকাল থাকুক, এরা পাপ করেই যাবে।

তুমি যদি তাদেরকে দেখতে, যাদেরকে আগুনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হবে, তারা বলবে, “হায়! আমাদেরকে যদি ফিরিয়ে নেওয়া হতো, তাহলে আমরা আমাদের রবের নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা বলতাম না এবং মুমিনদের একজন হয়ে যেতাম।” বরং তারা আগে যা গোপন করেছিল, সেটা এখন তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর যদিও বা তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হতো, তারা আবার তাই করত যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল। নিশ্চিতভাবে এরা মিথ্যাবাদী। —আল-আনআম ২৭-২৮

এই আয়াতের অর্থ এই যে, এদেরকে যদি মৃত্যুর পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের পরকালের স্মৃতি মুছে দেওয়া হয়, তাহলে এরা এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, এরা অন্যায় করতেই থাকতো। এদের জন্য পৃথিবীতে চিরকাল বেঁচে থেকে চিরকাল অন্যায় করা আর একসময় পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া একই কথা। এদের জন্য চিরকাল শাস্তিই যথার্থ।

তবে প্রাচীন তাফসিরবিদ আত-তাবারি বেশ কয়েকটি আছার সংগ্রহ করেছেন, যেখানে সাহাবিদের মন্তব্য আছে যে, জাহান্নাম একসময় খালি হয়ে যাবে বা একসময় এটিও ধ্বংস হয়ে যাবে এর ভেতরের অপরাধীদের নিয়ে, যখন তাদের উপযুক্ত শাস্তির মেয়াদ শেষ হবে। ইবন আল-কাইয়ুম-এর হাদি আল-আরওয়াহ বইয়ের এক লম্বা অধ্যায়ে যে সমস্ত আলিমরা জাহান্নামের অনন্ত শাস্তি সমর্থন করেন না, তাদের সেই দাবির পেছনে কারণগুলো দেখিয়েছেন। তার সারমর্ম হচ্ছে যে, জাহান্নাম-এর একাধিক পরিণতি হতে পারে এবং আল্লাহর রহমত এবং ক্ষমা সবকিছুর উপরে। তার বক্তব্য, “সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাবান বিচারকের প্রজ্ঞার এটা সাজে না যে, তিনি কাউকে সৃষ্টি করবেন চিরকাল শাস্তি দেওয়ার জন্য, অনন্ত শাস্তি যা শেষ হয় না এবং যার কোনো বিরতি নেই।” তবে তিনি নিজে কোনো একটি মতকে সমর্থন করে অন্য মতকে বাতিল বলেননি। বরং তিনি বলেছেন যে, “আল্লাহ ভালো জানেন।”

একইভাবে তার শিক্ষক ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ দুটো মতকেই তার লেখা শেষ বইতে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন। যদিও তিনি বলেননি যে, তিনি নিজে কোন মতকে সমর্থন করেন, কিন্তু তার লেখা পড়লে বোঝা যায় যে, জাহান্নাম চিরজীবন হতে পারে এবং নাও হতে পারে— এই দুটো মতকেই তিনি সমানভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি কোনোটাকেই বাতিল বলেননি।

যাহোক, জাহান্নাম চিরকাল থাকবে, নাকি কোটি কোটি কোটি বছর থাকবে তাতে খুব একটা পার্থক্য হয় না। জাহান্নামে এক মুহূর্ত থাকার অভিজ্ঞতা দুনিয়াতে যাবতীয় ফুর্তির আনন্দ বাতিল করে দেবে। এর শাস্তি এতটাই কুৎসিত যে, সেখানে একদিন থাকাটাও পৃথিবীতে আজীবন শাস্তি পাওয়া থেকে অনেক বেশি কষ্টের। তাহলে কোটি কোটি বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্ত অমানুষিক শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন সহ্য করার কথা চিন্তাও করা যায় না। 

কিয়ামতের বর্ণনার জন্য যে আয়াতগুলো ব্যবহার করা হয়েছে—
  •  فَإِذَا نُفِخَ فِي الصُّورِ نَفْخَةٌ وَاحِدَةٌ ﴿١٣﴾ وَحُمِلَتِ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ فَدُكَّتَا دَكَّةً وَاحِدَةً ﴿١٤﴾
  •  إِذَا زُلْزِلَتِ الْأَرْضُ زِلْزَالَهَا ﴿١﴾ وَأَخْرَجَتِ الْأَرْضُ أَثْقَالَهَا ﴿٢﴾
  • فَإِذَا انشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَانِ ﴿٣٧
  • إِذَا السَّمَاءُ انفَطَرَتْ ﴿١﴾ وَإِذَا الْكَوَاكِبُ انتَثَرَتْ ﴿٢﴾
  • إِذَا الشَّمْسُ كُوِّرَتْ وَإِذَا النُّجُومُ انكَدَرَتْ وَإِذَا الْجِبَالُ سُيِّرَتْ وَإِذَا الْعِشَارُ عُطِّلَتْوَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ وَإِذَا الْبِحَارُ سُجِّرَتْ… عَلِمَتْ نَفْسٌ مَا أَحْضَرَتْ)
  • فَإِذَا بَرِقَ الْبَصَرُ ﴿٧﴾ وَخَسَفَ الْقَمَرُ ﴿٨﴾ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ﴿٩﴾
  •  يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ ﴿١﴾ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَىٰ وَمَا هُم بِسُكَارَىٰ وَلَـٰكِنَّ عَذَابَ اللَّـهِ شَدِيدٌ ﴿٢﴾
  •  يَوْمَ تَرْجُفُ الْأَرْضُ وَالْجِبَالُ وَكَانَتِ الْجِبَالُ كَثِيبًا مَّهِيلًا ﴿١٤﴾
  •  وَإِذَا الْبِحَارُ فُجِّرَتْ ﴿٣﴾
  •  يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ۚ ذَٰلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ ﴿٤٤﴾
  • ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُم قِيَامٌ يَنظُرُونَ
  •  وَانشَقَّتِ السَّمَاءُ فَهِيَ يَوْمَئِذٍ وَاهِيَةٌ ﴿١٦﴾ وَالْمَلَكُ عَلَىٰ أَرْجَائِهَا ۚ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ﴿١٧﴾
  •  فَيَذَرُهَا قَاعًا صَفْصَفًا ﴿١٠٦﴾ لَّا تَرَىٰ فِيهَا عِوَجًا وَلَا أَمْتًا ﴿١٠٧﴾
  •  يَوْمَ تُبَدَّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ ۖ وَبَرَزُوا لِلَّـهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ ﴿٤٨﴾
  •  خُشَّعًا أَبْصَارُهُمْ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ كَأَنَّهُمْ جَرَادٌ مُّنتَشِرٌ ﴿٧﴾ مُّهْطِعِينَ إِلَى الدَّاعِ ۖ يَقُولُ الْكَافِرُونَ هَـٰذَا يَوْمٌ عَسِرٌ ﴿٨﴾
  •  وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِمَن يَرَىٰ ﴿٣٦﴾

আমি কি আকাশ থেকে অঢেল পানি বর্ষণ করিনি — আন-নাবা ১৪-১৬

আর আমি কি আকাশ থেকে অঢেল পানি বর্ষণ করিনি, যা দিয়ে শস্য এবং উদ্ভিদ উৎপন্ন করি, আর ঘন বাগান? —আন-নাবা ১৪-১৬

আমি কি আকাশ থেকে প্রচুর পানি বর্ষণ করিনি?

পানি এক মহামূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। পরিষ্কার পানির উৎসকে ঘিরে জনবসতি গড়ে ওঠে, শহর-কারখানা তৈরি হয়। পরিস্কার পানির ব্যবসা আজকে পৃথিবীতে অন্যতম লাভজনক বিনিয়োগ, যার স্টক মার্কেটে ইনডেক্স-এর বৃদ্ধির হার গত কয়েক বছরে তেল এবং সোনাকে ছাড়িয়ে গেছে। আজকের অর্থনীতিতে নিরাপদ পানি হচ্ছে ‘তরল সোনা’, যার মোট বাজার দর ২০২৫ সালের মধ্যে ২০ ট্রিলিয়ন ডলার হতে যাচ্ছে, যা পুরো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির মূল্য থেকেও বেশি![৪৯০] 

আগামী ২৫ বছরের মধ্যে দেশগুলো তাদের সমুদ্র বন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের পিছনে মোট যত অর্থ খরচ করবে, তার থেকে বেশি অর্থ খরচ করতে হবে পরিষ্কার পানির জন্য[৪৯০] সারা পৃথিবীতে ব্যবহারযোগ্য পানির অভাব এত ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে যে, বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী বড় যুদ্ধ আর তেল নিয়ে হবে না, হবে পানি নিয়ে। ইতিমধ্যেই বিশটি দেশ নদী নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িত।[৪৯১]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আমি কি তোমাদের উপরে সাতটি সুদৃঢ় সৃষ্টি করিনি —আন-নাবা ১২-১৭

আমি কি তোমাদের উপরে সাতটি সুদৃঢ় সৃষ্টি বানাইনি? একটি উজ্জ্বল প্রদীপ তৈরি করিনি? —আন-নাবা ১২-১৩

আমি কি তোমাদের উপরে কি সাতটি সুদৃঢ় সৃষ্টি বানাইনি?

মহাকাশে এমন সব সৃষ্টি আল্লাহ تعالى তৈরি করে রেখেছেন, যাদের বিশালত্ব আমাদের কল্পনার সীমার বাইরে। আমাদের সূর্য এত বড় যে, এর ভেতরে তের লক্ষ পৃথিবী ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে। সূর্য থেকে মাঝে মাঝে আগুনের ফুলকি ছিটকে বের হয়, যেগুলোর একেকটার আকৃতি কয়েক’শ পৃথিবীর সমান। আর সূর্য তেমন কোনো বড় নক্ষত্রও নয়। এমন সব দানবাকৃতির নক্ষত্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে, যাদের ভেতরে দশ কোটি সূর্য এঁটে যাবে। এখন পর্যন্ত জানা সবচেয়ে বড় নক্ষত্রটি পঞ্চাশ কোটি সূর্যের সমান![৪৩৮]

সূর্যের তুলনায় পৃথিবীর আকৃতি
  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আমি কি তোমাদের ঘুমকে একধরনের বিরতি করে দিইনি? —আন-নাবা ৯

আমি কি তোমাদের ঘুমকে একধরনের বিরতি, রাতকে একরকম আবরণ এবং জীবিকা অন্বেষণের জন্য দিন তৈরি করে দিইনি? —আন-নাবা ৯-১১

ঘুম আল্লাহর تعالى পক্ষ থেকে এক বিরাট উপহার। ধনী, গরিব, জ্ঞানী, মূর্খ সবাইকে সমানভাবে এই উপহার ভোগ করার সুযোগ দিয়েছেন। বরং এই উপহারটি তিনি গরিবদেরকে বেশি দিয়েছেন ধনীদের থেকে। অনেক ধনীরা আছেন, যারা তাদের আলিশান বাড়িতে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, নরম বিছানায়, দু-তিনটা বালিশ দিয়েও  আরামে ঘুমাতে পারেন না। ঠিকমতো ঘুমের জন্য তাদেরকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ খেতে হয়। অন্যদিকে গরিবরা তাদের কুঁড়ে ঘরের মাটিতে মাদুর বিছিয়ে শক্ত বালিশে আরাম করে সারারাত ঘুমায়। কিছু মানুষের জীবনে প্রাচুর্যের শেষ নেই, কিন্তু এক রাত ঘুমের জন্য তারা এমন কোনো চেষ্টা নেই যে তারা করছে না। মাসের পর মাস ঘুমের পিল খেয়ে যাচ্ছে রাতে কয়েক ঘণ্টা ঘুমের জন্য। একসময় গিয়ে পিল কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। —ঘুম যে কত বড় একটি উপহার, সেটা তারাই বোঝে, যারা রাতের ঘুম হারিয়ে ফেলে।  

ঘুমকে আল্লাহ تعالى বলেছেন سبات সুবাত, অর্থাৎ বিরতি, থামা, বন্ধ করা। ক্লান্ত দেহ, মনকে পুনরায় সতেজ করার জন্য ঘুমের বিকল্প নেই। চা, কফি, এনার্জি ড্রিঙ্ক ইত্যাদি যা কিছুই মানুষ পান করুক না কেন, ঘুম মানুষকে যতটা সতেজ করে, ততটা আর কোনো কিছুই পারে না। দুপুর বেলা দশ-বিশ মিনিট ঘুমিয়ে নিলে বাকি দিন এবং সন্ধ্যায় দেহ-মন যতটা সতেজ, চাঙ্গা থাকে; মাথা যতটা ঠাণ্ডা থাকে; চিন্তাভাবনা যতটা পরিষ্কার হয়— তা অন্য কোনো বিকল্প পানীয় বা ওষুধ থেকে পাওয়া যায় না। 

একইভাবে ঘুম মানুষকে মানসিক শান্তি দেয়। সারাদিনের মানসিক চাপ, অশান্তির পর রাতের বেলা যখন ঘুমিয়ে পরে, পরেরদিন জেগে উঠে সেই চাপ এবং অশান্তি অনেকখানি দূর হয়ে মন শান্ত হয়ে যায়। আজকে পৃথিবীতে লক্ষ মানুষকে নানা ধরনের ওষুধ এবং পানীয় পান করে মন শান্ত করতে হয়, অস্থিরতা কমাতে হয়। অথচ আল্লাহ تعالى মানুষকে ঘুম দিয়েছেন প্রতিদিন নানা ব্যস্ততার মাঝে শান্তি, স্থিরতা খুঁজে পাওয়ার জন্য। 

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আমি কি তোমাদেরকে জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করিনি? — আন-নাবা

আমি কি তোমাদেরকে জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করিনি? — আন-নাবা ৮

অনেকে প্রশ্ন করেন, পৃথিবীতে যদি শুধুই নারী থাকতো, কোনো পুরুষ না থাকতো, তাহলে কি পৃথিবীটা অনেক শান্তির হতো না? অথবা, আল্লাহ تعالى যদি মানুষকে লিঙ্গবিহীন প্রাণী হিসেবে তৈরি করতেন, যেখানে সবাই নিজে থেকেই বাচ্চা জন্ম দিতে পারত, যেরকম কিনা অন্য কিছু প্রাণী পারে, তাহলে কী সমস্যা হতো? তখন নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব, সংসারে ঝামেলা, অশান্তি, অশ্লীলতা, ব্যাভিচার, ধর্ষণ ইত্যাদি মানবজাতির অর্ধেকের বেশি অপরাধ কখনো হতো না? আবার কিছু বিশেষ ব্যক্তিবর্গ এই প্রশ্নও করেন যে, এখানে জোড়ায়-জোড়ায় বলতে কি সমকামী জোড়া হতে পারে না? 

নারী-পুরুষের বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে অন্য যত ধরনের সম্পর্ক আছে, সেগুলো কোনো দিক থেকে বেশি ভালো কিনা এবং সমকামিতার পরিণাম নিয়ে নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। তার কিছু এখানে তুলে ধরা হলো। 

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কী ব্যাপারে তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছে? — আন-নাবা পর্ব ১

কী ব্যাপারে তারা একে অন্যকে জিজ্ঞেস করছে? সেই বিরাট ঘটনার ব্যাপারে? যা নিয়ে তাদের নিজেদের ভেতরেই নানা মতবিরোধ? সাবধান! শীঘ্রই তারা জানতে পারবে। শেষ পর্যন্ত গিয়ে তারা জানতে পারবেই! — আন-নাবা ১-৫

একদিন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে; তারপর কোটি কোটি মানুষকে আবার সৃষ্টি করে ওঠানো হবে এবং তাদের সমস্ত স্মৃতি ফিরিয়ে দেওয়া হবে; তারপর তাদের পুরো জীবনটাকে দেখানো হবে —এটা কোনোভাবে সম্ভব, সেটা অনেকেই বিশ্বাস করত না। আবার অনেকে মনে করত যে, এরকম কিছু যদি সত্যিই ঘটে, তাহলে সেই দিন তাদের পীর-ফকির-দরবেশ-আউলিয়া-ওস্তাদ-দেবতাদের কাছে তারা ফিরে যাবে। তখন তাদের আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না। কত টাকা-পয়সা, ফুল-মিষ্টি-নারিকেল খরচ করেছে এদের পেছনে। সেগুলোর বিনিময়ে কিছুই পাবে না, তা কী করে হয়? —আবার অনেকে মনে করত যে, একদিন যদি সবার বিচার হয়ও, এক সৃষ্টিকর্তার পক্ষে কি আর হাজার কোটি মানুষের সব কাজের খবর রাখা সম্ভব? এত মানুষের খুঁটিনাটি বিচার করার সময় কোথায়? নিশ্চয়ই তিনি শুধু ঘাঘু অপরাধীদের ধরে শাস্তি দেবেন? বাকিরা সবাই আরামে পার পেয়ে যাবে। আবার অনেকে মনে করত যে, এই দুনিয়াতে তারা কত সম্মান-সম্পদ নিয়ে আনন্দে আছে। তার মানে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তাদের উপর মহা খুশি। মৃত্যুর পরে নিশ্চয়ই তাদের জন্য আরও বেশি সম্মান-সম্পদ অপেক্ষা করছে।[৭] 

—শেষ বিচার দিন কোনো ঠাট্টা তামাশার বিষয় নয়। এটি সৃষ্টিজগতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এই দিন অসহায় অত্যাচারিত মানুষের ন্যায্য বিচার পাওয়ার দিন। জোর খাটিয়ে দুনিয়ায় পার পেয়ে যাওয়া সব অত্যাচারীর পাকড়াওয়ের দিন। এই দিন সর্বোচ্চ আদালতে হাজিরা দেওয়ার দিন। হাজার কোটি মামলার শুনানি এবং ফয়সালার দিন। একইসাথে এই দিন সকল ন্যায়পরায়ন, যোগ্য মানুষের ভালো কাজ এবং ত্যাগের প্রতিদান পাওয়ার দিন। পরম-করুণাময়ের অসীম দয়া উপভোগের দিন। তাহলে, কোন সাহসে মানুষ এরকম এক বিরাট ঘটনাকে নিয়ে একে অন্যর সাথে ঠাট্টা করে?

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কোনটা সৃষ্টি করা বেশি কঠিন: তোমরা, নাকি যে আকাশ তিনি বানিয়েছেন, সেটা? — আন-নাযিয়াত পর্ব ২

কোনটা সৃষ্টি করা বেশি কঠিন: তোমরা, নাকি যে আকাশ তিনি বানিয়েছেন, সেটা? তিনি সেটার ছাদকে উঁচু করেছেন, সুবিন্যস্ত করেছেন। এর রাতে আধার দিয়েছেন এবং এর দিনের উজ্জ্বলতা প্রকাশ করেছেন। আর ভূমিকে তারপরে বিস্তৃত করেছেন। তা থেকে পানি এবং তৃণভূমি বের করেছেন। দৃঢ়ভাবে পর্বতমালাকে গেঁথে দিয়েছেন। এসবই তোমাদের এবং তোমাদের গবাদির জীবিকার জন্য। —আন-নাযিয়াত ২৭-৩৩

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

আমরা কি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবো? – আন-নাযিয়াত পর্ব ১

শপথ তাদের যারা নির্মমভাবে ছিনিয়ে নেয়, যারা আলতোভাবে বাঁধন ছেড়ে দেয়, যারা তীব্র গতিতে ছুটে চলে, যারা সবার সামনে চলে গিয়ে ফয়সালা করে ফেলে।

আরবরা কান খাড়া করে এক রোমহর্ষক ঘটনা শুনছে। তারা কল্পনা করছে: একদল যুদ্ধের ঘোড়া ছুটে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে মাটিতে পা ঠুকছে। তাদের বাঁধন ছেড়ে দেয়া হল, আর অমনি তারা তীব্র বেগে ছুটে যাওয়া শুরু করল। ছুটতে ছুটতে সবাইকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেল। শত্রুপক্ষকে শেষ করে যুদ্ধের ফয়সালা করে ফেলতে যাচ্ছে। তারপর…

সেদিন এক ভীষণ কম্পন প্রকম্পিত করবে। তারপর আসবে আরেকটা। অনেক অন্তর সেদিন ভয়ে কাঁপতে থাকবে। তাদের দৃষ্টি হবে ভয়ে নত।

মানে? কোথা থেকে কী আসলো? সেই ঘোড়ার উপর সওয়ারী যোদ্ধাদের কী হলো? কে জিতলো শেষ পর্যন্ত?

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সে ভ্রু কুচকালো এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো —সূরা আবাসা

সে ভ্রু কুচকালো এবং মুখ ফিরিয়ে নিলো। কারণ তার কাছে অন্ধ লোকটি এসে পড়েছিল। তুমি জানলে কীভাবে, হয়ত সে পরিশুদ্ধ হতো? অথবা হয়ত সে উপদেশ গ্রহণ করতো এবং সেই উপদেশ তার উপকারে আসতো? আর যে কিনা নিজেকে প্রয়োজনমুক্ত মনে করে, তার জন্য তুমি কত চেষ্টা করছিলে। অথচ সে নিজেকে না শোধরালে তোমার কোনোই দায় নেই। আর যে কিনা তোমার কাছে ছুটে আসলো আল্লাহর ভয়ে, তুমি তার ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করলে? —আবাসা ১-১০

আমরা বড় হই কিছু ধারণা নিয়ে— সমাজের ধনী মানুষদেরকে, গরিব মানুষদের থেকে বেশি  সুযোগ, সম্মান দিতে হবে। যাদের ডিগ্রি আছে তাদেরকে অশিক্ষিত মানুষদের থেকে বেশি সুযোগ সম্মান দিতে হবে। কেউ যদি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হয়, মন্ত্রী-আমলা হয়, তাহলে তো কথাই নেই। উঠতে বসতে ‘স্যার, স্যার’ করতে হবে। —ছোটবেলা থেকে আমাদেরকে এই ধারণাগুলো দিয়ে বড় করা হয়। আমরা অনেক সময় ভুলে যাই যে— সম্পদ, খ্যাতি, উপাধি, পদ, বংশ ইত্যাদি যেই ব্যাপারগুলো আমরা এত গুরুত্ব দেই, আল্লাহর কাছে এগুলোর সাথে কারো প্রাপ্য-সম্মানের কোনোই সম্পর্ক নেই। তাঁর কাছে কারো সম্মান নির্ভর করে শুধুমাত্র তার তাকওয়ার উপর।

উপরের এই আয়াতগুলো দিয়ে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে এমন এক মূল্যবোধ শেখাতে চান, যার নজির ইতিহাসে আর একটিও নেই। একবার, রাসুলল্লাহ عليه السلام আরবদের উচ্চপদস্থ কিছু মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তিনি সেই লোকগুলোর সাথে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি আশা করছিলেন এই লোকগুলোকে ইসলামের পথে আনতে পারলে, মক্কাতে ইসলাম প্রচারে যে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন তিনি হচ্ছিলেন, তা অনেকাংশে কমে যাবে। যখন তিনি সেই লোকগুলোর সাথে ইসলামের ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন, তখন একজন অন্ধ সাহাবি এসে বার বার কুরআনের নতুন কোনো বাণী এসেছে কিনা, সে ব্যাপারে জানতে চেয়ে তার আলোচনায় বাধা তৈরি করতে থাকে। তখন রাসুল কিছুটা বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে সাহাবিকে উপেক্ষা করে ওই লোকগুলোর দিকে মনোযোগ দেন। —এই ব্যাপারটি আল্লাহর تعالى কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। আল্লাহ تعالى তখন দশ-দশটি আয়াত নাজিল করে রাসুলকে সংশোধন করে দেন।  

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)