অবশ্যই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি —আল-ইনশিরাহ

আমি কি তোমার অন্তর প্রশস্ত-প্রশান্ত করে দেইনি? তোমার উপর থেকে ভীষণ বোঝা নামিয়ে দিয়েছি, যা তোমার পিঠ ভেঙ্গে দিচ্ছিল? তোমার মান-সম্মান উঁচু করেছি? তাহলে অবশ্যই কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। অবশ্যই কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি। তাই যখনি কোনো কাজ থেকে অবসর পাও, তখনি নিবেদিত হও, তোমার প্রভুকে পাওয়ার জন্য তাঁর দিকে ফিরে যাও। —আল-ইনশিরাহ

আমি কি তোমার অন্তর প্রশস্ত-প্রশান্ত করে দেইনি?

ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আপনি কাজের পাশাপাশি সন্ধ্যায় ইউনিভারসিটি গিয়ে পার্টটাইম মাস্টার্স বা পিএইচডি করবেন। আপনার পরিবার আপনার এই সিদ্ধান্ত শুনে বড়ই খুশি হবে। বংশে একজন মাস্টার্স/পিএইচডি করা ছেলে/মেয়ে থাকবে, কী সৌভাগ্যের ব্যাপার! ক্লাসে যাওয়ার আগে আপনার জন্য নাস্তা টেবিলে রাখা থাকবে। ক্লাস করে এসে আপনি যেন শান্তিতে ঘুমোতে পারেন, সেজন্য বাচ্চাদেরকে আগেই ঘুম পাড়িয়ে রাখা হবে। মেহমানরা বেড়াতে এসে যেন আপনার পড়াশুনায় ক্ষতি না করে, সেজন্য চৌদ্দগুষ্টিতে সাবধান নোটিস চলে যাবে। কেউ যদি এসেও পড়ে, আপনি দেখা করতে না আসলে কোনো সমস্যা নেই, কারণ আপনার পরীক্ষা চলছে। আপনার পরীক্ষার সময় বাড়িতে কারফিউ পড়ে যাবে। কেউ জোরে টিভি ছাড়বে না, ফোনে গল্প করবে না। কিছুক্ষণ পরপর চা, নাস্তা আসতে থাকবে। আপনাকে যথাসাধ্য সবরকম শান্তির ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। একসময় আপনি মাস্টার্স/পিএইচডি শেষ করবেন। আপনার স্বামী-স্ত্রী-বাবা-মা গর্ব করে সবার কাছে আপনার অর্জনের কথা বলবে।

কিন্তু ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কাজের পাশাপাশি একটা ইসলামিক ডিগ্রির জন্য পড়াশুনা করবেন, বা এলাকার মুসলিম ভাইবোনদের সাথে নিয়মিত ইসলামি আলোচনায় অংশ নেবেন, বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যোগ দেবেন। আপনার পরিবারের সদস্যরা এই কথা শোনার পর আপনার উপর শুরু হবে তাদের যাবতীয় দাবি এবং অভিযোগের বৃষ্টি। এমনিতেই কাজের বাইরে আপনাকে কম পাওয়া যায়, এখন কেন আরও কম পাওয়া যাবে? যেই কাজ করতে আপনি বাধ্য নন, কেন আপনি সেই কাজের পিছনে এত সময় দেবেন? এগুলো না করে শুধু নামাজ-রোজা করলে ক্ষতি কী হবে? আমরা কী মুসলিম না? এগুলো না করলে কি জান্নাতে যাওয়া যায় না?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন — আল-বাক্বারাহ ১২৮

আমাদের সন্তানদের কেউ যদি মেধাবী হয়, তাহলে তাকে ডাক্তার বানাই। তারচেয়ে কম মেধাবীটা হয় ইঞ্জিনিয়ার। আরেকটু কম হলে বাংলা বা ইংলিশে পড়ে। আর যেটার অবস্থা একেবারেই খারাপ, সেটাকে আমরা মাদ্রাসায় দেই, ইমাম সাব বানাই। আমাদের মধ্যে কোনো এক অদ্ভুত কারণে একটা ধারণা আছে যে, ছেলেমেয়েরা বড় হলে নিজেরাই সৎ, আদর্শ মানুষ হবে, দুনিয়ায় শান্তিতে থাকবে। দুনিয়ায় শান্তিতে থাকাটাই আসল কথা। পরে কী হবে তা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ছেলেমেয়েদেরকে অত ইসলাম শেখানোর প্রয়োজন নেই। ইসলাম শিখে হবেটা কী? ইসলাম কী ছেলেমেয়েকে বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ, সন্মান, উচ্চশিক্ষা —এসব কিছু দেবে?

তারপর তারা বড় হয়। ডাক্তারটা একসময় গিয়ে ১ লাখ টাকার অপারেশন করে ৫ লাখ টাকায়। বছর খানেকের মধ্যে কোটিপতি হয়ে বিদেশে চলে যায়। ওদিকে সেই ৫ লাখ টাকার বিল দিতে গিয়ে রোগীর পরিবার লোণে জর্জরিত হয়ে, পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে, অভাবে, কষ্টে, দুশ্চিন্তায় বছরের পর বছর পার করে। ইঞ্জিনিয়ারটা বড় হয়ে বিরাট অঙ্কের ঘুষ খেয়ে প্রজেক্ট করে। সেই ঘুষের টাকা দিয়ে সে বাড়ি-গাড়ি করে, আর তার ছেলেমেয়েরা ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়ে থার্টি-ফার্স্ট নাইটে ড্রিঙ্ক করে মাতলামি করে। বাংলা, ইংরেজিতে পড়াগুলো রাজনৈতিক দলের ক্যাডার হয়ে মারামারি, খুনাখুনি, ধর্ষণ করে।

এদিকে ইমাম সাহেব মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতন পেয়ে তার পরিবারকে নিয়ে কোনোমতে দিন পার করে হলেও তার ছেলেমেয়েকে নৈতিকতা শেখান, হাফেজ বানান। বাবা-মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লে তিনি এবং তার স্ত্রী নিষ্ঠার সাথে বছরের পর বছর তাদের সেবা করেন। যেদিন বাবা-মা মারা যায়, সেদিন তিনি তার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ভাইদেরকে ফোন করে আর পান না। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি নিজেই হাজার হাজার মুসল্লিকে সাথে নিয়ে বাবা-মার জানাজা পড়েন। ইমাম সাহেবের বাবা-মা’র জানাজা, কত বিরাট সন্মানের জানাজা!

আজকের প্রজন্মের একটা বড় অংশ ভয়াবহ রকমের নৈতিক অবক্ষয়ে ডুবে গেছে: তাদের বাবা-মা’দের দুনিয়ায় সম্পদ, সন্মান, আরাম-আয়েশের লোভের জন্য। সেই সব বাবা-মা’দের কাছে তাদের সন্তানরা হচ্ছে পেনশন। সেই পেনশনের মূল্য বাড়ানোর জন্য তারা যতভাবে সম্ভব চেষ্টা করেন সন্তানদেরকে দুনিয়াতে বড়লোক বানাবার। ইসলাম হচ্ছে তাদের পেনশনের মূল্য বৃদ্ধিতে একটি বাঁধা মাত্র। ছেলে ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করলে, দাঁড়িওলা বন্ধুদের সাথে মেলামেশা শুরু করলে, তারা আতঙ্কিত হয়ে যান: এই বুঝি আমাদের পেনশন গেল!

এই ধরনের বাবা-মাদের ভেতরে এই ভয়ঙ্কর লোভ জন্ম হতে দিয়েছে তাদেরই বাবা-মা, যারা অনেকে নিজেরা ইসলাম মানলেও, তাদের সন্তানদেরকে ইসলামের পথে রাখার জন্য কোনো জোর দেননি। যার ফলে তারা তাদের বংশধরদের মধ্যে ইসলাম হারিয়ে যাওয়ার একটা চেইন রিয়াকশন শুরু করে দিয়ে গেছেন, যার ফলাফল আজকের ইসলাম ভুলে যাওয়া, নৈতিকভাবে ধ্বসে যাওয়া প্রজন্ম।

এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে এই প্রজন্ম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য একটাই উপায়— তাদেরকে আল্লাহর تعالى প্রতি অনুগত করা। তাদেরকে উপলব্ধি করানো যে, সামনে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা আসছে। আজকে তাদেরকে ‘বাস্তবতা’ বলতে যা শেখানো হচ্ছে, সেটা কয়েক বছরের মায়া মাত্র। আসল বাস্তবতা আসছে সামনে, যেখানে সময় কখনো শেষ হবে না, যেই মহাবিশ্ব কখনো ধ্বংস হবে না। নবী ইব্রাহিম عليه السلام তা উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তিনি তার সন্তান এবং বংশধরদের জন্য দু’আ করেছিলেন—

2_128

ও আমাদের প্রভু! আমাদের দুজনকে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) করে রাখুন, এবং আমাদের বংশধর থেকে আপনার প্রতি অনুগত (মুসলিম) একটি জাতি তৈরি করে দিন। আমাদেরকে দেখিয়ে দিন কীভাবে ইবাদত করতে হয় এবং আমাদের ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহণ করুন। নিঃসন্দেহে আপনি বার বার ক্ষমা করেন, নিরন্তর দয়াময়। [আল-বাক্বারাহ ১২৮]

2_128_title  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যদি পারো তো এর মতো একটা সূরা বানাও – বাকারাহ ২১-২৪

2-21

মানব জাতি! তোমাদের সেই প্রভুর প্রতি পূর্ণ দাসত্ব ও উপাসনা করো, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের আগে যারা ছিল তাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তোমরা তাঁর প্রতি সবসময় পূর্ণ সচেতন থাকতে পারো। [বাকারাহ ২১]

বেশিরভাগ অনুবাদে উ’বুদুকে ٱعْبُدُوا۟ ‘ই’বাদত করো’ বা ‘উপাসনা করো’ অনুবাদ করা হয়, যা মোটেও উ’বুদুর প্রকৃত অর্থকে প্রকাশ করে না। উ’বুদু এসেছে আবাদা  عبد থেকে যার অর্থ দাসত্ব করা। আমরা শুধুই আল্লাহর تعالى উপাসনা করি না, আমরা আল্লাহর تعالى দাসত্ব করি।[১] এমনটি নয় যে, আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়লাম, রোযা রাখলাম, যাকাত দিলাম—ব্যাস, আল্লাহর تعالى সাথে আমাদের সম্পর্ক শেষ, এরপর আমি যা খুশি তাই করতে পারি। বরং আমরা সবসময় আল্লাহর দাস। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা কাজে, প্রতিটা কথায় আমাদের মনে রাখতে হবে—আমরা আল্লাহর تعالى দাস এবং আমরা যে কাজটা করছি, যে কথাগুলো বলছি, তাতে আমাদের প্রভু সম্মতি দেবেন কি না এবং প্রভুর কাছে আমি জবাব দিতে পারব কি না।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)