ধর্ম মানতে কোনো ধরনের জোর জবরদস্তি নেই — আল-বাক্বারাহ ২৫৬

2_256

ধর্ম মানতে কোনো ধরনের জোর জবরদস্তি নেই। সঠিক পথ ভুল পথ থেকে পরিষ্কারভাবে আলাদা হয়ে গেছে। তাই যে তাগুত (মিথ্যা প্রভুদের) অস্বীকার করবে, এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আনবে, সে অবশ্যই এমন এক মজবুত হাতল ধরবে, যা ভাঙ্গার কোনো আশঙ্কা নেই। আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৫৬]

আল্লাহ تعالى এখানে কঠিনভাবে বলেছেন لَا إِكْرَاهَ, কোনো ধরনের জোর জবরদস্থি করা যাবে না। এই আয়াতে শব্দটা হচ্ছে إِكْرَاه, যার অর্থ কোনো একটা ব্যাপার কেউ ঘৃণা করে, এবং তাকে সেটাই জোর করে করানো।[১][৫] একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, কেন জোর জবস্থি করে ধর্ম মানানো সম্ভব না। ধর্ম মানুষের অন্তরের ব্যাপার। মানুষকে জোর করে কোনো কিছু বিশ্বাস করানো যায় না। কারো সামনে তলোয়ার ধরে বললাম, “তিন দিন সময় দিলাম। এর মধ্যে মুসলিম হয়ে যাও। নাইলে…” — তাহলে সে মনে প্রাণে ইসলামে বিশ্বাস করে, তার যাবতীয় ভুল বিশ্বাস ভেঙ্গে ফেলবে না। সে বড়জোর একজন মুনাফিক হয়ে যাবে। একইসাথে কাউকে গিয়ে হুমকি দিলাম, “যদি কালকে থেকে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে না দেখি, তাহলে তোমাকে ধরে… ” — এই হুমকিতে সে হয়তো মসজিদে যাবে। কিন্তু সেটা আল্লাহর تعالى জন্য হবে না, হবে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে।

জোর করে ইসলাম গ্রহণ করানো ‘ইসলাম’ এবং ‘মুসলিম’ এই দুটো শব্দের সংজ্ঞারই পরিপন্থী। ‘মুসলিম’ শব্দের অর্থ: যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর تعالى ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করেছে। কাউকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার ইচ্ছাকে আল্লাহর تعالى কাছে সমর্পণ করানো যায় না —এটা স্ববিরোধী, অযৌক্তিক কথা। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, আল্লাহ تعالى এই আয়াতে বলেননি যে, ইসলামে কোনো জোর জবস্থি নেই। বরং তিনি বলেছে,ধর্মে কোনো জরজবরদস্থি নেই। তাই অন্য ধর্মের লোকেরা যেন তাদের ধ্যান, ধারণা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি জোর করে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে না দেয়। তারা যেন মুসলিমদের শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম প্রচারে বাঁধা না দেয়। যদি দেয়, সেটা ফিতনা হবে, এবং সেই ফিতনা দূর করতে মুসলিমরা সংগ্রাম করতে পারবে।[১১]  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি অনন্ত বিদ্যমান, সব কিছুর ধারক — আয়াতুল কুরসি, আল-বাক্বারাহ ২৫৫

কু’রআনে কিছু আয়াত রয়েছে, যেখানে আল্লাহ تعالى আমাদের অনেক মানসিক সমস্যা এবং প্রশ্নের সমাধান দিয়ে দিয়েছেন। এই আয়াতগুলো আমরা যখন মনোযোগ দিয়ে পড়ি, তখন ধাক্কা খাই। যখন সময় নিয়ে ভেবে দেখি, তখন আমাদের হতাশা, অবসাদ, ডিপ্রেশন, কিছু না পাওয়ার দুঃখ, নিজের উপরে রাগ, অন্যের উপরে হিংসা, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা —এই সবকিছু কাটিয়ে ওঠার শক্তি খুঁজে পাই। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করি যে, আমরা এতদিন থেকে যেসব সমস্যায় ভুগছিলাম, তার সমাধান তো এই আয়াতেই ছিল! এরকম একটি আয়াত হচ্ছে আয়াতুল কুরসি। এই আয়াতের প্রতিটি বাক্যে শিরক থেকে দূরে থাকার শিক্ষা রয়েছে এবং একই সাথে আমরা দুনিয়াতে যে নানা ধরনের শিকলের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছি, তা থেকে বেড়িয়ে আসার উপায় শেখানো হয়েছে—

2_255

আল্লাহ, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাসনার যোগ্য কেউ নেই, তিনি অনন্ত বিদ্যমান, সব কিছুর ধারক। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশগুলো এবং পৃথিবীতে যা কিছুই আছে, সবকিছু শুধুমাত্র তাঁর। কে আছে যে তার অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে? তাদের দৃষ্টির সামনে এবং দৃষ্টির অগোচরে যা কিছুই আছে, তিনি তাঁর সব জানেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। তাঁর কুরসী আকাশগুলো এবং পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে। সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে কখনো ক্লান্ত করে না। তিনি সবার ঊর্ধ্বে, সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান। [আল-বাক্বারাহ ২৫৫]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সেই দিন চলে আসার আগেই আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে দান করো — আল-বাক্বারাহ ২৫৪

আমরা যখন দান করতে যাই, তখন আমাদের অনেকেরই বেশ কষ্ট হয়। মনে হয়, ইশ! নিজের এত কষ্টের টাকা অন্যকে দিয়ে দিলাম, হায় হায়, এই টাকাটা দিয়ে কত কিছু করতে পারতাম। অথচ আল্লাহ تعالى আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, আমাদের যা কিছু আছে, তার সবই তাঁর দেওয়া। তিনি تعالى আমাদেরকে ‘আমাদের সম্পত্তি’ খরচ করতে বলছেন না, বরং বলছেন, তিনি আমাদেরকে যা দিয়েছেন, তা থেকে যেন আমরা খরচ করি।

সময় নিয়ে চিন্তা করলেই আমরা দেখবো, আমরা জীবনে যা কিছুই অর্জন করেছি, তার সবই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আল্লাহর تعالى দেওয়া। যদি আল্লাহ تعالى আমাদেরকে মেধা, বুদ্ধি, হাত- পা, চোখ-কান, বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, উপকারী মামা-চাচা-খালু না দিতেন, তাহলে আমাদের অর্জনগুলোর কিছুই হতো না। কু’রআনে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে যখন দান করতে বলেন, তখন তিনি আমাদেরকে মনে করিয়ে দেন যে, আমরা দান করছি তাঁরই দেওয়া রিজক থেকে।

আল-বাক্বারাহ’র এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সাবধান করে দিচ্ছেন যে, আমরা যেন সেই দিন আসার আগেই জলদি দান করি, যেদিন আর দান করার কোনো সুযোগ থাকবে না—

2_254

বিশ্বাসীরা, সেই দিন চলে আসার আগেই দান করো, আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে, যেদিন কোনো বিনিময় করা যাবে না, কোনো প্রাণের বন্ধু কাজে আসবে না, কোনো সুপারিশও না। আর যারা বিশ্বাস করতে অস্বীকার করে, তারাই হচ্ছে অন্যায়কারী। [আল-বাক্বারাহ ২৫৪]

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কিন্তু তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলো, কেউ বিশ্বাস করলো, কেউ অবিশ্বাস করলো — আল-বাক্বারাহ ২৫৩

2_253-1

সেই রাসুলগণ, তাদের কয়েকজনকে আমি অন্যদের থেকে বেশি অনুগ্রহ করেছি। তাদের মধ্যে এমন কয়েকজন আছে, যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন। এবং তাদের কাউকে তিনি বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। মরিয়মের সন্তান ঈসা-কে আমি পরিস্কার প্রমাণ দিয়েছি এবং পবিত্র রূহ দিয়ে সহযোগিতা করেছি। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তাহলে তাদের পরে যেসব জাতি এসেছিল, তারা কেউ একে অন্যের বিরুদ্ধে মারামারি করত না, তাদের কাছে পরিস্কার প্রমাণ আসার পরেও। কিন্তু তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলো, কেউ বিশ্বাস করলো, কেউ অবিশ্বাস করলো। যদি আল্লাহ চাইতেন, তাহলে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে মারামারি করত না, কিন্তু আল্লাহ যা চান, তাই করেন। [আল-বাক্বারাহ ২৫৩]

যখন রাসূল মুহাম্মাদ عليه السلام এর কার্টুন আঁকা হয়, তাঁর নামে আজেবাজে কথা ছড়ানো হয়, অপমানজনক চলচ্চিত্র বানানো হয়, তখন কিছু মুসলিমদের রক্ত গরম হয়ে যায়। অনেকেই রাস্তায় বেড়িয়ে অন্য নিরীহ মুসলিমদের গাড়ি, দোকান ভেঙ্গে রাসূলের عليه السلام প্রতি তাদের অগাধ ভালবাসার প্রমাণ দেখান। রাসূলের عليه السلام ‘শিক্ষার প্রতি সম্মান’ দেখিয়ে অ্যাম্বাসি ভাংচুর করেন, যেন যারা রাসূলের عليه السلام অপমান করে, তারা আর ভয়ে কখনো এরকম কাজ করার দুঃসাহস না দেখায়। যদিও সেরকম কিছু কোনোদিন হয়নি, বরং যারা এই কাজগুলো করে, তারা আরও বেশি প্রশ্রয় পেয়ে আরও বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেছে। মুসলিমরা প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে কয়েক  হাজার মানুষ তাদের কথা জানতো। প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর সারা পৃথিবীতে সংবাদ শিরোনাম হয়ে তাদের ব্যবসা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। রাসূলের عليه السلام বিরুদ্ধে নোংরামি আরও বেড়ে গেছে। মুসলিমরা তাদের ‘ঈমানী দায়িত্ব পালন’ করে রাসূলের عليه السلام অপমান গুটি কয়েক মানুষের থেকে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

তাহলে কী রাসূলের عليه السلام অপমান হলে আমরা প্রতিবাদ করব না? অবশ্যই করবো, কিন্তু করার সময় প্রজ্ঞা দেখাতে হবে, মূর্খতা দেখালে হবে না। একইসাথে আমাদের সব নবীর প্রতি নিরপেক্ষ হতে হবে। বহু বছর আগে থেকেই ঈসা عليه السلام এর বিকৃতি করে কার্টুন দিয়ে বাজার ভরে গেছে, হলিউডের চলচ্চিত্রগুলোতে তাকে নিয়ে নিয়মিত ব্যাঙ্গ করা হয়। এগুলো নিয়ে মুসলিমদের কোনো মাথাব্যাথা নেই। ব্যাপারটা এমন যে, ঈসা عليه السلام হচ্ছেন খ্রিস্টানদের সমস্যা, মুসলিমদের তাকে নিয়ে কোনো চিন্তা না করলেও চলবে। ঈসা عليه السلام এর অপমান হলে তো খ্রিস্টানদের অপমান হয়, মুসলিমদের তাতে কিছু যায় আসে না। অন্য কোনো নবীর সম্মান রক্ষা করা মুসলিমদের ঈমানী দায়িত্ব না।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কত বার এমন হয়েছে যে, ছোট একটা দল বড় বাহিনীকে পরাজিত করতে পেরেছে আল্লাহর অনুমতিতে —আল-বাক্বারাহ ২৪৬-২৫২

মুসলিমদের উপর যখন অমুসলিমরা নির্যাতন করে, তাদের সম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায়, কর্তৃত্ব দখল করে নেয়, বাড়িঘর থেকে বের করে দেয়, তখন মুসলিমরা কীভাবে যুদ্ধ করে তাদের অধিকার আদায় করবে, তা আল্লাহ تعالى আল-বাক্বারাহ’তে তালুত এবং দাউদ عليه السلام-এর ঘটনার মাধ্যমে আমাদেরকে শিখিয়েছেন। এই আয়াতগুলো থেকে আমরা জানতে পারি: তারা কোন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ করেছিলেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে একটি মুসলিম সম্প্রদায় হাতে অস্ত্র তুলে যুদ্ধ করতে পারে। মাত্র ছয়টি আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে ইতিহাসের সেই অসাধারণ ঘটনার পরিষ্কার বর্ণনা দেবেন, যেই ঘটনা নিয়ে বাইবেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বিভ্রান্তিকর বর্ণনা আছে। এই আয়াতগুলো থেকে একজন নেতা অনেক উপলব্ধির বিষয় পাবেন। একই সাথে অনুসারীরাও বিভিন্ন প্রকারের নেতাদের সম্পর্কে সাবধান হতে পারবেন—

2_246_title

2_246

বনি ইসরাইলের ওই গোত্র প্রধানদের কথা ভেবে দেখেছ, যারা তাদের নবীকে বলেছিল, “আমাদের জন্য এক রাজা নির্ধারণ করে দিন, যেন আমরা আল্লাহর تعالى পথে যুদ্ধ করতে পারি।” তিনি বলেন, “যদি এমন হয় যে, তোমাদের উপর যুদ্ধ করার আদেশ আসলো, কিন্তু তারপরেও তোমরা যুদ্ধ করলে না, তখন?” তারা বলল, “কেন আমরা আল্লাহর تعالى পথে যুদ্ধ করবো না, যখন কিনা আমাদের ঘরবাড়ি থেকে আমাদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে বের করে দেওয়া হয়েছে?” তারপর যখন তাদের উপর যুদ্ধ করার আদেশ আসলো, কয়েকজন বাদে বেশিরভাগই পিঠটান দিলো। আল্লাহ تعالى অন্যায়কারীদের ভালো করে চেনেন। [আল-বাক্বারাহ ২৪৬]

এই আয়াতে বেশ কিছু শেখার ব্যাপার রয়েছে। কখন আল্লাহ تعالى যুদ্ধ করার অধিকার দেন? যখন মুসলিমদের উপর আক্রমণ হয়, তাদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল হয়ে যায়, তখন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ করার জন্য পরিষ্কার প্রমাণ কু’রআনে রয়েছে। এথেকেই দেখা যায়, ক্বিতাল বা যুদ্ধ হচ্ছে মূলত আত্মরক্ষামূলক।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন —আল-বাক্বারাহ ২৪৫

2_245

কে আছে যে আল্লাহকে تعالى ধার দেবে? তাহলে তিনি তাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহই تعالى কমিয়ে দেন এবং বাড়িয়ে দেন। তাঁর কাছেই তোমরা ফিরে যাবে। [আল-বাক্বারাহ ২৪৫]

এই আয়াত পড়ে যে কোনো মুসলিমের লজ্জা পাওয়া উচিত। আল্লাহ تعالى আমার কাছে ধার চাইছেন? আমি দুনিয়ার লোভে এতটাই স্বার্থপর হয়ে গেছি যে, তিনি تعالى এই ভাষা ব্যবহার করে আমাকে বলছেন তাঁর পথে খরচ করতে?

ধরুন, আপনার মা ছোটবেলা থেকে অনেক কষ্ট করে কাজ করে আপনাকে বড় করেছেন।  আপনার পড়ালেখার খরচ যোগান দিয়েছেন। তিনি আপনাকে একটুও কষ্ট করতে দেননি, যেন আপনার পড়াশুনায় কোনো ক্ষতি হয়, যেন আপনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন। আপনার মায়ের এই বিরাট আত্মত্যাগের জন্য আপনি বড় হয়ে শিক্ষিত হলেন, ডিগ্রি অর্জন করলেন, যথেষ্ট সম্পত্তির মালিকও হলেন। আপনার মা আপনার যত এত কষ্ট না করলে আপনি এত উপরে উঠতে পারতেন না। একদিন তিনি আপনাকে অনুরোধ করছেন, ‘বাবা, আমাকে কিছু টাকা ধার দেবে? আমি আগামী বছরই ফেরত দিয়ে দেবো। আর আমি তোমাকে ধারের টাকার দ্বিগুণ ফেরত দেবো। কোনো চিন্তা করো না বাবা। একটু ধার দেবে?’ —যখন মা তাকে এই ভাষায় অনুরোধ করছেন, দ্বিগুণ ফেরত দেওয়ার কথা বলছেন, এথেকেই বোঝা যায়, সে ছেলে হিসেবে কতটা নীচে নেমেছে, কতটা লোভী হয়ে গেছে যে, তাকে এভাবে বোঝাতে হচ্ছে।   (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা মৃত্যুর ভয়ে হাজারে হাজারে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গিয়েছিলো? — আল-বাক্বারাহ ২৪৩

2_243

তুমি কি তাদেরকে দেখনি যারা মৃত্যুর ভয়ে হাজারে হাজারে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে গিয়েছিলো? তখন আল্লাহ تعالى তাদেরকে বললেন, “মরো”। তারপরে একদিন তিনি তাদেরকে জীবিত করলেন। আল্লাহ تعالى মানুষের অনেক কল্যাণ করেন, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ কৃতজ্ঞতা দেখায় না। [আল-বাক্বারাহ ২৪৩]

2_244

আর আল্লাহর تعالى পথে যুদ্ধ (ক্বিতাল) করো। জেনে রেখো, আল্লাহ تعالى সব শুনছেন, সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২৪৪]

এই আয়াতের প্রেক্ষাপট নিয়ে দুটো ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। একটি ঘটনা হলো: একদল মানুষ একবার মহামারি আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ تعالى তাদেরকে শাস্তি হিসেবে মৃত্যু দেন এটা শেখানোর জন্য যে, মানুষ কখনো মৃত্যু থেকে পালাতে পারবে না। যাদের জন্য মৃত্যু নির্দিষ্ট, সেদিন সে মারা যাবেই। মানুষের ক্ষমতা নেই তার জন্য নির্ধারিত মৃত্যু থেকে পালিয়ে যাওয়ার। [৬][৮][৯][১০][১২][১৪][১৭][১৮]

আরেকটি ঘটনা, যার সাথে কু’রআনের আয়াতগুলোর সাথে সঙ্গতি মেলে, তা হলো: বনু ইসরাইলদেরকে যখন তাদের প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদেশ করা হয়েছিল নবীর মাধ্যমে, তখন হাজার খানেক মানুষ জানের ভয়ে যুদ্ধ করা থেকে পালিয়ে যায়। তাদেরকে আল্লাহ تعالى অবাধ্যতার শাস্তি হিসেবে মৃত্যু দেন। এভাবে তিনি মানুষকে শেখান যে, আল্লাহর تعالى পথে যুদ্ধ করা থেকে পালিয়ে গিয়ে কোনো লাভ নেই। যার মারা যাওয়ার কথা, সে মারা যাবেই। যার জন্য আল্লাহ تعالى হায়াত লিখে রেখেছেন, সে একটার পর একটা যুদ্ধে অংশ নিলেও মরবে না, জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবেই। আর যার জন্য আল্লাহ تعالى মৃত্যু লিখে রেখেছেন, সে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গুহায় গিয়ে বসে থাকলেও মারা যাবেই। শুধুই পার্থক্য হলো, যুদ্ধে গেলে মৃত্যু হবে একটা বিরাট অর্জন, আর পালিয়ে গেলে মৃত্যু হবে অর্থহীন, অপমানকর এক সমাপ্তি।[১২][১৪][৪][৬][১৭][১৮][১৩]

2_243_title

জিহাদ এবং ক্বিতালের মধ্যে পার্থক্য
আজকে জিহাদ এবং ক্বিতাল শব্দদুটোর ব্যাপক অপব্যবহার করা হচ্ছে। একদল সংগঠন কু’রআনের আয়াতগুলোতে জিহাদ এবং ক্বিতালের মধ্যে পার্থক্য না করে, জিহাদের জায়গায় ক্বিতাল করার প্রচারণা চালাচ্ছে। আরেকদল সংগঠন ক্বিতালের আয়াতগুলোকে সাধারণ জিহাদ অনুবাদ করে স্পষ্ট প্রতিরোধ এবং যুদ্ধের জায়গায় চুপচাপ বসে অপেক্ষা করা এবং অন্যায়ের সাথে আপোষ করে চলার জন্য প্রচারণা করছে।

এই দুই পক্ষই দাবি করে যে, যেহেতু জিহাদ এবং ক্বিতাল সমার্থক শব্দ, তাই এই শব্দ দুটোকে একে অপরের জায়গায় বদল করা যায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এরা আয়াতগুলোতে জিহাদের জায়গায় ক্বিতাল এবং ক্বিতালের জায়গায় জিহাদ সুবিধামত বসিয়ে, তাদের ইচ্ছেমত অনুবাদ এবং ব্যাখ্যা করে, যেন তারা তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পারে। একারণে যখনই যুদ্ধ, সংগ্রাম, হত্যা ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো আয়াত বা হাদিস পাবেন, প্রথমেই দেখে নেবেন আরবিতে শব্দটা কি জিহাদ নাকি ক্বিতাল।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সূরাহ ফাতিহাহ —আমরা যা শিখিনি

সম্পাদনা: ডঃ আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া, শাইখ সানাউল্লাহ নজির আহমদ, শরিফ আবু হায়াত অপু

রাসুল মুহাম্মাদ عليه السلام যখন ১৪০০ বছর আগে অমুসলিম আরবদেরকে কু’রআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তা শুনে আরবদের দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো—

কি অসাধারণ কথা! এভাবে তো আমরা কখনও আরবি ব্যবহার করার কথা ভেবে দেখিনি! এত অসাধারণ বাক্য গঠন, শব্দ নির্বাচন তো আমাদের সবচেয়ে বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকরাও করতে পারে না! এমন কঠিন বাণী, এমন হৃদয় স্পর্শী করে কেউ তো কোনো দিন বলতে পারেনি! এই জিনিস তো মানুষের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়! এটা নিশ্চয়ই আল্লাহর تعالى বাণী! আমি সাক্ষি দিচ্ছি – লা ইলাহা ইল্লালাহ…

  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

নামাজগুলোর সাবধানে যত্ন নাও — আল-বাক্বারাহ ২৩৮

ফার্সি ভাষায় ‘নামাজ’, আরবিতে ‘সালাহ’ শব্দটির একটি অর্থ হলো ‘সংযোগ’। নামাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর تعالى সাথে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করি, সবসময় তাঁকে মনে রাখি। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ একারণেই দিয়েছেন, যেন আমরা কাজের চাপে পড়ে, হিন্দি সিরিয়াল বা খেলা দেখতে গিয়ে, বা রাতভর ভিডিও গেম খেলতে গিয়ে তাঁকে ভুলে না যাই। কারণ তাঁকে ভুলে যাওয়াটাই হচ্ছে আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। যখনি আমরা একটু একটু করে আল্লাহকে تعالى ভুলে যাওয়া শুরু করি, তখনি আমরা আস্তে আস্তে অনুশোচনা অনুভব না করে খারাপ কাজ করতে শুরু করি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আমাদের পতন। দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আমাদেরকে এই একটু একটু করে নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে, আল্লাহর تعالى সাথে সংযোগ কিছুটা হলেও ধরে রাখে।

লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, সূরা আল-বাক্বারাহ’তে তালাক নিয়ে কয়েকটি আয়াত এবং বিধবাদের নিয়ে কয়েকটি আয়াতের ঠিক মাঝখানে আল্লাহ تعالى নামাজের কথা বললেন—

2_238

নামাজগুলোর সাবধানে যত্ন নাও, আর বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের, আর আল্লাহর تعالى সামনে সম্পূর্ণ একাগ্রতার সাথে দাঁড়াও। [আল-বাক্বারাহ ২৩৮]

তালাক এবং মৃত্যু দুটোই মানুষের জন্য ভয়াবহ ঘটনা। অনেকেই এই পরিস্থিতিতে পড়ে সবার আগে আল্লাহকে تعالى দোষ দেন, “কেন আমার বেলায় এমন হলো? আমি কী করেছি? আমার তো কোন দোষ ছিলো না? আমি এত নামাজ পড়তাম, যাকাত দিতাম, রোজা রাখতাম, তাহলে আমার কপালে এমন মানুষ জুটলো কেন?” —আল্লাহ تعالى এই দুই কঠিন ঘটনার মাঝখানে নামাজের আয়াত দিয়ে আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, জীবনে যতই কষ্ট আসুক, আমরা যেন নামাজ ছেড়ে না দেই। নামাজকে আমাদের শক্ত হাতে পাহারা দিতে হবে। জীবনের কঠিন ঘটনাগুলোতে আল্লাহর تعالى সাথে রাগ করে নামাজ ছেড়ে না দিয়ে, বরং দৃঢ়ভাবে নামাজকে আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। নামাজ হচ্ছে আল্লাহর تعالى সাথে আমাদের সংযোগ, আল্লাহর সাথে আমাদের একান্ত সম্পর্ক। বিপদ, দুর্যোগ, শারীরিক বা মানসিক কষ্টের সময় যদি আমরা আল্লাহর تعالى সাথেই সংযোগ কেটে দেই, তাহলে আমরা কার কাছে যাবো? আল্লাহ تعالى ছাড়া আর কে আছে, যে আমাদের কঠিন অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে পারে?

2_238_title  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমরা যদি সেই নারীদের বিয়ের ইঙ্গিত দাও — আল-বাক্বারাহ ২৩৪-২৪২

গত হাজার বছর ধরে ভারত উপমহাদেশে বিধবারা ভয়ঙ্কর অত্যাচার এবং অন্যায়ের শিকার হচ্ছে। হিন্দু আঞ্চলিক প্রথা অনুসারে বিধবাদের একসময় স্বামীর চিতায় জীবন্ত জ্বলে মরতে বাধ্য করা হতো। না হলে ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে তাদের অর্ধমৃতের মতো বেঁচে থাকতে হতো। বিধবারা সারাজীবন সাদা কাপড় পড়ে থাকতো, কখনো সাজতে পারত না, প্রথা অনুসারে মাথা কামিয়ে ফেলতে হতো। স্বামীর সম্পত্তিতে তাদের কোনো অধিকার ছিল না। বিধবা হয়ে যাওয়ার পর তাদের দেখাশুনা, ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর পক্ষ থেকে কেউ নিত না। তাদের জন্য পেঁয়াজ, রসুন, আমিষ ইত্যাদি খাওয়া সারা জীবনের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যেত। সমাজ তাদেরকে দেখত এক অশুভ, অস্পৃশ্য, ঘৃণিত সত্তা হিসেবে। স্বামীর মৃত্যুর জন্য বিধবার পোড়া কপালকে দোষ দেওয়া হতো।[৩৭৮][৩৭৯][৩৮০]  এই হচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা। আর ইসলাম আসার আগে প্রাচীন আরবে বিধবাদের নিয়ে কী করা হতো তা বর্ণনা করার ভাষা নেই।[১৪][১২]

আজকে লক্ষ লক্ষ নারী বাল্য বিয়ে করে স্বামী হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অল্প বয়সে মা হয়ে স্বামী হারিয়ে, শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত ভীষণ কষ্টের জীবন পার করে। পরিসংখ্যান অনুসারে ভারতে ৪ কোটি বিধবা রয়েছে, যার একটি বড় অংশ আশ্রমে থাকে, না হয় রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করে, না হলে পতিতালয়ে থেকে জীবন যাপন করছে। —এদের কেউ দেখে না। তাদের সন্তানরা তাদের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজে তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কোথাও তারা মানুষ হিসেবে সম্মান পায় না।[৩৭৮][৩৭৯][৩৮০]

বহু যুগ ধরে উপমহাদেশের বেশিরভাগ মুসলিমরা ইসলাম এবং হিন্দু সংস্কৃতি মিলিয়ে একটা খিচুড়ি ধর্ম পালন করছে। যার ফলে মুসলিমরা না শান্তি পাচ্ছে, না অন্যায় বন্ধ হচ্ছে, না সমাজের সংস্কার হচ্ছে। হিন্দুদের মতো অনেক মুসলিম পরিবারে স্বামী মারা গেলে বিধবা স্ত্রীর ‘পোড়া কপালকে’ দোষ দেওয়া হয়, যেখানে ইসলামে পরিষ্কারভাবে বলা আছে: মৃত্যুর সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আল্লাহর تعالى হাতে এবং ‘পোড়া কপাল’, ‘কুফা’ এই ধারণাগুলো হচ্ছে শিরক।[৩৮৩] এখনো গ্রামে-গঞ্জে মুসলিম সমাজে বিধবাদের অশুভ, কুলক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। অনেক মুসলিম পরিবারে বিধবাদের আর কখনো বিয়ে করতে দেওয়া হয় না। বেশিরভাগ মুসলিম পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করার সময় বিধবাদের কথা চিন্তাও করবে না, যেখানে কিনা রাসুল عليه السلام-এর মাত্র একজন স্ত্রী ছিলেন কুমারী, আর বিভিন্ন সময়ে ৮ জন স্ত্রী হয়েছিলেন বয়স্ক বিধবা।

মুসলিমরা যদি কুরআন পড়ত, তাহলে দেখত বিধবাদের সম্পর্কে আল্লাহ تعالى কত সুন্দর শিক্ষা দিয়েছেন, যা ১৪০০ বছর আগে মুসলিমরা অনুসরণ করে বিধবাদের জীবনকে সুন্দর, সম্মানের করে দিয়েছিল। লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো:  ইসলাম, খ্রিস্টান, ইহুদি —এই তিন ধর্মেই বিধবাদের সম্মান দেওয়া হয়েছে। তাদের জীবন নিরাপদে, সুন্দরভাবে পার করার জন্য আবারো বিয়ের অনুমতি দিয়েছে। বিধবাদের ঠিকমতো দেখাশুনা করার দায়িত্ব সমাজের উপর দেওয়া হয়েছে। একইসাথে বিধবাদের যত্ন নেওয়ার বিনিময়ে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে বড় পুরষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।[৩৮৩] শুধুই হিন্দু ধর্ম বাদে। এথেকেই বোঝা যায় যে, ইসলাম, খ্রিস্টান, ইহুদি ধর্মের উৎস একজন অত্যন্ত দয়ালু, নারী-পুরুষের প্রতি সদয় দৃষ্টিভঙ্গির একজন সত্তা, যার পুরুষদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব নেই। আর হিন্দু ধর্মের উৎস পুরুষতান্ত্রিক, নারী-বিদ্বেষী, অমানবিক এক বা একাধিক সত্তা।

সূরা আল-বাক্বারাহ’র এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শিখিয়েছেন বিধবাদের সম্পর্কে ইসলামের নিয়ম কী হবে। আমরা লক্ষ করলে দেখবো, নিয়মগুলো বেশিরভাগই নারীদের পক্ষে। আয়াতগুলো নিয়ে ঠিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, এই নিয়মগুলোর পেছনে কী বিরাট প্রজ্ঞা রয়েছে—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)