ইসলাম আসার আগে এবং প্রাচীন ধর্মগুলোতে নারীরা ছিল স্বামীদের সম্পত্তি। নারীদের তারা অনেকটা পোষা প্রাণীর মতো পালত। বিয়ে এবং তালাকের ব্যাপারে নারীদের কোনো অধিকার ছিল না। তাদের বাবা-মা যেখানে তাদের বিয়ে দিত, সেখানেই তারা সংসার করতে বাধ্য ছিল। বিয়ের পরে তারা হয়ে যেত স্বামীর সম্পত্তি। স্বামী যখন ইচ্ছা তাদের তালাক দিত, যখন ইচ্ছা তাদের ফিরিয়ে নিত। স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীদের কোনো অধিকার ছিল না। স্ত্রীর সম্পত্তি স্বামী যেভাবে ইচ্ছা খরচ করত। স্বামীর সিদ্ধান্তের উপর প্রশ্ন করার অধিকারও তাদের ছিল না। দাসির মতো মানবেতর জীবনযাপন করে স্ত্রীরা সারাজীবন স্বামীকে খুশি রাখার সবরকম চেষ্টায় যাবতীয় অপমান, অন্যায় মেনে নিয়ে জীবন পার করে দিত। আর প্রার্থনা করত যেন তার কখনো মেয়ে সন্তান জন্ম না হয়।[৪] (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য আল্লাহ তোমাদেরকে ধরবেন না — আল-বাক্বারাহ ২২৪-২২৫
আজকাল আমরা কথায় কথায় এমন সব শপথ নেই, যেগুলো আমাদের মধ্যে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, নিজেদের মধ্যে মিলমিশ করতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন ধরুন, একদিন এক আত্মীয়ের অন্যায় কাজে আপনি রেগে গিয়ে মনে মনে বললেন, “আল্লাহর تعالى কসম! আমি যদি কোনোদিন আর এর কোনো উপকার করেছি।” এই শপথের কারণে আপনি রমজানে তাকে আর যাকাত দিলেন না, অথচ সে ছিল আপনার কাছ থেকে যাকাত পাওয়ার সবচেয়ে বড় দাবীদার। আবার অনেকে মন মতো কিছু না হলে এমন সব শপথ নেন, যা ভয়ঙ্কর। যেমন, ছেলে নিজে পছন্দ করে মেয়ে বিয়ে করে এনেছে দেখে, ছেলের মা অপমানে মুখ বুঝে কোনোমতে বিয়ের অনুষ্ঠানটা পার করেছে। মেয়ে-পক্ষের দাওয়াতে মুরগির রান না দেওয়াতে সে রেগে গজ গজ করে বলেছে, “আল্লাহর تعالى কসম! এই মেয়েকে আমি কোনোদিন মেনে নিবো না।” এরপর থেকে সেই শপথের কথা রাখার জন্য শাশুড়ি কোনোদিন বউয়ের সাথে হাসিমুখে, ভদ্রভাবে কথা বলে না। সব কথায় একটা খোঁচা, একটা ধমক থাকবেই, পাছে আবার শপথ ভেঙ্গে যায়।
এই ধরনের শপথের ব্যাপারে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কঠিনভাবে বলেছেন—

আল্লাহর নামে নেওয়া শপথকে বাঁধা হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেবে না তোমাদের সৎকাজ, আত্মসংযম এবং মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে। আল্লাহ সব শোনেন, সব জানেন। [আল-বাক্বারাহ ২২৪]
প্রথমত, আল্লাহর تعالى পবিত্র নাম নিয়ে কোনো অন্যায় কাজের শপথই করার কথা না। এই ধরনের শপথ যারা করে, তাদের কাছে আল্লাহর تعالى নাম নেওয়াটা একটা খেলা হয়ে গেছে। তারা কথায় কথায় আল্লাহর تعالى পবিত্র নাম মুখে আনার দুঃসাহস দেখায়।

তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র — আল-বাক্বারাহ ২২৩
“তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্য ক্ষেত্র… [সূরা আল-বাক্বারাহ]” — কত অপমানকর কথা! ইসলাম নারীদেরকে মানুষ মনে করে না, চাষের জমি মনে করে? “… তোমরা যেভাবে ইচ্ছা তাদেরকে ব্যবহার করো ” — নারীরা কি পুরুষদের সম্পত্তি যে, যখন যা খুশি করবে? এই হচ্ছে ইসলামে নারীর সম্মান? ইসলাম না বড় গলায় বলে যে, এটা নারীদের অধিকার দিয়েছে? এই হচ্ছে তার নমুনা?
আজকাল একদল নাস্তিক এবং নারীবাদীরা সূরা আল-বাক্বারাহ’র এই আয়াতটি ব্যবহার করে ইসলামকে নারীদের জন্য একটি বর্বর, নিষ্ঠুর, পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম বলে অপপ্রচার চালায়। আসুন দেখি কু’রআন আসলে কী বলে, আর তারা কু’রআনকে দিয়ে কী বলায়—

তোমাদের স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত। তাই তোমাদের শস্যক্ষেতে যাও, যেভাবে তোমরা চাও। নিজেদের জন্য আগামী দিনের ব্যবস্থা করো। আর আল্লাহর تعالى প্রতি সাবধান! জেনে রেখো তোমরা তাঁর সামনা সামনি হতে যাচ্ছো। আর যারা পূর্ণ বিশ্বাসী হয়ে গেছে, তাদেরকে সুসংবাদ দাও। [আল-বাক্বারাহ ২২৩]

নারীবাদী এবং নাস্তিকরা নানা বিকৃত উপমা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, কু’রআন নারীদেরকে কতটা নিচু মনে করে, মানুষের সমান মর্যাদা দেয় না, পুরুষদেরকে স্ত্রীদের সাথে যা খুশি করার অধিকার দেয় ইত্যাদি। তাদের এইসব নোংরা উপমা পড়ে মুসলিমরাও ঘাবড়ে যান। অনেক মুসলিম নারী সেই সব অপব্যাখ্যা পড়ে কু’রআনকে খারাপভাবে দেখা শুরু করেন। তারপর তার এবং আল্লাহ تعالى সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরা শুরু হয়ে যায়। (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
ওরা তোমাকে মাসিকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে — আল-বাক্বারাহ ২২২

ওরা তোমাকে মাসিকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এটা কষ্ট। তাই মাসিকের দিনগুলোতে নিজেদেরকে তাদের থেকে আলাদা রাখো। যতক্ষণ তারা পরিচ্ছন্ন হয়ে না যাচ্ছে, ততক্ষণ তাদের কাছে যাবে না। তারপর যখন তারা নিজেদেরকে পরিচ্ছন্ন করে, তখন তাদের কাছে যাও, যেখানে যেতে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ অবশ্যই তাদেরকে ভালোবাসেন, যারা বার বার তাঁর কাছে ক্ষমা চায়। তিনি তাদেরকে ভালোবাসেন যারা নিজেদেরকে সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করে। [আল-বাক্বারাহ ২২২]
অন্য ধর্মের মানুষদের মধ্যে মাসিকের ব্যাপারে নানা ধরনের কুসংস্কার এবং নোংরা সব ধারণা ছিল এবং এখনো আছে। নারীদেরকে এই সময়টাতে এক ঘরে করে রাখা হতো। তাদের সাথে এক বিছানায় কেউ শুতে চাইত না। তাদের সাথে একসাথে বসে খাবার পর্যন্ত খেত না, আলাদা করে খেতে বসতে দেওয়া হতো। নারীদেরকে রান্না ঘরে রান্না করতে দেওয়া হতো না, কারণ তাদের রান্না করা খাবার খেলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়বে। এধরনের নানা রকমের অন্যায় থেকে শুরু করে এই সময়টাতে নারীদের সাথে নানা ধরনের নোংরা কাজও করা হতো।[১২] দুঃখের ব্যাপার হলো এই কষ্টের সময়টাতে পুরুষরা নারীদের সাথে অন্যায় তো করতোই, এমনকি পরিবারের অন্য নারীরাও মাসিকে থাকা মেয়েদের সাথে দুর্ব্যবহার করতো।
ইসলাম মাসিক সম্পর্কে যাবতীয় ভুল ধারণা অবসান করেছে, নারীদের সাথে অন্যায় করা বন্ধ করেছে, নারীদের এই স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যাপারটাকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে। যেই সব নারীবাদীরা অপপ্রচার করে বেড়ায় যে, ইসলাম নারীদেরকে হেয় করে, তারা ইতিহাস পড়ে দেখুক ইসলাম আসার আগে নারীদের জীবন কী ভয়ঙ্কর কষ্টের এবং অপমানের ছিল। ইসলাম আসার আগে প্রত্যেক মাসে এক সপ্তাহ নারীরা যে পরিমাণের অন্যায়, দুর্ব্যবহার এবং অপমান সহ্য করতো, আর ইসলাম আসার পরে নারীদের অবস্থা কীভাবে আমূল বদলে গেল, সেটাই নারীবাদীদের চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দুঃখজনকভাবে উপমহাদেশের মুসলিমরা হিন্দু ধর্ম দিয়ে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। হিন্দুদের নানা কুসংস্কার, অশুচির ধারণা মুসলিমদের মধ্যেও ঢুকে গেছে। যার ফলে মাসিক সম্পর্কে ইসলাম যা শিখিয়েছে, সেটা মুসলিমরা হিন্দুদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস, কুসংস্কার দিয়ে গুলিয়ে ফেলেছে। এখনো গ্রামে-গঞ্জে এই সময়টাতে নারীদের সাথে ব্যাপক অন্যায় আচরণ হতে দেখা যায়।
আল্লাহ تعالى মানুষকে সর্বশ্রেষ্ঠ ডিজাইনে তৈরি করেছেন। মাসিক আল্লাহর تعالى সর্বশ্রেষ্ঠ ডিজাইনের একটি অংশ। মাসিকের ব্যাপারটাকে খারাপভাবে দেখার সময় আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে: আমরা কি আল্লাহর تعالى সর্বশ্রেষ্ঠ ডিজাইনকে খারাপভাবে দেখছি? আমরা কি আল্লাহর تعالى ডিজাইনের কোনো একটি ব্যাপারকে ঘৃণা করছি? আল্লাহ تعالى কু’রআনে গর্ব করে বলেছেন যে, তিনি মানুষকে সবচেয়ে সুন্দর গঠনে সৃষ্টি করেছেন [সূরা আত-ত্বিন ৯৫:৪]। আমরা কি তাহলে মানুষের গঠনের কোনো একটি দিকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন করার মতো ধৃষ্টতা দেখাচ্ছি?

মাসিক কেন হয়? (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
ওরা তোমাদেরকে আগুনের দিকে ডাকে — আল-বাক্বারাহ ২২১
চৌধুরী সাহেব তার বিদেশের বাড়িতে আরাম চেয়ারে বসে, কফি হাতে নিয়ে একটা বইয়ে ডুবে আছেন। তখন তার ছেলে এসে বলল, “বাবা, আমি জেনিফারকে বিয়ে করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ওকে আমার অনেক ভালো লাগে। ও অন্যদের মতো খারাপ না। পার্টি করে না। আমি ওকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবো না।”
“কী!”, চৌধুরী সাহেব রাগে লাল হয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলেন , “তুমি বিয়ে করবে এক খ্রিস্টান মেয়েকে? এই জন্য তোমাকে আমি বিদেশে বড় করেছি? আমরা চৌধুরী বংশ! আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে আমি খ্রিস্টান মেয়ে বিয়ে করতে দেবো না….”, বলতে বলতে চৌধুরী সাহেব বুক চেপে ধরে মাটিতে পড়ে গেলেন।
এই ধরনের ঘটনা আজকে বিদেশে বসবাসকারী মুসলিম পরিবারগুলোতে নিত্যদিনের ঘটনা। চৌধুরী সাহেব টাইপের বাবা-মা তাদের সন্তানদের বড় করেন পাশ্চাত্যের সংস্কৃতিতে। তাদের ছেলেমেয়েরা পশ্চিমা টিভি, মুভি, ম্যাগাজিন দেখে জীবন সম্পর্কে শেখে। পশ্চিমা স্কুল-কলেজ-ইউনিভারসিটিতে হাজারো অমুসলিম ছেলেমেয়ের সাথে ওঠাবসা করে বড় হয়। আর তাদের বাবা-মায়েরা সপ্তাহে একদিন তাদেরকে জুমুআহ’র নামাজে মসজিদে নিয়ে, পহেলা বৈশাখে বাঙালি পোশাক পরিয়ে, পান্তা ভাত খাইয়ে ধরে নেন: তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে ‘বাঙালি মুসলিম আদর্শ’ ধরে রাখবে। তারপর দেশ থেকে আমদানি করে আনা কাউকে ধরিয়ে দিলেই তাকে বিয়ে করে সুখে সংসার পার করবে।
এই বাবা-মা’রা যদি তাদের সন্তানদেরকে কুর’আন শেখাতেন এবং নিজেরা শিখতেন, তাহলে তারা বিয়ে সম্পর্কে আজকাল প্রচলিত অনেক বিভ্রান্তির উত্তর পেয়ে যেতেন—

মুশরিক নারীদেরকে বিয়ে করবে না, যতক্ষণ না তারা ঈমান আনছে। একজন বিশ্বাসী দাসীও মুশরিক নারী থেকে ভালো, যদিও কিনা মুশরিক নারী তোমাদেরকে বিমোহিত করে। আর তোমাদের মেয়েদেরকে মুশরিক পুরুষদের সাথে বিয়ে দেবে না, কারণ একজন বিশ্বাসী দাসও মুশরিক পুরুষ থেকে ভালো, যদিও কিনা সে তোমাদেরকে মুগ্ধ করে। ওরা তোমাদেরকে আগুনের দিকে ডাকে। আর আল্লাহ তোমাদেরকে জান্নাত এবং তার নিজগুণে ক্ষমার দিকে ডাকেন। তিনি তাঁর নির্দেশগুলোকে মানুষের কাছে একদম পরিষ্কার করে দেন, যাতে করে তারা শিক্ষা নিতে পারে। [আল-বাক্বারাহ ২২১]
আজকাল প্রায়ই শোনা যায় এমন সব প্রশ্ন: “ভাই, আমি আমার হিন্দু বান্ধবীকে বিয়ে করতে চাই। তাকে আমি মুসলিম বানিয়ে ফেলবো। সে-ও বলেছে যে সে ইসলাম “ট্রাই” করে দেখতে চায়। এভাবে একজনকে মুসলিম বানানোর বিরাট সওয়াব আমি পাবো। তাছাড়া আজকালকার মুসলিম মেয়েদের কী অবস্থা দেখেন না? ইউনিভার্সিটি পার না হতেই কয় হাত বদল হয়। আমার এই বিয়েটা তো অবশ্যই হালাল হবে, তাই না ভাই?” (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের অবস্থা কঠিন করে দিতে পারতেন — আল-বাক্বারাহ ২২০
আমাদের যাদের ছোট বাচ্চা আছে, তারা জানি দিনের মধ্যে কতবার তারা বাবা-মাকে ডাকে। বাবা-মা কিছুক্ষণের জন্য চোখের আড়াল হলেই তারা অস্থির হয়ে ‘বাবা! মা!’ ডাকাডাকি শুরু করে। আর আজকের নিষ্ঠুর সমাজে অল্প বয়সে বাবা-মা হারিয়ে ফেলা একটি ছোট বাচ্চা একা কীভাবে বেঁচে থাকে, কী খায়, কোথায় ঘুমায়, জ্বর হলে কে তাকে মাথায় পানি ঢেলে দেয়, কে তাকে কোলে নিয়ে হাঁটে —এগুলো নিয়ে আমরা কতখানি ভাবি? সারাদিন আমাদের মনের কোনায় চিন্তা চলতে থাকে: নিজের বাচ্চাকে কী খাওয়াবো, কখন ঘুম পাড়াবো, কোথায় পড়াবো, কোথায় ঘুরতে নিয়ে যাবো, কী কিনে দেবো — আর ওদিকে লক্ষ লক্ষ ছোট বাচ্চারা বাবা-মা ছাড়া একা বড় হচ্ছে চরম অবহেলা, অনাদরে, মানুষের নিষ্ঠুর ব্যবহার সহ্য করে।
মানুষের জন্য কল্যাণ করা ইসলামের মূলভিত্তিগুলোর একটি। কু’রআনে আল্লাহ تعالى বহু আয়াতে বহুভাবে আমাদেরকে বলেছেন যে, শুধু নামাজ, রোজা, হাজ্জ ইত্যাদি ধর্মীয় রীতিনীতিগুলো পালন করলেই হবে না, একইসাথে আমাদেরকে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে, সামাজিক, নৈতিক দায়িত্বগুলো পালন করতে হবে। এতিমদের কথা কু’রআনে বহুবার এসেছে, কারণ আল্লাহর تعالى কাছে এতিমদের গুরুত্ব অনেক বেশি। বাবা-মা হারিয়ে ফেলা এতিমের থেকে বেশি আর কেউ আমাদের সামাজিক সেবার দাবীদার হতে পারে না। এতিমদের প্রতি মুসলিমদের দায়িত্ব কতখানি, কীভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে, করার পুরষ্কার এবং না করার শাস্তি সম্পর্কে আমাদের বহুবার সাবধান করে দেওয়া হয়েছে। এরকম একটি আয়াত হলো—


দুনিয়া এবং আখিরাতের ব্যাপারে চিন্তা করো। ওরা তোমাকে এতিমদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, “তাদের জন্য সুব্যবস্থা করাটা তোমাদের জন্যই উত্তম। যদি তাদের সাথে একসাথে থাকো, তাহলে তারা তোমাদের ভাইবোন। আল্লাহ জানেন কে অনিষ্টকারী, আর কে উপকারী। যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তাহলে তোমাদের অবস্থা কঠিন করে দিতে পারতেন। নিঃসন্দেহে তিনি সমস্ত ক্ষমতা এবং কর্তৃত্বের অধিকারী, পরম প্রজ্ঞাবান।” [আল-বাক্বারাহ ২২০]
তাদের জন্য সুব্যবস্থা করাটা তোমাদের জন্যই উত্তম (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
ওরা তোমাকে মদ এবং জুয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে — আল-বাক্বারাহ ২১৯
চৌধুরী সাহেব বলেন, “অ্যালকোহল পান করাটা কোনো বড় গুনাহ না, কারণ হাজার হলেও, কু’রআনেই বলা আছে, ‘তারা যদি তোমাকে মদ এবং জুয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে: বলে দাও, এগুলোতে বিরাট ক্ষতি আছে, কিন্তু মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে’। দেখলে তো? খোদ আল্লাহই বলে দিয়েছেন মদ এবং জুয়াতে কিছু উপকার আছে। সুতরাং একটুআধটু হুইস্কি পান করলে কোনো সমস্যা নেই, আমি তো আর মাতাল হয়ে যাচ্ছি না। বরং একটু হুইস্কি বা ওয়াইন পান করলে হজম ভালো হয়। আর লটারিতে তো কোনো সমস্যাই নেই। হাজার হলেও হার্ট ফাউন্ডেশনের লটারি, এতে কত মানুষের চিকিৎসা হবে কখনও চিন্তা করে দেখেছ? বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর ত্যাগ সবসময়ই আল্লাহ পছন্দ করেন।”
এধরনের চৌধুরী সাহেব টাইপের মানুষরা আপনাকে বলবে না, কু’রআনের আয়াতে আসলে বলা আছে—

ওরা তোমাকে মদ-মাদক এবং জুয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে, বলে দাও, “এই দুটোতেই বিরাট পাপ, ক্ষতি রয়েছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও। কিন্তু এই দুটো থেকে যে পাপ, ক্ষতি হয়, তা তাদের উপকার থেকে অনেক বেশি। আর ওরা তোমাকে কী খরচ করবে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, ‘প্রয়োজন মেটাবার পর যা বাড়তি থাকে।’ এভাবেই আল্লাহ تعالى তার নির্দেশকে তোমাদের কাছে পরিষ্কার করে দেন, যাতে করে তোমরা চিন্তাভাবনা করো।” [আল-বাক্বারাহ ২১৯]
অনেক মুসলিম সত্যিই মনে করেন অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল পান করা যেহেতু বৈজ্ঞানিক ভাবেই সমর্থিত, তাই তারা তা হারাম মনে করেন না। তারা বিশ্বাস করেন যে, শুধুমাত্র মাতাল হওয়ার মতো পরিমাণ পান করলেই তা হারাম। যদিও বিজ্ঞানীরা কী বলছেন তাতে কিছুই আসে যায় না সেটা হালাল না হারাম হবে কিনা। কিন্তু যারা বিজ্ঞানীদের উপর নির্ভর করেন, তাদের জন্য দুঃসংবাদ। ২০১৫ সালে বিস্তারিত পরীক্ষা করে বিবিসিতে দেখানো হয়েছে যে, অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল খাওয়াও লিভারের জন্য ক্ষতিকর। যারা নিয়মিত ‘নিরাপদ’ পরিমাণে অ্যালকোহল পান করে আসছিলেন, তাদের লিভারও দফারফা। দীর্ঘদিন অ্যালকোহল ছেড়ে না থাকলে লিভার আর সুস্থ অবস্থায় ফিরে যেতে পারে না। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশের পর শত বছর ধরে চলে আসা চিকিৎসা বিজ্ঞানের বইগুলো শীঘ্রই পরিবর্তন হতে যাচ্ছে।[৩১৩] (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
যারা অন্যায় থেকে বাঁচতে ভিটেমাটি ত্যাগ করেছে —আল-বাক্বারাহ ২১৮
অন্যায় থেকে বাঁচার জন্য প্রেক্ষাপট অনুসারে ইসলামে দুটো পথ রয়েছে— ১) অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, অথবা ২) অন্যায় থেকে সরে যাওয়া। যখন মুসলিমরা কোনো দেশে বা এলাকায় সংখ্যালঘু বা প্রতিপক্ষের তুলনায় এতটাই দুর্বল যে, কোনো ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধ করতে গেলে প্রতিপক্ষের আক্রমণে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু অর্জন হবে না, তখন তাদের হিজরত করে চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো উপায়। এভাবে অনর্থক রক্তপাত হবে না, মুসলিমরা বেঁচে থেকে আল্লাহর ইবাদত করতে পারবে, অন্য জায়গায় গিয়ে ইসলামের প্রচারও করতে পারবে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম হিজরত, যেখানে রাসুল عليه السلام একদল মুসলিমকে মুশরিকদের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করে চলে যেতে বলেন। এধরনের হিজরতে কোনো অপমান নেই, এটি কোনো কাপুরুষের মতো কাজও নয়, বরং আল্লাহর কাছে এটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য একটি কাজ—

যারা বিশ্বাস করেছে এবং যারা অন্যায় থেকে বাঁচতে ভিটেমাটি ছেড়ে চলে গেছে এবং আল্লাহর পথে চলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, কোনো সন্দেহ নেই, ওরা অবশ্যই আল্লাহর দয়া পাওয়ার আশা করতে পারে। আল্লাহ অবশ্যই অনেক ক্ষমা করেন, তিনি নিরন্তর দয়ালু। [আল-বাক্বারাহ ২১৮]
ইসলামিক পরিভাষায় হিজরত হচ্ছে অত্যাচার, অন্যায় থেকে বাঁচতে এবং অন্য মুসলিমদের সাথে যোগ দিতে ভিটেমাটি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া। একইসাথে কোনো শিরক দুষ্ট জায়গা থেকে অন্য কোনো কম শিরক দুষ্ট জায়গা, যেখানে পাপ অপেক্ষাকৃত কম হয়, অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো, মুসলিমদের জান-মালের নিরাপত্তা অপেক্ষাকৃত বেশি, সেখানে চলে যাওয়াও হিজরত।[৩৫৪] (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
হতে পারে তোমরা এমন কিছু পছন্দ করো, যা আসলে তোমাদের জন্য খারাপ — আল-বাক্বারাহ ২১৬
কু’রআনে জিহাদ – সংগ্রাম, এবং কিতাল – যুদ্ধ সম্পর্কে কিছু আয়াত রয়েছে, যেগুলো শুধু অমুসলিমরাই নয়, একই সাথে মুসলিমরাও ব্যাপক অপব্যবহার করেছে ইসলামকে একটি আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক ধর্ম হিসেবে মানুষের কাছে অপপ্রচার করতে। একদিকে অমুসলিমরা এই আয়াতগুলোকে ব্যবহার করেছে ইসলামের শান্তির বাণীকে ধামাচাপা দিয়ে, অমুসলিমদের মনে ইসলামের প্রতি ভয় ঢুকিয়ে দিতে। অন্যদিকে একদল মুসলিম নেতারা এই আয়াতগুলো ব্যবহার করেছে সরলমনা মুসলিম যুবকদের মগজ ধোলাই করে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে।
বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা দেখতে পাই, পশ্চিমাদের অত্যাচারের শিকার হয়ে অনেক ইমাম, আলেম তাদের আগের শান্তিপ্রিয় নীতি রাতারাতি পাল্টে ফেলে, প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলা শুরু করেন। যেই ইমামরা একসময় অমুসলিমদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান সমর্থন করে বক্তৃতা দিতেন, তারাই কয়েক বছর পর সব অমুসলিমদের মেরে ফেলার মতো ফাতওয়া দেওয়া শুরু করেন। অনেকসময় তারা তাদের বক্তৃতা দেওয়ার দক্ষতা এবং ইন্টারনেটের প্রযুক্তির পারদর্শিতা খাঁটিয়ে সারা পৃথিবীতে হাজার হাজার মুসলিমের মধ্যে আগ্রাসী মানসিকতার সূচনা করে দেন। তাদেরকে ঠিক সেই সব কথাই বলতে দেখা যায়, যেটা আজকের মুসলিম তরুণ, যুবকরা শুনতে চায়, করার স্বপ্ন দেখে। তাদের জ্বালাময়ী লেখনী, রক্ত গরম করা বক্তৃতা তরুণরা চোখ বড় বড় করে গিলতে থাকে। যার ফলে রাতারাতি তারা তরুণদের কাছে সেলিব্রিটি হয়ে ওঠেন। তরুণরা কয়েকটা বক্তৃতা শুনেই সারা পৃথিবীর হাজার হাজার, লক্ষ আলেমদেরকে ‘বাতিল’, ‘সরকারের দালাল’, ‘ভন্ড’ বলে গালিগালাজ করা শুরু করে দেয়। আর এইসব দক্ষ বক্তাদেরকে পৃথিবীর বুকে একমাত্র সঠিক ইসলামের বাহক মনে করা শুরু করে। (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)
তোমরা ভালো যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবশ্যই জানেন —আল-বাক্বারাহ ২১৫
আজকাল অনেক আধুনিক মুসলিম ধর্ম মানার কোনো কারণ খুঁজে পান না। তারা ভাবেন যে, ধর্মীয় রীতিগুলো অনুসরণ করা, যেমন নামাজ পড়া, রোজা রাখা —এগুলো করে কী হবে? এগুলো করে কী মানুষের কোনো লাভ হচ্ছে? মানুষের কষ্ট কমছে? অভাব দূর হচ্ছে? সমাজের সংস্কার হচ্ছে? — তাদের জন্য এই আয়াতটি অনুপ্রেরণা দেবে—

ওরা তোমাকে জিজ্ঞেস করে: কীসে তারা খরচ করবে? বলে দাও, “তোমরা ভালো যা কিছুই খরচ করো, প্রথমত সেটা হবে তোমাদের বাবা-মার জন্য, তারপর নিকটজন, এতিম, অভাবী, অসহায় ভ্রাম্যমান মানুষদের জন্য। আর তোমরা ভালো যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবশ্যই জানেন।” [আল-বাক্বারাহ ২১৫]
পৃথিবীর মূল ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলাম হচ্ছে একমাত্র ধর্ম, যেখানে মানুষের জন্য খরচ করা বাধ্যতামূলক। ইসলামে শুধু মানুষের জন্য খরচ করার নির্দেশই দেওয়া হয়নি, একই সাথে কার জন্য কীভাবে খরচ করতে হবে, সেটাও সুন্দরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যেখানে বিশ্বাসের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে একটি হলো বাধ্যতামূলক দান। যারা মনে করেন: মানব ধর্মই আসল ধর্ম, মানুষের উপকার করতে পারাটাই আসল কথা, নামাজ, রোজা করে কী হবে? —তারা হয়তো জানেন না যে, মানব ধর্মের যে সব ব্যাপার তাদের কাছে এত ভালো লাগে, সেগুলো ইসলামের অংশ মাত্র। একজন প্রকৃত মুসলিম শুধুই একজন নিয়মিত নামাজী, রোজাদার নন, একই সাথে তিনি একজন দানশীল মানুষ, একজন চরিত্রবান, আইনের প্রতি অনুগত, আদর্শ নাগরিক।

সুরা আল-বাক্বারাহ’তে এ পর্যন্ত আমরা তিন বার দান করার নির্দেশ পেলাম। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন কুরআনে এতবার দান করার কথা বলা হয়েছে?
আপনি দেখবেন: কিছু মানুষ আছে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমযানে ত্রিশটা রোজা রাখে, কিন্তু গত এক বছরেও কোনোদিন কোনো এতিমখানায় একটা টাকাও দিতে পারেনি। ড্রাইভার, কাজের বুয়া, বাড়ির দারোয়ান তার কাছে বার বার টাকা চাইতে এসে— “দিবো, দিবো, রমজান আসুক” —এই শুনে খালি হাতে ফিরে গেছে। গরিব আত্মীয়স্বজন এসে কয়েকদিন থেকে ফিরে গেছে, কিন্তু কোনো টাকা নিয়ে যেতে পারেনি। মসজিদে বহুবার সে বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য টাকার আবেদন শুনেছে, কিন্তু কোনোদিন পকেটে হাত দিয়ে একটা একশ টাকার নোট বের করে দিতে পারেনি। এয়ারকন্ডিশনড মসজিদে বসে নামাজ পড়া সোজা কাজ, কিন্তু পকেট থেকে হাজার টাকা বের করে গরিব আত্মীয়, প্রতিবেশী, এতিমখানায় দেওয়া যথেষ্ট কঠিন কাজ। এর জন্য ঈমান লাগে। (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)