তোমরা ভালো যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবশ্যই জানেন —আল-বাক্বারাহ ২১৫

আজকাল অনেক আধুনিক মুসলিম ধর্ম মানার কোনো কারণ খুঁজে পান না। তারা ভাবেন যে, ধর্মীয় রীতিগুলো অনুসরণ করা, যেমন নামাজ পড়া, রোজা রাখা —এগুলো করে কী হবে? এগুলো করে কী মানুষের কোনো লাভ হচ্ছে? মানুষের কষ্ট কমছে? অভাব দূর হচ্ছে? সমাজের সংস্কার হচ্ছে? — তাদের জন্য এই আয়াতটি অনুপ্রেরণা দেবে—
2_214

ওরা তোমাকে জিজ্ঞেস করে: কীসে তারা খরচ করবে? বলে দাও, “তোমরা ভালো যা কিছুই খরচ করো, প্রথমত সেটা হবে তোমাদের বাবা-মার জন্য, তারপর নিকটজন, এতিম, অভাবী, অসহায় ভ্রাম্যমান মানুষদের জন্য। আর তোমরা ভালো যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবশ্যই জানেন।” [আল-বাক্বারাহ ২১৫]

পৃথিবীর মূল ধর্মগুলোর মধ্যে ইসলাম হচ্ছে একমাত্র ধর্ম, যেখানে মানুষের জন্য খরচ করা বাধ্যতামূলক। ইসলামে শুধু মানুষের জন্য খরচ করার নির্দেশই দেওয়া হয়নি, একই সাথে কার জন্য কীভাবে খরচ করতে হবে, সেটাও সুন্দরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে। ইসলামই একমাত্র ধর্ম, যেখানে বিশ্বাসের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে একটি হলো বাধ্যতামূলক দান। যারা মনে করেন: মানব ধর্মই আসল ধর্ম, মানুষের উপকার করতে পারাটাই আসল কথা, নামাজ, রোজা করে কী হবে? —তারা হয়তো জানেন না যে, মানব ধর্মের যে সব ব্যাপার তাদের কাছে এত ভালো লাগে, সেগুলো ইসলামের অংশ মাত্র। একজন প্রকৃত মুসলিম শুধুই একজন নিয়মিত নামাজী, রোজাদার নন, একই সাথে তিনি একজন দানশীল মানুষ, একজন চরিত্রবান, আইনের প্রতি অনুগত, আদর্শ নাগরিক।

2_215_title

সুরা আল-বাক্বারাহ’তে এ পর্যন্ত আমরা তিন বার দান করার নির্দেশ পেলাম। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন কুরআনে এতবার দান করার কথা বলা হয়েছে?

আপনি দেখবেন: কিছু মানুষ আছে যারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমযানে ত্রিশটা রোজা রাখে, কিন্তু গত এক বছরেও কোনোদিন কোনো এতিমখানায় একটা টাকাও দিতে পারেনি। ড্রাইভার, কাজের বুয়া, বাড়ির দারোয়ান তার কাছে বার বার টাকা চাইতে এসে— “দিবো, দিবো, রমজান আসুক” —এই শুনে খালি হাতে ফিরে গেছে। গরিব আত্মীয়স্বজন এসে কয়েকদিন থেকে ফিরে গেছে, কিন্তু কোনো টাকা নিয়ে যেতে পারেনি। মসজিদে বহুবার সে বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য টাকার আবেদন শুনেছে, কিন্তু কোনোদিন পকেটে হাত দিয়ে একটা একশ টাকার নোট বের করে দিতে পারেনি। এয়ারকন্ডিশনড মসজিদে বসে নামাজ পড়া সোজা কাজ, কিন্তু পকেট থেকে হাজার টাকা বের করে গরিব আত্মীয়, প্রতিবেশী, এতিমখানায় দেওয়া যথেষ্ট কঠিন কাজ। এর জন্য ঈমান লাগে।

আমাদের অনেকেরই দান করতে গেলে অনেক কষ্ট হয়। কোনো এতিম খানায় দান করলে, বা কোনো গরিব আত্মীয়কে হাজার খানেক টাকা দিলে, মনে হয়: হায়, হায়, আমার বিপদের সময়ের সঞ্চয় সব শেষ হয়ে গেল। আমরা ব্যাপারটাকে এভাবে চিন্তা করতে পারি: দুনিয়াতে আমার একটি একাউন্ট রয়েছে, আখিরাতে আমার আরেকটি একাউন্ট রয়েছে। আমি যখন আল্লাহর تعالى রাস্তায় খরচ করছি, আমি আসলে আমার দুনিয়ার একাউন্ট থেকে আখিরাতের একাউন্টে ট্রান্সফার করছি মাত্র। এর বেশি কিছু না। আমার সম্পত্তি কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে না। আমারই থাকছে। একদিন আমি দেখতে পাবো: আমার আখিরাতের একাউন্টে কত জমেছে এবং আল্লাহ‌ تعالى আমাকে কত গুণ বেশি মুনাফা দিয়েছেন। সেদিন আমার শুধুই আফসোস থাকবে, “হায়, আর একটু যদি এই একাউন্টে ট্রান্সফার করতাম, তাহলে আজকে এই ভয়ংকর আগুন থেকে বেঁচে যেতাম!”

তোমরা ভালো যা কিছুই খরচ করো, প্রথমত সেটা হবে তোমাদের বাবা-মার জন্য

আপনি যখন জন্ম নিয়েছিলেন, বাথরুম করে গা মাখামাখি করে ফেলতেন, তখন আল্লাহ تعالى আপনাকে দুজন মানুষ আপনার সেবায় ২৪ ঘণ্টা নিবেদিত করে দিয়েছিলেন, যাতে আপনার মৌলিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে আপনাকে কিছুই করতে না হয়। তারা কোনো এক অদ্ভুত কারণে নিজেদের খাওয়া, ঘুম, আরাম — সব ত্যাগ করে, চরম মানসিক এবং শারীরিক কষ্ট সহ্য করে, আপনার জন্য যখন যা করা দরকার তাই করেছিলেন। তারপর আপনি একটু বড় হলেন। আপনার খাবার, জামাকাপড়, পড়ালেখা সব কিছুই তারা আপনার জন্য দিনরাত খেটে জোগাড় করে আনলেন। তাদের জীবনের কত সুখ, সম্মান, স্বপ্ন ছেড়ে দিয়ে, কীভাবে আপনাকে একটি সুন্দর জীবন দেওয়া যায়, তার জন্য কত ত্যাগ করলেন। এই দুজন মানুষের জন্য আমরা যদি খরচ না করি, তাহলে কার জন্য করব?

বাবা-মার সাথে ইহসান অর্থাৎ ‘ভালো কাজ সবচেয়ে সুন্দর ভাবে করা’ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহ تعالى একে তাঁর ইবাদত করতে বলার ঠিক পরেই স্থান দিয়েছেন।[৪][১১] এমনকি আল-বাক্বারাহ’র ৮৩ আয়াতে আমরা দেখতে পাই যে, বনি ইসরাইলের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়ার সময়, আল্লাহ  নামাজ এবং যাকাতের অঙ্গীকারের আগে বাবা-মা’র সাথে ইহসান করাকে বলেছেন। একজন মুসলিমের জন্য তাওহিদের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে বাবা-মা।[৪][১১] আমরা যতই ইসলামের দাওয়াতের কাজ করি, দাড়ি রাখি, হিজাব করি, জিহাদ করি, যদি আমাদের বাবা-মা কিয়ামতের দিন আল্লাহর تعالى কাছে আমাদের বিরুদ্ধে কষ্ট নিয়ে অভিযোগ করেন, তাহলে আমরা শেষ!

নিকটজন

আমাদের অনেকেরই অফিসের কলিগ, বন্ধু-বান্ধবের সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক আছে। আমরা তাদেরকে প্রতিনিয়ত ফোন করে খোঁজ খবর নেই। তাদের বার্থ-ডে, ম্যারেজ-ডে, গ্রাজুয়েশন-ডে, ফাদার-ডে, মাদার-ডে, সারভেন্ট-ডে —সব ধরনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হই। তাদের পরিবারের কেউ হাসপাতালে ভর্তি হলে সাথে সাথে ছুটে যাই। কিন্তু নিজের ভাই, বোন, নিকটাত্মীয়ের সাথে থাকে চুলাচুলি সম্পর্ক। কেন ওরা আমার ছেলের জন্মদিনে কেক নিয়ে আসলো না? কেন ওরা আমাকে আগে দাওয়াত না দিয়ে অমুককে আগে দাওয়াত দিলো? কেন বিয়ের দিন ওরা আমার সাথে খেতে বসলো না? কেন ওরা কুরবানির ঈদের দিন আমাকে গরুর রান পাঠাল না? —এইসব ব্যাপার নিয়ে প্রতিনিয়ত কাছের মানুষদের সাথে চলে ঝগড়াঝাটি। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলেছেন নিকটজনদের সাথে অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক রাখতে। অথচ আমাদের অনেকেরই তাদের সাথে থাকে চরম শত্রুতার সম্পর্ক।

অনেক সময় আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে অনেকে থাকেন যারা ধর্মের ব্যাপারে বেশ কঠিন। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, মেয়েরা হিজাব করেন, কোনো গানবাজনার অনুষ্ঠানে যান না। অন্যদিকে কিছু আত্মীয় থাকেন, যারা ঠিক মুসলিম কিনা এই ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নন। তারা হয়ত বছরে দুইবার ঈদের নামাজে আল্লাহর تعالى সাথে দেখা করেন। কিন্তু তাদের আল্লাহর تعالى সাথে সম্পর্ক এই পর্যন্তই। তারা সপ্তাহে কয়েকদিন বেশিরভাগ সময় শপিং সেন্টারে, রেস্টুরেন্টে, পার্টি সেন্টারে পার করেন। সিঙ্গাপুরে যান ঈদের শপিং করতে। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেন হিন্দুদের রীতি অনুসারে গায়ে-হলুদ, বউভাত, পান-চিনি ইত্যাদি সাত-দিন ধরে নারী-পুরুষ সব একসাথে মাখামাখি করে অনুষ্ঠান করে।

এই দুই প্রজাতির আত্মীয়রা যখন একসাথে হন, তখন ঘটে ভয়ংকর ঘটনা। ইসলামী মানসিকতার আত্মীয়রা ঈদের দিন যখন এদের বাসায় যান, তখন এই প্রগতিবাদী-আত্মীয়রা বলে উঠেন, “আরে! মাওলানা সাব এসেছেন! আসেন, আসেন! বসেন! কী সৌভাগ্য আমাদের!” মহিলারা যারা হিজাব করেন, তারা সবাই জড়সড় হয়ে বসেন এক সোফায়, আর হিজাব ছাড়া যারা, তারা যতটুকু সম্ভব দূরে ঘোরাঘুরি করেন, আর কিছুক্ষণ পরপর হিন্দি সিরিয়ালের শাশুড়ির দৃষ্টিতে হিজাব পরিহিতাদের দিকে তাকান। তারপর সারাদিন ধরে ইসলামী-আত্মীয়দের উপর চলে প্রগতিবাদীদের নানা ধরনের বিব্রতকর প্রশ্ন:

“আচ্ছা ভাই, সত্যি যদি আল্লাহ থাকে, তাহলে পৃথিবীতে এত গরিব মানুষ কেন? এত দুঃখ-কষ্ট  কেন?”

“ভাই, ইসলাম না সত্যি ধর্ম? তাহলে মুসলিমদের অবস্থা আজকে সবচেয়ে খারাপ কেন? আল্লাহ আপনাদের এই রকম বেহাল অবস্থা করে রেখেছেন কেন?”

“ভাই, আমি তো আল্লাহকে বলিনি আমাকে বানাতে? কেন সে আমাকে বানাল? তারপর আবার আমাকে এত নিয়ম কানুন দিয়ে দিলো, যা না মানলে আমাকে আবার ভয়ংকর শাস্তিও দেবে? এটা কেমন কথা হলো?”

“ভাই, এই যে দিন রাত নামাজ-রোজা করছেন। ধরেন মরার পরে গিয়ে দেখলেন ধর্মটর্ম সব মিথ্যা। তখন কী করবেন? জীবনটা তো কিছুই উপভোগ করলেন না?”

যখন প্রগতিবাদী আত্মীয়রা কোনো অনুষ্ঠানে কাকে দাওয়াত দিবেন পরিকল্পনা করেন, তখন তাদের মধ্যে আলাপ চলে, “না না, ওই মাওলানা-সাবদের দাওয়াত দেওয়া যাবে না। ওরা এই পার্টিতে আসলে আমার সব প্রেস্টিজ শেষ। এবার আমার অফিসের কলিগরা আসবে। ওদের সামনে বোরকা পড়া কয়েকটা ভয়ংকর মহিলা বসে থাকবে। আমি বন্ধুদেরকে মুখ দেখাতে পারব না। থার্টি ফার্স্টের পার্টিতে আমাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে।”

এর উল্টোটাও ঘটে। ইসলামী-আত্মীয়রা নিজেদের মধ্যে আলাপ করেন, “না ভাই। আমাদের এই খাস মোলাকাতে ওই জাহিলদের কোনোভাবেই দাওয়াত দেওয়া যাবে না, মা’আয আল্লাহ। ঈদের দিন একটা মুবারাক দিন। এই দিনে ওদের নাপাকি কথা-বার্তা, বেগানা আওরাতের ঘোরাফেরা, এই সব কোনোভাবেই মঞ্জুর করা যায় না। মাসজিদের ইমাম, খাতিবরা এসে ওই জাহিলদেরকে দেখলে আমার ইজ্জাত খাতাম হয়ে যাবে। নিকাহের দাওয়াতে দেখা করব, আমার দায়িত্ব শেষ, ইন শাআ আল্লাহ।”

শুধু তাই না, বছরে একবার যখন তারা যখন যাকাত দেন, তখন তাদের যেই গরিব আত্মীয়রা নামাজ, রোজা করে এবং তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে, তাদেরকে তারা যাকাত দেন। বাকি আত্মীয়রা আরও বেশি গরিব হলেও, তারা আর যাকাত পায় না। অথচ আল্লাহ تعالى এই আয়াতে বলে দিয়েছেন, বাবা-মা’র পরেই আমাদের সম্পদে নিকটজনদের হক।

এতিম

ইসলামে ٱلْيَتَٰمَىٰ (এতিম) শুধু বাবা-মা হারা ছোট বাচ্চারাই নয়, এমনকি যারা বয়স্ক, যাদের কেউ নেই, যাদের অবস্থার উন্নতি করার কোনো সুযোগ তাদের নেই, তারাও এতিম।[১][১৭১]

আমাদের ছোট বাচ্চারা কিছুক্ষণ বাবা-মাকে না দেখলে ‘বাবা! মা!’ বলে ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। প্রত্যকে ঘন্টায় তারা যে কতবার আমাদেরকে ডাকে, তার কোনো হিসেব নেই। তাদের জীবনে বাবা, মা হচ্ছে সবকিছু। একটা দিনও তারা বাবা, মা ছাড়া চিন্তা করতে পারে না। বাবা, মাকে হারিয়ে ফেলার কল্পনা করা তো দূরের কথা। তারা কেন, আমরা বাবা-মারাই চিন্তা করতে পারি না: আমরা যদি হঠাৎ করে মারা যাই, তাহলে আমাদের ছোট বাচ্চাগুলোর কী হবে।

সমাজে যত মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যাদের দেখাশোনা করা দরকার, একটু আদর, একটু ভালবাসা দরকার, তারা হলো এতিম বাচ্চারা। একজন বাচ্চার কাছে তার বাবা-মার থেকে বেশি জরুরি আর কে হতে পারে? ছোট বাচ্চারা অসহায়, দুর্বল। তারা নিস্পাপ, তারা অবুঝ। আজকের নিষ্ঠুর সমাজে বাবা-মা ছাড়া একটি শিশুর একা একা জীবন কী ভয়ংকর কঠিন, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। সমাজের অন্য যে কারো থেকে তাদের সাহায্য দরকার সবচেয়ে বেশি। আমরা যদি তাদের সাহায্যে এগিয়ে না আসি, তাহলে তারা কোথায় যাবে?

একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্রের সকল এতিমদের অভিভাবক হয়ে যাওয়া।[১১] এটি একটি ফরযে কিফায়া, যার অর্থ: সমাজের কেউ যদি এই দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে সমাজের সবাই একটি ফরয ভাঙার গুনাহ অর্জন করবে। জানাযার নামাজ পড়া যেমন ফরযে কিফায়া, তেমনি সমাজের দুস্থ, এতিমদের সবার দেখাশোনার দায়িত্ব হচ্ছে সেই সমাজের মুসলিমদের উপর ফরযে কিফায়া।[১৭১] অথচ আমরা জানাযার নামাজ যতটা না আগ্রহ নিয়ে পড়ি, এতিম, গরিবদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে সেরকম চেষ্টা করি না।

এতিমদেরকে দান করে, তাদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করে, আমরা তাদের উপর কোনো মহান অনুগ্রহ করি না। বরং এটা তাদের প্রাপ্য, আমাদের উপর তাদের হক। আমরা বসে বসে যতই ইসলামের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে বাণী কপচাই, রাজনীতির অবস্থা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি, ইসলামিক লেকচারের আয়োজন করি, কিরাত প্রতিযোগিতা করি,  জিহাদের স্লোগান দেই —যতদিন পর্যন্ত সমাজে এতিম শিশু, বৃদ্ধরা না খেয়ে রাস্তায় শুয়ে থাকে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের ফরযে কিফায়া ভাঙার গুনাহ থেকে আমাদের মুক্তি নেই। ততদিন পর্যন্ত আমরা এই কঠিন অঙ্গীকার ভাঙার ফলাফল থেকে রেহাই পাবো না, যদি না আল্লাহ تعالى অন্য কিছু ইচ্ছা না করেন।[১৭২]

আল্লাহ تعالى যখন কোনো শিশুর কদরে লিখে দিয়েছেন যে, সে তার বাবা-মাকে হারিয়ে ফেলবে, তখন ইসলামিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার অভিভাবক হয়ে যাওয়া।[১১] আজকে আমরা ব্যক্তিগতভাবে, এনজিও এবং দাতা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে যতগুলো এতিমদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করি না কেন, আমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে আরও অনেক এতিম থেকেই যাবে। এদেরকে একদল পশু হাত-পা ভেঙ্গে, গরম সীসা ঢেলে চোখ গালিয়ে দিয়ে ভিক্ষা করতে নামাবে, আর তাদের ভিক্ষার আয় কেড়ে নেবে। একারণেই আমাদের দরকার একটি ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব দেশের সকল এতিমদের সঠিকভাবে পালন করার জন্য যে বিপুল পরিমাণের সম্পদ, কাঠামো, লোকবল দরকার, তা দেশের মানুষের কাছ থেকে আদায় করে এতিমদের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে নিয়ে, রাষ্ট্রের সকল জনগণের উপর বাধ্যতামূলক করে দেবে। অন্য কোনো ধরনের সরকার এর আগে কখনো এমন করেনি, করবেও না। করতে গেলে সেই সরকারের রাজনৈতিক দলের ভোট পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।[১১]

আমরা কয়জন জানি আমাদের এলাকায় এতিম কারা? আমরা প্রতিদিন মসজিদে নামাজ পড়তে ঢুকি এবং নামাজ শেষে বের হয়ে যে যার কাজে চলে যাই। নামাজের সময় পাশে বসা ছেড়া কাপড় পড়া মলিন মুখের অসহায় দেখতে মানুষটার খবর নেওয়ার প্রয়োজন পর্যন্ত অনুভব করি না। এতিমদের সাথে ইহসান করতে হলে প্রথমে আমাদেরকে তো আগে জানতে হবে আমাদের চারপাশে এতিম কারা!

আমাদেরকে মসজিদ দেওয়া হয়েছে যেন আমরা এলাকার মুসলিম ভাইদের খোঁজ খবর রাখি, একে অন্যের সাথে পরিচিত হই, বিপদে আপদে এগিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আজকে মসজিদ শুধুমাত্র একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কোনোমতে নামাজ শেষ করে ডানে বামে না তাকিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে পারলেই বাঁচি।[১]

অভাবী, অসহায় পর্যটকদের জন্য

মিসকিন ٱلْمَسَٰكِين হচ্ছে খুবই গরিব মানুষরা, যাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, কাপড় যোগাড় করা খুবই কঠিন। এরা সবসময় অভাবী। একজন এতিমের হয়ত উত্তরাধিকার সুত্রে সম্পত্তি থাকতে পারে। কিন্তু এদের কোনো সম্পত্তি থাকা তো দুরের কথা, মৌলিক চাহিদা পূরণ করার মতো সামান্য অবস্থাও নেই। এরা হচ্ছে সমাজের ভুলে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা।

আজকে আপনার-আমার পরিবার নিয়ে থাকার জন্য বাসা আছে। রাতে খাওয়ার মতো খাবার ফ্রিজে রাখা আছে। কালকে বাইরে পড়ার মতো কাপড় আছে। কিন্তু মিসকিনদের এসব কিছুই নেই। তারা প্রতিটা দিন কষ্টে, ভয়ে থাকে: কীভাবে তারা আগামীকাল কিছু খাবার, পড়ার মতো পরিষ্কার কাপড়, থাকার মতো জায়গা জোগাড় করবে। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করা ছাড়া আর কিছু নিয়ে চিন্তা করার মতো অবস্থা তাদের নেই।[১][১১]

আজকে এমন কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেই, যা বাধ্যতামূলকভাবে দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য। একমাত্র একটি ইসলামিক রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে, জনগণের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে যাকাত সংগ্রহ করে, একটি তহবিল গঠন করে, দেশের সকল মিসকিনদের অভাব দূর করার ব্যবস্থা করা।

যতদিন ইসলামিক আইন প্রতিষ্ঠা না হচ্ছে, ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি ধনীদেরকে আরও ধনী বানিয়ে যাবে, এবং গরিবদেরকে আরও গরিব বানাতে থাকবে। আজকে পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, যা সম্পত্তিকে সুষমভাবে বণ্টন করে ধনী-গরিবের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য, তা দূর করতে পারে। যার ফলে সবসময় এমন কিছু মানুষ থেকে যায়, যারা তাদের প্রয়োজনের চেয়ে হাজার গুণ বেশি সম্পত্তি নিয়ে থাকে, যা তারা আমোদ ফুর্তিতে নষ্ট করে। অন্যদিকে এমন কিছু মানুষ সবসময় থেকে যায়, যারা দুই বেলা খাবারও জোগাড় করতে পারে না। সম্পদ সুষমভাবে বণ্টনের এমন কোনো পদ্ধতি কোনো সরকার যদি তৈরি করার চেষ্টাও করে, তখন দেশের বড় বড় ধনকুবেররা ব্যবস্থা করে দিবে যেন সেই সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে না পারে।

আল্লাহর تعالى বিরুদ্ধে মানুষের একটি সাধারণ অভিযোগ হলো: আল্লাহ تعالى কেন পৃথিবীতে এত মানুষ পাঠাল, কিন্তু তাদের জন্য যথেষ্ট খাবার, প্রাকৃতিক সম্পদ, থাকার জায়গা দিয়ে পাঠাল না। এটি একটি বিরাট ভুল ধারণা যে, পৃথিবীতে এত যে গরিব মানুষ, তার মূল কারণ পৃথিবীতে সম্পদের অভাব। পৃথিবীত মাত্র ১% মানুষ পুরো পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি সম্পদ দখল করে রেখেছে।[১৭৩] শুধু তাই না, মাত্র ২% সবচেয়ে ধনী মানুষগুলো পুরো পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি বাড়ি এবং জমির মালিক। বাকি অর্ধেক জমি এবং বাড়ির মধ্যে বাকি ৯৮% জনসংখ্যা বসবাস করছে। মানুষের মধ্যে আজকে যে এই চরম বৈষম্য, তার প্রধান কারণ মানুষের সীমাহীন লোভ, দুর্নীতি এবং ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি। সুদ একটি বড় কারণ যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে করে বড় লোকরা বসে বসে আরও বড় লোক হয়, আর মধ্যবিত্ত এবং গরিবরা অমানুষিক খাটার পরেও দিনে দিনে আরও গরিব হতে থাকে।

পুরো পৃথিবীর সব মানুষকে, পুরো ৬ বিলিয়ন মানুষের প্রত্যেককে একটি বাসা এবং সামনে একটি ছোট বাগান দিলেও তাদর সবাইকে যুক্তরাষ্ট্রের এক টেক্সাস অঙ্গরাজ্যেই জায়গা দেওয়া যাবে। বাকি পুরো যুক্তরাষ্ট্র সহ পুরো পৃথিবী খালি পড়ে থাকবে! আল্লাহ আমাদেরকে এক বিরাট পৃথিবী দিয়েছেন, কিন্তু মাত্র ২% লোভী মানুষের কারণে আজকে ১.৬ বিলিয়ন মানুষ দিনে একবেলাও খেতে পারে না।

বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ করলে, সারা পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর করে ফেলা সম্ভব। একটি লোকও তখন না খেয়ে থাকবে না। অথচ বছরে ১২০০ বিলিয়ন ডলার খরচ হয় অস্ত্রের পেছনে। একটি দেশের খাবার অপচয়ের পেছনে নষ্ট হয় ১০০ বিলিয়ন ডলার। ‘অবিস’ বা অতিরিক্ত মোটারা বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত খাবার খায়, যা দিয়ে সারা পৃথিবীতে না-খাওয়া মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা করা যেত।[১৭৪] একদিকে মানুষ না খেয়ে মারা যায়, আর অন্যদিকে মানুষরা অতিরিক্ত খেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়।

আল্লাহ কখনই মানব জাতির কোনো ক্ষতি করেন না, বরং মানুষরাই মানুষের ক্ষতি করে। [ইউনুস ১০:৪৪]

তোমরা ভালো যা কিছুই করো না কেন, আল্লাহ সে ব্যাপারে অবশ্যই জানেন

এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন যে, “তোমরা خير ‘খাইর’ যা কিছুই করো” — خير হছে এমন ভালো কাজ, যা কাউকে বলে দিতে হয় না যে, এটা একটা ভালো কাজ, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই বুঝতে পারে যে, তা ভালো কাজ।[১] যেকোনো স্বেচ্ছাসেবা, স্বেচ্ছায় করা ভালো কাজ আল্লাহ تعالى অবশ্যই লক্ষ্য করেন এবং অবশ্যই তার মূল্যায়ন করেন।

আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। দেখলেন ফুটপাথে এক জায়গায় মানুষ কলা, পান খেয়ে ফেলে রেখেছে। মানুষ সেগুলো পাড়িয়ে ফুটপাত ময়লা করে ফেলছে। আপনি সেটা ঝেড়ে পাশের ড্রেনে ফেলে দিলেন, ফুটপাতটা পরিষ্কার করে দিলেন। কেউ বলেনি আপনাকে এই কাজ করতে। আপনি এই কাজ করতে মোটেও বাধ্য নন। কিন্তু তারপরেও আপনি স্বেচ্ছায় এই ভালো কাজটা করলেন। কেউ এসে আপনাকে একটা ধন্যবাদও দিলো না। কারো কাছ থেকে ধন্যবাদের দরকার নেই, কারণ আল্লাহ تعالى পুরোটাই দেখেছেন এবং তিনি নিজে এর মূল্য আপনাকে দেবেন। আল্লাহ تعالى হচ্ছেন عَلِيمٌ — তিনি সবকিছুর ব্যাপারে সব জানেন। আল্লাহ تعالى আপনার এই ভালো কাজটা শুরু থেকেই দেখছিলেন।

আরেকটি ব্যাপার হলো আল্লাহ تعالى বলছেন مِنْ خَيْرٍ অর্থাৎ যা কিছুই ভালো, সেটা আমাদের কাছে যতই ছোট মনে হোক না কেন। রাস্তা থেকে কলার খোসা সরিয়ে দেওয়ার মতো একটা মামুলি কাজও আল্লাহর تعالى কাছে খাইর। কোনো কিছুই তাঁর কাছে ফেলনা নয়। একরকম বিন্দু বিন্দু ভালো কাজ একসময় সিন্ধু হয়ে আমাদের ভালো কাজের পাল্লাকে ভারী করে দিতে পারে। আর প্রতিটি ভালো কাজ আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন বলে কুরআনেই কথা দিয়েছেন।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ।
  • [১৭১] ইসলামের আইনে এতিম — http://en.islamtoday.net/artshow-395-3407.htm, http://islamqa.info/en/106811
  • [১৭২] এতিম, বিধবা, অত্যাচারিত মানুষদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব: হাবিব আলির লেকচার — https://www.youtube.com/watch?v=fZG6ibK8mwo
  • [১৭৩] ধনী-গরিবদের মধ্যে সম্পদের বিশাল ব্যবধান — http://en.wikipedia.org/wiki/Distribution_of_wealth
  • [১৭৪] রোহিঙ্গার মুসলিমদের তাড়িয়ে দেওয়া — http://www.alkawsar.com/article/717/print

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—


ডাউনলোড করুন কুর‘আনের কথা অ্যাপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *