না, না, আমাদের বাপ-দাদাদের যা করতে দেখেছি, আমরাও তা-ই করবো — আল-বাক্বারাহ ১৭০-১৭১

2_170_title

2_170যখন তাদেরকে বলা হয়, “আল্লাহ تعالى যা পাঠিয়েছেন, তা অনুসরণ করো।” তারা বলে, “না, না, আমাদের বাপ-দাদাদের যা করতে দেখেছি, আমরাও তা-ই করবো।” কী! যেখানে কিনা ওদের বাপ-দাদারা বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করতো না এবং তারা সঠিক পথ পাওয়ারও চেষ্টা করেনি? [আল-বাক্বারাহ ১৭০]

প্রশ্ন হচ্ছে: কেন মানুষ বাপদাদার অনুসরণ করা এত পছন্দ করে। সাধারণ উত্তর হচ্ছে: তাদের প্রতি সম্মান রেখে এবং এই বিশ্বাস থেকে যে, তারা আমাদের থেকে ধর্ম ভালো জানতো। কিন্তু এর ভিতরে আরেকটা গোপন স্বার্থপর কারণ আছে। আমরা যদি লক্ষ্য করে দেখি কোন ব্যাপারগুলো মানুষ অন্ধ অনুকরণ করে, আমরা দেখবো যে, সেগুলোর বেশিরভাগই হচ্ছে: কীভাবে নিজের কথা, কাজ, আচরণ, উপার্জন, সংস্কৃতি, ফ্যাশন —এসব কিছুতে কোনো পরিবর্তন না করে, বিভিন্ন শর্টকাট ব্যবস্থায় পার পেয়ে যাওয়া যায়।

যেমন: আমরা কুর’আন না বুঝে শুধুই আরবিতে তিলাওয়াত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবো, কারণ আমাদের বাপ-দাদারা তাই করে গেছেন। কিন্তু আসল কারণ হচ্ছে, বুঝে কুর’আন পড়লে তো জেনে যাবো আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কী কী করতে বলেছেন, কী কী করতে মানা করেছেন। এসব জেনে গেলে তো বিবেকের দংশনে পুড়তে হবে। তারপর আল্লাহকে تعالى জবাব দেব কীভাবে? তার চেয়ে কিছুই না বুঝে দিন-রাত কুর’আন তিলাওয়াত করে যাও। আমাদের বাপ-দাদারা করলে, আমরা কেন করবো না?

আবার আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে চলে আসা ইসলামের মূল্যবোধের বিরোধী কাজগুলো করা বন্ধ করবো না। ৭ দিন ধরে অনুষ্ঠান করে, নারী-পুরুষ সব মাখামাখি করে বিয়ের অনুষ্ঠান করবো। তারপর বছরে এক রাত ১০০ রাকাআত নফল নামাজ পড়ে সব গুনাহ মাফ করে ফেলবো। আমরা নিয়মিত ঘুষ খেয়ে, দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হাতানো বন্ধ করবো না। কিন্তু সেই হারাম টাকা দিয়ে অমুকবাগী পিরের মুরিদ হয়ে, তাকে খুশি করে, তার হাত ধরে জান্নাতে চলে যাওয়ার আশা রাখবো। আমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবো না। কিন্তু এক উমরি-ক্বাযা নামাজ পড়ে, সব ছেড়ে আসা নামাজ মাফ করিয়ে নেবো। এভাবে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন না এনে, বছরে দুই-তিন বার কোনো হুজুগের ইবাদত করে চেষ্টা করবো সব মাফ করে ফেলার। কারণ আমাদের বাপ-দাদারা সেটা করে গেছেন। তারা পারলে আমরা পারবো না কেন?

যখন এধরনের মানুষদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয় যে, এভাবে বাপ-দাদার অন্ধ অনুকরণ ভুল, তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন। এই ধরনের মানসিকতার মূল কারণ হচ্ছে হিংসা।[আল-বাক্বারাহ ৮৯-৯০] তবে এটি ঠিক হিংসা নয়, সাইকোলজির ভাষায় একে বলে সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স বা আত্মগরীমা: অন্যের কাছে নিজের হীনমন্যতা ঢেকে রাখার জন্য নিজেকে বড় বলে জাহির করার এক ধরনের মানসিক প্রতিরক্ষা। তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না যে, আপনি তাদের যুগ যুগ ধরে করে আসা উপাসনাগুলোকে বিদ’আহ বলে প্রমাণ করে দিচ্ছেন; তাদের মাথা ভর্তি হাদিসগুলোকে জাল হাদিস বলে সংশোধন করে দিচ্ছেন। তারা কোনোভাবেই মানতে পারছে না যে, আপনি ইসলামের সঠিক শিক্ষা পেয়েছেন, আর তারা সারাজীবন বাপ-দাদার অনুসরণ করে ভুল পথে ছিল।

আপনি তাদেরকে যতই বোঝাবার চেষ্টা করেন, তারা কোনোভাবেই শুনবে না। কারণ তারা মনে করে যে, আপনার কথা শুনলে তারা আপনার কাছে হেরে যাবে। তাদের এত দিনের কামানো ধর্মীয় বেশভূষা, নূরানি দাঁড়ি-পাঞ্জাবি-আতরের সন্মান, যেখানে কিনা মসজিদে তাদেরকে দেখলে সবাই সরে গিয়ে প্রথম কাতারে জায়গা ছেড়ে দেয়, সেখানে কিনা আমরা তাদেরকে বলছি: তাদের ইসলামের ভিত্তিটাই ছিল ভুল? এটা হতেই পারে না! তাদের হিংসা, আত্মগরীমা তাদেরকে অন্ধ, বধির, মূক করে দিয়েছে।

এখানে একটা ব্যাপার পরিস্কার করা দরকার: এই আয়াতে আল্লাহ অন্ধ আনুগত্য করতে শুধুমাত্র তখনি মানা করেছেন, যখন আমরা এমন কারো অনুসরণ করছি, যে নিজে সঠিক পথে নেই, এবং যে তার বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করে না।[১৪] আল্লাহ এই আয়াতে দুটো শর্ত দিয়ে দিয়েছেন কাদেরকে অনুসরণ করা যাবে না—

১) বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করতো না

আক্বল عقل অর্থ কোনো কিছু বেধে নিয়ন্ত্রণে রাখা, যেমন উট দড়ি দিয়ে বেধে রাখা, যেন পালিয়ে না যায়। নিজের রাগ, ঘৃণা, হিংসা, আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নিরপেক্ষভাবে বুদ্ধি ব্যবহার করা হচ্ছে আক্বল।[১]

মানুষের অনেক বুদ্ধি থাকতে পারে। কিন্তু সেই বুদ্ধিকে যদি লাগাম দেওয়া না হয়, তখন সেই বুদ্ধি থেকে ভয়াবহ সমস্যা তৈরি হয়। মানুষ তখন সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী হয়ে যায়। তাই বুদ্ধিমান হওয়া মানেই যে একজন ভালো মানুষ হওয়া, তা নয়। যেমন, অনেক জ্ঞানী মানুষদেরকে আমরা দেখেছি, যারা দীর্ঘ সাধনা করে আল্লাহকে تعالى খুশি করার নানা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। যেমন, আমুক মানুষটা অত্যন্ত পবিত্র। তাকে খুশি রাখতে পারলে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর تعالى কাছে তদবির করে আমার বড় বড় গুনাহ মাফ করে দেবেন। তাই সেই পবিত্র মানুষটাকে মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা দাও, তার সাগরেদদেরকে ভুরিভোজ করাও। অমুক মাসে অমুক রাতে ১০০ রাকাআত নফল নামাজ পড়লে সারা জীবনের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়, যেটা বছরের অন্য কোনো দিনে হয় না, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

যে তার বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তার বুদ্ধিকে ভালো কাজে লাগাতে পারে, বুদ্ধি ব্যবহার করে নিজেকে খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে, কু’রআনের ভাষায় তারাই বুদ্ধিমান। কু’রআনে যত জায়গায় আক্বল অর্থাৎ বুদ্ধিমান মানুষদের কথা এসেছে, সব জায়গায় এমন সব মানুষদের বোঝানো হয়েছে, যাদের বিবেক তাদের বুদ্ধিকে লাগাম দিয়ে রাখে। এদের বুদ্ধি তাদের প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

২) তারা সঠিক পথেও ছিল না

এই আয়াতের শেষে يَهْتَدُون ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ সাধারণত করা হয়, “সঠিক পথ লাভ করেনি।” কিন্তু এটি এসেছে اهتدى ইহতাদা থেকে, যার অর্থ হচ্ছে: দেখানো সঠিক পথে চলার জন্য নিজে থেকে আন্তরিক চেষ্টা করা।[১] এখানে একটি খুব সূক্ষ্ম ভাষাগত পার্থক্য আছে। আল্লাহ تعالى মানুষকে সঠিক পথে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘাড় ধরে দাঁড় করিয়ে রাখেন না, বরং তিনি মানুষকে সঠিক পথ কোনটা সেটা দেখিয়ে দেন। তারপর মানুষের কাজ হচ্ছে সেই সঠিক পথে চলার চেষ্টা করা। মানুষকে সেই চেষ্টাটা করতে হবে। চেষ্টা ছাড়া কেউ সঠিক পথ পাবে না এবং চেষ্টা ছাড়া কেউ সঠিক পথে টিকেও থাকতে পারবে না।[১] যারা দার্শনিক তর্ক দেখায়, “আল্লাহ যদি চাইতেন, তাহলে তো আমি সবসময় ভালোই থাকতাম। তিনি চাননি দেখেই তো আমি ভালো থাকতে পারিনি…”—তাদেরকে  ইহতাদা اهتدى এর মানে ঠিকভাবে বুঝতে হবে।

একটা উদাহরণ দেই—

আপনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, একসময় একটা চৌরাস্তা মোড়ে গিয়ে একটা সাইন বোর্ড দেখলেন: “চট্টগ্রাম ৫০ মাইল”, কিন্তু আপনি সেদিকে না গিয়ে দূরে একটা সিনেমা হল দেখা যাচ্ছে, সেদিকে যাওয়া শুরু করলেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ঠিকই আপনাকে সঠিক পথ দেখিয়েছিল, কিন্তু আপনি اهتدى (সঠিক পথে চলার চেষ্টা) করেননি।

যারা আল্লাহর تعالى বাণী অনুসরণ করে সঠিক পথে চলার আন্তরিক চেষ্টা করেনি, নিজের খেয়াল খুশি মতো ধর্ম অনুসরণ করেছে, অন্যের অন্ধ অনুকরণ করেছে, নিজেদের উর্বর মস্তিস্ক ব্যবহার করে বিভিন্ন শর্টকাট ইবাদত আবিষ্কার করেছে, তাদের অনুকরণ করতে আল্লাহ تعالى মানা করেছেন।

তাহলে কি কোনো ইমামকে অনুসরণ করবো না?

অনেকে মনে করেন এই আয়াতে ‘কোনো প্রশ্ন না করে অনুসরণ’ (তাক্বলিদ) পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তাক্বলিদ নিষেধ করা হয়েছে তখনি, যখন কিনা যাকে অনুসরণ করা হচ্ছে, সে নিজে আক্বল ব্যবহার করে না এবং ইহতাদা-ও করে না। ধর্মীয় ব্যাপারে পারদর্শী নন এমন কাউকে অবশ্যই ধর্মীয় ব্যাপারে জ্ঞানী, অভিজ্ঞদের মত মেনে নিতে হবে, তাদের শেখানো পথ অনুসরণ করতে হবে।[১৪] কারণ কুর’আনেই আল্লাহ تعالى বলেছেন—

তোমরা যদি কোনো ব্যাপারে না জানো, তাহলে যারা জানে, তাদেরকে জিজ্ঞাসা করো। [আন-নাহল ৪৩]

কিন্তু কাউকে জিগ্যেস করার আগে নিজে থেকে ইজতিহাদ, অর্থাৎ নিজের বিচার-বুদ্ধি, উপস্থিত তথ্য, প্রমাণ ব্যবহার করে নিশ্চিত হতে হবে যে, যাকে জিগ্যেস করা হচ্ছে, সে এই ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানে।[১৪] এমন কাউকে জিগ্যেস করতে যাবো না, যে কিনা আমি যা শুনতে চাই, সেটাই আমাকে বলবে। যদি সে আমার পছন্দ মতো উত্তর না দেয়, তাহলে আরেকজনকে গিয়ে জিগ্যেস করবো —এমনটা করা একধরনের প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। অথবা এমন কারো কাছে যাবো না, যে কিনা আমাকে সহজ কিছু করতে বলবে। আর যার কাছে গেলে কঠিন কিছু করতে বলবে, তার কাছে যাবো না —এমন করাটাও অসৎ মানসিকতার পরিচয়।

2_171অবিশ্বাসীদেরকে ডাকা হলো এমন কাউকে ডাকার মতো, যে কিনা হাঁকডাক ছাড়া আর কিছু শোনে না — বধির, মূক ও অন্ধ —এরা কেউ বিবেক-বুদ্ধি খাঁটায় না। [আল-বাক্বারাহ ১৭১]

এই ধরনের মানুষরা হলো তারা, যাদের কাছে প্রায়ই আল্লাহ‌র تعالى বাণী আসে। তারা সেটা নিয়ে অল্প একটু চিন্তা-ভাবনা করে ছেড়ে দেয়। আল্লাহ‌র تعالى বাণী শুনে, বুঝে, নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনার কোনো চেষ্টা তাদের মধ্যে নেই। একারণেই আল্লাহ‌ تعالى তাদেরকে বধির, মূক এবং অন্ধের সাথে তুলনা করেছেন। কারণ তাদের মস্তিস্কের সঠিক ব্যবহার না করতে করতে, তাদের সত্য শোনার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে—তারা বধির। তারা নিজে থেকে মানুষকে প্রশ্ন করে সত্যকে জানার চেষ্টা করে না—তারা মূক। তাদের চোখের সামনে সত্য থাকলেও, তারা সেটা দেখে না দেখার ভান করে—তারা অন্ধ। তাদের আর কোনোভাবেই ভালো হবার সম্ভাবনা নেই।[৩]

আপনার মনে হতে পারে—আল্লাহ تعالى যদি অবিশ্বাসকারিদেরকে বধির, মূক, অন্ধ বলে ঘোষণা দেন, তাহলে তাদের দোষ কী? তারা তো ইচ্ছা করলেও ভালো হতে পারবে না। কাফির, মুনাফিকরা তাদের মস্তিস্কের সঠিক ব্যবহার না করতে করতে, তাদের মস্তিস্কের সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলেছে।[৩] মানুষ যদি ছয় মাস তার পা ব্যবহার না করে, তার পায়ের পেশি শুকিয়ে যায়, তখন আর সে দাঁড়াতে পারে না। একই ভাবে মানুষ যদি মস্তিস্কের যথেষ্ট ব্যবহার না করে, তাহলে তার মস্তিস্ক ভোঁতা হয়ে যায়। মস্তিস্ক এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, মানুষ তা যত ব্যবহার করবে, তা তত শক্তিশালী হবে। একারণেই আল্লাহ‌ تعالى কু’রআনে শত শত উপমা, দৃশ্য, ঘটনা, যুক্তি-তর্ক, নানা ধরনের রহস্য দিয়ে রেখেছেন, যেন মানুষ কু’রআন বার বার পড়লে তার চিন্তাশক্তি বাড়ে, কল্পনা শক্তি প্রখর হয়, সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা বাড়ে।

মানুষ যখন তার সত্যকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ব্যবহার করে না, সত্য জানার পরেও সেটা মেনে নিয়ে নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করে না, তখন ধীরে ধীরে তার নিজেকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা একসময় নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের মস্তিস্কের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি আল্লাহ‌রই تعالى সৃষ্টি। তিনিই মানুষকে এভাবে বানিয়েছেন।

অনেক সময় আমরা ইসলামের উপর কোনো বই বা আর্টিকেল পড়ে উপলব্ধি করি যে, আমরা এতদিন যা শিখে এসেছি, তার মধ্যে ভুল রয়েছে। হাজার বছর থেকে বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কিছু রীতিনীতি, ধারণাগুলো আসলে ইসলাম সমর্থন করে না। অনেক সময় দেখা যায়: আমরা যে দলের শিক্ষা এতদিন অনুসরণ করে এসেছি, তার বিরুদ্ধে কুরআন, সাহিহ হাদিসেই যথেষ্ট শক্ত দলিল আছে। তখন আমরা অনেক সময় ভাবা শুরু করি, “এই খবর যদি মানুষকে জানানো হয় তাহলে ফিতনা তৈরী হবে। মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাবে। হুজুরদের প্রতি শ্রদ্ধা উঠে যাবে। এরচেয়ে বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষুদ্রতর ত্যাগ করা ভালো। থাক না কিছু কথা গোপন। আল্লাহ تعالى মাফ করবেন।”

সাবধান! কুর’আনে বহু আয়াতে আল্লাহ আমাদেরকে এই ধরনের চিন্তা করা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। এই ধরনের মানসিকতা বিরাট সব অন্যায়ের পথ খুলে দেয়।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • [১৬] লুঘাতুল কুরআন — গুলাম আহমেদ পারভেজ।

সে শুধুই তোমাদেরকে জঘন্য এবং অনৈতিক কাজ করতে বলে — আল-বাক্বারাহ ১৬৯ পর্ব ২

2_160_part2_title

আল্লাহ যখন শয়তানকে তার সান্নিধ্য থেকে বের করে দিচ্ছিলেন, তখন শয়তান একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ শপথ করেছিল, যা থেকে তার মানুষকে ধ্বংস করার অন্যতম একটি প্রধান পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়—

(শয়তান বলল) “আমি মানুষের কাছে আসব ওদের সামনে থেকে, ওদের পেছন থেকে, ওদের ডান দিক থেকে এবং ওদের বাম দিক থেকে। আপনি দেখবেন ওরা বেশিরভাগই কৃতজ্ঞ না। [আল-আ’রাফ ৭:১৭]

কু’রআনে আল্লাহ প্রায় ৬০টি আয়াতে কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন। এর মধ্যে একটি বিখ্যাত আয়াত হল—

মনে করে দেখো, তোমাদের প্রভু কথা দিয়েছিলেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও দিতেই থাকবো। কিন্তু যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও…, আমার শাস্তি বড়ই কঠিন। [ইব্রাহিম ১৪:৭]

এখানে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কথা দিয়েছেন যে, যদি আমরা কৃতজ্ঞ হই, তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে দিতেই থাকবেন। তিনি আরবিতে তিনবার জোর দিয়ে একথা বলেছেন, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি তোমাদেরকে আরও দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো, দিতেই থাকবো।”[১]

নিশ্চয়ই শয়তান চাইবে না আপনি জীবনে আরও বেশি পান, আরও ভালো থাকেন। একারণে শয়তানের সবসময় চেষ্টা থাকে: কীভাবে আপনাকে অসুস্থ বিনোদনে বুঁদ করে রাখা যায়, যেই বিনোদন আপনাকে কখনই পরিতৃপ্তি দেয় না। কীভাবে আপনাকে ভুলিয়ে দেওয়া যায় যে, আল্লাহর تعالى অনুগ্রহে আপনি জীবনে কত কিছুই না পেয়েছেন।

কেন আল্লাহ تعالى আমাদেরকে কৃতজ্ঞ হতে বলেন? তাঁর তো আমাদের কাছ থেকে কিছুই পাওয়ার নেই। আমরা কৃতজ্ঞ হই আর না হই, তাতে তো তাঁর কোনো লাভ নেই। তাহলে কৃতজ্ঞ হয়ে কী লাভ?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সে শুধুই তোমাদেরকে জঘন্য এবং অনৈতিক কাজ করতে বলে — আল-বাক্বারাহ ১৬৯

2_169_title

সে শুধুই তোমাদেরকে জঘন্য এবং অনৈতিক কাজ করতে বলে, আর যেন তোমরা আল্লাহর تعالى সম্পর্কে না জেনে কথা বলো। [আল-বাক্বারাহ ১৬৯]

শয়তান কখনও আপনাকে এসে বলবে না, “আমি শয়তান। আমি তোমাকে জাহান্নামে পুড়াতে চাই। আসো আমরা … করি।” ইবলিস এবং অন্যান্য জিন শয়তানরা মানুষের কাছে অদৃশ্য প্রাণী। তারা বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’ বা ‘অন্য ডাইমেনশন’-এ থাকে, যেখান থেকে তারা ঠিকই আমাদেরকে দেখতে পায়, কিন্তু আমরা তাদেরকে দেখতে পাই না, বা কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্র দিয়ে সনাক্ত করতে পারি না।

সে এবং তার অনুসারিরা তোমাদেরকে তাদের জায়গা থেকে দেখতে পায়, কিন্তু তোমরা তাদেরকে দেখতে পাওনা। [আল-আ’রাফ ৭:২৭]

শয়তান মানুষের অবচেতন মনে কুচিন্তা বা কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দেয়। আমরা সাবধানে লক্ষ্য করলেও বুঝতে পারবো না: আমাদের মনের গভীরে যে চিন্তাগুলো চলছে, তার কোনটা আমি, আর কোনটা শয়তান। সূরা আন-নাস-এ আল্লাহ تعالى আমাদেরকে বলেছেন, কীভাবে শয়তান কাজ করে—

(আমি আশ্রয় চাই) তার অনিষ্ট থেকে, যে নিজেকে লুকিয়ে রেখে কুমন্ত্রণা দেয়। যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। জ্বিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে। [আন-নাস  ১১৪:৪-৬]

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, শয়তান শুধুই জ্বিন নয়। একইসাথে যে সব মানুষ ইবলিস এবং তার উদ্দেশকে বাস্তবায়ন করতে সাহায্য করে, তারাও শয়তান।

শয়তান এমন কৌশলে আমাদের মনে কু-চিন্তা, অসুস্থ কামনা ঢুকিয়ে দেয় যে, আমরা মনে করবো: সেগুলো আসলে আমাদের নিজেদেরই চিন্তা-ভাবনা, আবেগ এবং অনুভুতি। যেহেতু আমরা সবসময় শয়তানের ব্যাপারে সাবধান থাকি না, তাই কখন যে শয়তান আমাদের মধ্যে তার কুমন্ত্রণা ঢুকিয়ে দিয়ে, আমাদেরকে দিয়ে তার কাজ করানো শুরু করে দেয়, তা আমরা ভুলে যাই। একারণেই আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সাবধান করেছেন—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল এবং ভালো, পবিত্র আছে, তা খাও — আল-বাক্বারাহ ১৬৮

2_168_title

2_168হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল এবং ভালো, পবিত্র আছে, তা খাও। আর শয়তানের পথ অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। [আল-বাক্বারাহ ১৬৮]

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى বলছেন, “হে মানুষ”—এটি শুধু মুসলিমদের জন্যই নয়, বরং সকল যুগের, সকল মানুষের, সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম—সবার জন্য নির্দেশ। এখানে আল্লাহ تعالى শুধুই বলেননি হালাল খাবার খেতে, একইসাথে সেটা তাইয়িবও হতে হবে। তাইয়িব طيب হচ্ছে যা ভালো এবং পবিত্র— দুটোই একসাথে।[১] যা কিছুই খেতে ভালো, দেখতে সুন্দর, শ্রুতিমধুর, সুন্দর ঘ্রাণ —সেগুলোই তাইয়িব।[১৬]

আল্লাহ تعالى আমাদেরকে যা দেন, সেটা আমাদের জন্য ভালো এবং পবিত্র। কিন্তু মানুষ অনেক সময় অনেক কিছু তৈরি করে যেটা খেতে ভালো হলেও, পবিত্র নয়। যেমন, আল্লাহ تعالى কলা দিয়েছেন, যা তাইয়িব— ভালো এবং পবিত্র। কিন্তু মানুষ যখন এই কলাকে পোকা মারার বিষ ডিডিটি এবং বিদেশ থেকে আনা কেমিক্যাল দিয়ে পাকিয়ে বিক্রি করে[৩১১], তখন সেটা খাওয়ার যোগ্য হলেও, সেটা আর পবিত্র থাকে না, তাইয়িব-এর দুটি শর্ত পূরণ করে না। সুতরাং, এই ধরনের কলা, ফরমালিন দিয়ে রাখা ফল, মাছ খাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া যাবে না, কুর’আনের এই আয়াতের নিষেধের জন্য এবং নিজের স্বাস্থ্যের জন্য।

একইভাবে আল্লাহ تعالى প্রকৃতিতে পানি, চিনি দিয়েছেন। সেগুলো হালাল এবং তাইয়িব। কিন্তু এগুলোর সাথে ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ, এসিড, মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণের চিনি, রঙ ব্যবহার করে যখন নানাধরণের পানীয় তৈরি করে, তখন সেটা আর তাইয়িব থাকে না।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এরপরেও কিছু লোক আছে যারা অন্যদেরকে আল্লাহর সমান গুরুত্ব দেয়— আল-বাক্বারাহ ১৬৫-১৬৭

আমরা জীবনে প্রায়ই এমন কিছু পরিস্থিতিতে পড়ি, যখন ইসলামের নিয়ম মেনে চললে, আল্লাহর تعالى নির্দেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করলে দেখা যাবে যে, আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে, ব্যবসায় কোনো বড় কাস্টমার হারিয়ে ফেলব, চাকরিতে প্রমোশন হাতছাড়া হয়ে যাবে, সমাজে স্ট্যাটাস নষ্ট হয়ে যাবে, লোকজন নানা কথা বলাবলি করবে ইত্যাদি। জীবনে প্রায়ই এমন ঘটনা আসে, যখন নিজেকে বোঝাতে হয়, “থাক না, একদিনেরই তো ব্যাপার। একটু ঘুষ খেলে কী হয়। সবাই খাচ্ছে না?” অথবা হয়তো নিজেকে যুক্তি দেখাই, “আমি যদি এটা না করি, তাতে কী হবে? আমার পরে যে আসবে সে তো ঠিকই করবে। তারচেয়ে এবার একটু অন্যায় করি। পরে বেশি করে ভালো কাজ করে পাপ কেটে নেবো।”

স্ট্যাটাস, সম্পত্তি, ক্ষমতা, সম্মানকে আমরা এতটাই ভালবাসি যে, এদেরকে ধরে রাখার জন্য মাঝে মাঝেই ইসলামকে বিসর্জন দিয়ে দেই। জেনে শুনে আল্লাহর تعالى নির্দেশ অমান্য করি। মনে মনে আল্লাহর تعالى সাথে পাপ-পুণ্যের লেনদেনের হিসেব করি। তাঁকে تعالى বোঝানোর চেষ্টা করি: কেন তাঁর تعالى নিষেধ এবার মানছি না, এবং কেন তাঁর تعالى উচিত এবার আমাকে মাফ করে, আরেকবার সুযোগ দেওয়া।

যারা এধরনের কাজ করেন, তাদের কী হবে, তা এই আয়াতে বলা হয়েছে—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এসবের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির মানুষদের জন্য অবশ্যই বিরাট নিদর্শন রয়েছে — আল-বাক্বারাহ ১৬৪ — ২য় পর্ব

2_164_title2

প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে: আকাশ এবং পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে কেউ যদি গভীরভাবে ভেবে দেখে, সে দেখবে যে, এসবের সৃষ্টির মধ্যে একই মূলধারার ডিজাইন লক্ষ্য করা যায়, একজন স্রষ্টারই স্বাক্ষর স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে। একইভাবে কেউ যদি দিন-রাতের পরিবর্তন নিয়ে ভেবে দেখে: কীভাবে দিন-রাতের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন হয়, কেন রাতের আকাশে অন্ধকার থাকে, কীভাবে প্রতি বছর একই দৈর্ঘ্যের দিনরাত হয়, তাহলে সে দেখবে এটা বিশেষভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেন মানুষের মতো জটিল প্রাণ একদিন পৃথিবীতে আসতে পারে।

তারপর কেউ যদি পানিতে ভেসে চলা জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে: কীভাবে এত ভারি একটা জিনিস পানিতে ভেসে আছে, তাহলে সে দেখবে: পানির এক বিশেষ গুণ ‘প্লবতা’র কারণেই তা হয়। যদি এই বিশেষ গুণ পানিতে দেওয়া না হতো, তাহলে সভ্যতা গড়ে উঠত না, কোনো প্রাণী পানিতে ভেসে থাকতে পারতো না। প্রাণী জগৎ কখনই আজকে এই পর্যায়ে আসতে পারতো না। কেউ একজন ইচ্ছে করে এই ব্যাপারগুলো নির্ধারণ করেছেন দেখেই আজকে মানুষ পৃথিবীতে বাস করতে পারছে, এত বৈচিত্র্যের উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগৎ হতে পেরেছে, পৃথিবী মানুষের বসবাসের জন্য এত আরাম দায়ক হয়েছে।

এবার আয়াতের বাকি নিদর্শনগুলো নিয়ে দেখি—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

এসবের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির মানুষদের জন্য অবশ্যই বিরাট নিদর্শন রয়েছে — আল-বাক্বারাহ ১৬৪ পর্ব ১

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى বুদ্ধিমান মানুষদের চিন্তা করার জন্য কিছু নিদর্শন দিয়েছেন। তিনি تعالى বলছেন যে, যদি মানুষ বুদ্ধিমান হয়, তাহলে এই ব্যাপারগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে মানুষ এই উপসংহারে পৌঁছাবেই: আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ থাকতেই পারে না।

2_164_title

2_164আকাশ এবং পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাতের পরিবর্তনে, মানুষের জন্য পণ্য নিয়ে সমুদ্রে ভেসে চলা জাহাজে, আকাশ থেকে আল্লাহর পাঠানো পানিতে, যা মৃত জমিকে আবার প্রাণ দেয়, এর মধ্যে সব ধরণের প্রাণীকে ছড়িয়ে দেয়, বাতাসের পরিবর্তনে এবং আকাশ এবং পৃথিবীর মাঝখানে মেঘের নিয়ন্ত্রিত চলাচলে —এসবের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধির মানুষদের জন্য অবশ্যই বিরাট নিদর্শন রয়েছে। [আল-বাক্বারাহ ১৬৪]

এই আয়াতে একটি খুবই শক্তিশালী বাণী রয়েছে। আল্লাহ تعالى কে —তা তিনি শুধু কু’রআন, হাদিসের বাণীর মাধ্যমেই আমাদেরকে জানাননি, আমাদের চারপাশের এই বিশাল জগতের মধ্যে পরিষ্কারভাবে তাঁর تعالى পরিচয় ছড়িয়ে রয়েছে। তাঁকে জানার জন্য যে, আমাদের শুধু হালাক্বাতে গিয়ে লেকচার শোনা, মসজিদে গিয়ে খুতবা শোনা, বা শুধু ধর্মীয় বই পড়তে হবে তা নয়, তাঁর এই বিশাল সৃষ্টিজগৎ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে, পৃথিবী ঘুরে দেখলে, আকাশ নিয়ে চিন্তা করলে, আমরা তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারবো। আল্লাহর تعالى আয়াত ءَايَٰت—যার অর্থ নিদর্শন—দুই ভাবে আমাদের কাছে এসেছে: ১) তাঁর পাঠানো বাণীর মাধ্যমে, এবং ২) তাঁর সৃষ্টিজগতের মাধ্যমে।[১] যারা বুদ্ধিমান, তারা সৃষ্টিজগতের মধ্যেই আল্লাহর পরিচয় تعالى খুঁজে পায়। তাঁর একত্ব এবং মহত্ত্ব উপলব্ধি করে বিস্ময়ে মাটিতে লুটিয়ে যায়।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কিছু নেই — আল-বাক্বারাহ ১৬৩

ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এসেছে এই আয়াতে—

2_163_title

2_163তোমাদের উপাসনার যোগ্য সত্তা একজন। তিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য আর কিছু নেই। পরম দয়ালু তিনি, নিরন্তর করুণাময় তিনি। [আল-বাক্বারাহ ১৬৩]

“তোমাদের إِلَٰه ‘ইলাহ’ একজন” — إِلَٰه ইলাহ শব্দটিকে সাধারণত উপাস্য বা উপাসনার যোগ্য প্রভু অনুবাদ করা হয়। কিন্তু ইলাহ অর্থ আসলে হচ্ছে: কোনো কিছু বা কাউকে এতটাই চাওয়া হয়, এতটাই ভালবাসা হয় যে, ভালবাসা তখন উপাসনার পর্যায়ে চলে যায়। হৃদয়ে তখন দিন, রাত শুধু ইলাহ-এর চিন্তা ঘোরে। ইলাহ হয়ে যায় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আকাঙ্খা। বাকি সব কিছু ইলাহ’র কাছে তখন তুচ্ছ। মন তখন ইলাহকে পাওয়া, ইলাহকে তুষ্ট করার চিন্তায় বিভোর হয়ে যায়।[১] [১১]

হাজার বছর ধরে মানুষের ইলাহ ছিল বিভিন্ন দেব-দেবী, সূর্য, চাঁদ, তারা, গরু ইত্যাদি নানা প্রাকৃতিক বস্তু, এমনকি বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষও। এদেরকে তুষ্ট করার জন্য, এদের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার জন্য মানুষ এমন কিছু নেই, যা করতো না, সেটা মানুষ কুরবানী করে হলেও। ইলাহ যে শুধু এধরনের কোনো প্রাকৃতিক কিছু বা মানুষ হতে হবে তা নয়, এটি যে কোনো কিছু হতে পারে। কারো বেলায় ইলাহ হয় তার সম্পদ। কারো বেলায় তা হয় তার মান-সম্মান, সমাজে স্ট্যাটাস। কারো বেলায় ইলাহ হয়ে যায় তার জৈবিক কামনা। কারো বেলায় তার ইলাহ হয়ে যায় তার স্বামী, বা স্ত্রী, এমনকি সন্তানরাও। মানুষ তখন এসব ইলাহ’কে পেতে গিয়ে তার সমস্ত মনোযোগ, সময়, শক্তি দিয়ে দেয়। শুধু তাই না, অনেক সময় মানুষ একাধিক ইলাহ’কে একই সাথে পাওয়ার চেষ্টা করে। তখন শুরু হয় একাধিক ইলাহ’র মধ্যে প্রতিযোগিতা। শেষ পর্যন্ত একাধিক ইলাহ’র কোনোটাকেই ঠিক মতো না পেয়ে অশান্তি, অতৃপ্তিতে, হতাশায় ডুবে যায়।[১১]  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যারা আমার পাঠানো পরিষ্কার প্রমাণ এবং পথনির্দেশ গোপন করে — আল-বাক্বারাহ ১৫৯-১৬২

একটি ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বসে কারিকুলাম ঠিক করছেন। একজন প্রস্তাব দিলেন প্রথম দুই সেমিস্টার রিয়াদুস সালেহীন পড়াতে। সবাই সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। আরেকজন প্রস্তাব দিলেন এর সাথে সহিহ বুখারী পড়াতে। সেটাও সবাই একবাক্যে রাজি। এরপর আরেকজন বেহেশতি জেওর, কাসাসুল আনবিয়া ঢুকিয়ে দিতে বললেন। সেটাও পাশ হয়ে গেল।

এরমধ্যে একজন বললেন, প্রতি সেমিস্টারে কুরআনের এক পারার অর্থসহ তিলাওয়াত শেখাতে। এই প্রস্তাব শুনে অন্যেরা আঁতকে উঠলেন, “না, না, শুধু আরবি তিলাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখুন। মানুষকে কুরআন অর্থসহ শেখালে বিভ্রান্তি হবে। মানুষ নিজে থেকেই নিজেদের মত যা খুশি বুঝে নিয়ে আমল করা শুরু করে দেবে। কুরআন সবার জন্য নয়। কুরআন বুঝতে গেলে অনেক বছর আরবি শিখতে হয়, আরবি ব্যাকরণে অভিজ্ঞ হতে হয়, কমপক্ষে ১৪টা তাফসির পড়তে হয়। এগুলো সব না শিখিয়ে শুধু কুরআন অর্থ সহ শেখালে সর্বনাশ হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষকে কুরআন থেকে যত দূরে রাখা যায়, ততই বরং কম ফিতনা হবে।”

2_159_title

2_159যারা আমার পাঠানো পরিষ্কার প্রমাণ এবং পথনির্দেশ গোপন করে, আমি মানুষের জন্য কিতাবে পরিষ্কার করে দেওয়ার পরেও, ওদেরকে আল্লাহ ঘৃণা ভরে পরিত্যাগ করেন, এবং অভিশাপকারীরা ওদেরকে অভিশাপ দেয়। [আল-বাক্বারাহ ১৫৯]

হাজার বছর আগে ইহুদি রাবাইরা (ধর্মীয় পন্ডিতরা) তাওরাতকে শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যেই কুক্ষিগত করে রেখেছিল। সাধারণ ইহুদিরা কখনো তাওরাত নিজেরা পড়তে পারতো না, সেটা তাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। তাওরাতকে জনসাধারণের ধরাছোয়ার বাইরে রেখে রাবাইরা নিজেদের ইচ্ছামত শরীয়াহ বানিয়ে, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করার জন্য ইচ্ছেমত হালাল, হারাম নির্ধারণ করে গেছে। নানা ধরনের ধর্মীয় রীতিনীতি ঢুকিয়ে গেছে, যেগুলো তাদেরকে ক্ষমতা, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি এনে দিয়েছে। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তাওরাতের পরিষ্কার নিষেধকেও বৈধ বলে চালিয়ে দিয়েছে। এভাবে তারা সফল ভাবে কয়েকশত বছর ধরে সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পরিষ্কার বাণী, পথনির্দেশ থেকে দূরে রেখে একটা পুরো জাতিকে ভুল পথে নিয়ে গেছে।[১][১১]

একইভাবে গত কয়েক শতকে উপমহাদেশের মানুষদেরকে কৌশলে কুরআন থেকে দূরে রেখে কয়েকটা প্রজন্ম তৈরী করা হয়েছে, যারা কুরআন সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞানও রাখে না। এরা জানে না কুরআনে পরিষ্কারভাবে কী হালাল, কী  হারাম বলা আছে। কুরআনে তাওহীদের শিক্ষা কী, তা তারা জানে না। তারা শুধু পড়েছে কিছু গৎবাঁধা বই, যেই বইগুলোর অনেকগুলোতেই নানা ধরনের জাল হাদিস, বিদআতের ছড়াছড়ি।[১১] এভাবে একটি পুরো জাতিকে কুরআনে নিরক্ষর করে রেখে গেছে কিছু ইসলামী দল এবং ‘আলেম’ নিজেদের ইচ্ছামত ধর্ম ব্যবসা করার জন্য। এদের পরিণাম ভয়ঙ্কর—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

যে নিজে থেকে ভালো কাজ করে, আল্লাহ অবশ্যই তার মূল্যায়ন করেন — আল-বাক্বারাহ ১৫৮

2_158_title

2_158সাফা এবং মারওয়াহ আল্লাহর تعالى নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। তাই যারা কা’বা ঘরে হাজ্জ বা উমরাহ করে, তারা এদুটিকে ঘিরে ঘুরলে কোনো দোষ নেই। আর যে নিজে থেকে ভালো কাজ করে, আল্লাহ تعالى অবশ্যই তার মূল্যায়ন করেন, তিনি সব কিছুর ব্যাপারে জানেন। [আল-বাক্বারাহ ১৫৮]

সাফা এবং মারওয়া আল্লাহর تعالى নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। এই আয়াতে নিদর্শন বলতে শা’আইর شَعَآئِرِ ব্যবহার করা হয়েছে, যার একবচন শা’ইরাহ شعيرة এসেছে شعر থেকে। এর অর্থ: কোনো স্থাপত্য, চিহ্ন, যা দেখে মানুষের কোনো উপলব্ধি হয়। কোনো কিছু দেখে আমরা যখন কোনো স্মৃতিচারণ করি, আমাদের মধ্যে আবেগের সৃষ্টি হয়, সেটা شعيرة।[১] যেমন বাঙালিদের شعيرة হচ্ছে স্মৃতিসৌধ, যা আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। সেরকম সাফা এবং মারওয়া আমাদেরকে নবী ইব্রাহিম عليه السلام এর স্ত্রীর পানির খোঁজে ছোটাছুটি করার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাদের ভীষণ কঠিন সব পরীক্ষা আল্লাহর تعالى প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে নির্দ্বিধায় পার করার চেতনায় আমাদের উদ্বুদ্ধ করে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)