ধন-সম্পদ, সন্তান কোনো কিছুই তার কাজে আসবে না — আল-মাসাদ

সুরা মাসাদ বা লাহাব কুর‘আনের অন্যতম বিতর্কিত সূরাহ। শুধুই যে অমুসলিমরা এই সূরাহকে আক্রমণ করে তাই নয়, একইসাথে অনেক মুসলিমদেরকেও দেখা যায় এই সূরাহ নিয়ে নানা সন্দেহে ভুগতে। তাদের উভয়ের অভিযোগ হচ্ছে, কেন কুর‘আনে শুধুই দুইজনকে অভিশাপ দিয়ে পুরো একটা সূরাহ দেওয়া হলো? এই সূরাহ পড়ে মুসলিমদের কী লাভ? কুর‘আন না মানুষের জন্য পথপ্রদর্শক? এই সূরাহ’র মধ্যে তো কোনো পথনির্দেশ দেখা যাচ্ছে না? কোটি কোটি মানুষ এই সূরাহ মুখস্ত করে কোটি কোটি বার পড়ছে, শুধুই কোনো এক বদ পরিবারকে অভিশাপ দেওয়ার জন্য, এ কেমন কথা হলো? নামাজে দাঁড়িয়ে লক্ষ কোটি মানুষ এক পরিবারের গুষ্টি উদ্ধার করছে, এতে মুসলিম উম্মাহর কী উপকার হচ্ছে?  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

তোমাদের মনে যা কিছু আছে, তা প্রকাশ করো বা গোপন রাখো — আল-বাক্বারাহ ২৮৪

কু’রআনে কিছু আয়াত রয়েছে, যেখানে আল্লাহ تعالى ইসলাম ধর্মের মূলনীতিকে এক কথায় জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা যতই তাফসির, হাদিস, ফিকহ পড়ি এবং মানার চেষ্টা করি না কেন, এই মূলনীতিগুলো যদি ঠিকভাবে নিজের ভেতরে বাস্তবায়ন না করি, তাহলে ধর্মের আসল উদ্দেশ্য কী, তা আর ধরতে পারি না। মুসলিম হিসেবে আমাদের কথা এবং কাজ কেমন হওয়া উচিত ছিল, তা উপলব্ধি করি না। তখন আমরা ইসলাম ধর্মের আসল উদ্দেশ্য নিজের জীবনে এবং সমাজে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হই, নিজের এবং আশেপাশের মানুষের জীবনে অশান্তি ডেকে আনি। এরকম একটি আয়াত হলো—  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

অনেকে আছে যারা শুধুই চায়, “ও রব্ব, আমাদেরকে দুনিয়াতে দিন” — আল-বাক্বারাহ ২০০-২০২

আমরা যখন হাজ্জ করতে যাই, আমাদের উদ্দেশ্য থাকে কীভাবে আমরা আল্লাহকে تعالى খুশি করতে পারি, যেন তিনি আমাদেরকে জান্নাত দেন। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, অনেকে হাজ্জে যান, কারণ তার দুনিয়াতে অনেক কিছু দরকার, এবং তিনি শুনেছেন হাজ্জে গিয়ে চাইলে নাকি সব পাওয়া যায়। যার ফলে তার হাজ্জে যাওয়াটা হয়ে যায়, মন্ত্রীর কাছে গিয়ে তদবির করার মতো একধরনের তদবির অনুষ্ঠান। হাজ্জে গিয়ে তার দু’আ হয়, “ও আল্লাহ, تعالى আমার ব্যবসাটা ভালো করে দিন, আমাকে চাকরিতে প্রমোশন দিন। আমাকে একটা বাড়ি কিনতে দিন। আমার ছেলেমেয়েকে বিদেশে পাঠাতে দিন। আমার জমিগুলোকে নিরাপদ রাখুন। আমার স্ত্রীর অত্যাচার দূর করে দিন। আমার ডায়াবেটিস ঠিক করে দিন।…” —অবশ্যই এগুলো চাওয়াটা দোষের নয়, কিন্তু আমাদেরকে বুঝতে হবে: এই মহাবিশ্বে আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী। কেন আমাদেরকে সৃষ্টি করে এই পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। আমরা যদি দুনিয়ার পেছনে দৌড়াতে গিয়ে এই বিরাট ব্যাপারটাকে বেশি গুরুত্ব না দেই, ভুলে যাই, হাজ্জের মতো এত বড় একটা সুযোগ পেয়েও উপলব্ধি না করি, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে, কারণ আল্লাহ تعالى বলেছেন—

2_200

হাজ্জের অনুষ্ঠানগুলো শেষ করার পর, আল্লাহকে تعالى বেশি করে মনে করবে, যেভাবে তোমাদের বাপদাদাদের মনে করো। না, বরং তারচেয়ে বেশি করে! কারণ অনেকে আছে যারা শুধুই চায়, “ও রব্ব, আমাদেরকে দুনিয়াতে দিন” —এদের জন্য পরকালে বিন্দুমাত্র কোনো ভাগ থাকবে না। [আল-বাক্বারাহ ২০০]

আগেকার আমলে হাজ্জ শেষ হওয়ার পর হাজ্জিরা একসাথে বসে তাদের বাপ-দাদাদের কৃতিত্ব নিয়ে গল্প করতো —কে কবে কাকে কত খাইয়েছে, কত সাহায্য করেছে, কত জমিজমা করেছে, কত যুদ্ধ করেছে, কত বীর পদক পেয়েছে ইত্যাদি।[১২][১৪][৬] আজকের দিনে আমরা বাপ-দাদাদের নিয়ে এভাবে গর্ব করি না। আমাদের গল্পগুলো হয়ে গেছে: কার বাবা মন্ত্রী, কার দাদা জমিদার ছিলেন, কে সৈয়দ বংশের, কার চাচা হাজ্জ কাফেলার চেয়ারম্যান ইত্যাদি। হাজ্জের মতো এত মূল্যবান সময়গুলো আমরা পার করি এসব খোশ গল্প করে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

কিয়ামতের দিন আল্লাহ ওদের সাথে কথা বলবেন না — আল-বাক্বারাহ ১৭৪-১৭৬

গত কয়েক শতকে উপমহাদেশের মানুষদেরকে কৌশলে কুরআন থেকে দূরে রেখে কয়েকটা প্রজন্ম তৈরী করা হয়েছে, যারা কুরআন সম্পর্কে নুন্যতম জ্ঞানও রাখে না। এরা জানে না কুরআনে পরিষ্কারভাবে কী হালাল, কী  হারাম বলা আছে, তাওহীদের শিক্ষা কী? তারা শুধু পড়েছে কিছু গৎবাঁধা বই, যেই বইগুলোর অনেকগুলোতেই নানা ধরনের জাল হাদিস, বিদআতের ছড়াছড়ি।[১১] এভাবে একটি পুরো জাতিকে কুরআনে নিরক্ষর করে রেখে গেছে কিছু ইসলামী নামধারি দল এবং কথিত আলেম নিজেদের ইচ্ছামত ধর্ম ব্যবসা করার জন্য। এদের পরিণাম ভয়ঙ্কর—

2_174_title

2_174আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন সেটা যারা গোপন রাখে, আর দুনিয়ায় সামান্য লাভের বিনিময়ে তা বেচে দেয়, ওরা নিজেদের পেটে জাহান্নামের আগুন ছাড়া আর কিছু ভরে না। কিয়ামতের দিন আল্লাহ ওদের সাথে কথা বলবেন না, ওদেরকে পবিত্রও করবেন না। ওদের জন্য রয়েছে প্রচণ্ড কষ্টের শাস্তি। [আল-বাক্বারাহ ১৭৪]

আজকাল অনেক ‘আধুনিক মুসলিম’ কু’রআনের আয়াতগুলোর পরিষ্কার বাণীকে ধামাচাপা দিয়ে, অনেকসময় বিশেষভাবে অনুবাদ করে, ইসলামকে একটি ‘সহজ জীবন ব্যবস্থা’ হিসেবে মানুষের কাছে প্রচার করার চেষ্টা করছেন। তারা দেখছেন যে, পাশ্চাত্যের ‘উন্নত’ জাতিগুলো ধর্ম থেকে দূরে সরে গিয়ে কত আনন্দের জীবন যাপন করছে, জীবনে কত স্বাধীনতা উপভোগ করছে: প্রতিদিন রংবেরঙের মদ পান করছে, বিশাল সব আভিজাত্যের হোটেলে গিয়ে জুয়া খেলছে, সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছে; ইচ্ছামত সুন্দর কাপড় পড়ছে, বন্ধু বান্ধব নিয়ে নাচগান করছে—জীবনে কতই না ফুর্তি ওদের।

ওদের এত সুখ, এত আনন্দ দেখে তারা ভিতরে ভিতরে ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছে। কেন তারা ওদের মতো ফুর্তি করতে পারবে না? কেন তাদেরকে এতটা নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে হবে?— এটা তারা কোনোভাবেই নিজেদেরকে বোঝাতে না পেরে, চেষ্টা করছে কোনোভাবে যদি ইসলামকে একটি ‘আধুনিক’, ‘সহজ’ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষের কাছে প্রচার করা যায়। তখন তারা পশ্চিমাদের মতো ফুর্তি করতে পারবে, আবার মুসলিমদের কাছ থেকে একদম দূরেও সরে যেতে হবে না, সমাজে অপরাধীর মতো লুকিয়ে চলতে হবে না। ‘মুহাম্মাদ’ ‘আব্দুল্লাহ’ নাম নিয়ে একদিকে তারা সপ্তাহে একদিন জুম্মার নামায পড়তে যেতে পারবে, অন্যদিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে মেয়েদের সাথে নাচতে পারবে, রবিবারে পার্টিতে বন্ধুদের সাথে একটু রঙিন পানিও টানতে পারবে। এভাবে তারা ‘আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন সেটা গোপন রাখে, আর দুনিয়ায় সামান্য লাভের বিনিময়ে তা বেচে দেয়,’—কু’রআনের শিক্ষার পরিপন্থী একটি জীবন যাত্রাকে নিজেদের ফুর্তির জন্য মুসলিমদের কাছে গ্রহণযোগ্য করানোর চেষ্টা করছে।  (আর্টিকেলের বাকিটুকু পড়ুন)

সে এক জঘন্য যাওয়ার জায়গা — আল-বাক্বারাহ ১২৬-১২৭

2_126

ইব্রাহিম বলেছিলেন, “ও আমার প্রভু, এই শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং এখানকার অধিবাসীদেরকে ফলমূল-সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিন: যারা আল্লাহ تعالى এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে তাদের জন্য।” আল্লাহ تعالى বলেছিলেন, “যারা অবিশ্বাস করবে, তাদেরকেও আমি কিছু দিনের জন্য সুখে থাকার ব্যবস্থা করে দেব, তারপর তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তিতে জোর করে ঢোকাবো— সে এক জঘন্য যাওয়ার জায়গা।” [আল-বাক্বারাহ ১২৬]

প্রশ্ন হল: কীসের শহর? নবী ইব্রাহিম عليه السلام যখন কা’বা বানাচ্ছিলেন, তখন তার চারপাশে ধুধু মরুভূমি। শহরের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু তিনি তার দূরদর্শিতা থেকে ঠিকই বুঝেছিলেন: আল্লাহর تعالى এই ঘরের আশেপাশে একদিন একটা শহর হবে। মানুষ দূর দূর থেকে আসবে এখানে হাজ্জ করতে। তাই তিনি আল্লাহর تعالى কাছে দু’আ করেছিলেন, যেন এখানকার বিশ্বাসী অধিবাসীদের নিরাপত্তা এবং খাওয়ার কোনো অভাব না হয়।

তার দু’আ আল্লাহ تعالى কবুল করেছেন। মক্কায় সারাবছর কোনো ফলের অভাব হয় না। অথচ মক্কায় এবং তার আশেপাশে মরুভূমিতে খেজুর ছাড়া কোনো ফল হয় না। তারপরেও সেখানে গেলে আপনি চায়নার আপেল, মিশরের কমলা, ভারতের কলা —কোনো কিছুর অভাব দেখবেন না। নানা দেশ থেকে সব সুস্বাদু ফল সেখানে সরবরাহ হচ্ছে গত হাজার বছর ধরে।

এছাড়াও সূরা আল-কাসাস ২৮:৫৭-এ বলা আছে: أَوَلَمْ نُمَكِّن لَّهُمْ حَرَمًا ءَامِنًا يُجْبَىٰٓ إِلَيْهِ ثَمَرَٰتُ كُلِّ شَىْءٍ رِّزْقًا مِّن لَّدُنَّا অর্থাৎ সবকিছুর ফল মক্কাতে আসে। এর অর্থ শুধুমাত্র গাছের ফলই নয়, বরং সবকিছুর ফল, সেটা কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে উৎপন্ন পণ্যদ্রব্য সবকিছুই। মক্কাবাসিদের চাষবাস করার কোনো দরকার হয় না। তারা সেই সময়টুকু আল্লাহর تعالى ইবাদতে মনোযোগ দিতে পারেন।[৪]

নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন
নবী ইব্রাহিম عليه السلام মক্কার জন্য আল্লাহর تعالى কাছে নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন চেয়েছিলেন। তার এই দু’আ থেকে তার অসাধারণ প্রজ্ঞার নিদর্শন পাওয়া যায়, কারণ আমরা আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে  সোশালজিতে পড়ি: একটি জাতির উন্নতির জন্য দুটো জিনিস দরকার— ১) নিরাপত্তা, ২) উন্নয়ন। এর একটিও যদি না থাকে, সেই জাতি বেশি দূর যেতে পারে না।[১]

যেমন, একটি দেশে উন্নয়ন থাকতে পারে। হতে পারে সেই দেশে যথেষ্ট খাদ্য তৈরি হচ্ছে, বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। নতুন অফিস, স্কুল-কলেজও হচ্ছে। কিন্তু সে দেশে মানুষের জানমালের যদি কোনো নিরাপত্তা না থাকে, দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী থাকে, সবসময় মারামারি, ভাংচুর, খুন লেগেই থাকে —তাহলে সেই দেশের শিক্ষিত, দক্ষ মানুষগুলো সুযোগ পেলেই অন্য দেশে চলে যাবে, যেখানে তারা নিরাপত্তা পাবে।[১] সবাই প্রথমে নিজের এবং নিজের পরিবারের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। যতই টাকা থাকুক, ঘরের বাইরে বের হলে যদি ছিনতাইকারী, ক্যাডার, খুন, গুম, ধর্ষণের ভয় থাকে, দেশের সরকার যদি জনগণকে জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে সেই মানুষগুলো এক সময় ভাবা শুরু করে, “কী হবে এদেশে থেকে? কীসের জন্য আমি প্রতিদিন নিজের এবং আমার পরিবারের জীবনের ঝুঁকি নেব? এখানে কামড়ে থাকার মতো আছেটা কী?”

আবার অন্যদিকে কোনো দেশে যদি যথেষ্ট নিরাপত্তা থাকে, শক্তিশালী পুলিশ বাহিনী থাকে, কিন্তু সেই দেশে কোনো উন্নয়ন না থাকে, যথেষ্ট চাকরির সুযোগ না থাকে, ব্যবসার সুযোগ না থাকে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের আয় তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট না হয়, তাহলে সেই দেশেও মানুষ থাকতে চাইবে না, এবং সেই জাতি বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারবে না। দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে না পারলে, মানুষ একসময় মরিয়া হয়ে উঠবে।[১] গৃহ যুদ্ধ শুরু হবে। দুর্ভিক্ষ হবে। জাতি ধ্বসে যাবে।

যারা আল্লাহ تعالى এবং আখিরাতে বিশ্বাস রাখে
নবী ইব্রাহিম عليه السلام দু’আ করেছিলেন যেন শুধু বিশ্বাসীদেরকে আল্লাহ تعالى নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন দেন। কিন্তু আল্লাহ تعالى অবিশ্বাসীদের জন্যও তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু অবিশ্বাসীদের জন্য এই নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন হবে তাদের জাহান্নামে যাওয়ার পাথেয়। তারা বিপুল পরিমাণের সম্পত্তির মালিক হবে, সোনা দিয়ে লেপা মার্সিডিজ গাড়ি, বিশাল ব্যক্তিগত দোতলা প্লেন, মাইলের পর মাইল গাড়ির বহর, আকাশচুম্বী সব বিল্ডিং-এর মালিক হবে। কিন্তু এগুলো সব তাদেরকে বিলাসিতায় ডুবিয়ে রাখবে, আল্লাহ تعالى এবং আখিরাত থেকে ভুলিয়ে রাখবে। তারপর কিয়ামতের দিন তাদেরকে পশুর মতো তাড়িয়ে নিয়ে জাহান্নামের হিংস্র আগুনে ছুঁড়ে ফেলা হবে।

2_126_title

নবী ইব্রাহিমের عليه السلام দু’আ
নবী ইব্রাহিম যখন কা’বা তৈরি শেষ করলেন, তিনি এবং তার সন্তান ইসমাইল দু’আ করলেন—

2_127

ইব্রাহিম এবং ইসমাইল যখন কা’বার ভিত্তি তৈরি করছিলেন, “ও আমাদের প্রভু, আমাদের কাছ থেকে এটি গ্রহণ করুণ। আপনি তো সব শোনেন, সব জানেন।” [আল-বাক্বারাহ ১২৭]

এখন প্রশ্ন আসে, কা’বা তৈরি করার সময় নবী ইব্রাহিম عليه السلام কেন দু’আ করছিলেন, যেন তাদের তৈরি কা’বা আল্লাহ تعالى গ্রহণ করে নেন? তারা কি আল্লাহর تعالى আদেশই অনুসরণ করছিলেন না? এখানে গ্রহণ না করার মতো কী কারণ থাকতে পারে?

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শেখাচ্ছেন: আমরা যদিও আল্লাহর تعالى নির্দেশ অনুসারে নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, যাকাত দেই —কিন্তু এগুলো আল্লাহ تعالى গ্রহণ নাও করতে পারেন, কারণ, আল্লাহর تعالى হুকুম পালনে আমাদের যথেষ্ট ত্রুটি থাকতে পারে। নামাজ পড়েই আমরা যেন ধরে না নেই, “ব্যাস, আমার আজকের সব ফরজ দায়িত্ব শেষ। ফেরেশতারা, তোমরা চলে এসো, আমি জান্নাতে যাওয়ার জন্য তৈরি।” রমজানে ৩০ রোজা রেখে যেন না ভাবি, “আমি এখন শিশুর মতো পবিত্র। আমার জান্নাতে যাওয়া আর ঠেকায় কে?” ফেইসবুকে ইসলামের উপরে পোস্ট দিয়ে হাজার খানেক লাইক পেয়ে যেন না ভাবি, “১০০০ লাইক x ৭০ নেকি = ৭০,০০০ নেকি। চমৎকার! জান্নাতুল ফেরদাউস পর্যন্ত পৌঁছাতে আর মাত্র ৩০০ লাইক দরকার।”

আমরা একটা মসজিদ দিতে পারলে ভাবি: এই মসজিদে যত মানুষ নামাজ পড়বে, তার সওয়াবের অংশীদার হবো আমি। কিয়ামতের দিন আমার নেকির পাল্লা এত ভারি হবে যে, তা তোলার জন্য কয়েকজন ফেরেশতা লাগবে। আর এখানে নবী ইব্রাহিম عليه السلام তৈরি করছেন কা’বা! এই কা’বায় প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ হাজি ইবাদত করতে আসেন। হাজার বছর ধরে কত কোটি কোটি মানুষের ইবাদত হয়েছে এই কা’বা ঘিরে। তিনি যদি কা’বায় আসা প্রত্যেক মানুষের ইবাদতের সওয়াবের অংশীদার হন, তাহলে তিনি কী পরিমাণ সওয়াব পাবেন এই কা’বা থেকে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। আর তিনিই আল্লাহর تعالى কাছে ভিক্ষা চাইছেন, যেন তার এই চেষ্টা আল্লাহ تعالى কবুল করে নেন!

আল্লাহ تعالى যদি অনুগ্রহ করে আমাদের ইবাদতগুলো কবুল করে না নেন, তাহলে সর্বনাশ! আমাদের একটা নামাজও কবুল হবে না, কারণ নামাজে দাঁড়িয়ে এমন কোনো চিন্তা নেই, যা আমরা করি না। আমাদের রোজা কবুল হবে না, কারণ রোজা রেখে আমরা মিথ্যা বলি, গীবত করি, অন্যের উপর অন্যায় করি, নিজের সুবিধার জন্য টাকা এদিক ওদিক করি, হিন্দি সিরিয়াল দেখি। আমাদের যাকাত কবুল হবে না, কারণ যাকাত দেওয়ার সময় আমরা যতভাবে সম্ভব কম সম্পত্তির হিসেব করে, যাদেরকে যাকাত দিলে বেশি নাম হবে, তাদেরকে দেই। আমাদের হাজ্জ কবুল হবে না, কারণ হাজ্জের টাকায় মিশে আছে ব্যাঙ্কের সুদ, মামা-চাচা-খালু ধরে অন্যায়ভাবে জোগাড় করা চাকরি বা ব্যবসার আয়।

একারণে আমাদের প্রতিটি ইবাদতের পরে আল্লাহর تعالى কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে, যেন তিনি অনুগ্রহ করে তা গ্রহণ করে নেন। নবী ইব্রাহিম عليه السلام যেভাবে আকুলভাবে আল্লাহকে تعالى অনুরোধ করেছিলেন, “আপনি তো সব শোনেন” —ঠিক একইভাবে আমাদেরকেও আল্লাহর تعالى কাছে অনুরোধ করতে হবে, যেন তিনি আমাদের আকুল অনুরোধ শোনেন। “আপনি তো সব জানেন” —শত ভুলত্রুটি, দুর্বলতার পরেও আমাদের চেষ্টাকে তাঁর تعالى অসীম রহমতে বিবেচনা করেন। নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام মতো একজন নবী যদি কা’বা-র মতো বিরাট সন্মানের স্থাপনা বানিয়ে আল্লাহর تعالى কাছে সেটা গ্রহণ করার জন্য ভিক্ষা চাইতে পারেন, তাহলে আমরা কোথাকার কে?

এই আয়াতে বাবা-মাদের জন্য একটা শেখার ব্যাপার আছে: নবী ইব্রাহিম عليه السلام দু’আ করেছিলেন তার ছেলেকে সাথে নিয়ে। তিনি কা’বা তৈরি করেছেন ছেলেকে সাথে নিয়ে। আমরা অনেকেই নিজেরা ইসলামের ব্যাপারে খুবই সিরিয়াস হলেও, আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে ইসলামের কাজে খুব একটা লাগাই না। তাদেরকে সাথে নিয়ে ইবাদত করি না। অনেকে আছেন যারা সারাদিন অফিস করে এসেই চলে যান মসজিদে, হালাক্বায়: ইসলামের কাজে অংশ নিতে। অথচ এদিকে ঘরে তার ছেলে সারাদিন ভিডিও গেম খেলছে, মেয়ে হিন্দি সিরিয়াল দেখছে। অনেকে নিজেরা মসজিদে, রাস্তাঘাটে কষ্ট করে ইসলামের জন্য কাজ করলেও, তাদের আদরের দুলালদেরকে ঘরে বসে নামাজ-কুরআন পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। আবার অনেক মা নিজেরা হিজাব করলেও দেখা যায় তার কিশোরী-তরুণী মেয়ে হালের ফ্যাশনে গা ভাসিয়ে তারই সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

নবী ইব্রাহিম-এর عليه السلام কাছ থেকে আমাদের সবার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়ার আছে: নিজে ইসলামের জন্য কাজ করলেই হবে না, একইসাথে সন্তানদেরকেও সাথে নিয়ে ইসলামের জন্য কাজ করতে হবে। এর ফলে সন্তান যেমন জীবনের বাস্তবতা বাবা-মার কাছ থেকে শিখবে, একইসাথে সন্তান সুযোগ পাবে কিছু ভালো সময় তার বাবা-মার সাথে কাটানোর। একসাথে কাটানো এই সুন্দর সময়গুলো তাদের সারাজীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে। বাবা-মা যদি সত্যিই চান জান্নাতে গিয়ে সন্তানদের সাথে অনন্ত সুখ উপভোগ করতে, তাহলে তাদের এই জীবন থেকেই সন্তানদেরকে সাথে নিয়ে জান্নাতের জন্য কাজ শুরু করা উচিত।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।