সে অস্বীকার করেছিল, অহংকার করেছিল — বাকারাহ ৩৪

ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যজনক ঘটনাগুলোর একটি ঘটতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু আত্মপ্রকাশ করবে। সে এমন এক শত্রু, যে আমাদের জীবনে প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে, আমাদেরকে দিয়ে এমন কোনো খারাপ কাজ নেই, যা করাবে না। আদম (আ) কিছুক্ষণ আগে তার ক্ষমতার প্রদর্শনী করে প্রমাণ করে দিলেন: মানুষ ফেরেশতাদের থেকে কিছু ব্যাপারে বেশি ক্ষমতাবান, যার কারণে মহান আল্লাহ تعالى মানুষকেই পৃথিবীতে খালিফা হিসেবে পাঠাবেন, ফেরেশতাদেরকে নয়। ফেরেশতারা আদম (আ)-এর ক্ষমতায় অভিভূত হয়ে মেনে নিয়েছে যে, আল্লাহ تعالى নিঃসন্দেহে একজন যোগ্য প্রার্থীকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে যাচ্ছেন। তখন তারা আল্লাহর تعالى নির্দেশ পাওয়া মাত্র আদম (আ) এর সামনে সমর্পণ করল, একজন বাদে—

2_34

যখন ‘আমি’ ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, “আদমের প্রতি সমর্পণ কর”, তখন তারা সমর্পণ করেছিল, তবে ইবলিস ছাড়া। সে অস্বীকার করেছিল, অহংকার করেছিল। আর সে ছিল কাফিরদের [অবিশ্বাসীদের, অস্বীকারকারীদের] একজন । [বাকারাহ ৩৪]

shaitanইবলিস এক মহাজ্ঞানী সত্তা। সে একজন জিন, যাদেরকে আল্লাহ تعالى মানুষ সৃষ্টি করার অনেক আগেই সৃষ্টি করেছিলেন [আল-হিজর ১৫:২৭]। সে আল্লাহর تعالى ইবাদত করে এতটাই উপরে উঠতে পেরেছিল যে, আল্লাহ تعالى তার সাথে কথা বলতেন এবং আল্লাহর تعالى মহাপরিকল্পনার অনেক কিছুই সে জানত। এছাড়াও সে তার যোগ্যতার কারণে আল্লাহর تعالى কাছের সন্মানিত ফেরেশতাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল।[৪] কিন্তু তারপর ঘটল এক বিস্ময়কর ঘটনা, যার পর এত সন্মানিত এবং জ্ঞানী একজন সত্তা তার সবকিছু হারিয়ে ফেলল। আমরা অনেকেই ছোট বেলায় ইবলিসের এই অবাধ্যতার ঘটনাটা শুনেছি এবং ভেবেছি – “ছিঃ, ইবলিস কি বোকা, সে এত বড় ভুল কীভাবে করল।” আবার অনেকে ভেবেছি – “আহারে বেচারা ইবলিস। আল্লাহ تعالى  ইবলিসকে একটা মাত্র ভুলের জন্য এত বড় শাস্তি দিলেন? এত বড় একজন সত্তাকে সারা জীবনের জন্য বের করে দিলো? শাস্তিটা বেশি হয়ে গেল না?” শুধু তাই না, এই ধারণা থেকে Devil Worshipper ‘শয়তান পূজারী ধর্ম’ তৈরি হয়ে গেছে, যার অনুসারীরা মনে করে: সেদিন ইবলিসের সাথে অন্যায় করা হয়েছিল। একারণে তারা ইবলিসকে সমর্থন দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের ভয়ংকর বিকৃত উপায়ে তার উপাসনা করে এবং অপেক্ষা করছে কবে ইবলিসের সাথে ‘গডের’ শেষ যুদ্ধ হবে, যেদিন তারা ইবলিসের সহযোগিতা করবে।

আমাদের ভালো করে বোঝা দরকার সেদিন কী ঘটেছিল। ধরুন, আপনি আপনার চাকরি জীবনের প্রথম থেকে একটা কোম্পানিতে নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছেন। গত ত্রিশ বছর কঠোর পরিশ্রম করে আপনি একজন মামুলি কেরানি থেকে আজকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আপনার সাথে কোম্পানির চেয়ারম্যানের অনেক ভালো সম্পর্ক, আপনি তার অনেক কাছের একজন মানুষ। কিন্তু হঠাৎ একদিন চেয়ারম্যান সাহেব আপনাকে বলল যে, সদ্য অক্সফোর্ড থেকে গ্রাজুয়েট একজন তরুন ছেলে কালকে থেকে কোম্পানির প্রেসিডেন্ট হবে এবং আপনাকে তার অধীনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে হবে। আপনার অবস্থা তখন কী হবে? একজন সদ্য গ্রাজুয়েট হবে প্রেসিডেন্ট, আর আপনি যেখানে ত্রিশ বছর ধরে কোম্পানিতে কাজ করছেন, আপনি হবেন তার অধীনে একজন কর্মচারী! আপনার সাথে এতো বড় অন্যায়![১]

আপাতত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ইবলিসের এই প্রতিক্রিয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এখানে অনেক চিন্তার ব্যাপার আছে। প্রথমত, আল্লাহর تعالى অস্তিত্ব সম্পর্কে ইবলিসের সম্পূর্ণ ধারণা ছিল। আপনি, আমি নিজের চোখে আল্লাহকে দেখিনি, নিজের কানে আল্লাহকে শুনিনি। আমরা কোনো ফেরেশতাকেও কোনোদিন দেখিনি। আপনার-আমার পক্ষে আল্লাহর تعالى প্রতি সম্পূর্ণ অবিচল, অটুট বিশ্বাস রাখাটা যথেষ্ট কঠিন। কিন্তু আল্লাহ تعالى  ইবলিসের সাথে নিজে কথা বলেছেন।  এমনকি ইবলিস সন্মানিত ফেরেশতাদের সাথেও থাকত। তার জন্য আল্লাহকে تعالى প্রভু হিসেবে মেনে কোনো ধরণের প্রশ্ন না করে, তাঁর আদেশ মেনে চলাটাই স্বাভাবিক ছিল। আল্লাহর تعالى অবস্থান কত উপরে এবং সে কত নিচে; আল্লাহর تعالى অস্তিত্ব যে কত ব্যাপক, এবং সে আল্লাহর تعالى তুলনায় কত দুর্বল একজন মামুলি সৃষ্টি—এগুলো তার খুব ভালো ভাবে জানা থাকার কথা। সৃষ্টি জগতের মধ্যে আল্লাহর تعالى প্রতি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসী এবং সবচেয়ে বেশি অনুগতদের মধ্যে একজন হওয়ার কথা তার। কিন্তু এই সবকিছু দেখার, শোনার এবং জানার পরেও, সে কীভাবে আল্লাহর تعالى আদেশের উপর সোজা ‘না’ করে দিল, সেটা এক বিস্ময়কর ঘটনা। কু’রআনে পরে কয়েকটি সূরায় আল্লাহ تعالى ইবলিসের সাথে সেদিন তাঁর যে কথোপকথন হয়েছিল, তা আমাদেরকে জানিয়েছেন,

আল্লাহ বললেন, “ইবলিস, যাকে আমি নিজের হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি তুমি অনুগত হতে পারলে না কেন? তুমি কি তখন অহংকার করছিলে, নাকি তুমি নিজেকে মহিমান্বিতদের একজন মনে করো?” – [সাদ ৩৮:৭৫]

স্রষ্টার কাছ থেকে এত কঠিন একটা প্রশ্ন সরাসরি শোনার পরে স্বাভাবিকভাবেই ইবলিসের উচিৎ ছিল সাথে সাথে ক্ষমা চাওয়া এবং স্বীকার করা যে, সে বড় ভুল করে ফেলেছে, তাকে মাফ করে দেওয়া হোক। কিন্তু সে তা না করে উলটো আল্লাহকে تعالى বোঝানোর চেষ্টা করল,

সে বলল, “আমি ওর থেকে বড়। আপনি আমাকে আগুন থেকে বানিয়েছেন, আর ওকে বানিয়েছেন মাটি থেকে।” [সাদ ৩৮:৭৬]

ইবলিস কিন্তু বলতে পারত, “কত বছর ধরে আমি আপনার ইবাদত করছি, আপনার কত কাছের আমি,কত অনুগত; আর আজ আপনি আমাকে বলছেন নতুন একজনের কাছে নত হতে?” অথবা সে বলতে পারত, “আমাকে কেন ওই নতুন সৃষ্টির প্রতি অনুগত হতে হবে, তা আমাকে বুঝিয়ে বলবেন কি, যাতে আমি নিজেকে বোঝাতে পারি?” সে এর কোনোটাই করেনি। সে ‘কার’ মুখের উপর ‘না’ বলছে, ‘কাকে’ যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে—সেটা সে ভুলে গিয়েছিল।

ইবলিসের এই মানসিকতা কিছু মানুষের মধ্যেও আছে। যেমন, চৌধুরী সাহেব মনে করেন: পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়া, ত্রিশটা রোজা রাখার আসলে কোনো দরকার নেই। এই সব নামায, রোজা শুধু ওই সব অর্ধ-শিক্ষিত, অল্প-জ্ঞানী ‘মোল্লা’ টাইপের মানুষদের জন্য দরকার, যারা এখনও তার মত চিন্তার গভীরতা এবং উপলব্ধির উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি পাওয়া একজন মানুষ, সৃষ্টিজগত, বিজ্ঞানের উপর কয়েক ডজন বই পড়েছেন, ডিসকভারি চ্যানেলে শখানেক ডকুমেন্টারি দেখেছেন। তিনি আল্লাহকে تعالى যতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন, সেটা সবাই পারে না। একারণেই তার মত মানুষদের এইসব গৎবাঁধা নামায, রোজার দরকার হয় না। এভাবে তিনি যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, কুরআনের সব নির্দেশ আসলে তার জন্য প্রযোজ্য না।

“মহান আল্লাহ تعالى সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, সর্বশক্তিমান, একমাত্র প্রভু এবং আমি আল্লাহর تعالى এক মামুলি দাস”—এটা ইবলিস এবং এই চৌধুরী সাহেব টাইপের মানুষরা ঠিকভাবে নিজেদেরকে বোঝাতে পারেনি। তারা আল্লাহকে تعالى সৃষ্টিকর্তা মানে ঠিকই। কিন্তু তিনি যে সব প্রশ্নের ঊর্ধ্বে একজন প্রভু—এটা মানে না।

ইবলিস শুধু আল্লাহর تعالى সাথে যুক্তিতর্কই করেই শেষ করেনি, তার মধ্যে কখনোই কোনো ধরনের অনুশোচনাও ছিল না। একে তো সে আল্লাহর تعالى আদেশ অমান্য করল, তার উপর উল্টো সে তার স্রষ্টাকেই যুক্তি দিয়ে বোঝানোর মতো ঔদ্ধত্য দেখাল। এখানেই শেষ নয়, নির্বাসিত হওয়ার পর এই বলে সে প্রতিজ্ঞা করল যে, যে মানবজাতির সৃষ্টি নিয়ে আজ তার এই অবনমন, সেই মানবজাতিকে কিয়ামাত পর্যন্ত সে বিভ্রান্ত করে যাবে। কিন্তু একবারও সে তার অহংকারকে দমিয়ে আল্লাহকে تعالى বলতে পারল না, “ও আল্লাহ্‌, আমি ভুল করে ফেলেছি, আমাকে মাফ করে দিন, আমাকে আর একটা বার সুযোগ দিন।” তার অহংকার এতই বেশি ছিল যে, সে চিরকালের জন্য জাহান্নামে যেতেও রাজি ছিল, কিন্তু তারপরেও সে কারও কাছে মাথা নত করবে না। এমনকি তার স্রষ্টার কাছেও না!

এখানেই মানুষ আর ইবলিসের মধ্যে পার্থক্য। মানুষ ভুল করে আল্লাহ্‌র تعالى  কাছে ক্ষমা চায়—যা আমরা আদম (আ) এর কাছ থেকে শিখেছি। কিন্তু একজন শয়তান ভুল করে আল্লাহ্‌র কাছে ক্ষমা চায় না।

আমরা ইবলিসের এই ঘটনা থেকে আর কিছু না শিখি, একটি জিনিস অন্তত আমাদের শেখা দরকার, সেটা হচ্ছে: অহংকার না করা এবং অহংকারের চোটে অন্ধ  না হওয়া। জীবনে কত বার আমরা মানুষের সাথে খামোখা তর্ক করেছি শুধুই তর্কে জেতার জন্য; নিজের মধ্যে এটা বোঝার পরেও যে, আমাদের যুক্তিতে-বোঝায় ভুল আছে? কতবার আমরা, বয়সে ছোট একজনের কাছে মাথা নত করব না, এই অন্ধ অহংকারের ফলে অনেক ভালো উপদেশ, অনেক সাহায্য, সুযোগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি? কতবার আমরা স্ত্রী বা ছেলে-মেয়েদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেও, কোনোদিন তাদের কাছে একটি বারও মাফ চাইনি, পাছে আমাদের খানদানি সন্মান চলে যায় ভেবে? কতবার আমরা নিচের পদের কর্মচারী, বাসার কাজের লোক, ড্রাইভারদের সাথে অন্যায় ব্যবহার করেছি, কিন্তু সেটা পরে এক সময় বোঝার পরেও—“ওরা সস্তা মাটির তৈরি, আমি দামি মাটির তৈরি”—এই অহংকার বোধ থেকে একটি বারও তাদের কাছে গিয়ে নিজেদের দোষ স্বীকার করিনি? আমরা যদি নিজেদের অহংকারকে বিসর্জন দিয়ে যেটা করা উচিত সেটা করতে না পারি, যখন ক্ষমা চাওয়া প্রয়োজন তখন ক্ষমা চাইতে না পারি, যেখানে নিজের দোষ মেনে নেওয়া দরকার সেখানে নিজের দোষ মেনে নিতে না পারি, তাহলে ইবলিস যে কাজ করেছিল, আমরাও সেই একই কাজই করছি। সেক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ تعالى তাকে যেই পরিণতি দিয়েছেন, আমাদেরকেও সেই পরিণতি দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত—তাহলেই ইবলিস এবং আমাদের সাথে ন্যায়বিচার করা হবে।

খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধারণা আছে: ইবলিস আসলে একজন সন্মানিত ফেরেশতা ছিল। তারপর তাকে বের করে দেওয়া হয় এবং সে শয়তান হয়ে যায়। অনেক মুসলিমও এই ধারণা রাখেন, যখন তারা এই আয়াতটি পড়েন—

যখন ‘আমি’ ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, “আদমের প্রতি সমর্পণ কর” তখন তারা সমর্পণ করেছিল, তবে ইবলিস ছাড়া। … [বাকারাহ ৩৪]

অনেকে বলেন, “এখানে তো আল্লাহ تعالى নির্দেশ দিয়েছিলেন শুধু ফেরেশতাদেরকে। তার মানে কি এই না যে, ইবলিস আসলে ফেরেশতাদের একজন ছিল?” না, কারণ আরেকটি আয়াতে পরিষ্কার করে বলা আছে ইবলিস ছিল জিনদের একজন—

‘আমি’ যখন ফেরেশতাদেরকে বললাম, “আদমের প্রতি সমর্পণ করো”, তারা সবাই করেছিল, ইবলিস ছাড়া—সে ছিল জিনদের একজন। [আল-কাহফ ১৮:৫০]

তাছাড়া আরবি ভাষা এই ধরনের বাক্য গঠন করতে দেয়—“সেদিন সন্ধায় দাওয়াতে আমার সব আত্মীয়রাই এসেছিল, ফখরুদ্দীন ছাড়া।” এখানে ফখরুদ্দীন আমার আত্মীয় ছিল না, সে ছিল বাবুর্চি।[৬]

সবশেষে এই আয়াতে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার রয়েছে—

… সে কাফিরদের [অবিশ্বাসীদের, অস্বীকারকারীদের] একজন ছিল। [বাকারাহ ৩৪]

অর্থাৎ ইবলিসের আগেই আরও জিন ছিল, যারা আগে থেকেই কাফির (অবিশ্বাসী, অকৃতজ্ঞ) ছিল। ইবলিস প্রথম কাফির নয় এবং মানুষের সকল পাপের উৎস নয়। হয় আদম (আ)-এর এই ঘটনার পরে ইবলিস সেই কাফির জিনদের দলের একজন হয়ে গিয়েছিল, অথবা সে আগে থেকেই কাফির জিনদের একজন ছিল। আল্লাহ تعالى এই অসাধারণ ঘটনার মধ্য দিয়ে ইবলিসের ভালো-মানুষী মুখোশের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল রূপ সবার সামনে বের করে দিয়েছিলেন।[৩] তার ভেতরে যে প্রচণ্ড অহংকার বোধ, সেটা মহান আল্লাহ تعالى এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করে দিয়েছেন।

কেউ কেউ প্রশ্ন করেন, “এভাবে ইবলিসকে কি একটা ফাঁদে ফেলা হলো না? আদম (আ) এর প্রতি সমর্পণ করতে না বললেই তো সে আর কোনোদিন শয়তান হয়ে যেত না, আর আমাদের এত বড় একজন শত্রু তৈরি হতো না।” ইবলিসের মতো ভয়ংকর প্রবৃত্তি একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য অনেক সময় লাগে এবং আগে থেকেই ভিতরে অনেক সমস্যা থাকতে হয়। এধরনের প্রবৃত্তি যদি কারও থাকে, সেটা একদিন না একদিন বের হয়ে আসবেই। মহান আল্লাহ تعالى খুব ভালো করেই জানতেন যে, ইবলিস মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করবেই, কারণ সে মানুষের মতো উন্নততর একটা সৃষ্টিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি, যা ফেরেশতারা নিঃসঙ্কোচে মেনে নিয়েছে। মানুষের প্রতি তার হিংসা, তার ভিতরের ভয়ংকর অহংকার, ক্রোধ, মহান আল্লাহর تعالى প্রতি অবাধ্যতা—এগুলো যদি আল্লাহ تعالى একদম শুরুতেই প্রকাশ করে না দিতেন, তাহলে ইবলিস মানুষের এক গোপন শত্রু হয়ে যেত। আল্লাহ تعالى ইবলিসের আসল রূপকে একদম শুরুতেই প্রকাশ করে দিয়ে এবং নবী, রাসুল ও ঐশী গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে আমাদেরকে ইবলিসের ব্যাপারে সাবধান করে দিয়ে আমাদের এক বিরাট উপকার করেছেন। আমরা এখন জানি যে, ইবলিস আমাদের প্রকাশ্য শত্রু।

সবশেষে আরবি অনুরাগীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। আরবিতে قال কে সাধারণত অনুবাদ করা হয়, “সে বলেছিল।” قال মানে সবসময় মুখে কিছু বলা নয়। এটি অন্য যে কোনো পদ্ধতিতে ভাব প্রকাশকেও বোঝায়। যেমন, প্রাচীন আরবি কবিতায় বলা হতো, قالت له العينان سمعا وطاعة — “তার চোখদুটি বলেছিল, আমরা শুনব এবং মানবো।” চোখ নিশ্চয়ই কথা বলতে পারে না। এমনকি কু’রআনে সূরা আন-নামল-এর ১৮ আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে পিঁপড়ার কথা বলার কথা বলেছেন একই আরবি শব্দ  قَالَتْ ব্যবহার করে, যা থেকে বোঝা যায়, শুধুই মুখ দিয়ে শব্দ করে কথা বলাই قال নয়, পিঁপড়াদের মতো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে সংকেতের মাধ্যমে ভাব বিনিময় করাকেও قال — “কথা বলা” বলা যায়। একইভাবে ফেরেশতারা যখন “কথা বলে”, বা শয়তান যখন “কথা বলে”, তখন সেটা মানুষের কথা বলার মতো শব্দ করে, মুখের মতো একটা অঙ্গ নড়াচড়া করে কথা বলা নয়। আগুন এবং আলোর তৈরি সত্তা, যাদের কোনো বস্তুর তৈরি দেহ নেই, তারা কীভাবে ভাব বিনিময় করে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কু’রআনে যখনি ফেরেশতা এবং জিনদের সম্পর্কে কিছু পড়বেন, চেষ্টা করবেন তারা ‘মানুষের মতো’—এমন কোনো কিছুর কল্পনা না করতে। যেমন, সাদা আলখাল্লা পড়া, হাত-পা-মাথা বিশিষ্ট, পাখির মতো দুটি পাখা এবং মানুষের দেহের মতো দেহধারী একদল ফেরেশতা, হাঁটু গেড়ে বসে আদম (আ) এর সামনে মাটিতে মাথা রেখে, তাকে সিজদা করছে—এধরনের কল্পনা করবেন না। এগুলো সব খ্রিস্টান চিত্রকরদের কল্পনার ফসল, যেগুলো দেখতে দেখতে মুসলিমদের কল্পনাও দূষিত হয়ে গিয়েছে।

পুনশ্চ: শয়তান কীভাবে আমাদেরকে প্রভাবিত করে এবং আমাদেরকে বুঝতে না দিয়ে কীভাবে আস্তে আস্তে খারাপ পথে নিয়ে যায়, সে বিষয়ে জানতে এই আর্টিকেলটি পড়তে পারেন—আমার সবচেয়ে বড় শত্রু

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—


ডাউনলোড করুন কুর‘আনের কথা অ্যাপ

8 thoughts on “সে অস্বীকার করেছিল, অহংকার করেছিল — বাকারাহ ৩৪”

  1. পড়ালেখা করতে করতে জীবনের প্রায় অর্ধেক সময় শেষ করে ফেললাম, অথচ মৌলিক জিনিসগুলাই আজ পর্যন্ত ঠিকভাবে জানলাম না। কুরআন শরীফের বিস্তারিত তাফসির জানা ও বোঝাটাই সত্যিকারের জ্ঞ্যান সাধনা। আরেকটা ভীতিকর ব্যাপার হলঃ আমাদের যদি ইসলাম এর এমন মাহাত্যপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে এখনো এমন ঘোলা ঘোলা ধারনা থেকে থাকে তাহলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কি হবে?

  2. আপনার লেখাটির একেবারে শেষে তথ্যসূত্রাবলীর একটি তালিকা দিয়েছেন এভাবেঃ

    [১] নওমান আলি খানের সূরা বাকারাহ এর উপর লেকচার।
    [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
    [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
    [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
    [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
    [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
    [৭] মিরযা বাশির উদ্দিনের তাফসীর — ভুলেও পড়বেন না, কারণ তার তাফসীরে আহমেদীয়া গোত্রের আক্বিদা প্রচার করা হয়েছে।

    একেবারে শেষের যে সূত্রটি [৭] সেটি কাফের কাদিয়ানী সম্প্রদায় বা তথাকথিত “আহমাদীয়া মুসলিম জামাত” এর ওয়েব সাইট। আমি জানি কাদিয়ানীদের তথ্যসূত্র সর্বতঃভাবে প্রত্যাখ্যাত এবং পরিত্যাজ্য। কোন মুসলমানের জন্যই সেটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। আল্লাহ ভালো জানেন, তবে আমার কাছে প্রতিয়মান হচ্ছে আপনি অত্যন্ত সুকৌশলে কাদিয়ানী প্রচারণা চালিয়ে নিচ্ছেন। আল্লাহ ভালো জানেন…

    1. কাদিয়ানী/আহমেদিয়া, শিয়া এদের সাথে আমাদের সমস্যা আক্বিদায়। আমি তাদের আরবি ভাষা বিশ্লেষণের একটা উদাহরণ দিয়েছি মাত্র। আমরা যে আরবি ভাষা অনুসরণ করি, সেটা তারাও অনুসরণ করে। ভাষা, বিজ্ঞান, গণিত — এসব নিয়ে আমাদের সাথে তাদের বিরোধ নেই। বিরোধ শুধু আক্বিদায়।

      কাদিয়ানী/আহমেদিয়া এবং শিয়া—এদের আক্বিদার সমস্যা নিয়ে একটা আর্টিকেল আছে—
      http://quranerkotha.com/baqarah-4/

      1. জ্বী ভাইয়া, পদার্থ বিজ্ঞানের বিশেষায়িত কোন ব্যাপারে কাদিয়ানী বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম এর কোন কাজকে অবশ্যই আমরা বিবেচনায় নিতে পারি, এতে আমাদের মোটেও আপত্তি থাকার কথা নয়। এমনকি আরবী ভাষা বা সাহিত্যের কোন কাজ মূল্যায়নেও আরবী ভাষা-সাহিত্যে পন্ডিত কোন অনারব কাদিয়ানীর বক্তব্য গ্রহণ করতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু কোর’আন বিশ্লেষণে, কোর’আনিক ভাষা বিশ্লেষনে কক্ষনো নয়!! কাদিয়ানীরা ইসলামের যতোটুকু বিকৃতি ঘটিয়েছে তা’র সবটুকুই তারা ঘটিয়েছে কোর’আনের এই ভাষার মনগড়া অর্থ আর কৌশলী বিশ্লেষণের মার-প্যাঁচের মাধ্যমে।

        তা’ ছাড়া, এই বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের কাজকে প্রামাণ্য সুত্র হিসেবে উল্লেখ করার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে প্রকারান্তরে গ্রহণযোগ্যতা দান করছেন, স্বীকৃতি দান করছেন। তাই নয় কী ভাই??

        1. আমি যে উদাহরণটা দিয়েছি, সেটা আমার একমাত্র ইংরেজিতে পাওয়া আরবি ক্বালা শব্দের বিশ্লেষণ। বাকি যা কিছু খুঁজে পেলাম, সব আরবিতে লেখা, যেটা অনেকেই পড়ে বুঝতে পারবে না। আপনি উদাহরণটা আরেকবার দেখুন। সেটি একটি আরবি কবিতার উদাহরণ। কোনো কু’রআনের বিশ্লেষণ নয়, কোনো আক্বিদার ব্যাপার নয়—যেখানে তাদের সাথে আমাদের মতপার্থক্য রয়েছে। শুধুই একটি আরবি কবিতায় একটি আরবি শব্দ ব্যবহারের উদাহরণ।

          আপনি যদি ক্বালা শব্দের ব্যবহার কোনো ইংরেজি বা বাংলা আর্টিকেলে পান, তাহলে আমাকে দিলে খুশি হবো। আমি তখন রেফারেন্সটা পালটিয়ে দিবো। সমস্যা হচ্ছে আরবি আর্টিকেল ছাড়া কিছু পাচ্ছিনা যেটা সুন্নিদের লেখা।

          1. আলহামদুলিল্লাহ, ভাই, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
            আমি নিজে আরবী না জানা মানুষ। আর কোন বিচারেই ভালো মুসলমান নই। আপনার সাথে কথা বলেছি শুধুমাত্র আক্বীদার অবস্থান থেকে। আপনার লেখা গুলো মা-শা-আল্লাহ খুবই চমৎকার এবং জ্ঞান ভিত্তিক। আশাকরছি এখন দ্বিধামুক্তভাবে আপনার লেখাগুলো শেয়ার করতে পারবো ইন-শা-আল্লাহ।
            উপরোক্ত কথোপোকথনে আমার দ্বারা ব্যাক্তিগত আঘাতের কোন কারণ ঘটে থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

  3. মাশা-আল্লাহ্‌ আপনার প্রত্যেকটি লেখা-ই তথ্য সমৃদ্ধ। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *