আল্লাহর কাছ থেকে তোমাকে রক্ষা করার জন্য তুমি কাউকে পেতে না — আল-বাক্বারাহ ১২০

ইহুদি, খ্রিস্টানরা রাসুল মুহাম্মাদ عليه السلام-কে মানুষ হিসেবে বেশ পছন্দই করতো। তারা জানতো: তিনি একজন সৎ, বিনয়ী মানুষ, কোনো অন্যায় করেন না, ধনী-গরিব পার্থক্য করেন না। এমনকি তারা রাসুলের عليه السلام কাছে নিজেদের সম্পদ আমানত হিসেবেও রেখে যেত। সবদিক থেকে তারা রাসুলকে عليه السلام একজন অনুসরণ করার মত আদর্শ মানুষ হিসেবেই মানতো। তাদের বক্তব্য ছিল: লোকটা ভালোই ছিল, শুধু নিজেকে নবি বলে দাবি না করলেই পারতো। তাহলে আমাদের আর কোনো সমস্যা ছিল না।

2_120

ইহুদি নাসারারা কখনই তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তাদের মতবাদ অনুসরণ করছ। বলে দাও, “আল্লাহর تعالى পথনির্দেশ একমাত্র সঠিক পথনির্দেশ।” তোমার কাছে এই জ্ঞান আসার পরেও তুমি যদি তাদের ইচ্ছাকে মেনে চলতে চাইতে, তাহলে আল্লাহর تعالى কাছ থেকে তোমাকে রক্ষা করার জন্য তুমি কাউকে পেতে না, কোনো সাহায্যকারীও না। [আল-বাক্বারাহ ১২০]

sandstorm

এখানেই বিধর্মীদের সাথে আমাদের সমস্যা। আমরা যতই ভালো মানুষ হই, তারা আমাদের কথা, কাজ, গুণের যতই প্রশংসা করুণ না কেন, শেষ পর্যন্ত গিয়ে একটা ব্যাপারে তাদের অনেকেই আমাদের সাথে কোনো আপোষ করবে না, সেটা হলো ইসলাম। আমরা তাদের সাথে যতই ওঠাবসা করি, একসাথে পড়ালেখা করি, চাকরি-ব্যবসা করি, ছুটি কাটাতে বেড়াতে যাই, যখনি রাসুলের عليه السلام শেষ নবি হওয়ার কথা আসবে, বা আল্লাহ تعالى একমাত্র উপাসনার যোগ্য প্রভু দাবি করা হবে, তখন তাদের অনেকেই তাদের ধর্মের শিক্ষার ব্যাপারে একদম কঠোর অবস্থান নেবে এবং আমাদের সাথে কোনো আপোষ করবে না।

মেরুদণ্ডহীন মুসলিমরা হিন্দুদের বিয়ের রীতিনীতি অনুসরণ করে বিয়ে করলেও, হিন্দুদেরকে কখনো দেখবেন না মুসলিমদের রীতিনীতি অনুসরণ করে বিয়ের অনুষ্ঠান করতে। কুপমন্ডক মুসলিমদেরকে ক্রিস্টমাসে যীশুর জয়গানে অংশগ্রহণ, হ্যালোইন উদযাপন করতে দেখলেও, খ্রিস্টানদেরকে কখনো দেখবেন না ঈদ-উল-আযহায় কুরাবানি করে গরিবদের খাওয়াতে। যখনি মুসলিমরা এমন কিছু করবে, যেটা শুধু ইসলামেই রয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে নেই, তখনি অন্য ধর্মের লোকেরা, বিশেষ করে ইহুদি, খ্রিস্টানরা, যারা তাদের ধর্মের ব্যাপারে কিছুটা হলেও জানে, তারা অনেকেই আর মুসলিমদের ধারে কাছেও ঘিরবে না। তারা ঠিকই তাদের ধর্মের ব্যাপারে যথেষ্ট কঠোর।

সমস্যা হচ্ছে সাধারণ মুসলিমদেরকে নিয়ে, যারা কোনো পশ্চিমা হুজুগ পেলেই গা ভাসিয়ে দেয়। সেই হুজুগ ইসলামের শিক্ষার বিরুদ্ধে গেল কিনা, তা নিয়ে তারা মাথা ঘামায় না। হাজার হোক: পশ্চিমারা করছে না? ওরা তো সবদিক থেকে উন্নত। ওরা যা করবে আমরাও তাই করবো। আমাদেরকে সবদিক থেকে ওদের মত হতে হবে না? আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে ওরা চাবুক দিয়ে ওদের চাকর বানিয়ে রেখেছিল। এবার আমরা নিজেরাই ওদের চাকর হয়ে যাবো, চাবুক লাগবে না।

আল্লাহ تعالى আমাদেরকে এই আয়াতে বলছেন, এরকম কাপুরুষ মুসলিম না হয়ে বল—

“আল্লাহর تعالى পথনির্দেশ একমাত্র সঠিক পথনির্দেশ।”

আমরা যদি ইসলাম মেনে গর্ব বোধ না করি, তখন পার্টিতে গেলে খ্রিস্টান বন্ধু গায়ে পড়ে একটু ড্রিঙ্ক করার জন্য অনুনয় বিনয় করলেই, “থাক না, একরাতই তো” ভেবে হাসিমুখে গ্লাসের দিকে হাত বাড়িয়ে দেব। যদি আমাদের মধ্যে আল্লাহর تعالى প্রতি কোনো সন্মান না থাকে, তখন হ্যালোইনের রাতে বন্ধুরা ফোন করে আসতে বললেই সুড়সুড় করে বেরিয়ে যাবো। ছেলে পক্ষ থেকে গম্ভীর স্বরে, “ভাইসাহেব, বিয়েতে কিন্তু নাচের-গানের আসর থাকতেই হবে। আপনার কথা মত মসজিদে কাবিন করছি। এবার আমাদের কথা রাখতে হবে।” — এই ধমক শুনে ফ্যাঁকাসে হেসে “জ্বি, বিয়াই সাহেব” বলে রাজি হয়ে যাবো। ইসলামের শিক্ষা আমাদের কাছে আসার পরেও আমরা যখন এমন ভুল কাজ করি, সেটা আল্লাহর تعالى কাছে এতটাই অপছন্দের যে, তিনি এক ভয়ঙ্কর সাবধানি দিয়েছেন—

তোমার কাছে এই জ্ঞান আসার পরেও তুমি যদি তাদের ইচ্ছাকে মেনে চলতে চাইতে, তাহলে আল্লাহর تعالى কাছ থেকে তোমাকে রক্ষা করার জন্য তুমি কাউকে পেতে না, কোনো সাহায্যকারীও না।

তবে একটা ব্যাপার লক্ষ্য রাখতে হবে: এখানে আল্লাহ تعالى মোটেও বলছেন না যে, আমরা যেন বিধর্মীদের সাথে ধর্মীয় ব্যাপারে আপোষ না করতে গিয়ে, তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা বন্ধ করে দেই। বরং বিধর্মীদের সাথে ভালো কাজে অংশগ্রহণ, অন্যায় প্রতিরোধে সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার সরাসরি নির্দেশ কু’রআনে রয়েছে—

لَّا يَنْهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمْ يُقَٰتِلُوكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓا۟ إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ

ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সুন্দর আচরণ ও ন্যায় বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেননি। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বানদের ভালবাসেন। [আল-মুমতাহানাহ ৬০:৮]

তাদের সাথে সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বিপদে এগিয়ে যাওয়া, এগুলো মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু যখনি এরকম কোনো পরিস্থিতি আসবে যেখানে আমাদেরকে ইসলামের নির্দেশ অমান্য করে তাদের জন্য কিছু করতে হবে, তখন আমাদেরকে ইসলামের নির্দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে, কোনো ধরনের আপোষ করা যাবে না। আমাদের অবস্থান তাদেরকে পরিষ্কার করে দিতে হবে—

۞ وَلَا تُجَٰدِلُوٓا۟ أَهْلَ ٱلْكِتَٰبِ إِلَّا بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ إِلَّا ٱلَّذِينَ ظَلَمُوا۟ مِنْهُمْ ۖ وَقُولُوٓا۟ ءَامَنَّا بِٱلَّذِىٓ أُنزِلَ إِلَيْنَا وَأُنزِلَ إِلَيْكُمْ وَإِلَٰهُنَا وَإِلَٰهُكُمْ وَٰحِدٌ وَنَحْنُ لَهُۥ مُسْلِمُونَ

আহলে কিতাবের (ইহুদি, খ্রিস্টান) মানুষদের সাথে সুন্দরভাবে ছাড়া যুক্তিতর্ক করবে না। তবে যারা অন্যায় করে, তাদের কথা আলাদা। বল, “আমরা বিশ্বাস করি যা আমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে, এবং যা তোমাদের উপর অবতীর্ণ হয়েছে; আমাদের এবং তোমাদের উপাস্য প্রভু একই সত্তা, আমরা তাঁরই প্রতি নিজেদেরকে সমর্পণ করি।” [আল-আনকাবুত ২৯:৪৬]

এই দুনিয়াতে আমরা ইহুদি, খ্রিস্টানদের সাথে হাতে হাত মিলিয়ে শিক্ষা, প্রযুক্তি, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারি, সেটাতে কোনো বাঁধা নেই। তারা যখন কোনো স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল বানানোর উদ্যোগ নেয়, তখন আমরা তাদের সাথে আমাদের লোকবল, অর্থ দিয়ে সাহায্য করতে পারি। সমাজের অসহায়, গরিব, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাদের দাতা সংগঠনগুলো যখন আমাদের কাছে সাহায্য চায়, আমরা অবশ্যই সাহায্য করতে পারি। শুধু আমাদেরকে এটাই মনে রাখতে হবে যে, এই দুনিয়াতে আমরা তাদের সাথে যতই একমত হই, সহমর্মিতা দেখাই, আখিরাতে তাদের এবং আমাদের পথ হবে আলাদা—

وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ ٱلْإِسْلَٰمِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِى ٱلْءَاخِرَةِ مِنَ ٱلْخَٰسِرِينَ

যদি কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কিছুকে ধর্ম হিসেবে নেওয়ার চেষ্টা করে, সেটা তার কাছ থেকে কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না। সে আখিরাতে সর্বহারাদের একজন হয়ে যাবে। [আলে-ইমরান ৩:৮৫]

আমরা যারা হিন্দু প্রতিবেশীদের সাথে সুন্দর সম্পর্ক রাখতে গিয়ে তাদের পূজার প্রসাদ হাসিমুখে খেয়ে ফেলি, তাদের বলা উচিত, “দাদা মাফ করবেন। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে উৎসর্গ করা খাবার আমাদের জন্য হারাম। আপনি জানেন: হালাল খাবার যে হালাল-নয় এমন খাবার থেকে বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি স্বাস্থ্যকর?” আবার যারা খ্রিস্টান প্রতিবেশীর কাছ থেকে শুভকামনা: “যীশু আপনার মঙ্গল করুক” শুনে হাসিমুখে ‘আমেন’ বলেন, তাদের বলা উচিত, “আল্লাহ تعالى যীশুর মঙ্গল করুক। আল্লাহ تعالى ছাড়া আর কেউ কাউকে রক্ষা করতে পারে না ভাই। আপনার অফিসের চেয়ারম্যান যদি কাউকে চাকরি থেকে বের করে দেন, কোনো ম্যানেজার কি পারবে আপনাকে চাকরিতে রাখতে?”

আমরা অনেকেই মনে করি: এধরনের বিপরীত অবস্থান নিলে তারা আবার কী মনে করেন? আমরা যদি “শিরক! কুফরী! সব জাহান্নামী!” —এরকম না করে, সুন্দর মার্জিত ভাবে আমাদের অবস্থান যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেই, তাহলে হতে পারে তারা আমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে আরও দুচারটা প্রশ্ন করবে এবং আমরা দাওয়াহ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যাবো। আমাদের কাছ থেকে ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে হয়তো একদিন তারা মুসলিমও হয়ে যেতে পারে। এভাবে আমরা তাদের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে জাহান্নামে চলে না গিয়ে, বরং তাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে নিজেদের জান্নাতে যাওয়ার পথ সহজ করে ফেলতে পারি। হাজার হোক, আল্লাহ তাদেরকে আমাদের জীবনে দিয়েছেন দেখার জন্য যে, আমরা কি তাদেরকে ইসলামের পথে ডাকি, নাকি ইসলাম নিয়ে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা মুসলিমদের মত চক্ষুলজ্জায় ইসলাম সম্পর্কে তাদেরকে কখনো কিছু না বলার চেস্টা করি।

[বিস্তারিত দেখুন: শায়খ আল-মুনাজ্জিদ-এর ফাতওয়া: http://islamqa.info/en/26721]

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—


ডাউনলোড করুন কুর‘আনের কথা অ্যাপ

One thought on “আল্লাহর কাছ থেকে তোমাকে রক্ষা করার জন্য তুমি কাউকে পেতে না — আল-বাক্বারাহ ১২০”

  1. খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা, ভাল লাগলো,

    “হাজার হোক, আল্লাহ তাদেরকে আমাদের জীবনে দিয়েছেন দেখার জন্য যে, আমরা কি তাদেরকে ইসলামের পথে ডাকি, নাকি ইসলাম নিয়ে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা মুসলিমদের মত চক্ষুলজ্জায় ইসলাম সম্পর্কে তাদেরকে কখনো কিছু না বলার চেস্টা করি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *