আমি অবশ্যই তোমাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছি — আল-বাক্বারাহ ১১৯

আজকাল অনেক মসজিদে জুম্মার খুতবায় বা হালাক্বাগুলোতে আলোচনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকে: আমরা কত খারাপ, কত ভুল করছি, কীভাবে আমাদের চামড়া বার বার পুড়িয়ে কাবাব বানানো হবে, অমানুষিক ভাবে পিটানো হবে, গলার মধ্যে গরম পানি ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হবে, আমাদের সব কষ্টের কারণ হচ্ছে ধর্ম না মানা ইত্যাদি নানা ধরনের হতাশাকর, নির্মম কথাবার্তা। প্রতি শুক্রবার কোনোমতে বাবা-মা, স্ত্রীর ধাক্কায়, না হলে ‘লোকে কী বলবে’ এই ভয়ে মসজিদে মানুষ যাও বা যায়, কিন্তু গিয়ে এমন সব হতাশাকর, বিরক্তিকর কথাবার্তা শুনতে থাকে যে, তখন মানুষের মনে শুধু একটাই চিন্তা আসে: কখন এই লোকটা চুপ করবে, কখন নামাজ শুরু হবে, আর কত তাড়াতাড়ি আমি বাড়ি ফিরে যাবো।

এমনিতেই মানুষের জীবন যথেষ্ট সংগ্রামের, কষ্টের, হতাশার। সপ্তাহে ছয় দিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় শুক্রবার মসজিদে গিয়ে আরো হতাশাকর কিছু কথাবার্তা শুনে বিমর্ষ মনে আমরা ঘরে ফিরি। আজকাল কিশোর-তরুণরা যে বাংলা খুতবা শুরু হলেই মোবাইল ফোন নিয়ে বসে পড়ে, তার জন্য তাদেরকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। দোষ হচ্ছে সেই খাতিবের, যার কথাবার্তার মধ্যে এমন কিছুই নেই, যা তাদেরকে আকর্ষণ করতে পারে।

নামাজ শুরুর ১০ মিনিট আগে সিংহভাগ মানুষ যে মসজিদে ঢোকে, সেটা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: আমরা কী নির্মমভাবে বিফল হয়েছি সঠিকভাবে মানুষকে দাওয়াহ দিতে। গানের কনসার্টে মানুষ ঘণ্টাখানেক আগে যায়, যেন সামনের সারিতে জায়গা পাওয়া যায়, শিল্পীদেরকে নিজের চোখে কাছ থেকে দেখা যায়। আর মসজিদে মানুষ যায় একদম শেষ মুহূর্তে, তারপর জুতা রাখার জায়গায়, না হয় বের হওয়ার গেটের কাছে বসার জন্য ধাক্কাধাক্কি লেগে যায়, যেন নামাজ শেষে সবার আগে বের হয়ে যাওয়া যায়।

কুরআনে বার বার বলা হয়েছে: নবি, রাসুল হচ্ছেন মানুষের জন্য সুখবরের বাহক এবং সাবধানকারী। بَشِير বাশিরুন (সুখবরের বাহক) এবং نَذِير নাযিরুন (সাবধানকারী) একসাথে কমপক্ষে ২০ বার কুরআনে এসেছে, যার মধ্যে ১৫ বারই প্রথমে বাশিরুন (সুখবরের বাহক) বলা হয়েছে। নবি-রাসুলরা আগে একজন সুখবরের বাহক, পরে একজন সাবধানকারী। কিন্তু আজকাল আমাদের দাওয়াহ দেওয়ার পদ্ধতি হয়ে গেছে: প্রথমে ১ ঘন্টা সমাজের, দেশের গুষ্টি উদ্ধার, পরে ১০ মিনিট কিছু আশার কথা।

2_119

আমি অবশ্যই তোমাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছি, সুখবরের বাহক এবং সাবধানকারী হিসেবে। তোমাকে আগুনের সাথীদের ব্যাপারে জবাব দিতে হবে না। [আল-বাক্বারাহ ১১৯]

আয়াতের শুরুতে আল্লাহ تعالى বলছেন, “আমি অবশ্যই তোমাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছি।” কু’রআন কোনো মেটাফিজিক্স বা ফিলসফির উপর বই নয় যে, এখানে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা মানুষের অনুমান এবং যুক্তির উপর নির্ভর করে থিওরির পর থিওরি লেখা আছে এবং যার ভূমিকাতে লেখক আগেভাগেই বলে দেন, “আমার কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।” কু’রআন অকাট্য সত্য —এই ঘোষণা করতে আল্লাহ تعالى দ্বিধাবোধ করেন না।

Quran

আজকাল সুধীবৃন্দরা দাবি করেন, “তোমাদের ইসলাম একটা অসহনশীল, বর্বর ধর্ম। তোমরা দাবি করো যে, ইসলাম হচ্ছে একমাত্র সঠিক ধর্ম, আর অন্য সব ধর্ম সব ভুল। আমি মনে করি এরচেয়ে অমুক ধর্ম অনেক সহনশীল, সুন্দর, কারণ সেই ধর্ম অন্য ধর্মগুলোকে এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে না। ”

—এর উত্তর খুব সহজ: প্রথমত, হ্যা, ইসলাম দাবি করে যে, ইসলাম হচ্ছে একমাত্র সঠিক ধর্ম এবং বাকি সব ধর্ম তার আসল রূপ থেকে বিকৃত হয়ে গেছে, যার কারণে সেগুলো আর মানা যাবে না। দ্বিতীয়ত, খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মও সেটাই দাবি করে, এমনকি হিন্দু ধর্মও একই দাবি করে, যেখানে খোদ কৃষ্ণই সেই কথা বলেছেন ভগবৎ গীতায়। [দেখুন: প্রমাণ দেখাও, যদি সত্যি বলে থাকো — আল-বাক্বারাহ ১১১-১১২]

তৃতীয়ত, যদি কোনো ধর্ম না দাবি করে যে, সে একমাত্র সঠিক ধর্ম, কারণ বাকি সব ধর্ম বিকৃত হয়ে গেছে, তার মানে দাঁড়ায়: সৃষ্টিকর্তা সেই ধর্ম পাঠিয়েছেন এমনিতেই সময় কাটানোর জন্য। তিনি বসে বসে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন, তাই তিনি নতুন একটা কিছু করার জন্য প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে, বিপুল পরিমাণ মানুষের সময় খরচ করে, অনেক মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে এমন একটা নতুন ধর্ম পাঠালেন, যেটা না মানলেও কোনো সমস্যা নেই, কারণ আগের ধর্মগুলো তো ঠিকই আছে। অন্য ধর্মের লোকরা সব সৎ পথেই আছে এবং স্বর্গেও যাবে। তাই এই নতুন ধর্মটা যদি কেউ মানে তো ভালো, না মানলেও কোনো সমস্যা নেই।

“সুখবরের বাহক”

নবি-রাসুল হচ্ছে بَشِير বাশিরুন: সুখবরের বাহক। একজন ধর্ম প্রচারকের প্রথমে সুখবর প্রচার করা উচিত। আমরা যদি খ্রিস্টান পাদ্রিদের দেখি, দেখব যে, তারা তাদের ধর্ম প্রচার করার জন্য যে পদ্ধতিটি অনুসরণ করেন, তা যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক। তারা যীশুর ব্যাপারে চমৎকার সব কথা বলেন, কীভাবে যীশু মানুষের সব পাপ নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন, কীভাবে তার ত্যাগের বিনিময়ে মানুষ আজকে পাপমুক্ত, কীভাবে তিনি তার অনুসারীদেরকে পরম ভালবাসায় স্বর্গে নিয়ে যাবেন ইত্যাদি নানা ধরনের পজেটিভ কথায় তারা মুখর। তাদের বাণী যতই ভুল হোক না কেন, একজন খ্রিস্টান ঠিকই রবিবারে চার্চে গিয়ে পাদ্রির বক্তব্য শুনে হাসিমুখে শান্তি নিয়ে ফিরে আসেন। তিনি সপ্তাহের বাকি ছয় দিন অপেক্ষা করে থাকেন: কবে আবার রবিবার আসবে, চার্চে গিয়ে আবার সুন্দর কিছু কথা শোনা যাবে।

একইভাবে আমরা যদি আজকে বাংলাদেশে খ্রিস্টান মিশনারিরদের কাজ দেখি, লক্ষ্য করলে দেখা যায়: তারা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ সবাইকে যেভাবে দাওয়াত দিচ্ছেন, তা খুবই কার্যকর পদ্ধতি। তাদের কথা ভর্তি থাকে আশার বাণী, ভালবাসার কথা, ক্ষমার কথা, সুন্দর জীবনের কথা। এইসব কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে হাজারে হাজারে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ আজকে খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছেন। তারা এমন সব মানুষদেরকে টার্গেট করেন, যাদের জীবনটা থাকে চরম দুর্বিষহ, অভাবে, অবহেলায়, সমাজের আবর্জনা হয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থেকে তারা হাঁপিয়ে উঠেছেন। এই অবস্থায় কিছু আশার কথা, ভালবাসার কথা তাদের জীবনটা বদলে দিতে পারে। যেহেতু মসজিদের ইমামের কাছ থেকে তারা আশার কথা, ভালবাসার কথা শোনেন না, তখন ঠিক সেই সুযোগটাই পাদ্রিরা নিয়ে নেন।

খ্রিস্টান পাদ্রিদের হাজার বছরের এই অত্যন্ত সফল পদ্ধতি এমনিতেই আসেনি। সাইকোলজিতে বইয়ের পর বই লেখা হয়েছে কীভাবে মানুষকে সুন্দর, পজেটিভ কথা বলে কাছে ডাকতে হয়। পাদ্রিদেরকে বিশেষভাবে ট্রেইনিং দেওয়া হয়: কীভাবে মানুষের মন জয় করতে হয়। “ইসলাম মানলে মানো, নাইলে তোমার কপালে খারাবী আছে” — এই ধরনের মানসিকতা নিয়ে তারা অনেক মুসলিম দাঈদের মত দাওয়াত দেন না।

২০১৪ সালের মার্চ মাসে একটি গবেষণা করা হয়: ভালো এবং মন্দ খবর আগে বা পরে দিলে মানুষের মধ্যে কী ধরনের প্রভাব পড়ে।  গবেষণায় দেখা যায়: মানুষকে যখন আগে মন্দ খবর দেওয়া হয়, সমালোচনা করা হয় এবং শেষে ভালো খবর দেওয়া হয়, প্রশংসা দেওয়া হয়, তাহলে সে নিজেকে পরিবর্তন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বেশ কয়েকজন মানুষের উপর পরীক্ষা করে দেখা গেল: যখন মানুষকে আগে খারাপ খবর দেওয়া হলো, সমালোচনা করা হলো এবং শেষে ভালো খবর এবং প্রশংসা করা হলো, তারপর তাদেরকে যখন কিছু ভিডিও দেখতে বলা হয়, যেখানে তার আচরণ, চিন্তাভাবনা পরিবর্তন করার উপদেশ থাকে, তারা সেই ভিডিওগুলো অপেক্ষাকৃত কম দেখে। তারচেয়ে বরং যাদেরকে আগে ভালো খবর দেওয়া হয়, প্রশংসা করা হয় এবং শেষে মন্দ খবর দেওয়া হয়, সমালোচনা করা হয়, তারা সেই ভিডিওগুলো দেখে নিজেকে পরিবর্তন করতে বেশি সচেতন হয়[২৫৯] এই গবেষণা থেকে এই উপসংহারে পৌঁছানো হয়: যদি মানুষের আচরণ পরিবর্তন করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে মানুষকে আগে ভালো খবর, প্রশংসা দেওয়ার পর শেষ করতে হবে খারাপ খবর, সমালোচনা দিয়ে। তাহলে মানুষের মধ্যে সতর্ক ভাবটা থেকে যাবে এবং সে নিজেকে পরিবর্তন করতে বেশি চেষ্টা করবে[২৫৯]

একারণেই কু’রআনে আগে বাশিরুন (সুখবরের বাহক) এবং পরে নাযিরুন (সাবধানকারী) এসেছে। মানুষের ভালো জিনিস শোনার প্রতি আগ্রহ সবসময় বেশি থাকে। তাকে প্রথমে আগ্রহী করতে হবে, তারপর তাকে বলতে হবে তার ভেতরে কী পরিবর্তন আনা দরকার।

সাইকোলজিস্ট এবং নিউরোসাইন্টিস্টরা মানুষের মস্তিষ্ক এবং ইমেইল স্ক্যান করে আবিষ্কার করেছেন: বৈজ্ঞানিক, উত্তেজনাকর, এবং হাসির আর্টিকেল মানুষ ইন্টারনেটে সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। তার তুলনায় দুর্যোগের বা নেগেটিভ আর্টিকেল অনেক কম ছড়ানো হয়। মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি আছে অন্যের কাছে ভালো, খুশির খবর ছড়ানোর[২৫৮]

সাইকোলজিস্ট John Gottman খুঁজে পেয়েছেন যে, সুস্থ দাম্পত্য জীবনের জন্য স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পজেটিভ এবং নেগেটিভ কথা এবং কাজের অনুপাত থাকতে হবে ৫:১। অর্থাৎ একটি সমালোচনা, খারাপ কথা বা কাজের সাথে কমপক্ষে পাঁচটি প্রশংসা, ভালো কথা বা কাজ করতে হবে। তাহলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক সুন্দর থাকবে। যদি এই অনুপাত মেনে না চলা হয়, তাহলে সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। এটা দুই দিকেই হয়। বেশি আহ্লাদ দিলে স্বামী বা স্ত্রী যেমন অতিরিক্ত আশা করতে থাকে, কিছু মনের মত না হলে চরম প্রতিক্রিয়া দেখায়, একই ভাবে কম পজেটিভ কথা বা কাজ করলেও সম্পর্কে ফাটল ধরতে থাকে, নিজেদের মধ্যে বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়, অল্পতেই ঝগড়া শুরু হয়[২৫৮]

আমরা উপমহাদেশের স্বামীরা কোনো কারণে স্ত্রীদেরকে কোনো ভালো কথা, প্রশংসা করতে গেলে বুক জ্বালাপোড়া করে, চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, মুখ শুকিয়ে যায়। কোনোভাবে যদি একটা ভালো কথা বলেও ফেলি, সাথে সাথে আরও পাঁচটা বদনাম, সমালোচনা করে সেটা উসুল করে নেই। স্ত্রীদের সাথে আমাদের আজকে যে করুণ সম্পর্ক, সেটাকে ঠিক করার জন্য আমাদেরকে এই ভালো খারাপ কথার ৫:১ অনুপাত মেনে চলতে হবে।

শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই নয়, এই অনুপাতটি সন্তানদের বেলায়ও মেনে চলতে হবে। সন্তানদের একটা বকা, সমালোচনা করলে, সাথে ৫টা প্রশংসা, ভালো কথা বলতে হবে। তাহলেই সন্তানের সাথে বাবা-মা’র সম্পর্ক সুন্দর হবে, বাবামা’র কথা শুনতে আগ্রহী হবে, নিজেকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করবে।

কু’রআনে সুখবর কোথায়?

সুধীবৃন্দরা প্রশ্ন করেন, “কু’রআন ভর্তি যত সব শাস্তি, ধমক, মারামারি, বনি ইসরাইলের গুষ্টি উদ্ধার। কু’রআনে ভালো কথা, সুখবর কোথায় দেখলেন?”

কু’রআনে কমপক্ষে ৭৫০টি আয়াত রয়েছে যেগুলোতে আল্লাহ تعالى প্রকৃতি, বিজ্ঞান নিয়ে আমাদেরকে বলেছেন। কু’রআনের প্রায় আট ভাগের এক ভাগ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বিজ্ঞান সম্পর্কিত। প্রায় ২৫০টি আয়াতে মুসলিমদেরকে কীভাবে জীবন যাপন করতে হবে তা নিয়ে বলা হয়েছে[২৬০] কমপক্ষে ২০০টি আয়াতে কীভাবে আমাদেরকে দয়া, করুণা, সহমর্মিতা নিয়ে পরিবার এবং মানুষের সাথে থাকতে হবে, তা নিয়ে বলা হয়েছে। কমপক্ষে ৭৭টি আয়াতে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে। কমপক্ষে ১০০টি আয়াতে সুন্দর ব্যবহার, নৈতিকতা শেখানো হয়েছে। কমপক্ষে ৫১৩টি আয়াতে নবিদের কথা বলা হয়েছে।[২৬১] কু’রআনে মাত্র ৫০০টি আয়াতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাহান্নামের কথা বলা হয়েছে, যা কু’রআনের মাত্র ৮% অংশ।  এরপরেও কেউ যদি দাবি করে কু’রআনে ভালো কথা নেই, শুধুই হতাশার কথা, তাহলে সমস্যা তাদের অন্তরে। তারা নিজেরা একবার কু’রআন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়লেই বুঝতে পারবেন কু’রআনে পজিটিভ আয়াতের কোনো অভাব নেই।

কু’রআনে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে অনেক সুখবর দিয়েছেন—

আশার বাণী

قُلْ يَٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسْرَفُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا۟ مِن رَّحْمَةِ ٱللَّهِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ

বল, “ও আমার বান্দারা, তোমরা যারা সীমালঙ্ঘন করে নিজেদেরকে নষ্ট করেছ, আল্লাহর تعالى রহমতের উপর নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ تعالى সব পাপ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি সত্যিই অত্যন্ত ক্ষমাশীল, নিরন্তর দয়ালু।” [আজ-জুমার ৩৯:৫৩]

وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجْعَل لَّهُۥ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ ۚ وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُۥٓ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ بَٰلِغُ أَمْرِهِۦ ۚ قَدْ جَعَلَ ٱللَّهُ لِكُلِّ شَىْءٍ قَدْرًا

যে আল্লাহর تعالى প্রতি সবসময় সচেতন থাকবে, আল্লাহ تعالى তার জন্য একটা পথ বের করে দেবেনই এবং তার জন্য এমন সব জায়গা থেকে রুজির ব্যবস্থা করে দেবেন, যা সে চিন্তাও করতে পারবে না। যে আল্লাহর تعالى উপর ভরসা রাখে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। অবশ্যই আল্লাহ تعالى তাঁর উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবেনই। আল্লাহ تعالى সবকিছুর জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ করেছেন। [আত্ব-ত্বালাক্ব ৬৫:২-৩]

وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ

মনে রেখো: তোমার প্রভু কথা দিয়েছেন: যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে আরও বেশি দিতে থাকবোই। [সুরা ইব্রাহিম ১৪:৭]

لَا تَحْزَنْ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَا

দুশ্চিন্তা করো না, আল্লাহ تعالى অবশ্যই আমাদের সাথে আছেন। [সুরা আত-তাওবাহ ৯:৪০]

وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ

তোমরা যেখানেই থাকো, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। [আল-হাদিদ ৫৭:৪]

AllahIsWIthUS

ভালো মানুষদের জন্য সুসংবাদ

إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ وَٱلَّذِينَ هَادُوا۟ وَٱلنَّصَٰرَىٰ وَٱلصَّٰبِـِٔينَ مَنْ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلْيَوْمِ ٱلْءَاخِرِ وَعَمِلَ صَٰلِحًا فَلَهُمْ أَجْرُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

কোনো সন্দেহ নেই, যারা বিশ্বাস করেছে এবং যারা ইহুদী, খ্রিস্টান, সাবিইন — এদের মধ্যে যারা আল্লাহকে এবং শেষ দিনে বিশ্বাস করে এবং ভালো কাজ করে, তাদের পুরস্কার তাদের প্রভুর কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই, তারা কোনো দুঃখ করবে না। [আল-বাক্বারাহ ৬২]

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِ ۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا۟ لِى وَلْيُؤْمِنُوا۟ بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ

যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার ব্যাপারে জিগ্যেস করে: আমি কাছেই আছি! যারা আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দেই। সুতরাং তাদেরকে আমার ডাকে সাড়া দিতে বল, আমার প্রতি বিশ্বাস রাখতে বল, যেন তারা সঠিক পথ পেতে পারে।[আল-বাক্বারাহ ২:১৮৬]

مَن جَآءَ بِٱلْحَسَنَةِ فَلَهُۥ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَآءَ بِٱلسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰٓ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

যে একটি ভালো কাজ নিয়ে আসবে, তার জন্য সে দশগুণ প্রতিদান পাবে। আর যে একটি খারাপ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে শুধুমাত্র তার অনুরূপ প্রতিদান দেওয়া হবে। কারো বিরুদ্ধে কোনো অন্যায় করা হবে না। [আল-আনআম ৬:১৬০]

فَٱذْكُرُونِىٓ أَذْكُرْكُمْ وَٱشْكُرُوا۟ لِى وَلَا تَكْفُرُونِ

সুতরাং, আমাকে মনে রাখো, আমিও তোমাকে মনে রাখবো। আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আর আমাকে কখনো অকৃতজ্ঞতা দেখিয়ো না। [আল-বাক্বারাহ ২:১৫২]

rememberme

সুন্দর উপদেশ

۞ قَوْلٌ مَّعْرُوفٌ وَمَغْفِرَةٌ خَيْرٌ مِّن صَدَقَةٍ يَتْبَعُهَآ أَذًى ۗ وَٱللَّهُ غَنِىٌّ حَلِيمٌ

দান করে তারপর কষ্ট দেওয়ার থেকে ভালো কথা এবং ক্ষমা অপেক্ষাকৃত বেশি ভালো। আল্লাহ تعالى সব সম্পদের মালিক, তিনি অনেক সহ্য করেন। [আল-বাক্বারাহ ২:২৬৩]

وَلَا تَقْتُلُوٓا۟ أَوْلَٰدَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَٰقٍ ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ ۚ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْـًٔا كَبِيرًا

অভাবের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না। আমি তাদের রুজি দেই, যেমন আমি তোমাদের দেই। খবরদার! তাদেরকে হত্যা করা একটি জঘন্য অন্যায়। [আল-ইসরা ১৭:৩১]

নৈতিকতা

যে কোন মানুষের সাথে কথা বলার সময় ভদ্র, মার্জিত ভাবে কথা বলবে – ২:৮৩।
কোনো ভণিতা না করে, ধোঁকা না দিয়ে, যা বলতে চাও পরিস্কার করে বলবে – ৩৩:৭০।
চিৎকার করবে না, কর্কশ ভাবে কথা বলবে না, নম্র ভাবে কথা বলবে – ৩১:১৯।
মনের মধ্যে যা আছে সেটাই মুখে বলবে– ৩:১৬৭।
ফালতু কথা বলবে না এবং অন্যের ফালতু কথা শুনবে না। যারা ফালতু কথা বলে, অপ্রয়োজনীয় কাজ করে সময় নষ্ট করে তাদের কাছ থেকে সরে যাবে – ২৩:৩, ২৮:৫৫।
কাউকে নিয়ে উপহাস করবে না, টিটকারি দিবে না, ব্যঙ্গ করবে না – ৪৯:১০।
অন্যকে নিয়ে খারাপ কথা বলবে না, কারো মানহানি করবে না – ৪৯:১০।
কাউকে কোনো বাজে নামে ডাকবে না। – ৪৯:১০।
কারো পিছনে বাজে কথা বলবে না – ৪৯:১২।
যাদেরকে আল্লাহ বেশি দিয়েছেন, তাদেরকে হিংসা করবে না, সে যদি তোমার নিজের ভাই-বোনও হয় – ৪:৫৪।
অন্যকে কিছু সংশোধন করতে বলার আগে অবশ্যই তা নিজে মানবে। কথার চেয়ে কাজের প্রভাব বেশি – ২:৪৪।
কখনও মিথ্যা কথা বলবে না – ২২:৩০।
সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঘোলা করবে না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করবে না – ২:৪২।
যদি কোনো ব্যপারে তোমার সঠিক জ্ঞান না থাকে, তাহলে সে ব্যপারে মুখ বন্ধ রাখো। তোমার মনে হতে পারে, এসব সামান্য ব্যপারে সঠিকভাবে না জেনে কথা বললে অত সমস্যা নেই। কিন্তু তুমি জানো না, সেটা হয়ত আল্লাহর কাছে কোনো ভয়ঙ্কর ব্যপার – ২৪:১৪, ২৪:১৬।
মানুষকে বিচক্ষণভাবে, মার্জিত কথা বলে  আল্লাহর পথে ডাকবে। তাদের সাথে অত্যন্ত ভদ্র, শালীনভাবে যুক্তি তর্ক করবে – ১৬:১২৫।

“একজন সাবধানকারী”

এখানে আল্লাহ تعالى যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা হলো –  نَذِيرًا যা ইনযার থেকে এসেছে। ইনযার অর্থ এমন খবর জানানো, যেটা জানার পর মানুষ সাবধান হয়ে যায়, চিন্তিত হয়ে পড়ে। ইনযার হচ্ছে ভালবাসার সাথে, উৎসাহের মাধ্যমে সাবধান করা, যাতে মানুষ নিজের ইচ্ছায় ভুল দিকে না যায়। যেমন, ছোট বাচ্চাদেরকে আগুন, সাপ ইত্যাদির খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে সাবধান করে দেওয়া, যাতে তারা সেগুলো নিয়ে চিন্তা করে, বুঝে শুনে সেগুলো থেকে দূরে থাকে। এটা কোনো ভয়ভীতি দেখিয়ে সাবধান করা নয়।

আপনি যদি কাউকে বলেন, “তিন দিন সময় দিলাম, মুসলিম হও। নাইলে কিন্তু…” – এটা ইনযার নয়। ইনযার ব্যবহার করে আল্লাহ আমাদেরকে শেখাচ্ছেন যে, অমুসলিমদেরকে, এমনকি ঘোরতর কাফিরদেরকেও ভালবাসার সাথে, উৎসাহের সাথে ইসলামের দিকে ডাকতে হবে, তাদের ভুল ধারণার পরিণতি সম্পর্কে সাবধান করতে হবে। কোনো ধরণের ভয়ভীতি, জোর করা যাবে না।

“তোমাকে আগুনের সাথীদের ব্যাপারে জবাব দিতে হবে না”

অন্যদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে আমরা অনেক সময় তাদের অনাগ্রহ, বিদ্বেষ, ইসলাম সম্পর্কে আজেবাজে সব কথাবার্তা শুনে হতাশ হয়ে পড়ি। নিজেদের ভেতরে একসময় জিদ তৈরি হয়: কেন দাওয়াত দিয়ে লাভ হচ্ছে না? একসময় সেই জিদ হতাশায় পরিণত হয়: আমাকে দিয়ে কী শেষ পর্যন্ত হবে না?

এই আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে শেখাচ্ছেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে দাওয়াত দেওয়া — প্রথমে বার বার সুখবর দেওয়া, তারপর সাবধান করে দেওয়া। এরপরেও কেউ যদি না শোনে এবং জাহান্নামে যায়, তাহলে তাদের ব্যাপারে আমাদের জবাব দিতে হবে না।

একজন দাঈ’র সফলতা নির্ভর করে না: সে ফেইসবুকে কয়টা লাইক পেল, কয়জন তার কথা শুনে ইসলামের পথে আসলো। আমরা যদি নবিদের জীবনী দেখি: নবি নুহ عليه السلام ৯৫০ বছর দাওয়াহ দিয়ে মাত্র কয়েকজনকে মুসলিম করতে পেরেছিলেন। তাই ইসলামের পথে কাজ করতে গেলে আমাদেরকে সবসময় আমাদের নিয়তের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে: আমরা যা কিছুই করছি, তা কি শুধুমাত্র আল্লাহর تعالى জন্য, না এর সাথে অন্য কোনো উদ্দেশ্যও কাজ করছে?[১১]

ইসলামের জন্য বছরের পর বছর কাজ করেও যদি আমরা একজনকেও ইসলামের পথে আনতে না পারি, শেষ পর্যন্ত কোনোদিন ইসলামের শাসন কায়েম করতে না পারি, অন্যদেরকে হারাম কাজ করা থেকে দূরে সরাতে না পারি — তারপরেও আমরা সফল হবো, যদি আমাদের সব চেষ্টা হয় শুধুমাত্র আল্লাহর تعالى সন্তুষ্টির জন্য। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে আমাদের নিয়তের জন্য জবাব দিতে বলবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের নিয়ত ঠিক আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।[১১]

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • [২৫৮] “Why We Love Bad News More Than Good News.” Available at: http://www.psychologytoday.com/blog/wired-success/201411/why-we-love-bad-news-more-good-news (Accessed: 2 December 2014).
  • [২৫৯] Markman, Art. “Why Hearing Good News or Bad News First Really Matters” http://www.psychologytoday.com/blog/ulterior-motives/201406/why-hearing-good-news-or-bad-news-first-really-matters (Accessed: 2 December 2014).
  • [২৬০] “Reconciling Islam and Modern Science: from schizophrenia to harmony (18 Nov 2010)” http://podcasts.ox.ac.uk/reconciling-islam-and-modern-science-schizophrenia-harmony-18-nov-2010
  • [২৬১] “Twenty Five Prophets Mentioned in the Holy Qur’an” http://www.iqra.net/articles/muslims/prophets.php
  • [২৬২] “Two Hundred Verses about Compassionate Living in the Quran” http://www.themuslimtimes.org/2013/10/human-rights/three-hundred-verses-about-compassionate-living-in-the-quran

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—


ডাউনলোড করুন কুর‘আনের কথা অ্যাপ

One thought on “আমি অবশ্যই তোমাকে সত্য দিয়ে পাঠিয়েছি — আল-বাক্বারাহ ১১৯”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *