কুরআনের কথা

বাবা-মা এবং নিকটজনদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে উইল-ওসীয়ত করে যাবে — আল-বাক্বারাহ ১৮০-১৮২

—সম্পত্তি নিয়ে মানব সভ্যতার সূচনা থেকে নানা ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে। আজকের আধুনিক যুগেও বর্বরতা একটুও কমেনি। ধনী, গরিব, উন্নত, অনুন্নত, মুসলিম প্রধান, অমুসলিম প্রধান সব দেশেই সম্পত্তি নিয়ে ভয়ঙ্কর সব পাশবিক ঘটনা ঘটে।[৩২৪] একারণে কুর’আনে আল্লাহ تعالى আমাদের কঠিনভাবে সম্পত্তির সঠিক ভাগবাটোয়ারা করে দিতে বলেছেন। বিশেষ করে উত্তরাধিকারদের সঠিকভাবে ওসীয়ত বা উইল করে যাওয়া মুসলিমদের জন্য ফরজ।[১২][৮] দুঃখজনকভাবে মুসলিমরা যতখানি নামাজ, রোজার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়, কুর’আনে অন্যান্য ফরজ নির্দেশগুলোর ব্যাপারে ততখানিই উদাসীন থাকে। যার ফলাফল হয় ভয়াবহ, আর দোষ হয় মুসলিম সমাজের, সর্বোপরি ইসলামের।

তোমাদের উপর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যে, তোমাদের কেউ যখন মৃত্যুশয্যায় পৌঁছে যায়, তখন যদি যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যায়, তাহলে বাবা-মা এবং নিকটজনদের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে উইল/ওসীয়ত করে যাবে। যারা আল্লাহর প্রতি সাবধান—মুত্তাক্বি, তাদের জন্য তা বাধ্যতামূলক।[১৮০] কেউ যদি উইল/ওসীয়ত শোনার পরেও তাতে পরিবর্তন করে, তাহলে তার উপর সমস্ত গুনাহ হবে। সাবধান! আল্লাহ অবশ্যই সব শোনেন, সব জানেন।[১৮১] কিন্তু কেউ ওসীয়তকারীদের বা সাক্ষীদের থেকে পক্ষপাতিত্ব বা অন্যায়ের আশংকা করে যদি তা তাদের মধ্যে সংশোধন করে দেয়, তাহলে তার কোনোই গুনাহ হবে না। অবশ্যই আল্লাহ অনেক ক্ষমা করেন, তিনি নিরন্তর দয়ালু।[১৮২] [আল-বাক্বারাহ ১৮০-১৮২]

আজকাল আধুনিক মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে একধরনের বিতৃষ্ণা কাজ করতে দেখা যায়। বিশেষ করে অমুসলিমদের নানা ধরনের অপপ্রচারের কারণে তারা বিভ্রান্ত হয়ে মনে করেন যে, ইসলামের উত্তরাধিকার আইন আজকের যুগের জন্য অচল। যেমন, একটি বহুল আলোচিত ব্যাপার হচ্ছে মেয়েদেরকে ছেলেদের অর্ধেক সম্পত্তি দেওয়া নিয়ে বিতর্ক। এই বলে অভিযোগ করা হয় যে, ইসলাম মেয়েদেরকে ছোট করে দেখে, ছেলেদের থেকে অর্ধেক সম্পত্তি দেয়। দুজন মেয়ের সাক্ষীকে একজন ছেলের সাক্ষীর সমান মনে করে। ইসলাম মেয়েদেরকে সমান অধিকার দেয় না, সমান সম্পত্তি দেয় না ইত্যাদি।

প্রথমত, ইসলাম পুরুষ এবং মহিলার মধ্যে সম্পত্তির ‘সমান’ বণ্টন করে না, বরং সম্পত্তির ‘সুষম’ বণ্টন করে। সুষম বণ্টন না করে সমান বণ্টন করলে দেখা যায়: কোনো পরিবারের এক ছেলে এবং এক মেয়ে সমান সম্পত্তি পায়, তারপর ছেলেটা বিয়ে করে আরেকটা মেয়েকে মোটা অংকের দেন মোহর দেয়, পরিবারের ভরণ পোষণের সব খরচ দেয়। আর মেয়েটা বিয়ে করে আরেক ছেলের কাছ থেকে মোটা অংকের দেন মোহর পায়। তার স্বামীর কাছ থেকে ভরণ পোষণের সব খরচ পায়। এভাবে ছেলেরা সম্পত্তি হারাতে থাকে, আর মেয়েরা সম্পত্তি লাভ করতে থাকে।[৩২৫]

এছাড়া ছেলেদের জন্য পরিবারের ভরণ পোষণ করা বাধ্যতামূলক। ইসলামী আইনে মেয়েরা একটা টাকাও পরিবারের জন্য খরচ করতে বাধ্য নয়। মা তার ভরণ পোষণ পাবেন তার ছেলের কাছ থেকে। বোন পাবে ভাইয়ের কাছ থেকে। মেয়ে পাবে বাবার কাছ থেকে। যদি কোনোই পুরুষ সম্পর্ক না থাকে, তাহলে ইসলামী সরকারের দায়িত্ব সেই মেয়ের ভরণ পোষণ দেওয়া। ইসলামে মেয়েদের ভরণ পোষণ দেওয়ার সব ব্যবস্থা করা আছে, যেন জীবিকার জন্য তারা কখনো কাজ করতে বাধ্য না হয়।[৩২৫]

যদি সম্পত্তির সুষম বণ্টন না করে, সমান বণ্টন করা হয়, তাহলে ছেলে-মেয়ের মধ্যে বংশ পরম্পরায় সম্পত্তির ব্যবধান বাড়তেই থাকবে, যা মেয়েদের জন্যই বিরাট ঝুঁকির কারণ হয়ে যাবে। ফলাফল হবে: “সম্পত্তি লিখে না দেয়ায় গলা টিপে মাকে খুন [দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫], সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজ স্ত্রী জবাই করে হত্যা করেছে স্বামীকে। [সংবাদ ২০ মে ২০১৫]” —এই ধরণের পাশবিক ঘটনাগুলো।

দ্বিতীয়ত, যারা মেয়েদের অর্ধেক সম্পত্তি পাওয়া নিয়ে গলাবাজি করছেন, তারা কেউ কিন্তু বলছেন না যে, ইসলামে মেয়েরা কিছু পরিস্থিতিতে ছেলেদের সমান, ছেলেদের থেকে বেশি, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সব সম্পত্তি মেয়েরাও পায়, যেখানে ছেলেরা কিছুই পায় না। ইসলামে মেয়েদের সম্পত্তির পরিমাণ ছেলেদের অর্ধেক, সমান, বেশি বা সব সম্পত্তি হবে কিনা, তা নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর—

১) মহিলা কখন পুরুষের সমান সম্পত্তি পাবে:

কেউ যদি বাবা-মা এবং একটি সন্তান রেখে মারা যায়, তাহলে বাবা এবং মা সমান সম্পত্তি পাবেন, যা মৃতের সম্পত্তির ছয়ভাগের একভাগ। [আন-নিসা ৪:১১]

মৃতের আপন ভাই ও আপন বোন সম্পত্তির সমান সমান ভাগ পায়।[৩২৫]

২) মহিলা কখন পুরুষের থেকে বেশি সম্পত্তি পাবে:

কেউ যদি একজন আপন বোন, এবং তিন-জন সৎ ভাই রেখে মারা যায়, তাহলে আপন বোন অর্ধেক সম্পত্তি পাবে। বাকি অর্ধেক সমানভাবে সৎ-ভাইদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। এভাবে বোন পাবে ভাইদের থেকে বেশি।[৩২৫]

৩) মহিলা কখন সব সম্পত্তি পাবে, পুরুষ কিছুই পাবে না:

যদি কোনো মহিলা তার স্বামী, আপন বোন এবং সৎ ভাই রেখে মারা যান, তাহলে সৎ ভাই কোনো সম্পত্তি পাবে না। অর্ধেক সম্পত্তি যাবে বোনের কাছে, বাকি অর্ধেক স্বামীর কাছে।[৩২৫]

এভাবে দেখা যায় যে, ইসলামী উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে ঢালাওভাবে যে সব অপপ্রচার চলছে সেগুলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আল্লাহ تعالى আমাদেরকে যেই আইন দিয়েছেন, সেটা ঠিকভাবে মেনে চললে পুরুষ-মহিলার মধ্যে সম্পত্তির বৈষম্য দূর করা যাবে, পুরুষ তার দায়িত্ব অনুসারে যথাযথ সম্পত্তি পাবে, মহিলা তার দায়িত্ব অনুসারে যথাযথ সম্পত্তি পাবে। সম্পত্তির সুষম বণ্টন হবে।[৩২৫]

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, পুরুষ এবং মহিলা কখনই সমান নয়, এমনকি আধুনিক যুগে, আধুনিক আইন এবং সমাজ ব্যবস্থাতেও নয়। যারা পুরুষ এবং মহিলাকে সমান বলতে চান, তাদেরকে যদি জিগ্যেস করা হয়: “সন্তানসম্ভবা মায়েদের সন্তান জন্ম দানের আগে ও পরে বেতন, ছুটি দেওয়া হয়, কিন্তু বাবাদের বেলায় দেওয়া হয় না কেন, যদিও কিনা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মা মারা যায়?” “মেয়েরা কঠিন শারিরিক পরিশ্রম, ভারি মাল পরিবহণ, মেনহোল, সুয়ারেজ পরিস্কার, ট্রাক চালানো এসব কাজ করে না কেন?” “মেয়েরা রাতে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে না কেন?” —তখন তাদের আসল চেহারা বের হয়ে যায়।

সূত্র:

নতুন আর্টিকেল বের হলে জানতে চাইলে কু’রআনের কথা ফেইসবুক পেইজে লাইক করে রাখুন—

Exit mobile version